Ketaki Kushari Dyson: An exceptional personality | Robbar
Robbar
  • ৬ আশ্বিন ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নারী, নগরী ও কেতকী কুশারী

কেতকী কুশারী ডাইসন গত শতকের ছয়ের দশকে কথাসাহিত্য ও কবিতা লিখতে শুরু করলেন। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল হাজার কুড়ি শব্দের উপন‍্যাস ‘নারী, নগরী’। নাম থেকেই বোঝা যায়, কী ছিল তাঁর লেখার অভিমুখ। তাঁর সে উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল একাধিক দেশ ও সংস্কৃতির আকর্ষণ ও বিকর্ষণের হালকা কৌতুক মেশানো বিবরণ।

শেষ আপডেট: সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ১৭:৩৪   
Facebook WhatsApp Messenger

১০.

‘মুখুজ্জের লিটফেস্ট’ শিরোনামে সাহিত্য জগতের কিছু অভিজ্ঞতার কথা মাস চারেক ধরে লিখছি। এখনও পর্যন্ত যা লিখেছি, সবই উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন ভাষার মানুষজনদের নিয়ে। এঁদের সঙ্গে প্রায় চার দশকের সম্পর্ক। এঁদের মধ্যে কেউ লেখক, কেউ আবার কথক। সঙ্গে সংসার ও সমাজের সাধারণ মানুষের কথাও এসেছে। এর মধ্যে লেখক ও কথকদের পারিবারিক লোকজনের কথা আছে, আবার পাঠক ও শ্রোতাদের কথাও আছে। তাঁদের জীবন ও জীবিকার প্রসঙ্গও কোথাও কোথাও এসেছে।

zoom
কেতকী কুশারী ডাইসন

এবার একটু বাইরে থেকে ঘরের দিকে ফেরা যাক। কেতকী কুশারী ডাইসন গত ১২ সেপ্টেম্বর জীবনের ইতি টেনে চলে গেলেন। এই কলকাতা শহরে জন্মেছিলেন ৮৬ বছর আগে ১৯৪০ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের স্মৃতি তাঁর আত্মকথনে ধরা আছে। রয়েছে বাবার কর্মসূত্রে তৎকালীন মহকুমা শহর মেহেরপুরে শৈশব কাটানোর বর্ণময় স্মৃতি। তারপর একসময় কলকাতার স্কুল ও কলেজে পড়ার কথাও। বাংলা, ইংরেজি ও স্প‍্যানিশ ভাষায় তাঁর লেখাপত্রের কথা সবারই জানা, কিন্তু সংস্কৃত ভাষার প্রতিও তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল। কলেজ-জীবনের প্রথমদিকে নিজের উৎসাহে সংস্কৃত ভাষায় প্রবন্ধ লিখেছিলেন, আর লেখার গুণে অনেকের চোখে পড়েছিল। কলেজের পত্রিকাতে ছাপাও হয়। সুকুমারী ভট্টাচার্যের স্নেহ ও ভালোবাসা পান মূলত এই সংস্কৃত ভাষার সূত্র ধরে। পরে তা আরও গভীর হয়। যতদিন সুকুমারী ভট্টাচার্য বেঁচেছিলেন, ততদিন সে সম্পর্কে কোনও ছেদ পড়েনি।

zoom
বিলেতে ছাত্রী কেতকী কুশারী

কলেজের ‘ডাকসিদ্ধ’ ছাত্রী কেতকী কুশারী ২০ বছর বয়সে বিলেত যান উচ্চতর শিক্ষার জন্য। সেখানেও ছাত্রী হিসেবে সবার নজর কাড়েন। অন্যদিকে অক্সফোর্ড তাঁর অভিজ্ঞতায় অনেকখানি বিস্তার আনল। যে কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের গুণমানের একটি অন‍্যতম মাপকাঠি হল, সেখানে বিশ্বের কতগুলি দেশের ছাত্রছাত্রীরা পড়তে ও গবেষণা করতে আসে। সেদিক দিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়। নানা দেশের ছাত্রছাত্রী ও গবেষকদের সঙ্গে পরিচয় ও বন্ধুত্ব গড়ে উঠল, যার প্রভাব তাঁর পরবর্তী সময়ের সৃজনশীল ও মননশীল লেখার মধ্যে প্রকাশ পেল। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর সময়ের আর এক শিক্ষার্থী রবার্ট ডাইসনের সঙ্গে ছয়ের দশকের মাঝামাঝি তাঁর বিয়ে হল। ওই দশকের শেষদিকে দু’টি সন্তান হল। নাম দিলেন ভার্জিল পূজারী ডাইসন ও ইগোর নীলাদ্রি ডাইসন। সাংস্কৃতিক যে বহুত্ববাদ পরবর্তী সময়ে তাঁর চর্চার অন্যতম বিষয়, তার সূচনা তাঁর সংসারেই। ‘ভার্জিল’ হচ্ছেন বিখ্যাত রোমান কবি, আর স্ক‍্যান্ডিনেভীয় শব্দ ‘ইগোর’ বলতে বোঝায় প্রজনন ও শান্তির দেবতা ইংয়ের রক্ষাকর্তা। নামের বাকি দু’টি শব্দের মধ‍্যেও দু’টি মহাদেশ ধরা আছে তাদের সংস্কৃতি-সহ।

zoom
স্বামী, দুই পুত্র ও সুমনা দাস সুরের সঙ্গে কেতকী কুশারী ডাইসন; ছবি সৌজন্য: সুমনা দাস সুর

জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি কেতকী কুশারী ডাইসন গত শতকের ছয়ের দশকে কথাসাহিত্য ও কবিতা লিখতে শুরু করলেন। ‘দেশ’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল হাজার কুড়ি শব্দের উপন‍্যাস ‘নারী, নগরী’। নাম থেকেই বোঝা যায়, কী ছিল তাঁর লেখার অভিমুখ। তাঁর সেই উপন্যাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল একাধিক দেশ ও সংস্কৃতির আকর্ষণ ও বিকর্ষণের হালকা কৌতুক মেশানো বিবরণ। যেমন এক জায়গায় লিখেছিলেন–

এক নম্বর ঘরের টিমথি ওয়‍্যার তখন জেরুজালেমে হিব্রু শাস্ত্রে নিমগ্ন ছিল। তার গ্রন্থসমাকুল ঈষদন্ধকার একতলার ঘরে তাত্ য়ান থাকতে এল। আমার ঘরের নিচেই। টিমথি থাকাকালীন তার গ্রামোফোন থেকে যে নিরন্তর গ্রেগরিয়ান সংগীতের ওঠাপড়া এবং জোরালো আলোচনার সঙ্গে টিমথি-এডওয়র্ডের কাষ্ঠভেদী যুক্ত-অট্টহাস্য তাদের ছাদ এবং আমার মেঝে বিদীর্ণ করত, তার বদলে এক নম্বরে এল এক নতুন মার্জিত নীরবতা। মারিয়া আমাদের বললেন তাত্ য়ানার সঙ্গে ভাব করতে, কিন্তু সাবধানে। প‍্যারিসের মেয়ে তো, কখন কী ভাবতে কী ভেবে বসে ঠিক নেই। অধিকাংশ সময়ই এক নম্বরের অভ‍্যন্তরে প্রাণীর অস্তিত্ব অনুভব করা যেত না। কারণ তাত্ য়ানা অধিকাংশ সময়ই লাইব্রেরিতে থাকত এবং যে সময়টুকু ঘরে থাকত তখনও চুপ করে পড়াশোনা করত।

zoom
‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ বইয়ের প্রচ্ছদ

কেতকী কুশারীর প্রথম কবিতার বই আকার পেল সাতের দশকের শেষ দিকে। তাঁর সবচেয়ে আলোচিত উপন্যাস ‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ আটের দশকের প্রথম দিকে ধারাবাহিকভাবে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হল। বইয়ের আকার পেল ১৯৮৩ সালে। তাঁর লেখার গুণে ১৯৮৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী দাসী পদক এবং প্রফুল্লকুমার-স্মৃতি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন। ১৯৮৮ সালে বাংলা ও ইংরেজি মিলে তাঁর বইয়ের সংখ্যা ছিল ১১টি। প্রবন্ধের বই ‘ভাবনার ভাস্কর্য’ তখন প্রকাশের মুখে।

zoom
‘ভাবনার ভাস্কর্য’ বইয়ের প্রচ্ছদ

১৯৮৮ সালে যে বইটি তাঁকে সর্বভারতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এল, সেটি হল সাহিত্য অকাদেমি প্রকাশিত ‘In Your Blossoming Flower-Garden: Rabindranath Tagore and Victoria Ocampo’। এর আগে রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে আমাদের একটি মূল্যবান অবলম্বন ছিল সাহিত্য অকাদেমি থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের জন্মের শতবার্ষিকী সংকলনটি। সেখানে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো প্রায় ১২ হাজার শব্দের একটি প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছিলেন। প্রবন্ধের এক জায়গায় আছে, ওকাম্পো ইংরেজি অনুবাদে বোদলেয়ারের (১৮২১-১৮৬৭) কবিতা পড়ে শোনাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথকে, আর কবি তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলছেন, ‘বিজয়া, তোমার ফার্নিচার কবিকে আমার ভাল লাগছে না।’ ফরাসি সাহিত্যের দিকপাল কবিকে ‘আসবাব কবি’ বলাতে ওকাম্পো না-হেসে পারেননি। বুঝেছিলেন, অনুবাদে সব গোলমাল হয়ে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের শতবর্ষে সে ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছিলেন, ‘Translations can be often murderous’। লেখাটির একেবারে শেষদিকে ছিল–

During his stay at San Isidro, Tagore taught me a few words of Bengali. I have retained only one, which I shall always repeat to India: ‘Bhalobasa’.
‘There is no history but of the soul.’

zoom

ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো মারা যান ১৯৭৯ সালে, আর তার তিন বছর পরে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্র ভবনের অধ্যক্ষ শিবনারায়ণ রায়ের উৎসাহে ও উপাচার্য অম্লান দত্তের সম্মতিতে কেতকী দায়িত্ব নেন রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর চিঠিপত্র সম্পাদনার। সে-কাজে সমর্থনের আশ্বাস মিলেছিল আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আইরেসের ‘সুর’ পত্রিকার (১৯৩১-১৯৯২), যার সূচনা করেছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। কেতকী তারপর তিনটি মহাদেশ ঘুরে নানা তথ্য সংগ্রহ করে যে বই লিখলেন, তার ভূমিকা অংশ, উৎস-নির্দেশ-সহ, ৩৭০ পৃষ্ঠার। রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোর চিঠিপত্রগুলি ৮২ পৃষ্ঠা ধরে টীকা সমেত ছাপা হল। ৩৩টি এমন ছবি ছাপা হল, যা আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। বইটিতে বেশ কিছু মানবিক সম্পর্কের কথা এসেছে, যার সন্ধানে কেতকী খুঁজেছেন এলমহার্স্টের নথি থেকে ওকাম্পোর কাগজপত্র। তাঁর মনে হয়েছিল, রবীন্দ্রনাথ এবং বাকি দু’জনের সম্পর্ককে আদর্শবাদের কল্পনাবিলাস থেকে বেরিয়ে বাস্তবের কষ্টিপাথরে বিচার করা দরকার, তা সে যতই জটিল হোক।

zoom
রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পো

বইটি প্রকাশের পর বেশ বিতর্ক হয়েছিল। কেউ সহজভাবে গ্রহণ করেছিলেন, কেউ আবার নিন্দামন্দও করেছিলেন। তিনজনের সম্পর্ক নিয়ে এমন খোলামেলা আলোচনা পছন্দ করেননি। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনাটি ঘটেছিল কেতকী কুশারী যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছিলেন তার একটিতে। সাহিত্য অকাদেমির রীতি হল কিছু গুরুত্বপূর্ণ নতুন বই বিশিষ্ট কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাতে বিশিষ্টজনেরা পড়েন। অকাদেমির বিক্রয় বিভাগের প্রধান, অরুণ কাঞ্জিলাল সে উদ্দেশ্যেই বইটি দিতে গিয়ে ধমক খেয়ে ফিরে এসেছিলেন। এর কারণ হল, সাহিত্য অকাদেমির মতো একটি বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান কেন এমন অশালীন বই প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে এও বলেছিলেন যে, তাঁদের পক্ষে এটা ‘disgrace’ যে, তাঁদের এক প্রাক্তন ছাত্রী বইটি লিখেছেন।

zoom
সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়

এর প্রায় ২৫ বছর পরে আর একটি ঘটনার সাক্ষী ছিলাম। সাক্ষী না বলে আসামিও বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ ও ওকাম্পোকে মূল চরিত্র হিসেবে রেখে, একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবেন আর্জেন্টিনার এক পরিচালক। চিত্রনাট্যও জমা দেন। আমার উপর দায়িত্ব ছিল, সেটি নিজে পড়া এবং কয়েকজন রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে মতামত নেওয়ার। ব‍্যক্তিগতভাবে চিত্রনাট্যে আমার আপত্তিকর কিছু আছে বলে মনে হয়নি। তাছাড়া প্রতিটি স্বাক্ষরিত লেখার দায় যেমন লেখকের, তেমন চলচ্চিত্রের দায় পরিচালকের। চিত্রনাট্যটি যাঁদের কাছে পাঠানো হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন সোমেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বয়েস তখন ৮৫-৮৬ বছর । তিনি ছবিটি করার পক্ষে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। বাধা এসেছিল ভিতর থেকে। এমন বিষয়ের উপর ছবি শান্তিনিকেতনে শুটিং করতে দেওয়া যাবে না, এমনই একটা মত দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ছবিটি তৈরি হয়েছে বলে শুনেছি, তবে যতদূর জানি শান্তিনিকেতনের বাইরে সেট তৈরি করে। আসলে মহাত্মা গান্ধী যাকে বলেছিলেন ‘ভয়ের ভয়’ সেটা বোধহয় নানা সময়ে আমাদের উপর ভর করে।

zoom

১৯৯০ সালে দেবেশ রায় তাঁর ‘তিস্তাপারের বৃত্তান্ত’ উপন্যাসটির জন্য সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেলেন। বেশ আলোড়ন ফেলেছিল বইটি; কারণ একটি বিস্তৃত ভূখণ্ডের প্রাকৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিবরণ সেখানে প্রায় ছবির মতো ফুটে উঠেছিল। দেবেশ রায়ের নির্মাণের নতুনত্ব ও অসাধারণ ভাষাশৈলীর কারণে বেশ আলোড়ন তুলেছিল সে বই। অনুবাদের কথাও উঠেছিল। হয়েওছিল বেশ কয়েকটি ভাষায়। ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের জন্য কেতকী কুশারী ডাইসনকে অনুরোধ করা হয়েছিল। তিনি খানিকটা রাজিও হয়েছিলেন, কিন্তু দু’-তিন মাস ধরে তিস্তাপারের প্রকৃতি ও মানুষজনকে দেখতে ও চিনতে চেয়েছিলেন। অকাদেমির ফাইলে এ বিষয়ে চিঠিপত্র মিলবে। কেতকীর মনে হয়েছিল ঠিকমতো অনুবাদের জন্য তিস্তা অঞ্চলের জীবনকে চাক্ষুষ দেখা ও অনুভব করা দরকার। সাহিত্য অকাদেমি সে অর্থ দিয়ে উঠতে পারেনি বলে কেতকী অনুবাদও করে উঠতে পারেননি। তবে অনুবাদের নানা তত্ত্বের মধ্যে এটিও একটি সূত্র। বিশেষ কিছু কিছু বইয়ের অনুবাদের ক্ষেত্রে, ছাপা শব্দগুলিকে নির্ভর করে ভাষান্তর করা কঠিন।

‘নোটন নোটন পায়রাগুলি’ প্রথম প্রকাশের বছর ২০ পরে কিছু পরিবর্তন-সহ নতুন করে প্রকাশ করে ছাতিম বুকস্। যতদূর মনে পড়ে, একইসঙ্গে আর একটি উপন্যাসও দু’-মলাটের মধ্যে আনা হয়েছিল। সেসময় কেতকী কুশারী ডাইসন আমাকে বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের কথা বলেন। আমি খুশি হয়ে রাজি হই কারণ তিনি আমার প্রিয় লেখক। পছন্দের মানুষও। অনুষ্ঠান হয়েছিল ছাতিম বুকস্-এর পার্কস্ট্রিট দপ্তরে। প্রকাশক শুভ্রমণি দে ভিন্ন জীবিকার মানুষ, কিন্তু অত্যন্ত যত্ন করে সে-বই প্রকাশ করেছিলেন। সংগ্রহ করে রাখার মতো সুদৃশ্য ছিল সে বইটি। পরবর্তী সময়ে এঁরাই প্রকাশ করেছিলেন গৌতম ভদ্রের “ন‍্যাড়া বটতলায় যায় ক’ বার?” সে বইটিও বাংলা প্রকাশনার একটি ভালো দৃষ্টান্ত।

zoom
‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ বইয়ের প্রচ্ছদ

পরবর্তী সময়ে কেতকী কুশারী ডাইসন নাটক লিখেছেন, অনুবাদ করেছেন, সুশোভন অধিকারীর সঙ্গে যৌথভাবে ‘রঙের রবীন্দ্রনাথ’ নামে বই লিখে সুরেশচন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছেন। তাঁর মতো বহুমুখী প্রতিভা নবজাগরণের কালে দেখা যেত, কিন্তু বিশ শতকের দ্বিতীয় পর্বে, নবনীতা দেবসেনের মতো দু’-একজনের কথা বাদ দিলে, প্রায় চোখেই পড়ত না।

zoom
‘দুখে কেওড়া’ বইয়ের প্রচ্ছদ

একটি ব‍্যক্তগত কথা দিয়ে শেষ করি। আমার লেখালেখির কথা জিজ্ঞেস করতেন। তাঁকে আমার ‘দুখে কেওড়া’ উপন্যাসটি দিই। খুব খুশি হয়ে বললেন যে, শান্তিনিকেতনে যাচ্ছেন, আর সেখানে গিয়ে নিশ্চিন্ত মনে বইটি পড়বেন। বোলপুরে গেলেন আর কিছুদিন পরে ফিরেও এলেন। সাহিত্য অকাদেমির কলকাতা দপ্তরে এসে উপন্যাসটির কথা উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলতে লাগলেন। সে উচ্ছ্বাস একটু পরেই উপন্যাসের সাহিত্যগুণ থেকে খাদ‍্যগুণে সরে গেল। আমার উপন্যাসটি একজন বৃদ্ধ খেতমজুরকে নিয়ে। তার নাম দুখে কেওড়া। তার ব‌উ ফুলু দেশি মদ ‘কাঁচি’ তৈরি করে, আর সন্ধেয় সে বেচে। মদের চাটের মধ্যে একটি হল ছাগলের ভুঁড়িচচ্চড়ি। ছাগলের পেটের ভিতর নলের মতো যে ধমনী ইত্যাদি থাকে, সেগুলো ভালো করে পরিষ্কার করে পেঁয়াজ, লঙ্কা, নুন, তেল ও মশলা দিয়ে ভাজা। মদের চাট হিসেবে বাঁকুড়া জেলায় বেশ জনপ্রিয়। কেতকী কুশারী ডাইসন শান্তিনিকেতনে উপন্যাসটি পড়ে, ছাগলের ভুঁড়ি আনিয়ে, চচ্চড়ি করে খান। যাঁরা কেতকীর লেখার সঙ্গে পরিচিত তাঁরা জানেন যে, খাদ্য সংস্কৃতি ছিল ওঁর বহুজাতিক চিন্তার অন্যতম একটি ভাবনার ক্ষেত্র। যে ভারতবর্ষের কথা উ‌ইলিয়ম জোন্স আঠারো শতকের আটের দশকে উল্লেখ করেছিলেন, তার বিস্তার ছিল বহুদূর পর্যন্ত। ভাঙতে ভাঙতে এখন তা অনেকটাই ছোট হয়ে গেছে, তবু যে সেতু এখনও আমাদের পরস্পরের সঙ্গে যোগ করে রেখেছে তা হল খাদ্য।

কেতকীদি বহন করে গেছেন রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার। তিনি বাঙালি ছিলেন ঠিকই কিন্তু ঘরকুনো নন। বিশ্বজোড়া মন নিয়ে বেঁচেছেন এবং লিখেছেন‌ও।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন মুখুজ্জের লিটফেস্ট-এর অন্যান্য লেখা

……………………….

bankura Hebrew Ketaki Kushari Dyson Memoir Nabaneeta Dev Sen obituary Oxford University Rabindranath Tagore Roman Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Second World War Sukumari Bhattacharya Sushobhan Adhikary Victoria Ocampo

Share this article on