


গণনাট্য ও কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে লগ্ন সুচিত্রা, মাঠে ময়দানে রবীন্দ্রসংগীত-না-চেনা হাজার মানুষের সামনে নিয়ত গান গাইতে থাকা সুচিত্রা গানে শব্দের উচ্চারণকে নিয়ে যান এক জোরালো স্পষ্টতায়। ১৯৮৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন যে, একবার আকাশবাণীর এক অবাঙালি অধিকর্তা না কি বলে বসেন: ‘আমি সুচিত্রার গান শুনেছি। উচ্চারণ এতই স্পষ্ট যে শুনে মনে হয় একটা hammering-এর এফেক্ট।’ তারপর আকাশবাণীর এক অনুষ্ঠানে ওঁকে সেই অধিকর্তা গান গাইতে অনুরোধ করায় সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘সে কী! সাধ করে, যেচে একটা হাতুড়ি নিয়ে নিজের মাথায়…’
৫.
“সবচেয়ে মজার দেখুন, দেবব্রত বিশ্বাসের যে রেকর্ডটা সবচেয়ে বেশি পপুলার হল, সেটিই ডিফেকটিভ, ‘আকাশ ভওরা…’”। দেবব্রত বিশ্বাসের উচ্চারণ নিয়ে রসিকতার ছলে শ্লেষ প্রয়োগ করছেন সুভাষ চৌধুরী সত্যজিৎ রায়ের সমীপে, ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত এবং ইউটিউবে শ্রবণলভ্য রবীন্দ্রসংগীত বিষয়ে একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে। যদিও সত্যজিৎ রায় দেবব্রত-র এহেন উচ্চারণের মধ্যে বিলিতি মেজাজ আছে কি না সে বিষয়ে যখন অনুসন্ধিৎসু মন্তব্য করছেন, বলছেন, ‘না কি বিলিতি মেজাজ? বোধহয়। দেখতে হবে।’ (ওঁর কণ্ঠস্বরেই শোনা যায় একটি সিরিয়াস স্বর), তখনও সুভাষ চৌধুরী তাঁর লঘু রসিকতার চালটি থেকে বেরিয়ে আসছেন না। সত্যজিতের তন্ময় কণ্ঠে ‘দেখতে হবে’ শুনেই আঙুল চলে গেল ইউটিউবে রবীন্দ্রনাথের ‘অন্ধজনে দেহ আলো’ গানটির লিংকে, স্পষ্ট শোনা গেল গায়ক রবীন্দ্রনাথ প্রথম অন্তরা ফিরে গাইছেন ‘শুষ্ক হৃদয় মমৌ’। এমনকী এই আলাপচারিতায় সত্যজিৎ ও সুভাষ চৌধুরী যে সুচিত্রা মিত্রের উচ্চারণের ভূয়সী তারিফ করতে থাকেন, আজীবন উচ্চারণনিষ্ঠ সেই সুচিত্রাও তাঁর জনপ্রিয়তম গান ‘কৃষ্ণকলি’তে বলে ওঠেন ‘আর জানে সেই মেইয়ে’। সংগীত-জীবনের প্রথমদিকে ‘সন্দীপন পাঠশালা’ ছবিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনায় গাওয়া ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ গানটিতে সুচিত্রা মিত্র উচ্চারণ করেন ‘নায়াসে’ (না আসে), যদিও উত্তরকালে প্রথম গায়নটির মেলোডিময় নিবেদনের পরিবর্তে তিনি এ গানে ব্যবহার করেন স্ট্যাকাটোর আভাস এবং ধারালো নৈপুণ্যে উচ্চারণ করেন ‘না আসে’। এবং এবারের স্পষ্টতর উচ্চারণের দাপটে পূর্বেকার সুরেলা আকুলতার পরিবর্তে গানটি পায় এক রাজনৈতিক দার্ঢ্য; উচ্চারণ বদলে দেয় গানের ব্যাখ্যান ও ‘বয়ান’। আর এর থেকেই প্রশ্ন আসে উচ্চারণ কি কেবলমাত্র স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি ও যুক্তধ্বনির অবিকল উপস্থাপন? এমনকী গান, বিশেষ করে রবীন্দ্রসংগীতের মতো ব্যঞ্জনাবহ কাব্যগীতির ক্ষেত্রেও?

বাংলা উচ্চারণের শুদ্ধতা ও বিকার নিয়ে লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ, তাঁর ‘শব্দতত্ত্ব’ বইয়ের ‘বাংলা উচ্চারণ’ শীর্ষক লেখাটিতে। বাংলাভাষার ক্ষেত্রে যেমন, তেমনই বাংলা উচ্চারণের ক্ষেত্রেও রবীন্দ্রনাথ মান্যতার যে নিরিখ তৈরি করেন তা ‘প্রমিত’ বাংলার মতোই কলকাতা-কেন্দ্রিক এবং একালের চোখে একেবারেই পলিটিকালি ইনকারেক্ট। তিনি লেখেন– ‘কলিকাতা অঞ্চলের উচ্চারণকেই আদর্শ ধরিয়া লইতে হইবে। কারণ কলিকাতা রাজধানী। কলিকাতা সমস্ত বঙ্গভূমির সংক্ষিপ্তসার।’ (বাংলা উচ্চারণ/ শব্দতত্ত্ব)। তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজস্ব বাংলা উচ্চারণে কলকাতার উচ্চারণকেই মেনে চলছেন? আর যদি মেনেই চলছেন তবে তা কোন কলকাতা? কোন শ্রেণির মানুষের কলকাতা? ‘জনগণমনঅধিনায়ক’ গানে বাঙালির হিন্দিঘেঁষা উচ্চারণ নিয়ে অনেক খিল্লি আর চাপান-উতোর চলে সোশাল মিডিয়ায়। কবিকন্ঠে এই টেক্সটের আবৃত্তি ইউটিউবে আছে। কেমন উচ্চারণ সেখানে? না, মোটেও তা আমাদের চেনা বাঙালি উচ্চারণ নয়। সেই উচ্চারণ সংস্কৃত-ঘেঁষা। রবীন্দ্রনাথ ভারতভাগ্যবিধাতার জয়বাণী শোনাচ্ছেন স্তোত্রের ভঙ্গিতে, উচ্চারণে প্রয়োগ করছেন সংস্কৃত শব্দ উচ্চারণের ওজস্বী আভা। অথচ গাইবার সময় এই উচ্চারণভঙ্গি অনেকটাই সরিয়ে রাখছেন, যদিও তৎসম শব্দের উচ্চারণের ক্ষেত্রে তিনি স্বরবর্ণের উচ্চারণে সংস্কৃত ভাষার উচ্চারণরীতিকেই মেনে চলেছেন। তাই ‘ওগো কাঙাল আমারে’ গানে ‘কী কাতর গান গাই’ গাওয়ার সময় ‘কী’-এর দীর্ঘ ঈ স্পষ্ট করছেন, আর তিনি ‘কাতোর’ হচ্ছেন না।

ঠাকুরবাড়ির সন্তান রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথ, ইন্দিরা দেবী প্রমুখ সকলেই ভালো সংস্কৃত জানতেন। যেমন জানতেন ব্রাহ্মসমাজের গাইয়েরা। যে উচ্চশিক্ষিত সংস্কৃতি-পরিসরে রবীন্দ্রগান প্রথম গাওয়া হয়েছে, তাঁদের উচ্চারণভঙ্গি আম-কলকাতার উচ্চারণ নয় কিন্তু। সেকালে রবীন্দ্রঘনিষ্ঠ যাঁরা রবীন্দ্রগান গাইতেন তাঁদের বাংলা উচ্চারণ শ্রীধর কথকের, রূপচাঁদ পক্ষীর বা নিধুবাবুর গান বা কবিগান যাঁরা গাইতেন তাঁদের মতো নয়। বেদানা দাসী আর ইন্দিরা দেবীর বাংলা উচ্চারণ একরকম হওয়ার কথাও নয়। নবদ্বীপের ঘরানাদার শাস্ত্র-অভিজ্ঞ কীর্তনিয়া এবং বিষ্ণুপুরের অভিজাত গাইয়েদের বাদ দিলে নবজাগরণের নতুন আলো-দেখা বাঙালি গাইয়েদের উচ্চারণ ছিল অনেকটাই সংস্কৃত-ঘেঁষা। রবীন্দ্রসংগীতে এই সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলা উচ্চারণ উত্তরকালে শুনতে আমরা শুনতে পাচ্ছি মোহন সিং-এর কণ্ঠে, বিশেষত ওঁর ‘বাজাও তুমি কবি’, ‘মহাসিংহাসনে বসি’ ইত্যাদি গানে। ওঁর গায়কি ও উচ্চারণভঙ্গিতে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব আছে, বিশেষ করে আকার-এর মাপে। রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ‘আমার পরান লয়ে’ এবং মোহন সিং-এর কণ্ঠে এই একই গান পাশাপাশি শুনলে উচ্চারণভঙ্গির এই সামীপ্য চোখে পড়ে।

এদিকে বাংলা উচ্চারণ নিয়ে যখন লিখতে বসলেন রবীন্দ্রনাথ ১৯০৯ সালে, তখন তিনি শান্তিনিকেতন আশ্রমের শিক্ষক। তিনি লিখছেন, ‘বাংলা ভাষায় এইরূপ উচ্চারণের বিশৃঙ্খলা যখন নজরে পড়িল, তখন আমার জানিতে কৌতূহল হইল এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে একটা নিয়ম আছে কিনা।’ সেই নিয়মের সন্ধান করতে করতে রবীন্দ্রনাথ এ-কারের উচ্চারণে পৌঁছন, ‘ভেক’ এবং ‘এক’-এ এ-কারের উচ্চারণ নিয়ে আগ্রহোদ্দীপক আলোচনা করেন, তারপর পৌঁছে যান ক্রিয়াপদের এ-কারে। ‘দ্যাখা’, ‘ব্যাচা’ থেকে ‘লেখা’, ‘গেলা’ এইসব নানা ফারাক খুঁজে নেওয়ার পর্বেই রবীন্দ্রনাথ লেখেন, ‘কিন্তু এ-কারের বিকার কোথায় হইবে তাহার একটা নিশ্চিত নিয়ম বাহির করা এমন সহজ নহে’। ১৯৩৮সালে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই আশ্রমকন্যা কণিকার (তখন মুখোপাধ্যায়) প্রথম রবীন্দ্রসংগীতের রেকর্ড বের হয় আচার্য শৈলজারঞ্জনের পরিচালনায়। তার একটি গান ‘মনে কী দ্বিধা রেখে’তে কণিকা গেয়েছেন ‘গ্যালে চলে’। গানটি শুনে ভাবলাম, শিক্ষক শৈলজারঞ্জন ময়মনসিংহ জেলার লোক, সেই প্রভাবেই বুঝি বা এই উচ্চারণ। কিন্তু চমকে গেলাম শান্তিদেবের কন্ঠে ‘যখন এসেছিলে অন্ধকারে’ গানেও ‘তুমি গ্যালে যবে’ শুনে। দু’টি গানই ইউটিউবে আছে, পাশাপাশি শুনছি আর ভাবছি কী উৎস এই উচ্চারণের? তবে কি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রগানে বাংলা শব্দের উচ্চারণ সরে যেতে শুরু করেছিল কলকাতার সমাজের রবীন্দ্রসংগীতে বাংলা উচ্চারণ থেকে? আর এসব বলতে বলতে এই লেখাও তো সরে গেল কাব্যগীতিতে শব্দের উচ্চারণের উদ্দেশ্য থেকে উচ্চারণের শুদ্ধতার কচকচিতে!

আমরা ছিলাম সুচিত্রা মিত্রের উচ্চারণের পন্থাটি বিষয়ে আলোচনায়। গণনাট্য ও কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে লগ্ন সুচিত্রা, মাঠে ময়দানে রবীন্দ্রসংগীত-না-চেনা হাজার মানুষের সামনে নিয়ত গান গাইতে থাকা সুচিত্রা গানে শব্দের উচ্চারণকে নিয়ে যান এক জোরালো স্পষ্টতায়। ১৯৮৬ সালে ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন যে, একবার আকাশবাণীর এক অবাঙালি অধিকর্তা না কি বলে বসেন: ‘আমি সুচিত্রার গান শুনেছি। উচ্চারণ এতই স্পষ্ট যে শুনে মনে হয় একটা hammering-এর এফেক্ট।’ তারপর আকাশবাণীর এক অনুষ্ঠানে ওঁকে সেই অধিকর্তা গান গাইতে অনুরোধ করায় সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, ‘সে কী! সাধ করে, যেচে একটা হাতুড়ি নিয়ে নিজের মাথায়…’

আসলে সুচিত্রা গানকে চোখে দেখতে চাইতেন, শ্রোতার কল্পনাতেও গানের একটা ভিজুয়াল অবয়বকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। অথচ তিনিই যখন ‘গোপনবাসীর কান্নাহাসির’ বলার সময় ‘কান্না’ শব্দের আকারটিকে উচ্চারণ করতেন এমন এক গহন ব্যাপ্তিতে, যাতে ওই আকারেই দুলে উঠত অতল রোদন। উচ্চারণ দিয়ে ছবি আঁকেন দেবব্রত বিশ্বাস আরও সুচারু কৌশলে, গানে গানে ধরা রয়েছে তাঁর সে কলানৈপুণ্য। আর টেকনিক্যালি স, শ, ষ, র, ড়, ঢ় পৃথক সৌষ্ঠব পেয়েছে প্রথম তাঁরই উচ্চারণে, একথা আজও কেন বলতে হয় নতুন করে– এই লেখার সূচনায় তার হদিশ আছে। তালবাদ্য-সহ গাওয়া গানে, বিশেষত নাটক বা নৃত্যনাট্যের গানে শান্তিদেব প্রয়োগ করেন শব্দের শানিত উচ্চারণ। যে শান্তিদেব ‘অমল ধবল পালে লেগেছে’ বলার সময় তরল ব্যঞ্জনের অনুপ্রাসটি প্রকাশ করেন প্রত্যেকটি ‘ল’-কে আলতো ঠেলে দিয়ে, সেই শান্তিদেব ‘চণ্ডালিকা’র গান একক রেকর্ডে গাওয়ার সময় ‘দুর্বল হোস নে’ গানে ‘শেষনাগমন্ত্র, নাগপাশবন্ধনমন্ত্র’ অংশে দন্ত্য-ন-গুলির উচ্চারণে সৃষ্টি করেন এক তীব্র ঝনৎকার। শুনে মনে হয় গায়ক যেন শুষে নিতে চাইছেন শব্দের ভিতরকার শক্তিকে, শব্দের সত্যকে। আবার গৌতম ঘোষের তৈরি তথ্যচিত্র ‘মোহর’-এ বর্ষীয়ান কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘মরণ রে তুহু মম’ গানে ‘মরণ’ শব্দটির এমন অনুচ্চ অথচ মগ্ন উচ্চারণ করেন, যেন মনে হয়, তিনি যেন স্বরকে নিয়ে গেলেন মৃত্যুর অদেখা গভীরে। খুব একান্ত ও প্রায় স্বগত উচ্চার যে কত সত্য হয়ে উঠতে পারে– এই ‘মরণ’ উচ্চারণটি তার প্রতিনিধি। এইভাবে ব্যাকরণকে অতিক্রম করে, ‘শব্দ’ আর ‘সত্য’ এই দুইয়ের মাঝখানে যেন সেতু বাঁধবার চেষ্টা করছে উচ্চারণ, আর সেই ধ্বনিতে গায়ক আর শ্রোতার ভিতরের তার দু’টি বাঁধা পড়ছে একটি সুরে। কারণ একাকী গায়কের একতারার একটি তার শিল্পের সংবেদনটিকে একলা বয়ে নিয়ে যেতে পারে না। গান যদি প্রকাশবিদ্যা হয়, তাহলে সেখানে শব্দের উচ্চারণ কতটা তদগত আর কতটা স্বগত– এই পরিমাপের ভিত্তিতে তৈরি হয় দু’টি নন্দনপথ, আলাদা হয়ে যায় সুচিত্রা আর কণিকার শব্দ উচ্চারণের পন্থা।

শৈলজারঞ্জন মজুমদার শান্তিদেবের কণ্ঠবাদনকে ‘হাউলিং’ মনে করতেন– একথা লিখছেন সুভাষ চৌধুরী, তাঁর ‘রবীন্দ্রনাথের গান ও অন্যান্য’ বইতে। পাঠককে অনুরোধ করি, ‘ওলো সই ওলো সই’ গানটি শান্তিদেব ও শৈলজারঞ্জন দু’জনের কণ্ঠেই ইউটিউবে শুনতে। ‘আমার ইচ্ছা করে’ অংশে শান্তিদেব ‘ইচ্ছা’ উচ্চারণ করছেন যুক্তবর্ণে ঝোঁক দিয়ে, ‘আমার’ শব্দটি উচ্চারণ করে হ্রস্ব-ই-কারটিতে আলাদা শ্বাসের আঘাত দিয়ে ‘ইচ্ছা’কে দিচ্ছেন একটি ‘সোচ্চার’ স্ফুরণ। আর ওদিকে শৈলজারঞ্জনের সুরনিবিষ্ট স্বগত গায়নে সেটি হয়েছে ‘আমারিচ্ছা করে’।

‘হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ’ বইতে জয় গোস্বামী লিখছেন, ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকালমাঝে’ গানটি তিনি যখন প্রথম শোনেন, তখন তাঁর কানে উচ্চারণটি পৌঁছয় ‘মহাকালো’ হয়ে (অধিকাংশ গাইয়েই ‘কাল’কে ‘কালো’ করে দেন, অন্যতম ব্যতিক্রম এ গানে দেবব্রত বিশ্বাস)। জয় জানাচ্ছেন কীভাবে এই ‘মহাকালো’ উচ্চারণ কালের এক বিপুল কালোবরণ রূপ এনে দেয় তাঁর অল্পবয়সি কল্পনায়। এক্ষেত্রে একটি শব্দের ও-কারান্ত উচ্চারণ শব্দটিকে পৌঁছে দেয় এক ভিন্ন দ্যোতনায়: ‘শব্দতত্ত্ব’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ যাকে বলছেন ‘শব্দের অনির্বচনীয়তা’, আমরা তার একটি উদ্ভাস পাই জয়ের এই শ্রবণ-আখ্যানে।
কিন্তু হ্যাঁ, শব্দের মতো উচ্চারণেরও একটি রাজনীতি আছে। কলকাতা, শান্তিনিকেতন, সভা, টিকেট কিনে শুনতে যাওয়া প্রেক্ষাগৃহ, রেকর্ড, ছায়াছবির গান, ফেসবুকের রিল, গানের ফিউশন– এই সব কিছু পরিসরে গাইয়ে-শ্রোতা এবং সর্বোপরি বাণিজ্য তৈরি করে নিচ্ছে নানারকম উচ্চারণ-পলিসি। ডাকসাইটে অভিনেতা ও গাইয়ে কানন দেবী ‘মুক্তি’ ছবিতে ‘আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে’ গানে বাজার মাত করেছিলেন। এই গানে ওঁর ‘তুফান’ শব্দের উচ্চারণের রণন এসে পৌঁছয় নয়ের দশকে কবীর সুমনের রেকর্ডে ‘প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে’ গানের ‘তুফান’ উচ্চারণে। এই অ্যালবামেরই ‘নিত্য তোমার যে ফুল ফোটে’ গানে ‘চরণচুম্বনে’ শব্দে ‘চুম্বন’ উচ্চারণে সুমন ওষ্ঠ্যবর্ণকে প্রয়োগ করেন এমন নিখুঁত কৌশলে যে, আমরা সেই শব্দের শরীরী অভিঘাত পাই। এক কাপ চায়ের সঙ্গে এই চুম্বনও কান পেতে নিয়েছেন বাঙালি শ্রোতা। আবার ‘রাবীন্দ্রিক’ নামের সাংস্কৃতিক নির্মাণটিরও একটি বাজার আছে, অনেক শ্রোতা সত্যিই মনে করেন একটু দাঁত চেপে বা একটু গোল গোল করে, স্বরের আকারকে বেশ ছোট করে গাইলে গায়কি এবং বেশ ‘রাবীন্দ্রিক’ হয়, আর তালব্য-শ একটু বাড়তি হলে, মানে সেদিনকে ‘শেদিন’ বললে একেবারে আগমার্কা ‘রাবীন্দ্রিক’ হয়ে যাওয়া যায়। তাঁরা কিশোরকুমারের ‘পাগলা হাওয়া’-র ‘পাগলা’ উচ্চারণটিকে ঠিক জাতে তুলতে রাজি হবেন না। যদি রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিক ভাববাদ এমনকী ভারতীয় ধ্বনিতত্ত্ব মানি, তবে উচ্চারণকে শব্দব্রহ্মকে প্রকাশ করার দায় নিতে হবে। নচেৎ আমাদের মেনে নিতে হবে উত্তর-আধুনিক বহুত্বের সমান অধিকারকে। কারণ উত্তর-আধুনিক চিন্তায় অথরিটি বলে কিছু নেই, এবং উত্তর-আধুনিকতা শব্দের কোনও অন্তর্নিহিত মহিমা বা ‘স্বরাত্মা’য় (essence) বিশ্বাস করে না।

একটা কথা বলে শেষ করি। লেখার অক্ষর এবং ছাপার অক্ষর জন্ম নেবার বহু আগে থেকে মানুষ গান গাইছে। আদিকাল থেকে সাহিত্য গায়কের কণ্ঠকে আশ্রয় করেই মানুষের কাছে পৌঁছেছে। সেখানে কাজেই গানে শব্দের উচ্চারণ, বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের গানে শব্দের উচ্চারণ নিয়ে নিরুচ্চার থাকার আর কথা নয় আমাদের।
………………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন ঠাকুরঘরানা-র অন্যান্য পর্ব
………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved