
কেজরিওয়াল, সিসোদিয়া যদি নির্দোষই হন, তাহলে তাঁদের জেল-যন্ত্রণা সইতে হল কেন? কে ফিরিয়ে দেবে তাদের ভেসে যাওয়া দু’-দুটো বছর। যে দু’-বছরে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারাতে হয়েছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে। হারাতে হয়েছে নাম-যশ, সসম্মান। জেলের অন্ধ কুঠুরি হয়েছে তাঁর ক্যাবিনেট। জনতার উপেক্ষা, মিথ্যে সন্দেহে গায়ে লেগেছে কলঙ্কের দাগ। সেই কলঙ্কের রাগমোচন কি করতে পারবে আপ নেতাদের বেকসুর খালাস দেওয়া আদালত কিংবা ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক।
৩৩.
‘অচ্ছে দিন আনেওয়ালা হ্যায়!’
কে না জানে, এই তৃতীয় বিশ্বের দেশে, দিন আনি রাত খাই পাবলিক বা আমজনতার একটাই স্বপ্ন– তা হল জীবনের বাকি দিনগুলোকে খানিক উজিয়ে বাঁচা। যেমন ম্যাদামারা গিয়েছে গতকাল, আগামিদিন যেন সেরকম লতলতে না হয়। একযুগ আগের কথা। সময়টা ওই ২০১৪-র মে-জুন। আকাশে-বাতাসে তখনও, ঠিক আজকের মতো ভোট ভোট গন্ধ। সেই ভ্যাপসা গরমে এক ঝটকায় হিমেল হাওয়া গিফট করেছিলেন দেশের শাসক-প্রধান। বলেছিলেন, ‘অচ্ছে দিন আনেওয়ালা হ্যায়!’ আমরা টের পেয়েছিলাম মহামানব এসে গিয়েছেন। কষ্টের দিন শেষ, সত্যযুগ এল বলে! চায়ের ছাঁকনিতে এবার পাপ-পুণ্যের বিচার হবে। এই সব আকাশ-পাতাল ভাবনায় আমাদের মাথার ঘাম পায়ে শুকিয়েছিল। তবু মনে মনে ভেবেছিলাম, ঈশ্বর বুঝি এবার মুখ তুলে চাইলেন। কিন্তু কাকস্য পরিবেদনা! আমরা, আমজনতা, হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি, কলসির অনেক নিচে ‘অচ্ছে দিন’-এর এক চিলতে জল পড়ে আছে। অনেক মূল্যের নুড়িপাথরের বিনিময়ে সেই ‘অচ্ছে দিনে’ গলা ভিজতে পারে। কবে? তা ভগাই জানে!
কিন্তু এবার?

রকম-সকম দেখে মনে হচ্ছে, অচ্ছে দিন কড়া নাড়ছে দরজায়। নয়তো আদালত চত্বরের বাইরে, সরগরম জনতার সামনে দাঁড়িয়ে কেন হাপুস-নয়নে কাঁদবেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল! ‘দিল্লি লিকার পলিসি কেস’-এ ঠিক দু’বছর আগে হাজতবাসের যেতে হয়েছিল দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে। একা রায়ে রক্ষে ছিল না, সুগ্রীব হয়েছিলেন মণীশ সিসোদিয়াও। তবে তাঁর জেলযাত্রার সুপরিকল্পিত বন্দোবস্ত আরও আগে সুনিশ্চিত হয়েছিল, দুর্ভোগের ফিরিস্তিও কিছু কম ছিল না। ক্ষমতায় থাকাকালীন কোনও প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর ডেপুটি জেলবন্দি হচ্ছেন ‘ক্ষমাহীন অপরাধে’, এ দৃশ্য সত্য কিংবা ত্রেতা-দ্বাপর যুগে অনায়সলভ্য হতেই পারে। কিন্তু স্বাধীন ভারতে এমন ঘটনা ‘হ্যালির ধূমকেতু’ ভ্যাকেশনে আসার মতোই বিরল। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, এটা মোদি-জমানা। এখানে সব সম্ভব। আর কোনও কিছু সম্ভব না হলেও ‘বিনা আমন্ত্রণে অতিথি’ হওয়ার মতো ইডি, সিবিআইয়ের মতো সংস্থা ও কর্মীদের সরকারি নির্দেশে বাড়িতে আচানক আগমন ও ব্যতিব্যস্ত করে তোলা জলবৎ-তরলংয়ের মতো ব্যাপার। সেই জমানায় দাঁড়িয়ে আপ নেতা, তাঁর ডেপুটি-সহ ২৩ জন নির্দোষ প্রমাণিত হচ্ছেন, একে ‘অচ্ছে দিন’ বলবেন না তো কাকে বলবেন!

বাঙালির সিংহভাগ কারণে-অকারণে কেন্দ্রের শাসক-বিরোধিতা করে এসেছেন এ-যাবৎকাল। অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখে তাদের মনে পড়ে যেতে পারে ম্যাটিনি আইডল উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত ‘সবার উপরে’ সিনেমার কথা। ভরা আদালতে বেকসুর খালাস পাওয়া প্রশান্ত চ্যাটার্জির চরিত্রে ছবি বিশ্বাস যখন এজলাসে দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন, ‘খালাস! খালাস আমি চাই নে… ফিরিয়ে দাও আমার সেই বারোটা বচ্ছর, যা জেলখানার নরকে পচে নষ্ট হয়ে গেছে…’। কেজরিওয়াল ছবি বিশ্বাস নন। জনতার বুকে শেল বিঁধিয়ে তিনি এভাবে বিচারের প্রহসন চোখে আঙুল দিয়ে দেখাননি। কিন্তু তাঁর কান্নায় ভেঙে পড়া সন্তপ্ত শরীর, সতীর্থ সিসোদিয়ার নীরব সান্ত্বনা, আমাদের আরও একবার নিষ্ঠুর বাস্তবের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, মনে করিয়েছে সেই অমোঘ আশঙ্কা– বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

কেজরিওয়াল, সিসোদিয়া যদি নির্দোষই হন, তাহলে তাঁদের জেল-যন্ত্রণা সইতে হল কেন? কে ফিরিয়ে দেবে তাদের ভেসে যাওয়া দু’-দুটো বছর। যে দু’-বছরে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রিত্ব হারাতে হয়েছে অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে। হারাতে হয়েছে নাম-যশ, সসম্মান। জেলের অন্ধ কুঠুরি হয়েছে তাঁর ক্যাবিনেট। জনতার উপেক্ষা, মিথ্যে সন্দেহে গায়ে লেগেছে কলঙ্কের দাগ। সেই কলঙ্কের রাগমোচন কি করতে পারবে আপ নেতাদের বেকসুর খালাস দেওয়া আদালত কিংবা ন্যায়নিষ্ঠ বিচারক। তাঁদের জীবনের বহমানতায় সেই কলঙ্ক অনুপ্রবিষ্ট। চাইলেও সেই দাগ মুছতে পারবেন না দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
হেনস্তার শিকার কম হননি সিসোদিয়াও। তাঁকেই প্রথম হাজতবাসের পথ দেখিয়ে রাজনীতির নোংরা খেলায় কিস্তিমাতের স্বপ্ন দেখেছিল কেন্দ্রের সরকারপক্ষ। সেই পরিকল্পনা আংশিক সাফল্যের মুখও দেখেছে। কেন্দ্রের শাসক দল পেয়েছে দিল্লির মসনদ। তর বিনিময়ে সিসোদিয়া, কেজরিওয়াল পরিবারকে হয়ে যেতে হয়েছে সম্মানহানিকর মানসিক যন্ত্রণা। মণীশ-পত্নী সীমা সাসোদিয়া অসুস্থ। স্বামীর হাজতবাসে সেই স্বাস্থ্যের আরও অবনতি ঘটেছে। যেমন লাঞ্ছিত হতে হয়েছে কেজরিওয়াল-পত্নী এবং তাঁর পরিবারকে। দিল্লির দূষণের চেয়েও এই রাজনীতির পাশাখেলা কি আরও দূষিত নয়?

ভারতের বিচারব্যবস্থার নিজস্ব কিছু পদ্ধতি রয়েছে। সেই প্রক্রিয়া ধরেই অপরাধের বিচার হয়। বিচারে কেউ দোষী, কেউ নির্দোষ সাব্যস্ত হয়। কিন্তু সেই বিচার একদিনে মেলে না। অনন্ত অপেক্ষা, ধৈর্য-বলে সেই বিচারের পথে আলো জ্বলে। ‘বিচার’ পান নিরপরাধীরা। মাঝে কেটে যায় বছরের পর বছর। এই সময়ের ধুলোয় চাপা পড়ে যায় অনেক নির্দোষের যন্ত্রণা, হাহাকার, চাপা কান্না। যখন তাঁরা বিচার পান, তখন দেখা যায়, তাঁদের অনেকেই বেঁচে নেই। ন্যায়দান তখন প্রহসনের নামান্তর রূপে বিবেচিত হয়। অরবিন্দ কেজরিওয়াল বিচার পেয়ে কাঁদছেন। কিন্তু এ-দেশের বুকে বিচার বিলম্বের জাঁতাকলে, জমে থাকা ফাইল আর ‘তারিখ পে তারিখ’-এ কেঁদে চলেছে কত শত আমআদমি, তা বলে বোঝানো দুষ্কর।
‘জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড’-ই যদি এদেশে ভবিতব্য হয়, তাহলে এমনই ‘অচ্ছে দিন’ কি চেয়েছিল আমজনতা?
………… পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য পর্ব …………
পর্ব ৩২: অমরত্বের দাবি রাখে যে শেষ তারা
পর্ব ৩১: বিরোধিতার সহজপাঠ
পর্ব ৩০: পুরনো-নতুনের কথোপকথন
পর্ব ২৯: পয়সা দিলে ‘ঈশ্বর’ও বিক্রি আছে
পর্ব ২৮: ব্রিগেডে গরিব মার খেলে কলকাতার এখনও শ্বাসকষ্ট হয়
পর্ব ২৭: রিলের পুজোয় রিয়েল পুজোর গন্ধ নেই!
পর্ব ২৬: আমার মূর্তির অনতিদূরে যদি রমার একটা মূর্তি করা যায়
পর্ব ২৫: তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাদেশি’ ভাষায় ‘সোনার বাংলা’, আর বাংলায় ‘জনগণমন’ লিখেছিলেন?
পর্ব ২৪: বর্ষাকাল মানেই বাঙালির কনফিউশনের বন্যা!
পর্ব ২৩: ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!
পর্ব ২২: শচীন-বিরাটরা আসেন-যান, ভারত থেকে যায়
পর্ব ২১: কিং কোহলি দেখালেন, ধৈর্যের ফল বিরাট হয়
পর্ব ২০: মনকে শক্ত করো টেস্ট, রাজা আর ফিরবেন না
পর্ব ১৯: মুকুল কিংবা ফিলিস্তিনি বালক, খুঁজে চলেছে যে যার ঘর
পর্ব ১৮: ধোনিবাদ: ধাঁধার চেয়েও জটিল তুমি…
পর্ব ১৭: সাদা সাদা কালা কালা
পর্ব ১৬: গতবারের বিক্রি প্রতিবারই ছাপিয়ে যায় বইমেলা, কারণ দামবৃদ্ধি না পাঠকবৃদ্ধি?
পর্ব ১৫: সেন ‘মায়েস্ত্রো’কে ভুলে বাঙালি দেখিয়েছে, সে আজও আত্মবিস্মৃত
পর্ব ১৪: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসই বাঙালির প্রকৃত সান্তা
পর্ব ১৩: প্রবাসে, দোতলা বাসে, কলকাতা ফিরে আসে
পর্ব ১২: না-দেখা সেই একটি শিশিরবিন্দু
পর্ব ১১: ঘোর শত্রুর বিদায়বেলায় এভাবে বলতে আছে রজার ফেডেরার?
পর্ব ১০: অভিধানের যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি মনুষ্যরূপ ধারণ করেছে
পর্ব ৯: জোট-অঙ্কে ভোট-রঙ্গ
পর্ব ৮: দক্ষিণ বিসর্জন জানে, উত্তর জানে বিসর্জন শেষের আগমনী
পর্ব ৭: পুজো এলেই ‘সর্বজনীন’ নতুবা নিঃসঙ্গ?
পর্ব ৬: এক্সক্লুসিভের খোয়াব, এক্সক্লুসিভের রোয়াব
পর্ব ৫: শাসন-সোহাগের দ্বন্দ্বসমাস
পর্ব ৪: পাঁকাল সাধনায় নাকাল
পর্ব ৩: দেখা ও না-দেখার সিদ্ধান্ত
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved