Robbar

গঙ্গাস্নানের প্রযুক্তি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 21, 2026 9:24 pm
  • Updated:July 21, 2026 9:31 pm  

এখন দেশে ধর্মভাব গাঢ়। তাই প্রযুক্তিও একালে সাবেকি ধর্মের মহিমাকে বজায় রাখছে বলে বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে। যেমন ধরুন গঙ্গাস্নান। মহাভারতে গঙ্গা অত্যন্ত স্বাধীনা। শান্তনুকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, কোনও প্রশ্ন করা চলবে না। এখন প্রযুক্তির কল্যাণে নিত্যদিন সেকালের কায়দা স্বীকার করলে অফিসযাত্রী ও অন্যান্য কাজে যাওয়া নারী-পুরুষদের গঙ্গাস্নান হচ্ছে। 

বিশ্বজিৎ রায়

১১.

রবীন্দ্রনাথের ‘ছেলেবেলা’ বইটি বেশ চিত্রময়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর জীবনের শেষের দিকে চিত্রময় ভাষায় ছেলেবেলার কথা লিখেছিলেন। এই চিত্রময়তার চালে লেখা তাঁর এই স্মৃতিগদ্যটি পাঠকের মনের চোখ টানে। রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছিলেন, তাঁর জন্ম হয়েছিল সেকালের কলকাতায়। বিশ শতকের কলকাতা রবীন্দ্রনাথের সেকালের উনিশ শতকের কলকাতার থেকে অনেক আলাদা। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ যখন ‘ছেলেবেলা’ লিখছেন, তখন বাঙালি সমাজের মেয়েরা উনিশ শতকের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে। পর্দাপ্রথা অনেকটাই কেটে গিয়েছে। রাজনৈতিক আন্দোলনে মেয়েরা যোগ দিচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথের নিজের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে সহ-শিক্ষা চালু হয়েছে। কেবল তাই নয় রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে মেয়েদের নান্দনিক দৃশ্যমানতা তৈরি হয়েছে। এই নান্দনিক দৃশ্যমানতার বিষয়টি সর্বভারতীয় স্তরে নানাভাবে আলোচিত। ইতিবাচক দিক দিয়ে যেমন কেউ কেউ সেটিকে দেখছেন, তেমনই নেতিবাচক সমালোচনাও হচ্ছে। রবীন্দ্রনাথের নিজের মনও মেয়েদের বিষয়ে খুলে গিয়েছে। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ যখন বেঁচে ছিলেন, তখন রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত জীবনে এমন কিছু কাজ করেছিলেন যার নিরিখে তাঁকে প্রগতিশীল বলা যাবে না। বিশেষত নিজের মেয়েদের কম-বয়সে বিবাহ দেওয়ার জন্য তিনি সমালোচিত। পিতা দেবেন্দ্রনাথ জমিদারির সেরেস্তা থেকে বিবাহের খরচ দেবেন বলেই এই কমবয়সে বিয়ে দেওয়া। এইসব পিছুটান ‘ছেলেবেলা’ লেখার সময় চলে গিয়েছে, অনেকটাই।

‘ছেলেবেলা’ যখন লিখছেন, তার আগে রবীন্দ্রনাথের ‘স্ত্রীর পত্র’ গল্পের মৃণাল স্বামীগৃহ ত্যাগ করেছে। ‘রক্তকরবী’ নাটকের নন্দিনী বিপ্লবে যোগ দিয়েছে। সুতরাং, মেয়েরা কতদূর যেতে পারে তা রবীন্দ্রনাথের পাঠক দেখেছেন। সেকালের কলকাতার কথা লিখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু ফিরেছেন পুরনো কলকাতার সংস্কারে। গঙ্গাস্নানের এক দৃশ্য তুলে ধরেছেন। বাড়ির বয়স্কা মহিলা পুণ্যার্থে গঙ্গাস্নানে যাবেন। গঙ্গাস্নানে সমাজ আপত্তি করেনি। করার কারণ নেই। গঙ্গায় স্নান করলে স্বর্গলাভ অনিবার্য। তাছাড়া তখন হিন্দু সমাজে অন্তর্জলী যাত্রা বেশ চলছে। মারা যাবেন এমন বয়স্কা পুরুষ-মহিলাকে গঙ্গার ঘাটে রেখে আসা হত। গঙ্গাজলটুকু মৃত্যুকালে নিশ্চিত মিলবে। গঙ্গার হাওয়া খেয়ে স্বর্গলাভ। রবীন্দ্রনাথের পরিবারে অন্তর্জলী যাত্রার আচার অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখনও দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করেননি। কাজেই গঙ্গাস্নান তো বেশ ঘটা করেই হওয়ার কথা। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন–

‘মেয়েদের বাইরে যাওয়া-আসা ছিল দরজাবন্ধ পালকির হাঁপধরানো অন্ধকারে, গাড়ি চড়তে ছিল ভারি লজ্জা। রোদবৃষ্টিতে মাথায় ছাতা উঠত না। কোনো মেয়ের গায়ে সেমিজ, পায়ে জুতো, দেখলে সেটাকে বলত মেমসাহেবি; তার মানে, লজ্জাশরমের মাথা খাওয়া। কোনো মেয়ে যদি হঠাৎ পড়ত পরপুরুষের সামনে, ফস্‌ করে তার ঘোমটা নামত নাকের ডগা পেরিয়ে, জিভ কেটে চট্‌ করে দাঁড়াত সে পিঠ ফিরিয়ে। ঘরে যেমন তাদের দরজা বন্ধ, তেমনি বাইরে বেরবার পালকিতেও; বড়োমানুষের ঝিবউদের পালকির উপরে আরও একটা ঢাকা চাপা থাকত মোটা ঘেটাটোপের, দেখতে হত যেন চলতি গোরস্থান। পাশে পাশে চলত পিতলে-বাঁধানো লাঠি হাতে দারোয়ানজি। ওদের কাজ ছিল দেউড়িতে বসে বাড়ি আগলানো, দাড়ি চোমরানো, ব্যাঙ্কে টাকা আর কুটুমবাড়িতে মেয়েদের পৌঁছিয়ে দেওয়া, আর পার্বণের দিনে গিন্নিকে বন্ধ পালকি-সুদ্ধ গঙ্গায় ডুবিয়ে আনা।’

পালকি, দিল্লি স্কুল, ১৮৩০

এই ছিল উনিশ শতকের লা-পাতা লেডিজের জন্য দেশ। লেডিজ কেন মুখ দেখাবে? এক পালকিতে রক্ষা নেই, তার ওপরে আবার মোটা ঘেরাটোপ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় চলতি গোরস্থান। হিন্দু-মুসলমান উভয়পক্ষে একই কাণ্ড।

বেগম রোকেয়ার ‘অবরোধবাসিনী’ পড়লে রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলার বর্ণনার সঙ্গে বেশ মিল পাওয়া যাবে। সেখানে মিঞাঁ মেয়েদের বস্তাবন্দি করে ট্রেনে করে তীর্থে যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মে বস্তা নামানো। নির্দেশ– বস্তার ভেতরে মেয়েরা যেন স্থির থাকেন। নিজেদের অস্তিত্ব লা-পাতা করে রাখেন। কুলি মোট ভেবে বস্তায় লাথি মারছে। ‘লা-পাতা’ লেডিজ ধীর-স্থির। আহা পর্দা-প্রথার কী মহিমা!

এখন দেশে ধর্মভাব গাঢ়। তাই প্রযুক্তিও একালে সাবেকি ধর্মের মহিমাকে বজায় রাখছে বলে বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে। যেমন ধরুন– গঙ্গাস্নান। মহাভারতে গঙ্গা অত্যন্ত স্বাধীনা। শান্তনুকে পরিষ্কার বলে দিয়েছিলেন, কোনও প্রশ্ন করা চলবে না। প্রশ্ন করলেই স্বামী শান্তনুকে ত্যাগ করে চলে যাবেন। করেওছিলেন তাই। অষ্টবসুর শাপমোচনের জন্য গর্ভে সন্তান এলেই জলে ভাসিয়ে দিতেন। শেষে শান্তনু আর প্রশ্ন না করে পারেননি। তখন ভীষ্মকে ফেলে গঙ্গা চলে গেলেন। টিভিতে এককালে যে মহাভারত হত তাতে গঙ্গা-শান্তনুর প্রণয়দৃশ্য ও গঙ্গার গৃহত্যাগ দৃশ্য বেশ রসসিক্ত ভঙ্গিতেই দেখানো হয়েছিল। যাক সে-কথা। গঙ্গা নারী হিসেবে স্বাধীন হলেও সেকালে গঙ্গাস্নানে মেয়েদের স্বাধীনতা ছিল না। একালে ধর্মভাবের আলোকে দেখলে সেকাল যেন একালে নবরূপ পরিগ্রহ করেছে।

গঙ্গাস্নান ও প্রার্থনা, উনিশ শতকের ছবি

এখন প্রযুক্তির কল্যাণে নিত্যদিন সেকালের কায়দা স্বীকার করলে অফিসযাত্রী ও অন্যান্য কাজে যাওয়া নারী-পুরুষদের গঙ্গাস্নান হচ্ছে। পালকি-সুদ্ধ গঙ্গায় ডুবিয়ে আনা যদি গঙ্গাস্নান হয়, তাহলে গঙ্গার তলা দিয়ে মেট্রো রেলে গমনা-গমনকারী যাত্রীগণের গঙ্গাস্নান হইবে না কেন?

অবশ্যই হইবে। হইতেছে। নিত্য হইতেছে। সকাল-বিকাল হইতেছে। পুরাতন প্রথা সকল স্মরণ করিলে পুণ্য। আগায় পুণ্য, গোড়ায় পুণ্য। হে আধুনিক আপিস-বিহারী বঙ্গজ নারী-পুরুষবৃন্দ। আপনারা পুরাতন প্রথাসকল স্মরণ করুন। আপনারা মনে রাখিবেন, পুরাতন প্রথাসকল বড়ই বিবেচনা প্রসূত। আপনাদের নব্য মেট্রোযানে পুরাতনী মতে নিত্য গঙ্গাস্নান হইতেছে। উপরন্তু এই নব্য রেলযানটি রবীন্দ্র-বিবরণ অনুযায়ী, চলমান গোরস্থান নহে। আলোকিত, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। গতিময়। ফলত একই সঙ্গে ইহা ভক্তিযোগ ও কর্মযোগের সহায়। আপনি ভক্তিমান অথবা ভক্তিমতি হইলেই যে মুহূর্তে যানটি গঙ্গাজলের নিম্নে প্রবেশ করিবে, সেই মুহূর্তে আপনার গঙ্গাস্নানের মানস অনুভূতি হইবে। আপনার শরীরের কোনও অংশ জলের স্পর্শ হইল না। কেবল আপনার চিত্ত নির্মল হইল। সেই নির্মল চিত্ত লইয়া আপনি এবার কর্মস্থলে প্রবেশ করিবেন। সেইস্থলে আপনার কর্মযোগের সূত্রপাত। আপনি ভক্ত, অতঃপর আপনি পাপ করিবেন না। আপনি স্নাত, তাই আপনি আলস্যের ঘোরে কর্মস্থল দূষিত করিবেন না। আপনি গঙ্গাস্পর্শ করিয়াছেন, তাই আপনি মিথ্যা বলিবেন না। তাই সকল অফিসযাত্রীকে প্রয়োজনে নিয়ম করিয়া অন্তত মাসে একবার মেট্রোপথে গঙ্গানিম্নে গমনের নির্দেশ প্রদান করা হউক।

তাহলেই হইবে। পাপমুক্ত ধরা, কলিকাতা কল্লোলিনী ও তিলোত্তমা।

……………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন সিরিয়াসলি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা

……………………..