


নবমী-দশমীর সকালে রওনা হলাম গোরখালির উদ্দেশে– সবাই– অর্থাৎ আমরা, মিঠিরা, টিয়ারা, পরিচারিকারা চারজন– মোট বারোজন। গঙ্গা-রূপনারায়ণ-দামোদরের সঙ্গমে দাঁড়িয়ে বৃহত্তর প্রাকৃতিক জগতের কথা মনে পড়ে বা বলা উচিত চোখের মধ্য দিয়ে অনুভবে আসে। শঙ্খ বলে, এ হল সেই জায়গা যেখানে অকালে ঝড় ওঠে, যেখানে…

১.
শুরু করলাম নিজেদের পথে। ময়মনসিংহের বুকের মধ্যে এসে গেছি। রাত্রির অন্ধকারেও সেই নতুন দেখা পথ আমার ভাল লাগাকে কমাতে পারেনি এক চুলও। হঠাৎ এসে পড়লাম কবি নজরুলের জায়গায়– এখানে ত্রিশালে তিনি ছেলেবেলায় পড়াশোনা করতে এসেছিলেন সেই বর্ধমান জেলা থেকে– এক সুজনের সঙ্গে। এখানকার সবাই সবসময় তাঁকে মনে করে। আরও উত্তরে চলেছি। কোথায় চলেছি? চুরখাই বাজার পেরিয়ে ময়মনসিংহ। উপেন্দ্রকিশোরের ময়মনসিংহ, তোমার অতি প্রিয় লেখক, তাই না? আরও চলেছি এগিয়ে– মুক্তাগাছা–। মুক্তাগাছা পার হলেই আমরা যে গ্রামে যেতে চাই সেই গ্রাম– নান্দিনা। মজাটা কী জানো? সন্ধের পরের সময়টা প্রায় ব্রহ্মপুত্রের পাশ দিয়ে দিয়েই আসছিলাম আমরা। এ ব্রহ্মপুত্র যমুনা নয়। মূল ব্রহ্মপুত্রের ধারা বয়ে চলেছে ময়মনসিংহের মধ্য দিয়ে উপবীতের মতো– এ সেই নদী। নান্দিনায় এসে নামলাম যখন দেখি আমরা একেবারে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে। যতদূর চোখ যায় দেখতে পাই নদীর ওপার, মাঠঘাট পার হয়ে চোখ চলে যায় দূরের অস্পষ্ট পাহাড়-শোভার দিকে। আরে, আমরা যে পৌঁছে গেছি গারো পাহাড়ের কাছাকাছি। হ্যাঁ, তাই তো! তাই তো এতো কনকনে ঠান্ডা হাওয়া। উত্তরবঙ্গের কথা মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল তার কামড় দেওয়া ঠান্ডার দাপট আর উত্তর থেকে হুহু করে বয়ে আসা হাওয়ার স্পর্শ। উত্তরবঙ্গও তো আমার তেমনই আপন। এখানে এসে আমি পৌঁছে গেলাম দুই বাংলাদেশের মেলানো জায়গায়– নান্দিনায় এপারে যে বাংলাদেশ। ওপারে সে বাংলা।
২.

কয়েকদিন ধরে সাহিত্য একাডেমি রামকুমার মুখোপাধ্যায়* ফোন করছিলেন, ‘বাবরের প্রার্থনা’র ইংরেজি অনুবাদ ‘Babur’s Prayer’ বাইরের কোথা থেকে চেয়ে পাঠিয়েছে দু হাজার কপি। তাই আবার ছেপে ওরা পাঠাতে চায়। প্রকাশক এলেন এক রাত্রে, বইটি নিতে। জানা গেল, কল্যাণ রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি ওরা, যিনি অনুবাদক। শঙ্খ-র কথা হল যে এ বই তো কল্যাণের। ওকে তো জানাতেই হবে। শঙ্খকে করতে হল যোগাযোগ অপর্ণা সেনের সহায়তায়, কল্যাণ এত অল্প সময়ে আর কি করবে এতদূর থেকে, অন্তত ‘নতুন’ সংস্করণের ভূমিকা লিখবে। ভূমিকা এলে জানা গেল– আমেরিকা-দেশে বইটির* চাহিদা খুব। অনেকেই নিয়েছে নানা কারণে, ৬/৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা পাঠ্য হয়েছে। শঙ্খ-র এ-সব কিছুই জানা ছিল না। কাছ থেকে আজ প্রকাশক সম্পূর্ণ সংশোধিত কপি নিয়ে গেলেন। শঙ্খ গেছে আজ অসুস্থ প্রদ্যুম্নকে দেখতে।
৩.

পুজো গেল। শাম্পান-মন্মনকে নিয়ে টিয়া এ-বাড়িতে। পুজোর মধ্যে শাম্পানের অনুষ্ঠান, অষ্টমী পর্যন্ত থাকা হল। নবমী-দশমীর সকালে রওনা হলাম গোরখালির উদ্দেশে– সবাই– অর্থাৎ আমরা, মিঠিরা, টিয়ারা, পরিচারিকারা চারজন– মোট বারোজন। গঙ্গা-রূপনারায়ণ-দামোদরের সঙ্গমে দাঁড়িয়ে বৃহত্তর প্রাকৃতিক জগতের কথা মনে পড়ে বা বলা উচিত চোখের মধ্য দিয়ে অনুভবে আসে। শঙ্খ বলে, এ হল সেই জায়গা যেখানে অকালে ঝড় ওঠে, যেখানে…
দু’দিন থাকা হল, বাড়িদুটির নামও গঙ্গা-ত্রিবেণী আর রূপনারায়ণ আরও একটি বাড়ির নাম দামোদর।
দুদিনই ভ্যানরিক্শা নিয়ে বেড়ানো, ওদের মুখেই গ্রাম-বৃত্তান্ত শোনা। একদিন গ্রাম্য পথ দিয়ে নদীর অন্যধারে এখানকার প্রাণকেন্দ্র রামকৃষ্ণ মিশনে, সন্ধ্যারতির সময়। অন্যদিন অন্যপথে গ্রামান্তরে – নূরপুর নাম গ্রামের, খ্রিস্টান পাড়ায়, পর্তুগীজ অধ্যুষিত গ্রাম; শতাধিক পরিবারের বাস এখনও (১১৫/১২০)। দুটি সুদৃশ্য গীর্জা গ্রামে– দুটি সম্প্রদায়ের। পরিবেশ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন। বড়দিনে মেলা হয়, তাতে সবার আনন্দ। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান!
……………………………………………………………….
২. নং অংশে ভুলক্রমে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন প্রতিমা ঘোষ।
২. নং অংশে বইটি করা হয়েছে ‘বইটির’।
এছাড়া, প্রতিমা ঘোষের এই লেখা রইল অসম্পাদিত। বানান অপরিবর্তিত।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved