Nandalal Bose and the Early Days of Kala Bhavana | Robbar
Robbar
  • ৭ ভাদ্র ১৪৩৩
  • মঙ্গলবার
  • ২৫ আগস্ট ২০২৬

নন্দলাল বসু ও কলাভবনের শুরুর দিনগুলি

কলাভবনের শৈল্পিক ইতিহাসে নন্দলাল বসুর ভূমিকা প্রশ্নাতীত। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে কলাভবনে যোগ দেওয়ার অনেক আগেই শান্তিনিকেতনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলেন শিল্পাচার্য। কেমন ছিল সেই সংযোগের যাত্রাপথ? পরবর্তী সময়ে কীভাবে এক নতুন শিল্পক্ষেত্র এবং চিত্রভাষা গড়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতন কলাভবনের অন্দরে? সেই আশ্চর্য আখ্যান নিয়েই এবারের পর্ব।

Published by: Robbar Digital

Posted:April 24, 2026 6:56 pm | Updated:April 25, 2026 4:35 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

অনাড়ম্বর আয়োজনে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পরে ‘কলাবিদ্যা’ শিরোনামে এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখলেন রবীন্দ্রনাথ। সে লেখা ছাপা হল আশ্রমের ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকায়। সময়ের নিরিখে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য লেখা। প্রধানত আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শিল্পের ভূমিকা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তুলে ধরলেন। অন্য দেশের তুলনা দিয়ে বোঝাতে চাইলেন, বিদেশের শিক্ষাদীক্ষা শিল্পকলাকে বর্জন করে নয়, তার হাত ধরেই এগিয়ে চলেছে এই কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। বললেন, ‘ইংরেজ ত ভাষা ভূগোল ইতিহাস গণিত বিজ্ঞান সবই শিখিতেছে আর তার সঙ্গে সঙ্গীত চিত্রকলা ও অন্যান্য সকল কলাবিদ্যাই শিখিতেছে। এই সকল ললিতকলা শিক্ষা দ্বারা তাহার পৌরুষ খর্ব হইতেছে এমন প্রমাণ হয় না। সঙ্গীতনিপুণ বলিয়া জর্মানজাতি অস্ত্রচালনায় অলস বা বিজ্ঞানচর্চায় পিছ-পা এ কথা কে বলিবে? বস্তুত আনন্দপ্রকাশ জীবনীশক্তির প্রবলতারই প্রকাশ। এই আনন্দপ্রকাশের পথগুলিকে মারিয়া দিলে জাতির জীবনী শক্তিকেই ক্ষীণ করিয়া দেওয়া হয়।’ এই প্রসঙ্গে টেনে এনেছেন জাপানিদের কথাও, বলেছেন, ‘জাপানী কাজ করিতে নিরলস, প্রাণ দিতে নির্ভীক, কিন্তু চেরি ফুল ফোটার সৌন্দর্যসম্ভোগ লইয়া দেশের ছেলে বুড়ো সকলেই উৎসব করে এবং চিত্রকলার পরম মূল্য বোঝে না এমন মূঢ় সে দেশে কেহ নাই।’ পাশাপাশি আমাদের দেশে শিল্পচর্চার অভাব তাঁকে বিস্মিত ও বিমর্ষ করেছে। তাঁর মনে হয়েছে, যে হৃদয়বৃত্তি আমাদের ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে সেই বৈচিত্রময় হৃদয়বৃত্তিকে যদি নষ্ট করে ফেলা হয়, তবে তা আত্মহত্যার শামিল। অথচ আমরা সে-কথা কিছুতেই বুঝতে পারছি না। রবীন্দ্রনাথের মতে– ‘এই হৃদয়বৃত্তির প্রকাশ কলাবিদ্যার সাহায্যেই ঘটে। সভ্য অসভ্য সকল দেশেই এই সকল কলাবিদ্যার পরে দেশের লোকের দরদ আছেই। কেবল আমাদের বিদ্যাদানের ব্যবস্থায় এই কলাবিদ্যার কোনো স্থান নাই।

zoom
শান্তিনিকেতনে শিক্ষকদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ (১৯৪০)

স্থান থাকার যে গুরুতর প্রয়োজন আছে সেই বোধ পর্যন্ত আমাদের শিক্ষিত লোকের মন হইতে চলিয়া গিয়াছে’। তাঁর এই হতাশ ভঙ্গিই জানিয়ে দেয়, শিল্পকলাকে স্কুলের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করতে কী পরিমাণ বাধার সামনে দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে! লেখায় খানিক তির্যক খোঁচা দিতেও ছাড়েননি রবীন্দ্রনাথ। বিশেষ করে, আমাদের মার্কা দেওয়া পণ্ডিতদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে দিয়েছেন তাঁর ভাবনার  প্রশ্নচিহ্ন– ‘আমাদের দেশেই আনন্দকে বিজ্ঞলোকে ভয় করে, সৌন্দর্যভোগকে তাহারা চাপল্য বলে মনে করে এবং কলাবিদ্যাকে অপবিদ্যা ও কাজের বিঘ্নকর বলিয়া জানে। ইহা কেবলমাত্র আমাদের মজ্জাগত দীনতার লক্ষণ। ইহাতে আমাদের প্রকৃত কর্মশক্তিকেই দুর্বল করিতেছে’। এ-কথা সর্বতোভাবে সত্য হলেও জানতে ইচ্ছে করে, সেই পর্বে শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কী ভাবছিলেন? বিদ্যালয়ের শিল্পচর্চা প্রসঙ্গে তাঁরাও কি রবীন্দ্রনাথের এহেন চিন্তার মানসিক প্রতিবেশী হতে পেরেছিলেন? বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতার আদর্শ কি শিক্ষকদের মনে প্রবেশ করেছিল? জোর দিয়ে এর উত্তর দেওয়া চলে না। কারণ, তাঁর শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের উঁচু ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে শিল্পের প্রতি উদাসীনতা কবির চোখ এড়িয়ে যায়নি। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছবি আঁকা আর গান এ– দুইয়ের মাধ্যমে ছাত্রদের মানসিক বিকাশ ঘটবে এমনটাই ভেবেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তাঁকে বলতে হয়েছে, ‘আমাদের দেশের শিক্ষার মধ্যে এই যে দারিদ্র তাহার লক্ষণ ও ফল আমাদের শান্তিনিকেতনের বালকদের মধ্যেও দেখিতে পাই। এখানকার বিদ্যালয়ে সঙ্গীত ও চিত্রবিদ্যা শিখাইবার ভাল ব্যবস্থাই আছে। ছেলেদের অনেকেরই গান গাহিবার ছবি আঁকিবার স্বাভাবিক শক্তি থাকে। যতদিন তাহারা নীচের ক্লাসে পড়ে ততদিন তাহাদিগকে গান গাওয়া বা ছবি আঁকা শেখানো শক্ত হয় না, ইহাতে তাহারা আনন্দই বোধ করে। কিন্তু উপরের ক্লাসে উঠিবামাত্র আমাদের দেশের শিক্ষার লক্ষ্য তাহারা বুঝিতে পারে, ইহার অন্তর্নিহিত দীনতা তাহাদিগকে আক্রমণ করে। তখন হইতে পরীক্ষার পড়ার বাহিরের এই সমস্ত শিক্ষার বিরুদ্ধে তাহাদের মন বাঁকিয়া বসে।’ কী আশ্চর্য! আমাদের শিক্ষায় যে-দীনতার কথা রবীন্দ্রনাথ বারবার বলছেন, তাঁর নিজের বিদ্যালয়েই কি-না মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে শিল্পের প্রতি সেই ঔদাসীন্য? এইজন্যই কি তিনি শিল্প ও সংগীতের জন্য আলাদা আখড়া, স্বতন্ত্র আসরের কথা ভেবেছিলেন? তাঁর প্রাণের কলাভবন গড়ে তোলার এমন দুর্মর সংকল্প গ্রহণ করেছেন? প্রবন্ধের শেষ বাক্যে সংগীত ও চিত্রকলা সম্পর্কে তাঁর ভাবনার মুখটি তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠেছে। সদর্পে ঘোষণা করেছেন, ‘বিশ্বভারতী যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তবে ভারতীয় সঙ্গীত ও চিত্রকলা তাহার প্রধান অঙ্গ হইবে এই আমাদের সঙ্কল্প হউক।’ আবার এই শিক্ষা বিদেশ থেকে আমদানি করলে চলবে না, নিজস্ব আধারে তাকে গড়ে তুলতে হবে। দেবীর আবাহন প্রসঙ্গে এমন কথাও বলতে ছাড়েননি, ‘আমাদের দেশের নির্বাসিত লক্ষ্মীকে নূতন আবাহনকালে মন্দিরের দ্বারে যে আলপনা আঁকিতে হইবে তার ডিজাইন কি জর্মানি হইতে সংগ্রহ করিয়া আনিব?’ অর্থাৎ, কলাভবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হোক, দেশীয় শিল্পের পটভূমিকায়– অন্তত সেই প্রথম পর্বে। এখন প্রশ্ন হল, সহসা এমন একজন শিল্পশিক্ষক তিনি কীভাবে পাবেন, যিনি তাঁর শিল্পনিকেতনের মূল সুরটিকে জাগিয়ে রাখতে পারঙ্গম? কে আছেন এই কাজের উপযোগী যথার্থ শিল্পী ও শিক্ষক– যাঁর হাতে কলাভবনের ভার দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিন্ত হতে পারেন?

zoom
কলাভবনে ছাত্রদের সঙ্গে নন্দলাল বসু

স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর মনে পড়েছে নন্দলালের কথা। অবনীন্দ্রনাথের প্রিয় শিষ্য নন্দলাল তখন চিত্রীমহলে বিশেষ পরিচিত। ‘সতীর দেহত্যাগ’, ‘দয়মন্তীর স্বয়ম্বর’, ‘সুজাতা’, ‘অহল্যা উদ্ধার’, ‘জতুগৃহ দাহ’, ‘উমার তপস্যা’ ইত্যাদি অজস্র ছবি তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। ভগিনী নিবেদিতা, কুমারস্বামী তাঁর কাজে উচ্ছ্বসিত।

zoom
নন্দলাল বসুর আঁকা ‘সতীর দেহত্যাগ’

সোসাইটির বার্ষিক প্রদর্শনীতে পেয়েছেন পুরস্কার, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের শিল্পরসিকরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ! এদিকে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নন্দলালের প্রত্যক্ষ পরিচয় সেই ‘চয়নিকা’ কাব্যগ্রন্থের ছবি আঁকার সুবাদে। ক্রমশ তা গাঢ়তর হলেও আদতে সে অবনের প্রিয়তম ছাত্র। গুরু যে প্রিয়তম শিষ্যটিকে ছাড়তে কিছুতেই রাজি হবেন না–‘রবিকা’ তা ভালো করেই জানেন। তাই নন্দলালের প্রতি দীর্ঘকাল ‘পাখির চোখ’ করে থাকলেও বুঝেছিলেন শান্তিনিকেতনের কাজে তাঁকে পাওয়ার আশা অত্যন্ত ক্ষীণ। তবুও হাল ছাড়েননি তিনি। বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার বেশ কিছু আগে, ১৯১৪ সালে, নন্দলালকে শান্তিনিকেতনে আমন্ত্রণ করেছিলেন। বেশ ঘটা করে আম্রকুঞ্জে সম্বর্ধনা জানিয়েছেন, কবিতায় গানে, বেদমন্ত্রে নন্দলালকে বরণ করেছেন।

zoom
আম্রকুঞ্জে নন্দলাল বসুর সংবর্ধনা

অভিভূত শিল্পী সেদিনের সম্বর্ধনা সভার কথা জানিয়েছেন আমাদের, বলেছেন, “কবি এলেন। আমি ওখানে বসতেই অসিত (হালদার) কিংবা ছেলেদের কেউ মালা দিলে আমার গলায়। কবি আমার হাতে অর্ঘ্য পরে খানিক বললেন। আমি বললুম অল্প।– বিশেষ করে বললুম ‘আমি ধন্য হয়েছি’।” এই সভাতেই রবীন্দ্রনাথ নন্দলালের উদ্দেশ্যে একটি কবিতা পাঠ করেছিলেন। তার শুরুটা এইরকম, ‘তোমার তুলিকা রঞ্জিত করে/ ভারত-ভারতী-চিত্ত।/ বঙ্গলক্ষ্মী ভাণ্ডারে সে যে/ যোগায় নূতন বিত্ত…’ ইত্যাদি। শান্তিনিকেতন আশ্রমের সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশ নন্দলালকে মুগ্ধ করেছিল। কলকাতার ‘সোসাইটি অফ ওরিয়েন্টাল আর্ট’-এর নিগড়ে-বাঁধা জীবন থেকে যেন মুক্তির স্বাদ পেয়েছিলেন।

zoom
মাঝে অর্ঘ্য হাতে নন্দলাল , দু’পাশে অসিত হালদার আর সুরেন কর (১৯১৪)

ঠিক সেই মুহূর্তে এক আশ্চর্য অনুভূতির মুখোমুখি হয়েছিলেন নন্দলাল। তিনি নিজেই জানিয়েছেন সে-কথা। বলেছেন, ‘এই অভিনন্দনের পরে, আমার এক অদ্ভুত অনুভূতির ঘটনা হল। গুরুদেব আমাকে বরণ করলেন অর্ঘ্য দিয়ে, আশীর্বাদ করলেন কবিতা পড়ে। অনুষ্ঠানের শেষে আমি চলে এলুম ডেরাতে। কবির দেওয়া অর্ঘ্য তখনও আমার হাতে। সহসা আমার মনে হল, আমাতে যেন আমি নাই। আমার দেহটা আছে বটে, তবে অতি স্বচ্ছ হয়ে গেছে। আমার রক্ত-মাংসের স্থূল শরীর ভেদ করে যেন আলো বাতাস খেলে বেড়াচ্ছে। অপূর্ব অনুভূতিতে আমার সমস্ত চেতনা আনন্দে ডগমগ করে উঠলো। কবির ভেতর দিয়ে মহর্ষির আশীর্বাদ আমাকে যেন ছুঁয়ে গেল। আমি যেন শান্তিনিকেতন আশ্রমের অন্তরে প্রবেশ করলুম।’

zoom
রবীন্দ্রনাথের স্বহস্তে লিখিত পাণ্ডুলিপির প্রতিলিপি।

সেদিনের সেই পবিত্র মুহূর্তটি নন্দলালকে যেন একেবারে আপন করে নিয়েছে। সেই আলোক, বাতাস, মাটির স্পর্শে নন্দলাল শান্তিনিকেতনের অন্তরে প্রবেশ করেছেন। কিছুকাল পরে তিনি যে এই আশ্রমেরই একজন হয়ে উঠবেন, সেদিনের অলৌকিক অনুভূতি যেন চকিতে তাঁকে জানিয়ে দিয়ে গেল।

Abanindranath Tagore Asit Kumar Halder Bengal School of Art indian painting kala bhavan Nandalal Bose Rabindranath Tagore Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Shantiniketan Shantiniketan Press Suren Kar

Share this article on