


বিফলতার মতো, চরম সাফল্যও ক্লান্তি বয়ে আনতে পারে, বিক্ষত, নিঃসঙ্গ করে দিতে পারে। সেই নিঃসীম আঁধার-সমুদ্রে বুদ্ধদেব গুহ যেন বাতিঘর। আলোয় আলোয় মুক্তি দিতে পারে আমায় লেখা, একটি চিঠিতে তাঁর মন্ত্রসম উচ্চারণ, ‘যার গন্তব্য যত দূরে, তার নিঃসঙ্গতা তত গভীর, যে পাখি যত উঁচুতে ওড়ে, তার নিঃসঙ্গতা তত বেশী, সে নিঃসঙ্গতা গর্বের, তা নিয়ে দুঃখ করতে নেই।’ বুদ্ধদেব গুহ প্রকৃতির সবুজ শুশ্রূষার মতো। চিরন্তন।
আজ ২৯ জুন।
অনেকগুলো বছর, এই দিনটা শুরু করতাম যে ফোনটা করে, তা এই নিয়ে পাঁচ বছর আর করা হবে না। আর কোনওদিন হবেও না!
চলে যাওয়ার প্রায় পাঁচ বছর পরেও অনেকের মতো আমার আজও বিশ্বাস হয় না– ওই রকম জিন্দা-দিল, মনমৌজী, উঁচু-মাথা মানুষটা নেই! ভবিষ্যতে হয়তো এমন দিনও আসবে, যেদিন অনেকে বিশ্বাসই করবে না যে, এইরকম একজন মানুষ সত্যিই একদিন ছিলেন!
পৃথিবীতে দু’ ধরনের মানুষ আছেন, এক– যাঁরা তাজমহল দেখেছেন আর দুই– যাঁরা দেখেননি। এপার বাংলা-ওপার বাংলা, বিলেত, আমেরিকা, কানাডা বিশ্ব জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ২৮ কোটি বাঙালিরও তাই। এক, যাঁরা বুদ্ধদেব গুহর লেখা পড়েছেন; আর দুই, যাঁরা পড়েননি!

আমি বুদ্ধদেব গুহ-র একজন পাঠক, ভক্ত। এবং খুব ভাগ্যবান ভক্ত।
প্রথম আলাপের সময় মানুষটা গনগনে মধ্যগগনে। আর আমি ইশকুলের চৌকাঠ পেরিয়ে সবেমাত্র কলেজে। সেই শুরু, তারপর এক নাগাড়ে প্রায় চার দশকের সম্পর্ক। শুধু নিভৃতবাসের বছরটায় দেখা হত না। কিন্তু প্রায় রোজ কথা হয়েছে ফোনে, কাজের কথা, অকাজের কথা, কোনও একটা স্বপ্ন দেখেছেন, ফোন করলেন। একটা গানের কথা মনে পড়ছে না, ফোন করলেন।
একবার তো হঠাৎ দেখি অসময়ে মিসড কল, দুপুর তিনটে চল্লিশ মিনিটে, আমি তো ভয় পেয়ে রিং ব্যাক করলাম।
–দাদা, ফোন করেছিলেন?
–হ্যাঁ কৌশিক, আচ্ছা শোনো, ঋজুর বাড়িতে যে রান্না করত ওর নামটা কী বলো তো, একদম মনে পড়ছে না, এদিকে বিকেল বেলা ডিকটেশন দিতে হবে…
–ঋজুদার বাড়ি?
–হ্যাঁ, হ্যাঁ আরে বলো না…
–গদাধরদা?
–হ্যাঁ, হ্যাঁ গদাধর! বাঁচালে।… বলেই হেসে ফেললেন। লাজুক হাসি।
আমি বললাম, দাদা এই ফোনটা কিন্তু আমি চিরদিন মনে রেখে দেব।
–তা দিও। থ্যাংক ইউ।

তো, এই ঋজুদার জন্যই আমার জীবনে প্রথম অটোগ্রাফ দেওয়া। সে-বার বইমেলায় শীতের এক বিকেলে দাদার সঙ্গে ঘুরছি, বোধহয় ’৯৩ বা ’৯৪ সাল হবে। দাদা একটি স্টলে বসেছেন, বিপুল ভিড় তাঁকে ঘিরে, প্রতিবারই যেমন হত। বিশাল সর্পিল লাইন। একটি ছেলে, বছর ১৬-১৭, পাতলা গোঁফ, চোখে চশমা, কাঁধে ঝোলাভর্তি বই। আমার সামনে এসে নার্ভাস গলায় বলল–
–আপনি মানে, আপনি ডা. কৌশিক লাহিড়ী? আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেবেন?
আমার তো ভিরমি খাওয়ার দশা। আমি কে? আমি কেন?
–মানে, ঋজুদা সমগ্র আপনাকে উৎসর্গ করা তো!
ঝাপসা চোখে অটোগ্রাফ দেওয়ার সেই মুহূর্তটা আজও ভুলিনি।
শ্যাম থাপার সেই বিখ্যাত বাইসাইকেল ব্যাকভলি মনে আছে? সেটা ছিল ’৭৮ সালের ৫ আগস্ট। শনিবার। সেই সপ্তাহের ‘দেশ’ পত্রিকায় একটি গল্প প্রকাশিত হয়। গল্পটির নাম– ‘বাবা হওয়া’, লেখক বুদ্ধদেব গুহ।
মা আমাকে পড়তে দেন। সেই প্রথম আমার বড়দের পত্রিকা খোলার অনুমতি পাওয়া। সেই প্রথম আমার বুদ্ধদেব গুহর লেখা পড়া! খুব যে কিছু বুঝতে পেরেছিলাম, তা নয়। তবে মজে গিয়েছিলাম!
তার পরের বছরগুলিতে একে একে পড়ে ফেললাম– ‘বনবিবির বনে’, ‘গুগুনোগুম্বারের দেশে’, ‘রুআহা’, ‘অ্যালবিনো’ আর তারপর ‘জঙ্গলের জার্নাল’, ‘লবঙ্গীর জঙ্গলে’, ‘পারিধী’, ‘বিন্যাস’ এবং ‘কোজাগর’! আমার পরবর্তী জীবনের ম্যাপিং বোধহয় তখনই নির্দিষ্ট হয়ে যায়।

’৮৪ সালে ‘পরিবর্তন’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় সে-বার অনেক সাহিত্যিকের ঠিকানা ছাপা হয়েছিল। সেখান থেকে রাজা বসন্ত রায় রোডের ঠিকানাটা পাই। বাড়ির নাম ‘কনীনিকা’। মানে চোখের তারা বা মণি।
সাহস করে যখন চিঠি-লিখি তখন আমার ১৮ হয়নি, লেখকেরও ৫০ ছুঁতে একটু দেরি, আর হ্যাঁ, ‘মাধুকরী’ ‘দেশ’-এর পাতায় প্রকাশিত হতে আরও মাস দেড়েক!
কী আশ্চর্য! সপ্তাহ না-ফুরতেই, মনোগ্রাম করা মোটা কাগজে দারুণ হাতের লেখায় চিঠির উত্তর এল।
কিশোরটি সারা দুপুর বিকেল ভেসে বেড়ালো মাটি থেকে পাক্কা ইঞ্চি দুয়েক ওপরে! আর তার মনের বনে একটা হলদে প্রজাপতি উড়তে শুরু করল!
আজ পরিণত বয়সে পৌঁছে, আমার বাড়ির দলিল ঠিক কোথায় রাখা আছে আমার খেয়ালও থাকে না, কিন্তু একটি-একটি করে পাওয়া কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহর ১৪১টি চিঠির একটি সম্ভার ধীরে ধীরে আমার সর্বস্ব সম্পত্তি হয়ে উঠেছে– গত প্রায় চার দশক ধরে তার প্ৰতিটি শব্দে, যতিচিহ্নে, আঁকিবুঁকিতে, অক্ষরে, সাক্ষরে!
রংপুরের প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক ডা. ভূপতিকান্ত মৈত্র ছিলেন লেখকের পিতা শচীন্দ্রনাথ গুহর বন্ধু। ইনি হলেন ‘দূরের ভোর’, ‘ঋভু’, ‘নাজাই’– এমন বহু লেখায় উল্লিখিত সেই ভূপতিকাকা। আমার সেজদাদু। সেই সূত্রে পারিবারিক সম্পর্কটা আট দশক পেরিয়ে গিয়েছে।

আমাকে লেখা এই বিপুল সংখ্যক চিঠিতে ধরা পড়েছে প্রায় সাড়ে তিন দশকের একটা বিস্তৃত সময়, বিশেষত যে-সময়টা তিনি সৃষ্টিশীলতা, ব্যস্ততা এবং খ্যাতির তুঙ্গে। পরবর্তীতে বিখ্যাত হয়ে ওঠা, আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পাওয়া, বহু গল্প-উপন্যাসের সৃষ্টিকাল সেই সময়টা!
এ তো গেল কাগজে-কলমে গাঁথা স্থাবর সম্পত্তি! আর স্মৃতির আকাশ জুড়ে যে অস্থাবর সম্পত্তি, তা তো সীমাহীন!
বোধহয় ’৯২ সাল। আমার জন্মদিনে প্রণাম করতে গিয়েছি ১২ নম্বর ওয়াটার্লু স্ট্রিটের অফিসে। আমার জন্মদিন শুনে আমাকেই নিয়ে গেলেন খাওয়াতে। তিন নম্বর ওয়াটার্লু স্ট্রিটে ‘সং হে’ (Song Hay) বলে একটা রেস্টুরেন্ট ছিল, সেখানে। অফিস থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে পান কেনা হল, মিঠা পাতা, সুপুরি আর খয়ের ছাড়া, সঙ্গে একটু ১২০ জর্দা। গ্লাসে কী করে বিয়ার ঢালতে হয় একটুও ফেনা না উপচে, হাতে ধরে শেখালেন! তারপর প্রাণখোলা সহজ আড্ডা! শুধু দু’জন অসমবয়সি পুরুষের।
কখনও বহরমপুরের রাস্তায় গাড়ি খারাপ হওয়ার পর অচেনা গ্রামের ফরেন লিকার শপ থেকে রামের পাঁইট কিনে হিপ পকেটে নিয়ে দু’জনে মিলে হাইওয়ে-তে অভাবনীয় রিকশা ভ্রমণ!
কখনও শ্রাবণী পূর্ণিমায় চিড়িয়াখানায় এক আকাশ চাঁদের নিচে ঘাসে শতরঞ্চি পেতে বসে আড্ডা, গান, গাড়ির ডিকি-তে রাখা কম্বল জড়ানো খিচুড়ি খাওয়া। কখনও সুন্দরবনের কুইমুড়িতে মণিনদীর ওপরে লঞ্চে। ডান পাশে নলগড়া। আরও দক্ষিণে ঠাকুরান নদী। পুব দিগন্ত থেকে বাঘের হলুদ মাথার মতো অতিকায় শ্রাবণী পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের ডালপালা ছাড়িয়ে রওনা দিয়েছে মাঝ আকাশে। বর্ষার টইটম্বুর নদীর জল, এক আকাশ অলৌকিক জ্যোৎস্না, আর ওপাশে ঘন ম্যানগ্রোভ অরণ্য। দাদা গাইছেন, ‘ও চাঁদ, চোখের জলের লাগল জোয়ার…’। অথবা, লামনির মহুয়া-মদির চাঁদে থইথই বাইগাপল্লিতে। গলায় ঢোলক ঝুলিয়ে ওদের সঙ্গে গানের তালে দাদার অব্যর্থ তালবাদ্য!

নিজেকেই ঈর্ষা হয়, যখন ভাবি, এ-যুগের বাঙালি যাঁর হাত ধরে পালামৌ চিনেছে, আমাকে হাত ধরে তিনিই নিয়ে গিয়েছেন কোয়েলের কাছে, বনবিবির বনে, লামনি-অচানকমারে-কেচকি-বেতলা-কেঁ
‘১২ সালের বর্ষায় শুরু করেছিলাম, ফেসবুকে বুদ্ধদেব গুহ গ্ৰুপ, নিজে হাতে লিখে দিলেন শুভেচ্ছাবার্তা, তারপর এল ফেসবুক পেজ, ২১ জুলাইয়ে ইউটিউব চ্যানেল। সস্নেহে হাসতেন, আমার এই সব কর্মকাণ্ডে। বলতেন, ‘কার সময় আছে বলো তো, এসব দেখার?’
একটা নয়, আমাকে দু’-দু’খানা বই উৎসর্গ করেছেন! একটা নয়, আমার দু’-দু’খানা বইয়ের মুখবন্ধ লিখে দিয়েছেন। নিজে হাতে উদ্বোধন করেছেন, আমার লেখা সফরসরণি– ‘নিঃসীমানার বেড়া’। কত যে ঘড়ি আর কলম দিয়েছেন, তার গোনা-গুনতি নেই! তার মধ্যে আবার অতি মহার্ঘ্য মঁ ব্লাঁ, পেলিক্যান!
–আচ্ছা কৌশিক, শোনো, মিউনিখ থেকে একটা কলম আনতে পারবে? স্টেডলার? বুঝলে? শীর্ষেন্দু লেখে, সঞ্জীবও। দেখি তো কেমন কলম!
খুঁজে খুঁজে এনে দিয়েছিলাম। শিশুর মতো খুশি হয়েছিলেন।
এত যে প্রাপ্তি, দু’-হাত উপচে পড়ছে, যার আদৌ যোগ্য আমি নই! পুণ্যফল? কী পুণ্য করেছি আমি? কাকে ধন্যবাদ দেব? কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়েছি শুধু জলভারাবনত লতার মতো! কথায় কথায় একদিন বলছিলেন আমাকে, গতজন্মে তোমার কোনও ঋণ ছিল আমার প্রতি! মনে পড়ল, সেই অমোঘ পঙ্ক্তিটি– সংসারে সব ঋণ শোধ করা যায় না, শুধু স্বীকার করা যায় মাত্র!

হিরো ওয়ারশিপের বয়স পেরিয়ে এসেছি অনেকদিন, পেশার চোরাবালিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত, তবুও আজও অস্ট্রিয়া গেলে টিরল প্রভিন্সের কথা মনে পড়ে, লানডানে (এই বানানটাও প্রথম প্রবাসের প্রভাব) গেলে ২৭ নম্বর ওয়েস্টবোর্ন রোডের ‘Tiroler Hut’ দেখতে ইচ্ছে করে, ইম্ফলে প্রতিবার অবতরণের সময় কাঙ্গপোকপির বর্ণনা ভেসে ওঠে চোখের সামনে।
আমার গড়ে ওঠার রসায়নে বাবা-মার ঠিক পরেই তাঁর স্থান, তিনিই
গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনি, পত্রাশ্রয়ী সাহিত্য, অনবদ্য সব ছবি, মন্দ্র সুকণ্ঠে আশ্চর্য সব গান, সব মিলিয়ে প্রতিভার এক অফুরন্ত উৎসমুখ! বাঙালি রেনেসাঁ ব্যক্তিত্বদের হয়তো শেষতম প্রতিনিধি! তিনিই হয়তো শেষ বাংলাভাষী সাহিত্যিক যাঁর প্রয়াণের পর দু’টি দেশের প্রধানমন্ত্রী, একটি দেশের উপরাষ্ট্রপতি এবং একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শোক প্রকাশ করেন!
তবে বুদ্ধদেব গুহ আমার কাছে এসব ছাড়াও আরও অনেক কিছু। অন্য কিছু। উপচে পড়া প্রাণশক্তিতে ভরপুর, দীপ্যমান এক আলোকময় অস্তিত্ব। মানুষ! অনেক বড় মাপের মানুষ!
বিফলতার মতো, চরম সাফল্যও ক্লান্তি বয়ে আনতে পারে, বিক্ষত, নিঃসঙ্গ করে দিতে পারে। সেই নিঃসীম আঁধার-সমুদ্রে বুদ্ধদেব গুহ যেন বাতিঘর। আলোয় আলোয় মুক্তি দিতে পারে আমায় লেখা, একটি চিঠিতে তাঁর মন্ত্রসম উচ্চারণ, ‘যার গন্তব্য যত দূরে, তার নিঃসঙ্গতা তত গভীর, যে পাখি যত উঁচুতে ওড়ে, তার নিঃসঙ্গতা তত বেশী, সে নিঃসঙ্গতা গর্বের, তা নিয়ে দুঃখ করতে নেই।’
বুদ্ধদেব গুহ প্রকৃতির সবুজ শুশ্রূষার মতো। চিরন্তন।
২০১৯ শারদ নবকল্লোলে প্রকাশিত ‘বাবার চিঠি’ যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ করল! কতবার যে পড়ার চেষ্টা করেছি লেখাটা, আর চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছে! আমাকে নিয়ে লেখা ছোটগল্প লিখেছেন আমার জীবনপুরুষ। জীবনে আর কী কিছু পাওয়ার আছে!

’২১ সালের প্রথমদিকে, আমার চোখে একটি আকস্মিক এবং জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়। তখন আবার ঘোর কোভিড। সাষ্টাঙ্গপ্রণিপাত, সিজদা নামাজের ভঙ্গিতে মাথা নিচু, উবু হয়ে, শুধু গৃহবন্দি নয়, বিছানা-বন্দি হয়ে আছি হপ্তাতিনেক। রোজ সকালে-বিকেলে দাদার ফোন।
–কেমন আছ? কি করছ? কবে থেকে বেরতে পারবে?
একদিন সকালে সেরকমই ফোন করে কেমন স্বপ্নোত্থিতের মতো স্বগোতক্তির ঢঙে বলে গেলেন:
বুঝলে, কমলেশ (ড্রাইভার)-কে নিয়ে সকালবেলায় তোমার বাড়ি গেলাম… ফ্ল্যাট নাম্বার খুঁজে খুঁজে উঠলাম… তোমার ছেলে দরজা খুলল… বেশ লম্বা হয়েছে ছেলেটা, তোমার চেয়েও লম্বা… সরোজা তো চমকে উঠল আমাকে দেখে… তোমার ঘরে নিয়ে গেল… তুমি উপুড় হয়ে শুয়ে, চোখে ব্যান্ডেজ… তাকালে আমার দিকে… মন খারাপ হয়ে গেল… তুমি কি আমায় দেখতে পেয়েছিলে… পকেটে একটা চেক নিয়ে গিয়েছিলাম, তা সেটা দিতেই ভুলে গেলাম… বাড়ি ফিরে এসে দেখি কেউ ওঠেনি, সব ঘুমাচ্ছে…
মনে পড়ল প্রায় বছর ২৬-২৭ আগে এক সকালে বালিগঞ্জের চিত্রলেখা অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে সটান পৌঁছে গিয়েছিলেন পিজি হোস্টেলের তিনতলায়, আমার ঘরে! আমি তখন হাসপাতালে। দুপুরে ফিরে এসে দেখি ঘরের দরজার ছিটকিনির তালায় একটা পাকানো চিরকুট! তাতে লেখা– ‘অনেক কষ্ট করে তোমার ঘর খুঁজে উপরে এলাম। তুমি নেই।’

বাস্তবে ফিরলাম।
–স্বপ্ন দেখলেন দাদা?
–তাই হবে। আচ্ছা শোনো, তোমার মা খুব চিন্তা করছেন, আর তোমারও তো অনেক প্রফেশনাল ক্ষতি হয়ে গেল, আমি গরিব মানুষ, ওই অ্যাওয়ার্ডের টাকাটা এসেছে, আমি কমলেশকে দিয়ে একটা চেক তোমাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি, দু’-লাখ আছে।
আমি স্তম্ভিত! কোনও রকমে আটকালাম স্নেহের সেই নিগূঢ় নায়াগ্রা প্রপাত!
’২১ সালের জুলাইয়ের শেষদিকে একদিন বললাম: দাদা, আপনার ‘সীতাগড়ের মানুষখেকো’ লেখাটা মনে আছে?
ক্ষীণ কণ্ঠে উত্তর দিলেন।
–হ্যাঁ, কোথায় পেলে সে লেখা, সে তো অনেক দিন আগের কথা!
–১৯৬৩ পুজোবার্ষিকী আনন্দবাজার। এটাই কি আপনার প্রথম শারদীয়ার লেখা?
–তা-ই হবে। এই লেখাটা নিয়ে একটা মজার গল্প আছে জানো?
–কী গল্প?
–সে তো বিরাট লম্বা গল্প, কাল শোনাব।

গলার স্বরটা ক্লান্ত শোনাল।
পরদিন ফোন করেছিলেন, আমিই ধরতে পারিনি। আমার ফোনের স্ক্রিনে লাল অক্ষরে লেখা দাদার নামটা জ্বলজ্বল করছিল। রিং ব্যাক করলাম। বেজে গেল। পরদিন বিকেলে আবার হাসপাতালে ভর্তি হলেন শেষবারের মতো। কেন ফোন করেছিলেন, আর জানা হল না। সে কি শুধু ‘সীতাগড়ের মানুষখেকো’ গল্পটার নেপথ্যের সেই মজার গল্পটা বলার জন্যই? না কি আর কিছু বলার ছিল? জানি না! আর কোনওদিন জানাও হবে না!
সেই ’৭৮ সালের ৫ আগস্ট প্রকাশিত ‘বাবা হওয়া’ গল্পটি পড়েছিলাম, নার্সিং হোমের বেডে শুয়ে। তার ২৮ বছর পর আমার বাবা যেদিন চলে যান, সেদিনটাও ছিল ৫ আগস্ট, শনিবার! ’২১-এর অগাস্ট মাসের পাঁচ তারিখ, বেলভিউয়ের আইসিইউ-তে দেখা করতে গিয়ে বললাম– দাদা, কাল চৌঠা আগস্ট ছিল। চুরাশির চৌঠা আগস্ট। ‘দেশ’-এ মাধুকরী শুরু হয়েছিল। আপনার মনে আছে?

A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved