Bhakti Movement Shaped Bengali Society and Culture। Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

ভক্তিই শক্তি

যে চৈতন্যদেব পদাবলি সাহিত্যকে বিশেষ বিস্তার ও রূপদানে সাহায্য করেছিলেন, তিনি কি বীর নন? সেই সময় সমাজের জাতিপ্রথার অমানবিকতাকে যেভাবে তিনি প্রতিহত করেছিলেন, তা কি সহজ কাজ? প্রশাসনের নজরের সামনে দিয়ে যেভাবে কীর্তন প্রচার করেছিলেন, তা কি সাহসের কাজ নয়? নবদ্বীপ, বৃন্দাবন, পুরী– তিন জায়গায় বাঙালির ভক্তিধর্ম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এইভাবে বঙ্গের বাইরে বঙ্গজ ধর্মধারাকে তাঁর আগে আর কেউ প্রবাহিত করতে পেরেছিলেন কি?

Published by: Robbar Digital

Posted:June 23, 2026 9:17 pm | Updated:June 24, 2026 3:36 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৮.

বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলি গান ও কবিতা হিসেবে বহুশ্রুত, বহু পঠিত। রাধা-কৃষ্ণের প্রেম কথা বাঙালির প্রাণের কথা। এই পদাবলির ধারাটিকে কেউ কেউ সাদরে রসসাহিত্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আবার কেউ কেউ প্রেমের কবিতার সামাজিক ইতিহাস আলোচনার সূত্রে পদাবলির বিচার করেছেন। প্রেমের কবিতার সামাজিক ইতিহাস পর্যালোচনার ধারাটি বাঙালির সমাজ-রাজনীতি বোঝার জন্য বেশ কাজে লাগে। বঙ্কিমচন্দ্রের কথাই ধরা যাক।

বঙ্কিম ভাবার চেষ্টা করছিলেন চৈতন্যদেবের প্রেমধর্ম ও পদাবলি সাহিত্য বাঙালিকে জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে, না কি বাঙালি-চরিত্রের উদ্যম, বীরত্ব ইত্যাদি গুণ বিনষ্ট করেছে! চৈতন্যদেবের বৈষ্ণবতা বঙ্কিমচন্দ্রের মতে পূর্ণসত্য নয়। তাঁর মনে হয়েছিল, বাঙালি চরিত্রকে এই পদাবলি অলস, গৃহসুখপরায়ণ করে তুলেছে। এই পদাবলি অলস গৃহসুখপরায়ণ করে তুলল কীভাবে? তাঁর মত, যে ভূখণ্ডে বাঙালির বসবাস, সেখানে সহজেই চাষাবাদ হয়। তাই আর্যজাতির পুরুষেরা এই ভূখণ্ডে এসে সহজ উৎপাদনশীল ভূমির প্রভাবে অলস হয়ে পড়ল। অল্প আয়াসে উৎপন্ন ধান্য তাদের ক্ষাত্রতেজ হরণ করল। তারা প্রেমের গান লিখতে বসল, ক্রমশ এই কান্ত-কোমল পদাবলি তাদের জাতীয় সংগীত হয়ে উঠল। এই প্রেমের গানের বৈষ্ণবতা বঙ্কিম পছন্দ করেননি।

zoom
নৃত্যগীতরত চৈতন্য, ছাপাই ছবি

তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে যে সন্তানদলের কথা তিনি লিখেছিলেন, তাঁদের বৈষ্ণবতার চরিত্র আলাদা। রাক্ষস দলনকারী ঐশ্বর্যশালী দেবতা মুরারি বিষ্ণুর তাঁরা উপাসক। যে ‘কৃষ্ণচরিত্র’ রচনা করেছিলেন বঙ্কিম, তাতে কৃষ্ণের গোপীবিলাসকে অনৈতিহাসিক ও পরবর্তীকালের প্রক্ষেপ বলে নির্দেশ করেছিলেন। পদাবলির জগৎ থেকে বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালিকে অরিদমনকারী বৈষ্ণবতার জগতে নিয়ে আসতে চাইলেন। বাঙালির জাতীয় চরিত্রের নিহিত আলস্যকে দূর করে ‘বন্দে মাতরম্‌’ মন্ত্রে দীক্ষিত করাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য।

এদিকে আবার পিছন ফিরে দেখলে টের পাওয়া যাবে, কৃত্তিবাসী রামায়ণে বিষ্ণুভক্ত গরুড় রামের অস্ত্রধারী রূপ দেখে বিরক্ত। ইন্দ্রজিতের বাণে নাগপাশে রাম-লক্ষ্মণ আচ্ছন্ন। গরুড় এসেছে তাঁদের উদ্ধার করতে। আসামাত্র সাপেরা পালিয়েছে। রাম-লক্ষ্মণ মুক্ত। বানর-সেনাদের উল্লাসের অবধি নেই। গরুড় রামকে বলছে, যে মূর্তিতে রাম বংশীধারী, সেই মূর্তি এবার একবার দেখাতে হবে। রামের জবাব: এই যুদ্ধের ময়দানে সেই মুরলীবিলাস দৃশ্য কি দেখানো উচিত! ভক্ত সর্পখেকো পাখি বলছে, গোপনে তার মস্ত ডানা দিয়ে সে একটা ঘর বানাবে। সেই ঘরে তাকে যদি প্রভু সেই প্রেমরূপ দেখান। অগত্যা। রাম আর কী করেন! তির-ধনুক ত্যাগ করে সেই ডানা দিয়ে তৈরি ঘরে ভক্তগরুড়কে প্রেমময় রূপ দেখালেন। খানিক দূরে হনুমান দাঁড়িয়েছিল। পাখির সঙ্গে রামের প্রীতি দেখে সে খুবই বিরক্ত। মনে মনে ভাবছে, প্রভু রামের জন্য সে কত কী করে! লাফ দিয়ে সাগর ডিঙিয়ে মা সীতার খোঁজ এনে দিয়েছে। আর আজ প্রভু কি না পাখিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন! কৃত্তিবাসের রামায়ণে এই সব কথা পড়তে দিব্য লাগে। রাম-রাবণের যুদ্ধের মাঝখানে একটু স্বাদ-বদল। ধনু খসিয়ে রামের হাতে কৃষ্ণের বাঁশি তুলে দিল পাখি।

zoom
ভক্ত গরুড়

বঙ্কিমচন্দ্র সেই বাঁশিটিকেই আবার হরণ করতে চান। প্রেমের গানে বঙ্গদেশের সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে! আর নয়। সাহেবরা বাঙালিদের দিকে তাকিয়ে বলে মেয়েলি হিন্দু। এর জবাব দিতে হবে। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে মেয়েরাও কী পুরুষালি! শান্তি লাফিয়ে উঠে ঘোড়ায় চেপে রণক্ষেত্রের দিকে যায়। বঙ্কিমের ‘দেবী চৌধুরাণী’ উপন্যাসে প্রফুল্ল নামের সাধারণ মেয়ে জ্ঞান-ভক্তি-কর্ম ইত্যাদি যোগচর্চা করে অসামান্যা হয়ে ওঠে। শরীরের চর্চা করে সে, একদিকে যেমন বীর, তেমনই অপরদিকে চিত্তরঞ্জন করার ক্ষমতাতেও অপরিসীম গুণের অধিকারী। বাঙালি নারী-পুরুষের এই বীর ঐশ্বর্যময় রূপ তুলে ধরে বঙ্কিম বোঝাতে চান, বাঙালি মোটেই দীন-হীন বীরত্ব-বিহীন জাতি নয়। বস্তুত পক্ষে, পরের শতকে ইংরেজ-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে বাঙালি বিপ্লবীরা ‘বন্দে মাতরম্‌’ মন্ত্র উচ্চারণ করে মানসিকভাবে দৃঢ় থাকতেন।

এই দৃঢ়তা যেখানে নিঃস্বার্থপর দেশপ্রেম, সেখানে তা একরকম, আর যেখানে তা দৃঢ়তার ছদ্মবেশে হিংসা ও বিদ্বেষ সঞ্চারের উপায়, সেখানে তা আর এক। রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসে দুই বন্ধুর কথা আছে। সন্দীপ আর নিখিলেশ। সন্দীপ বিপ্লবী, নিখিলেশ উদার জমিদার। সন্দীপ ‘বন্দে মাতরম্‌’ মন্ত্রের প্রচারক আর নিখিলেশ দরিদ্র প্রজাদের কীভাবে সুবিধে হয়, তা দেখাশোনা করে। সন্দীপ তার দলচরদের মনে দৃঢ়তা জাগানোর জন্য হিংস্রতা অভ্যেস করায়। একটি ছাগল নির্বিবাদে মাঠে ঘাস খাচ্ছিল। সন্দীপ তার পা কেটে আনতে বলে। এই হিংস্রতার স্বরূপ ক্রমশই সন্দীপের দলের কেউ কেউ টের পায়। সন্দীপ ব্যক্তিগত জীবনেও বিলাসী। অর্থবিলাস ও নারীবিলাস তার প্রিয়। তার বক্তৃতায় মজে অনেকেই এই বিষয়টি খেয়াল করে না। ক্রমে বক্তৃতার বানানো জগতের বাইরে সন্দীপকে চিনতে পারে কেউ কেউ। সন্দীপ ও সন্দীপ-অনুগামী জমিদারদের কৌশলে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সূত্রপাত।

zoom
‘ঘরে-বাইরে’ সিনেমার একটি দৃশ্যে বিমলা ও সন্দীপ

সন্দীপের বন্ধু নিখিলেশ। তার স্ত্রী বিমলা সন্দীপের প্রতি আকৃষ্ট। সন্দীপই তার নারীমোহন শক্তি দিয়ে বিমলাকে আকর্ষণ করেছে। নিখিলেশ তা জানে। বিমলার ওপর নিখিলেশ কিন্তু বল প্রয়োগ করে না। স্বামীসুলভ কর্তৃত্ব দেখায় না। নিখিলেশ বেদনাহত। দুঃখ পেয়েছে। তার মনের বেদনা বৈষ্ণব কবিতায় প্রকাশ করে। রাধা যেমন কৃষ্ণের বিরহে, কখনও কখনও কৃষ্ণের অপর নারী গমনে বেদনার্ত, নিখিলেশও এখানে তেমন। তার মন্দির শূন্য। রায়শেখর ও বিদ্যাপতি– দুয়ের নামেই এই পদ প্রচলিত। রাধার মতো বেদনায় নিখিলেশ ক্রন্দন রত। এই বৈষ্ণব-পদাবলিমুখী নিখিলেশকে কী বলব আমরা? উদ্যমহীন মেয়েলি পুরুষ? ব্যক্তিগত জীবনে বিমলার ওপরে জোর না-খাটানোর দৃঢ়তা যে নিখিলেশ দেখাতে পারে, সেই নিখিলেশই কিন্তু দাঙ্গার সময় হিন্দু-মুসলমানের মাঝখানে নির্ভয়ে দাঁড়াতে পারে। ‘বন্দে মাতরম্‌’ মন্ত্র বলা আপাত বীর বিপ্লবী সন্দীপ দাঙ্গা লাগায়, দাঙ্গা থামায় না।

পদাবলির জগৎ বড় অদ্ভুত। যে চৈতন্যদেব এই পদাবলি সাহিত্যকে বিশেষ বিস্তার ও রূপদানে সাহায্য করেছিলেন, তিনি কি বীর নন? সেই সময় সমাজের জাতিপ্রথার অমানবিকতাকে যেভাবে তিনি প্রতিহত করেছিলেন, তা কি সহজ কাজ? প্রশাসনের নজরের সামনে দিয়ে যেভাবে কীর্তন প্রচার করেছিলেন, তা কি সাহসের কাজ নয়? নবদ্বীপ, বৃন্দাবন, পুরী– তিন জায়গায় বাঙালির ভক্তিধর্ম প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল। এইভাবে বঙ্গের বাইরে বঙ্গজ ধর্মধারাকে তাঁর আগে আর কেউ প্রবাহিত করতে পেরেছিলেন কি?

zoom
চৈতন্যদেব। শিল্পী: গগন ঠাকুর।

পদাবলির জগৎ বড় বিচিত্র। বাঙালির মনোজগৎও তা-ই। তবে বীরত্বের নামে হিংস্রতার প্রচারের পক্ষে শ্রেষ্ঠ বাঙালি চিন্তকেরা কেউই মত দেননি। চৈতন্যদেবের ভাবনা নিয়ে বঙ্কিম তর্ক করতে পারেন, সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু ‘আনন্দমঠ’-এর সন্তানদলের কাজকে তিনি অপশাসনের বিরুদ্ধে বিশেষ আপৎকালীন প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখিয়েছেন। তাকে আদর্শ বলে প্রচার করেননি। সশস্ত্র বিপ্লবীরাও অহেতুক হিংসার বিরোধী ছিলেন। মাস্টারদা সূর্য সেনের অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের ইতিহাস সেকথা প্রমাণ করেছে।

…………… রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা …………..

Anandmath Bankim Chandra Chattopadhyay Bhakti Movement Indian Revolutionary Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sri Chaitanya Surya Sen Vaishnava Padavali Vande Mataram ঘরে-বাইরে দেবী চৌধুরাণী বন্দে মাতরম্

Share this article on