gautam gambhir and his path to success। Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

গম্ভীর যে পৃথিবীকে জয় করলেন গৌতম

ভারতীয় ক্রিকেট অনুরক্ত যাঁরা, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, গম্ভীর আর ধোনির সম্পর্ক কতটা আদায়-কাঁচকলায়। ২০১১-এর বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব নিয়ে যে-সম্পর্কের চিড় ধরা শুরু। তারপর গত ১৫ বছরে সেই ফাটল ক্রমশ চ‌ওড়া হয়েছে। যার ফাঁক গলে মিলিয়ে গিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের দুই শ্রেষ্ঠ ম্যাচ উইনারের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌজন্যের সহজপাঠ। সখাত সলিলে বয়ে চলা সেই সম্পর্কে শীতল স্রোত ব‌ইবে চিরকাল, এমনটাই মনে হয়েছিল ক্রিকেট-ভক্ত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের পরবর্তী কয়েক প্রহর সেই ভুল ভাঙাল। ভাঙালেন মহেন্দ্র সিং ধোনি।

Published by: Robbar Digital

Posted:March 10, 2026 5:42 pm | Updated:March 10, 2026 5:46 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

৩৪.

এ বড় সুখের সময় নয়। এ বড় আনন্দের সময় নয়। আসলে চিরন্তনের বদলে তাৎক্ষণিকতার সুখ যখন আমাদের গ্রাস করে, তখন সমাজের বুকে বাসা বাঁধে ঘুণপোকা। সেই জীর্ণতা কখন‌ও যুদ্ধবেশে ছায়া ফেলে, কখন‌ও প্রতীয়মান হয় অনিশ্চয়তার চাদর গায়ে। রঙিন ঠুলির আড়ালে আমাদের চোখ তখন সত্যকে মিথ্যা দেখে, আপনকে মনে করে পর। সর্বগ্রাসী স্বপ্নে শান্তিকে লাগে অলীক কল্পনা।

আমাদের পারিপার্শ্বিক পৃথিবী যেন সেই সংশয়ের ঘেরাটোপে আটকে। যার প্রাণ আছে, কিন্তু পালানোর পথ নেই। বড্ড অসহায়।

ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি এমনই দমবন্ধ পরিবেশে বিকেলের বৈশাখি হাওয়া, একমুঠো টাটকা বাতাস। যে বাতাসের ঘ্রাণে কোন‌ও যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রদেশের শিশুর রক্ত লেগে নেই, নেই মৃতস্তূপের নীরবতা, যার আচ্ছাদন সরিয়ে নিলে একঝাঁক নিষ্পাপ স্কুল-পড়ুয়ার নিথর মুখ ভেসে ওঠে। ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের উচ্ছ্বাস সেই সব ষাট লাখি আমজনতার, এস‌আইআরের মতো তুঘলকি চালে যাদের অস্তিত্ব আজ প্রশ্নচিহ্নের সামনে।

এমন‌ই দুর্দিনে আপনাদের খুব দরকার ছিল। আপনারা, মানে, গৌতম গম্ভীর, আর? মহেন্দ্র সিং ধোনি।

zoom
ভারতীয় ক্রিকেটের দুই মহারথি: মহেন্দ্র সিং ধোনি-গৌতম গম্ভীর

রণ-রক্তসফল এই পৃথিবীতে আপনাদের কাঁধে কাঁধ মেলানো সৌহার্দ যেন ভোরের ভৈরবী। আপনারা দেখালেন, ভেঙে পড়া বন্ধুত্বকে সৌজন্যবোধের সার-জলে জীবন্ত করে তোলা যায়, ভগ্ন এই ধরিত্রীতে তাকে গড়ে তোলা যায় দৃষ্টান্ত রূপে।

ভারতীয় ক্রিকেট অনুরক্ত যাঁরা, তাঁরা খুব ভালো করেই জানেন, গম্ভীর আর ধোনির সম্পর্ক কতটা আদায়-কাঁচকলায়। ২০১১-এর বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব নিয়ে যে-সম্পর্কের চিড় ধরা শুরু। তারপর গত ১৫ বছরে সেই ফাটল ক্রমশ চ‌ওড়া হয়েছে। যার ফাঁক গলে মিলিয়ে গিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের দুই শ্রেষ্ঠ ম্যাচ উইনারের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌজন্যের সহজপাঠ। সখাত সলিলে বয়ে চলা সেই সম্পর্কে শীতল স্রোত ব‌ইবে চিরকাল, এমনটাই মনে হয়েছিল ক্রিকেট-ভক্ত। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালের পরবর্তী কয়েক প্রহর সেই ভুল ভাঙাল। ভাঙালেন মহেন্দ্র সিং ধোনি।

zoom
আমেদাবাদে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে মহেন্দ্র সিং ধোনি

সচরাচর সোশাল মিডিয়ায় খুব একটা পোস্ট করেন না ভারতের সফলতম অধিনায়ক। কিন্তু ভারতের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর করেছেন, বরাবরের মতো চমকে দিয়ে প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় দলের হেডস্যর গম্ভীরকে। যে গম্ভীরকে এ-যাবৎকাল মাহি-বিরোধী মুখ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত ছিল ভারতীয় ক্রিকেটকুল। সম্পর্কের সেই হিমশৈল্য ভেঙে ‘ক্যাপ্টেন কুল’ পোস্ট করেছেন ‘হাস্যময়’ গম্ভীরকে নিয়ে। লিখেছেন, ‘কোচ সাহাব স্মাইল লুকস গ্রেট অন ইউ, ইনটেনসিটি উইথ স্টাইল ইজ আ কিলার কম্বো।’ প্রকাশ্যে, বিশ্বকাপ জয়ের মায়াবী রাতে ধোনির এই পোস্ট, আশ্চর্য সমাপতন। দ্বেষের দুনিয়াকে হারিয়ে শ্রদ্ধার পৃথিবীকে এমন এক টানটান মুহূর্তে জিতিয়ে দেওয়া, যখন সৌহার্দের আলো ক্রমে কমে আসছে এই ভালোবাসার পৃথিবীতে।

ধোনি একা নন, সেই অসম্ভবকে সাকার করতে পেরেছেন গৌতম গম্ভীর‌ও। ভারতীয় ক্রিকেটে তিনি সেই যুগপুরুষ, যাঁর কাছে ব্যক্তির আগে দল। ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চেয়ে ঢের গ্রহণযোগ্য দলের সাফল্য। সেই গম্ভীর-সাধনায় কোনও রাখঢাক নেই। নেই কোনও মুখ-মুখোশের দ্বন্দ্ব। ছিল‌ও না কোন‌ও কালে। সবচেয়ে বড় কথা, নেই বিন্দুমাত্র আপস। তাই অবলীলায় গৌতম কঠোর হতে পারেন, নির্দ্বিধায় বলতে পারেন, ‘আমার হাসি দেখার জন্য ক্রিকেট অনুরাগীরা মাঠে আসেন না, আসেন আমাকে চ্যাম্পিয়ন দেখতে।’ যাঁর কাছে জয়টাই দিনের শেষে মুখ্য, বাকি সব গৌণ। এমন ক্রিকেট-দ্রষ্টার হাত ধরে সাফল্যের শিখরে পৌঁছনোটা তাই ভারতীয় দলের নিয়তি নির্ধারিত ছিল। আক্ষেপ শুধু একটাই, বড্ড দেরি হল সেটা বুঝতে। গম্ভীরের ক্রিকেট-দর্শন, তাঁর প্রাজ্ঞতাকে বুঝতে অনেক ভুল বোঝাবুঝির পাহাড় ডিঙতে হল ক্রিকেট অনুরাগীদের, লেগে গেল বেশ অনেকটা সময়!

zoom
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হাতে গৌতম গম্ভীর, সঙ্গে সূর্যকুমার যাদব

আসলে দিল্লির বাঁ-হাতি ভারতীয় ক্রিকেটের সেই সাধক, যাঁকে চিনতে বারবার ভুল করেছে শতকোটি দেশবাসী। ভুল বুঝেছে তার চেয়েও শতগুণ। ক্রিকেটের মায়াসভ্যতায় ‘গোতি’ প্রকৃতই মেঘে ঢাকা তারা, যাঁর কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের ঋণ অপরিমিত। ২০০৭-এর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হোক কিংবা ২০১১-এর ওয়ান ডে বিশ্বকাপ জয়– ভারতের সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর গড়েছেন গম্ভীর। অথচ যথাযোগ্য মর্যাদা, যা গম্ভীরের পাওয়া উচিত ছিল, তার সিকিভাগ‌ও জোটেনি তাঁর কপালে। বদলে চোখের সামনে দেখেছেন, মহেন্দ্র সিং ধোনি নামক সতীর্থকে ঘিরে উন্মত্ত ক্রিকেট অনুরাগীদের ব্যক্তিপুজো, সাফল্য উদযাপনের সেই পন্থার তীব্র বিরোধী গম্ভীর, আজ‌ও। তাই ‘মাহি’-বন্দনায় আকাশ বাতাস ভারী হয়েছে, ততই সেই স্তাবক-বৃত্ত থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে নিয়েছেন ‘গোতি’। নির্মম ব্যাটিংয়ের মতো কোনও রাখঢাক না-রেখে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করেছেন এই বীরপূজার বিরুদ্ধে।

ব্যক্তিপূজায় মজে থাকা ভারতীয় ক্রিকেটের ভক্ত-প্রহ্লাদদের ভ্রম হয়েছে, তাঁরা বুঝেছেন, গম্ভীর বুঝি ঈর্ষাকাতর। দাম্ভিক। ঔদ্ধত্যে ভরপুর এক তারকা। আসলে কালের যাত্রাধ্বনি তাঁরা শুনতে পায়নি। পেলে তাঁরা টের পেতেন, গম্ভীর অবিবেচক নন, দূরদর্শী। সেই দূরদর্শিতা কতটা সুদূরপ্রসারী, তা আইসিসির বড় প্রতিযোগিতায় চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেটের ‘ডবল জি’।

zoom
ভারতের বিশ্বজয়ের দুই কারিগর

আসলে রাজা হওয়ার বাসনা নিয়ে কখনও আবির্ভূত হননি গম্ভীর। ২০০৭-তে হননি, ২০১১-তেও নয়। ১৫ বছর পেরিয়ে ২০২৬-এও না। ভারতীয় ক্রিকেটকে শ্রেষ্ঠত্বের বরমাল্য পরানোই গোতি-র একমাত্র অভীষ্ট। যা আসে সংহতির মধ্যে দিয়ে, শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে, জয়ের মধ্য দিয়ে। সূর্যকুমার, বুমরাদের মধ্যে সেই খিদের আগুন জ্বালাতে সক্ষম হয়েছেন গৌতম। সাদা বলের ফরম্যাটে তিনি সেরা কোচ। অবিসংবাদিত রূপে তিনি‌ই সেরা। আসলে গৌতম-গাম্ভীর্যে এক একাগ্রতা ছিল, যা তিনি ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন ড্রেসিংরুমে। প্রয়োজনে কঠোর হয়েছেন। তাঁর কঠিন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা হয়েছে। সমালোচনায় রক্তাক্ত হয়ে‌ও ময়দান ছাড়েননি গম্ভীর।

এমন সাফল্যবানকে ধোনির মতো ব্যক্তিত্ব কুর্নিশ জানাবেন, সেটাই কাম্য। ট্রফির সঙ্গে বিদ্বেষের এই পৃথিবীকেও তাই জিতে নিয়েছেন গম্ভীর। যুদ্ধের বিষবাষ্পে দুই হাস্যোজ্জ্বল মহারথীর ‘দোস্তি’ রক্তকরবী হয়ে ফুটলে ক্ষতি কি!

………… পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য পর্ব …………

পর্ব ৩৩: জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড

পর্ব ৩২: অমরত্বের দাবি রাখে যে শেষ তারা

পর্ব ৩১: বিরোধিতার সহজপাঠ

পর্ব ৩০: পুরনো-নতুনের কথোপকথন

পর্ব ২৯: পয়সা দিলে ‘ঈশ্বর’ও বিক্রি আছে

পর্ব ২৮: ব্রিগেডে গরিব মার খেলে কলকাতার এখনও শ্বাসকষ্ট হয়

পর্ব ২৭: রিলের পুজোয় রিয়েল পুজোর গন্ধ নেই!

পর্ব ২৬: আমার মূর্তির অনতিদূরে যদি রমার একটা মূর্তি করা যায়

পর্ব ২৫: তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাদেশি’ ভাষায় ‘সোনার বাংলা’, আর বাংলায় ‘জনগণমন’ লিখেছিলেন?

পর্ব ২৪: বর্ষাকাল মানেই বাঙালির কনফিউশনের বন্যা!

পর্ব ২৩: ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!

পর্ব ২২: শচীন-বিরাটরা আসেন-যান, ভারত থেকে যায়

পর্ব ২১: কিং কোহলি দেখালেন, ধৈর্যের ফল বিরাট হয়

পর্ব ২০: মনকে শক্ত করো টেস্ট, রাজা আর ফিরবেন না

পর্ব ১৯: মুকুল কিংবা ফিলিস্তিনি বালক, খুঁজে চলেছে যে যার ঘর

পর্ব ১৮: ধোনিবাদ: ধাঁধার চেয়েও জটিল তুমি…

পর্ব ১৭: সাদা সাদা কালা কালা

পর্ব ১৬: গতবারের বিক্রি প্রতিবারই ছাপিয়ে যায় বইমেলা, কারণ দামবৃদ্ধি না পাঠকবৃদ্ধি?

পর্ব ১৫: সেন ‘মায়েস্ত্রো’কে ভুলে বাঙালি দেখিয়েছে, সে আজও আত্মবিস্মৃত

পর্ব ১৪: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসই বাঙালির প্রকৃত সান্তা

পর্ব ১৩: প্রবাসে, দোতলা বাসে, কলকাতা ফিরে আসে

পর্ব ১২: না-দেখা সেই একটি শিশিরবিন্দু

পর্ব ১১: ঘোর শত্রুর বিদায়বেলায় এভাবে বলতে আছে রজার ফেডেরার?

পর্ব ১০: অভিধানের যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি মনুষ্যরূপ ধারণ করেছে

পর্ব ৯: জোট-অঙ্কে ভোট-রঙ্গ

পর্ব ৮: দক্ষিণ বিসর্জন জানে, উত্তর জানে বিসর্জন শেষের আগমনী

পর্ব ৭: পুজো এলেই ‘সর্বজনীন’ নতুবা নিঃসঙ্গ?

পর্ব ৬: এক্সক্লুসিভের খোয়াব, এক্সক্লুসিভের রোয়াব

পর্ব ৫: শাসন-সোহাগের দ্বন্দ্বসমাস

পর্ব ৪: পাঁকাল সাধনায় নাকাল

পর্ব ৩: দেখা ও না-দেখার সিদ্ধান্ত

পর্ব ২: মহাবিশ্বে যে টোকে না, সে বোধহয় টেকেও না

পর্ব ১: অফিসে দৈবের বশে প্রেমতারা যদি খসে

Gautam Gambhir IndiaT20WorldCup Iran-Israel Conflict Mahendra Singh Dhoni Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar SIR T20 World Cup Team India World Champion

Share this article on