nandalal bose and art teachers of kalabhavana from west | Robbar
Robbar
  • ৬ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ২৪ আগস্ট ২০২৬

কলাভবন: পূর্ব থেকে পশ্চিমে

শুরুর কলাভবনে– নন্দলাল, অসিত হালদার বা সুরেন কর তাঁদের শিক্ষার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্রদের শেখাতেন। বাঁধা-ধরা পাঠক্রমের কঠিন বাঁধন সেখানে ছিল না। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ১৯২২ সালের শেষে আন্দ্রে কারপেলেস শান্তিনিকেতনে আসেন, তিনিও শিক্ষকতায় যোগ দেন। ফরাসি শিল্পী আন্দ্রে পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট ঘরানায় ছবি আঁকতেন। সেজান, ভ্যান গখ প্রমুখ শিল্পীরা ছিলেন তাঁর আদর্শস্থানীয়। আন্দ্রের শিল্পচর্চায় পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্পধারার ছাপ প্রত্যক্ষভাবে ফুটেছে। অন্যদিকে প্রবলভাবে স্বদেশীয়ানা এবং জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শে স্নাত নন্দলাল সে সময় কলাভবনে তেলরঙের ছবি আঁকার পক্ষপাতী ছিলেন না।

Published by: Robbar Digital

Posted:July 10, 2026 11:53 am | Updated:July 11, 2026 6:51 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

১১.

কলাভবনে ক্লাসের সূচনা হয়েছিল ‘দ্বারিক’ বাড়ির দোতলায়। তার বছর চারেক পরে সাময়িকভাবে সেই ক্লাস সরিয়ে নিতে হয়। তখনকার মতো ক্লাস চলে যায় ‘দ্বারিক’ বাড়ির পশ্চিম ঘেঁষে এখনকার ‘সন্তোষালয়’ নামের বাড়িতে। কিছুদিন ক্লাস চলল সেখানে। তারপর আবার ১৯২৩ নাগাদ কলাভবন উঠে এল আরও পশ্চিমে, পুরনো লাইব্রেরির ওপরতলায়, আজকের পাঠভবনের দোতলায়। সেখানেও পাকাপাকি থিতু হতে পারেনি কলাভবন। আবার তাকে সরতে হয়েছে, এবারে আরও পশ্চিমে। লাইব্রেরির ওপরতলা থেকে বছর পাঁচেক বাদে নেমে এসেছে লালকাঁকড়ের মাটিতে। পুরনো ‘নন্দন’ ও তার আশেপাশের কয়েকটা ঘর নিয়ে শুরু হয়েছে কলাভবনের নতুন যাত্রা। শোনা যায়, পূর্ব দিক থেকে কলাভবনের এই অবস্থানগত পরিবর্তন ক্রমশ পশ্চিম-দিকে সরে আসায় নন্দলাল একটু রসিকতা করেছেন। ঘনিষ্ঠ বৃত্তে গল্পচ্ছলে তিনি বলেছেন, কলাভবনের গতি দেখছি ক্রমে পুব থেকে পশ্চিমে চলেছে। অর্থাৎ, শিল্পের অভিমুখ যেন প্রাচ্য থেকে ধীরে ধীরে পাশ্চাত্যের দিকেই এগিয়ে চলেছে।

নন্দলালের এই রসিকতার নেপথ্যে কিছু ঘটনা মিশেছিল বলে মনে হয়। সেদিকে একটু নজর দেওয়া যাক।

zoom
নন্দলাল বসু

প্রথমেই বলা দরকার, সিলেবাস বলতে ঠিক যা বোঝায় তা কলাভবনের ওপরে খুব শক্তভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। শুরুর কলাভবনে– নন্দলাল, অসিত হালদার বা সুরেন কর তাঁদের শিক্ষার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে ছাত্রদের শেখাতেন। বাঁধা-ধরা পাঠক্রমের কঠিন বাঁধন সেখানে ছিল না। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ১৯২২ সালের শেষে আন্দ্রে কারপেলেস শান্তিনিকেতনে আসেন, তিনিও শিক্ষকতায় যোগ দেন। ফরাসি শিল্পী আন্দ্রে পোস্ট-ইম্প্রেশনিস্ট ঘরানায় ছবি আঁকতেন। সেজান, ভ্যান গখ প্রমুখ শিল্পীরা ছিলেন তাঁর আদর্শস্থানীয়। আন্দ্রের শিল্পচর্চায় পাশ্চাত্যের আধুনিক শিল্পধারার ছাপ প্রত্যক্ষভাবে ফুটেছে। অন্যদিকে, প্রবলভাবে স্বদেশিয়ানা এবং জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শে স্নাত নন্দলাল সে-সময় কলাভবনে তেলরঙের ছবি আঁকার পক্ষপাতী ছিলেন না। পুরনো ছাত্রদের মুখে শোনা যায়, তেলরঙের ছবির পশ্চিমি টেকনিক একেবারেই পছন্দ করতেন না, ছাত্রদের প্রতি একপ্রকার নিষেধাজ্ঞা ছিল। এদিকে আন্দ্রে এসেছেন রবীন্দ্রনাথের ডাকে, তিনি প্যারিসের আধুনিক চিত্রশিল্পী। শিল্পকলার কাজে তাঁকে ব্যবহার না করলে কলাভবনেরই ক্ষতি। এমন প্রেক্ষাপটে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠাতা আর নন্দলালের মধ্যে প্রচ্ছন্ন কোনও মতবিরোধ ঘনিয়ে উঠেছিল কি না, বলা মুশকিল। তার কোনও নথি অবশ্য আমাদের গোচরে নেই। উভয়ের মধ্যে ভাবনা তথা আদর্শের সংঘাত প্রচ্ছন্নভাবে গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। রবীন্দ্রনাথ বহুদিন ধরে বলে আসছেন– ‘য়ুরোপীয় সভ্যতাকে নিকৃষ্ট বলিয়া বর্জন করিতে হইবে এ কথা আমার বক্তব্য নহে’। একথা বলছেন যখন স্বদেশি উন্মাদনার বশে শিল্পক্ষেত্রেও বর্জন তথা ভাঙচুর চলেছিল। এমনকী ভারতশিল্পের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হ্যাভেল সাহেবের অনুমোদনে সরকারি আর্টস্কুলের গ্যালারি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল পাশ্চাত্য ছবি ও মূর্তি। যার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছিলেন রণদাপ্রসাদ গুপ্ত, বসন্ত গাঙ্গুলী, হেমেন মজুমদার, প্রহ্লাদ কর্মকার প্রমুখ শিল্পী। কাজটা ঠিক হয়েছিল কি না, সে-বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। অতুল বসুর লেখায় এই পর্বের জ্বলন্ত ছবি ধরা আছে। একটু বাঁকা ভঙ্গিতে তিনি লিখেছেন– ‘জাদুঘরে বিদেশী শিল্পের কিছু নমুনাসহ একটা চিত্রশালা ছিল। এসব নিদর্শন পাছে আমাদের চিত্তবিভ্রম ঘটায়, তাই তিনি (ই বি হ্যাভেল) সেগুলি নিলামে চড়ালেন এবং পড়ে থাকা বাকিগুলি পুকুরে ডোবালেন।’ এই প্রেক্ষিতেই রবীন্দ্রনাথ উপরোক্ত কথাগুলি বলেছিলেন। পরবর্তীকালেও দেখা গিয়েছে, শিল্পসাহিত্যে পশ্চিমের ভালো দিকগুলিকে গ্রহণ করার কথাই বলেছেন, তার মধ্যে কোনও ভুল বা বিরূপতা পোষণ করেননি। অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তাঁর ঘোষণা– ‘বিদেশের সোনার কাঠি যে জিনিসকে মুক্তি দিয়েছে সে তো বিদেশী নয়– সে আমাদের আপন প্রাণ।… সমুদ্রপারের রাজপুত্র এসে মানুষের মনকে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে জাগিয়ে দেয় এটা তার ইতিহাসে চিরদিন ঘটে আসছে। আপনার পূর্ণশক্তি পাবার জন্যে বৈষম্যের আঘাতের অপেক্ষা করতেই হয়। কোনো সভ্যতাই একা আপনাকে সৃষ্টি করে নি। গ্রীসের সভ্যতার গোড়ায় অন্য সভ্যতা ছিল এবং গ্রীস বরাবর ইজিপ্ট ও এশিয়া থেকে ধাক্কা খেয়ে এসেছে। ভারতবর্ষে দ্রাবিড়মনের সঙ্গে আর্যমনের সংঘাত ও সম্মিলন ভারতসভ্যতা সৃষ্টির মূল উপকরণ, তার উপরে গ্রীস রোম পারস্য তাকে কেবলই নাড়া দিয়েছে। য়ুরোপীয় সভ্যতায় যে-সব যুগকে পুনর্জন্মের যুগ বলে সে সমস্তই অন্য দেশ অন্য কালের সংঘাতের যুগ’ ইত্যাদি। এই ভাবনাতেই তিনি কলাভবনে পূর্বের সঙ্গে পশ্চিমের বাতাসকে সমানভাবে আন্দোলিত করাতে চেয়েছেন, স্টেলা ক্রামরিশ বা আন্দ্রেকে আহ্বান করেছেন।

 

zoom
শান্তিনিকেতনের আলপনা

আগেই বলেছি, সেই মুহূর্তে তরুণ নন্দলাল প্রখরভাবে স্বাদেশিকতায় জারিত, তীব্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। ফলে ব্রিটিশ শাসকের বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে তিনি সমগ্র পশ্চিমকে বর্জন করতে উদ্যত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ না-চাইলেও পাশ্চাত্য রীতিকে বর্জন করতে হবে– এই ভাবনার ছাপ কলাভবনে যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে। এই প্রসঙ্গ কতদূর গড়িয়েছিল জানা নেই– তবে এটুকু প্রমাণ পাওয়া যায়, আন্দ্রের তৈলচিত্রের ক্লাসটিকে কলাভবনে আবশ্যিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। অর্থাৎ, আজকের ভাষায় বললে আন্দ্রের ক্লাসকে রাখা হয়েছিল মূল পাঠক্রমের বাইরে, অ্যাডিশনাল সাবজেক্ট হিসেবে। এই ঐচ্ছিক বিষয়ে সামান্য গুটিকয় ছাত্রছাত্রী যুক্ত হয়েছিলেন। বিষয়টি যেহেতু নন্দলালের অপছন্দ, সেই ক্লাসে যোগ দিতে অন্য ছাত্রছাত্রীরা বিরত হয়েছিল কি না– তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।

zoom
আন্দ্রে কারপেলেস-এর আঁকা রবীন্দ্র-প্রতিকৃতি

এদিকে কেবল ক্লাস নেওয়া নয়, আন্দ্রে নিজেও শান্তিনিকেতন এবং আশেপাশের গ্রামের একাধিক ছবি এঁকেছেন। কয়েকটি রবীন্দ্রভবনের সংগ্রহে আছে। অনুভূমিক পটে আঁকা একটি ছবিতে দেখা যায় গোধূলির মৃদু আলোয় ঘন বাদামি খোয়াইয়ের পথে হেঁটে চলেছেন রবীন্দ্রনাথ। এই অসাধারণ মুহূর্ত ধরা আছে আন্দ্রের ক্যানভাসে। কলাভবনে তাঁর অ্যাডিশনাল বিষয়ের ক্লাসে তিনি শেখাতেন স্টিল-লাইফ, পোট্রেট, ল্যান্ডস্কেপ প্রভৃতি। ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কাছেই তেলরঙের ছবি করার পশ্চিমি টেকনিকের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার প্রত্যক্ষ সুযোগ পায়। বিনোদবিহারী জানিয়েছেন, মাত্র দু’জন ছাত্র আর একজন ছাত্রী এই ক্লাসে অয়েল পেন্টিং শিখেছেন। অবশ্য আন্দ্রে বেশিদিন শান্তিনিকেতনে থাকতে পারেননি, ১৯২২-এর নভেম্বরে এসে ১৯২৩-এ-ই প্যারিসে ফিরে গিয়েছিলেন। আরও কয়েকটি বিষয়ে আন্দ্রের বিশেষ দক্ষতা ছিল, তা হল কাঠখোদাই এবং এনগ্রেভিং। এছাড়া লিথোগ্রাফিতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। বলা বাহুল্য, কলাভবনে উড-কাট বা কাঠখোদাই কাজের প্রচলন তাঁর হাত ধরেই। কিছুলাল পরে যা নন্দলালের হাত ধরে ‘সহজপাঠ’-এর ইলাস্ট্রেশন হিসেবে বাংলা গ্রন্থচিত্রণের অন্যতম ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায়। বলা দরকার, কলাভবনের নতুন পর্বে আন্দ্রের কাছে শেখা কাঠখোদাই, লিথোগ্রাফ, অয়েল-পেন্টিং ইত্যাদি বিষয়গুলি আবশ্যিক হাতের কাজ হিসেবে শেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে। তার পাশাপাশি বই-বাঁধাই, গালার কাজ, ফ্রেস্কো আর আলপনা শেখানোও হয়ে উঠেছে মূল বিষয়ের অন্তর্গত। অবশ্য হাতের কাজের ক্লাসের সময় নির্ধারিত হয়েছিল দুপুরে, খাওয়ার পরে। ছাত্রছাত্রীরা উড-কাঠ আর অয়েল-পেন্টিং ইত্যাদি শিখত আন্দ্রের কাছে, অন্যদিকে গালার কাজ শেখাতেন রূপচাঁদ গুই নামে ইলামবাজারের এক প্রবীণ কারিগর। বই-বাঁধাই শেখাতেন শুক্লা নামে এক সাঁওতাল যুবক– পিয়ারসন সাহেব তাকে কলকাতা থেকে বই-বাঁধাইয়ের কাজ শিখিয়ে এনেছিলেন।

zoom
শ্রীনিকেতনে গালার কাজ

কলাভবন আদিযুগের এই অনুপুঙ্খ খবরাখবর দিয়েছেন বিনোদবিহারী। ইলামবাজারের সেই গালার কারিগর সম্পর্কে তিনি লিখেছেন– ‘অধিকাংশ কারিগরের মতো তার মেজাজ ছিল রুক্ষ; কিন্তু তিনি ছিলেন আদর্শ গুরু। কোনো একটি করণ-কৌশল সম্পূর্ণ আয়ত্ত না হওয়া পর্যন্ত অন্য বিষয় জানবার আগ্রহ তিনি অত্যন্ত অপছন্দ করতেন।’ ফলে তিনি যে ছাত্রছাত্রীদের কাছে খুব একটা পপুলার ছিলেন– তা মনে হয় না। তবে এখানে এটুকু পরিষ্কার যে, শিল্পের পাঠক্রমের পাশাপাশি ক্রাফট ও হাতের কাজের শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে। মনে রাখা দরকার, কারুসঙ্ঘের সূচনা হয়েছে তার বেশ কিছুকাল পরে। ইতিহাসের নিরিখে খোঁজ নিলে দেখা যাচ্ছে যে, কলাভবন কেবলমাত্র শিল্পশিক্ষার আসর নয়, তাকে সামগ্রিক দিক দিয়ে এগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের কথায়, গুরু অবনীন্দ্রনাথের মতো নন্দলালও তাঁর ছাত্রদের সুখসুবিধের দিকে সর্বদা লক্ষ রাখতেন। কীভাবে ছাত্রদের আর্থিক উন্নতি হবে, কেমন করে তারা ভালো থাকবে– এই নিয়ে নন্দলালের ভাবনার শেষ ছিল না।

zoom
শিল্পসদনে বই বাঁধাই চলছে

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এ-বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন। বিশের দশকের শেষে সুনীতিকুমারকে লেখা চিঠি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সেখানে একাধিক প্রসঙ্গের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ লিখছেন– ‘কী করলে আমাদের আর্টিস্টদের জীবিকার দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচিয়ে তাদের সাধনাকে বাধামুক্ত করা যেতে পারে সেও একটা আলোচ্য বিষয়। যাই হোক, এদের নিজেদের ছবিগুলি যাতে সম্পূর্ণ এদের নিজের উপার্জনের সহায় হয় সে আমাকে করতেই হবে’। অর্থাৎ, কেবল কলাভবনের প্রতিষ্ঠা নয়, সেখানকার ছাত্রদের জীবিকার সংস্থানও রবীন্দ্রনাথের অন্যতম লক্ষ্য।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন গল্পকলা-র অন্যান্য পর্ব

………………………

Kalabhaban Nandalal Bose Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantiniketan

Share this article on