১৯৩৪ সালে শান্তিনিকেতন আশ্রম ছেড়ে কলকাতায় চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথের সকল নাটের কাণ্ডারি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার ক’দিন পরে সেই বছরেই নাটোরের বাড়িতে ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্স’-এ দিনেন্দ্রনাথ সম্পাদক আর উদ্বোধক রবীন্দ্রনাথ। দু’জনের দেখা হল। দিনু দেখলেন তাঁর রবিদা তাঁকে একবারের জন্যও আশ্রমে ফিরে যেতে বললেন না। তার পরের বছরই আশ্রমের বাড়ির আসবাবপত্র বিক্রি করে চিরতরে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করলেন দিনু ঠাকুর।
৬.
“গত ৬/৪/৭৪ তারিখে অমিতাভ ঘোষ কর্তৃক আয়োজিত ‘রবীন্দ্রসংগীত পরিষদে’ আমার একক গান গাওয়া নিয়ে শৈলজাবাবু কীরূপ নোংরামি করেছিলেন তুমি অমিতাভ ঘোষকে ডেকে একবার জিজ্ঞাসা করে নিও। কানাইকে (কানাইলাল সরকার) আমি বলেছি ঘটনার কথা সেও তোমাকে বলতে পারবে। শৈলজাবাবু ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে আমার গানের অনুষ্ঠান বন্ধ করার জন্য ইনজাংশন জারি করিয়েছিলেন। গান বন্ধ হয়নি। পুলিশ এসে গানের সময় তদন্ত করেও গিয়েছিল।” একথা লিখছেন শান্তিদেব ঘোষ, ১১/৪/৭৪ তারিখে অমিতাভ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে। (ছিন্নপাতার সাজাই তরণী। অমিতাভ চৌধুরী)

রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষের ঠিক ১৩ বছর পরে যদি শান্তিদেব ঘোষকে আসরে রবীন্দ্রগান গাইতে হয় পুলিশি নজরদারিতে, তবে হালফিলের নানা পরিসরে বহু-উচ্চারিত ‘থ্রেট কালচার’ আর তার সব ক’টি ন্যারেটিভ এর কাছে শিশু। এমনকী, তার বছরখানেকের মধ্যেই দেশে আনা হচ্ছে জরুরি অবস্থা, সেই দশকেই বিশ্বভারতী সংগীত সমিতির নানা উপদ্রবে দেবব্রত বিশ্বাস রেকর্ড প্রকাশের জগৎ থেকে নিজেকে নির্বাসিত করছেন, তবু রবীন্দ্রনাথের গানের দুনিয়ায় ‘কণ্ঠীশুদ্ধ কণ্ঠকে’ চেপে ধরার এমন উদ্যোগ আর দু’টি ঘটেনি।

তবে জর্জ বিশ্বাসের থেকেও করুণতর নির্বাসনের ঘটনাটি ঘটেছিল দিনেন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে, শান্তিনিকেতন আশ্রম থেকে রবীন্দ্রনাথের সকল গানের ভাণ্ডারি দিনু ঠাকুরকে সরে যেতে হয়েছিল রবীন্দ্রনাথেরই জীবদ্দশায়, ঠাকুর পরিবার থেকে তাঁর প্রাপ্য মাসোহারা বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, পরিবার আর বিশ্বভারতীর অন্দরের গোপন হিংসা ছেয়ে ফেলেছিল রবিগানের আকাশ। ১৯৩২ সালে জমিদারির আয় কম হচ্ছে এই কারণ দেখিয়ে ট্রাস্টি থেকে দিনেন্দ্রনাথকে কোনও টাকা দেওয়া হল না। দিনেন্দ্রনাথের ভিতরে বাজে এই বঞ্চনা। “রথীদের কিছু আটকাচ্ছে না, আমি গরম সইতে পারি না তাই প্রতিবছর পাহাড়ে যাই, সেটুকু পাব না যেতে!” এই ক্ষোভ প্রকাশ করলেন অভিমানী দিনু ঠাকুর। (সূত্র: দিনেন্দ্রনাথের শেষ কয়েকটি দিন, অমিতা ঠাকুর, দিনেন্দ্র শতবার্ষিকী গ্ৰন্থ, টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট)। অমিতা ঠাকুর লিখছেন: “কাজেই ক্রমশঃ যখন দেখলেন যে তাঁকে যেন আর প্ৰয়োজন নেই তেমন তাঁর মনের গভীরে একটা বিক্ষোভ সৃষ্টি হচ্ছিল। শেষের দিকে তেমন কেউ যেতেনও না। সন্ধ্যেবেলা তো একেবারে একা বসে থাকতেন।”

এই সময় ‘গীতবিতান’ প্রথম সংকলিত হচ্ছে, আর সেই কাজে দিনেন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন, তার নজির পাচ্ছি দিনেন্দ্রকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে। অথচ গীতবিতান যখন প্রকাশ হল, তখন সেই বইয়ে দিনেন্দ্রনাথের নামটুকু পর্যন্ত রইল না। পাছে সুর ভুলে যান বলে ঝড়বাদল মাথায় করেও যে রবীন্দ্রনাথ দিনুর কাছে ছুটে গিয়ে তুলে দিয়েছেন তাঁর সদ্যরচিত গান, আর দিনুও তাঁর রবিদাদার গানকে কণ্ঠে নিয়েছেন গান শেখানোর গভীর দায়ে, দু’জনের এই সুরের সখ্যের মাঝে কীভাবে মাথা তুলল ঈর্ষার গূঢ় ফণা, সেই প্রশ্ন আমাদের অবসন্ন করে।
“জানা গিয়েছিল যখন বিশ্বভারতী থেকে চারু ভট্টাচার্য মহাশয় বেতনের প্রস্তাব নিয়ে দিনেন্দ্রনাথের কাছে এলেন উনি তখন চারুবাবুকে বলেছিলেন, ‘ওরা আপনাকে পাঠিয়েছে, আপনি নতুন মানুষ, নিজেরা কেউ এ প্রস্তাব নিয়ে আসবার সাহস রাখেনি, তাই। এতকাল বিদ্যালয়ের সেবা করে এখন আমি মেনে নেব বিশ্বভারতীর কাছ থেকে?’ খুবই রেগে গিয়েছিলেন এ প্রস্তাবে। অত্যন্ত অপমানিতও বোধ করেছিলেন।” জানাচ্ছেন অমিতা ঠাকুর।

১৯৩৪ সালে মুম্বইতে অভিনেয় ‘তাসের দেশ’ নাটকের জন্য সব গান শেষবারের মতো শিখিয়ে সেই বছরই আশ্রম ছেড়ে কলকাতায় চলে গেলেন রবীন্দ্রনাথের সকল নাটের কাণ্ডারি দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার ক’দিন পরে সেই বছরেই নাটোরের বাড়িতে ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্স’-এ দিনেন্দ্রনাথ সম্পাদক আর উদ্বোধক রবীন্দ্রনাথ। দু’জনের দেখা হল। দিনু দেখলেন তাঁর রবিদা তাঁকে একবারের জন্যও আশ্রমে ফিরে যেতে বললেন না। তার পরের বছরই আশ্রমের বাড়ির আসবাবপত্র বিক্রি করে চিরতরে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করলেন দিনু ঠাকুর। ১৯১৯ সালে সংগীত ভবন প্রতিষ্ঠার সময় তিনিই ছিলেন অধ্যক্ষ। রবীন্দ্রসংগীতের ইতিহাসে ঠাকুরবাড়ি আর আশ্রমের গায়কির মধ্যে যে বিরোধহীন অন্বয় রচনা করেছিলেন দিনেন্দ্রনাথ, তা ভেঙে পড়তে শুরু করল সেই দিনটি থেকেই। ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যেতে থাকা অভিমানী স্বামীটির কথা ভেবে কমলা দেবী কখনও বা কোনও পরিজনকে বলেছেন, রবিদাদাকে একটু বলুন না ওঁকে ডাকতে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের থেকে কোনও ডাক এসে পৌঁছয়নি দিনেন্দ্রর কাছে। তবুও কেউ শিখতে এলে রবিদার গান শিখিয়েছেন জোড়াসাঁকোয় বসে। তারপর ১৯৩৫ সালেই জুলাই মাসে এক রাত্রিতে পৃথিবী থেকে চলে গেলেন দিনেন্দ্রনাথ। কলকাতা শহরে এতটুকুও আলোড়ন হল না তাঁর শেষ বিদায়ে। প্রাপ্য মাসোহারা থেকে বঞ্চিত করার যে রাজনীতির আঘাত পেয়েছিলেন দিনেন্দ্রনাথ, তার ৪০ বছর পরে লেখা আর এক আচার্যের চিঠিতে পাই একই আশ্রমিক আক্রমণের ইশারা।

১৯৭৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর দপ্তর থেকে আড়াই হাজার টাকার একটি অর্থসাহায্য এসে পৌঁছচ্ছে শান্তিদেব ঘোষের কাছে, সঙ্গের চিঠিতে সচিব লিখছেন: ‘She has sanctioned a sum of Rs 2500 from the funds at het disposal which she hopes will be of some help.‘ এই বয়ানটি উল্লেখ করে শান্তিদেব লিখছেন অমিতাভ চৌধুরীকে (২৫/৬/৭৪), ‘বুঝতে পারছি না কেন এই টাকাটা পাঠাচ্ছেন ইন্দিরা। এ ধরনের সাহায্য তো আমি চাই নি। আমার মনে হচ্ছে বোধহয় তিনি কারও মুখে শুনেছেন যে বর্তমানে আমি মাইনে পাচ্ছি না, পেনশনের টাকাও নেই, তাইতে হয়ত অসুবিধেয় পড়েছি। তাই উপস্থিত এই টাকাটা পাঠালেন।’ (ছিন্ন পাতার সাজাই তরণী) এর দু’ মাস আগে আরেকটি চিঠিতে শান্তিদেব লিখছেন: ‘তোমরা যে চিঠি ইন্দিরাকে পাঠিয়েছিলে তাতে ওদের ধারণা হয়েছে যে, যদি আমি সংগীত ভবনে ফিরে যাই তাহলে যোশীজিকে হয়ত সরতে হবে ইত্যাদি নানারূপ কাল্পনিক অভিযোগকে কেন্দ্র করে এই চারজন প্রবল হইচই করে বেড়াচ্ছে। পুলিশ ডেকে প্রমাণ করতে চাইছে যে আমি এর পেছনে আছি।‘

অমিতাভ চৌধুরীকে লেখা চিঠির এই চারজন হলেন ধ্রুবতারা যোশী, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, নীলিমা সেন, আরতি গুপ্ত। এই নামোল্লেখ শান্তিদেবের চিঠির গোড়াতেই আছে। ‘সুধাসাগরের তীরেতে বসিয়া পান করে শুধু হলাহল”, এই পঙ্ক্তিটি গানে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ২৫ বছর বয়সে, ১৮৮৬ সালে। এর ঠিক ১৫ বছর বাদে, ১৯০১-এ (বাংলা ১৩০৮ সালের ৭ পৌষ) তিনি শান্তিনিকেতনে স্থাপন করেছেন তাঁর বিদ্যালয়। এর ঠিক ১৯ দিন পরে প্ৰথম যে গানটি লিখছেন রবীন্দ্রনাথ মাঘোৎসবকে উপলক্ষ করে, তাতে লিখছেন:
‘স্বার্থ হতে জাগো, দৈন্য হতে জাগো, সব জড়তা হতে জাগো জাগো রে…’
ভৈরবী সুরের এ গানের স্বরলিপি করে রাখছেন দিনেন্দ্রনাথ। এর ঠিক ৯ বছর পরে (১৯১০) ‘রাজা’ নাটকে রাজার কণ্ঠে রাখছেন গান দিয়ে দ্বার খোলাবার অঙ্গীকার। অথচ তাঁরই গানের ভূমিতে রক্ত ঝরছে প্রত্যহের কুশাঙ্কুরের আঘাতে, জীবনের সত্য আর শিল্পের সত্যের মাঝখানে জমছে অমোঘ শ্লেষ।

সম্প্রতি নবতিপর বিভা সেনগুপ্তর এই বয়সের তিন সপ্তক ছোঁয়া সুরেলা মরমী কণ্ঠ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। প্রশ্ন জাগে, পূর্ণ মহিমায় যখন ছিল তাঁর কণ্ঠ, তখন তাঁকে আমরা শুনতে পাইনি কেন? কেন তাঁর গুরু দেবব্রত বিশ্বাসকে দংশনপ্রবণ এক বিখ্যাত সাংবাদিককে লক্ষ্য করে একটি আসরে গাইতে হয়েছিল, ‘কেন তোমরা আমায় ডাকো?‘ ইন্দ্রাণী সেন আমায় বললেন একটি কাহিনি। ‘সখী ভাবনা কাহারে’ গানটি যখন রেকর্ড করেছিলেন সুমিত্রা সেন, মিউজিক বোর্ড প্রথমে গানটি অনুমোদন করতে চাননি। বোর্ডের অন্যতম বিচারক সুচিত্রা মিত্র ফোন করে সুমিত্রা সেনকে বললেন, গানটি আবার রেকর্ড করতে হবে। তখনকার দিনে ডিজিটাল রেকর্ডিং ছিল না। আবার রেকর্ড করা মানে পুনরায় সব যন্ত্রীদের নিয়ে গান গাওয়া। ‘মা কী বলবেন ভেবে পেলেন না। তখন বাবা ফোনে সুচিত্রা মিত্রকে বললেন, সুমিত্রা আর গাইবে না। ওই রেকর্ডিংটাই পাস হয়ে গেল। বাকিটা ইতিহাস…‘, বললেন ইন্দ্রাণী সেন।

আহত পাখির কান্না শুনে দস্যু রত্নাকরের মুখ দিয়ে উচ্চারিত হয়েছিল রামায়ণের প্রথম শ্লোক। শোক থেকে জন্ম নিল শ্লোক। সেই শ্লোক গেয়ে বেড়াতে লাগল লব আর কুশ। সেই গান শুনে নগরবাসী কাঁদতে লাগলেন। আজ থেকে ৪০ বছর আগে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাসে আমাদের মাস্টারমশাই সতী চট্টোপাধ্যায় উত্থাপন করলেন এই প্রশ্ন। কার বেদন? একতারাটিকে একা যে সংবেদন ধারণ করতে হয়, তার ভার কতখানি? কী-ই বা সেই বেদন যার উৎসারে হিংস্র দস্যু গেয়ে ওঠে গান? আর ভিতরে প্রচুর কলুষ বহন করেও কীভাবে কেউ ডুব দিতে পারেন গানের লীলার সেই কিনারে।

সতীদি বললেন, ‘বিদ্যা’ আর ‘বেদন’ দুই-ই জন্ম নিয়েছে সংস্কৃত ‘বিদ’ ধাতুটি থেকে। এ সংসারে বিদ্যমান হয়ে থাকাই বা কম কী! সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে জানা গেল রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে পারেন, এটা জানাজানি হওয়ায় একজন নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি গিয়েছে। তাসের দেশে গান! সেটা হয় না কি! ভরসায় কথা, কাজ হারানো গীতবিতানের সেই প্রাক্তনীকে নিয়ে কলকাতা শহরে একটি অনুষ্ঠান ভেবেছেন একটি সংস্থা। সেই আসরে একজন পেশাদার গাইয়ে সঙ্গীও হচ্ছেন জীবিকাহারা যুবকটির গানের। সকল দ্বন্দ্ব বিরোধ মাঝে সেই আসরেই না হয় না হয় ঝরে পড়ুক সুরের রুদ্রনিঠুর স্নেহ। সেই স্নেহ আমাদের মনে করিয়ে দিক, লেগে থাকাই তো বেঁচে থাকা।
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য পর্ব
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved