From Tarkovsky’s Dream to The Turin Horse of Bela Tarr by Prithu Halder
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বেলা অবেলা কালবেলা

আন্দ্রেই তারকোভস্কির স্বপ্নদৃশ্য থেকে বেলা তারের শেষ সিনেমা– দু’টি ছবির মধ্যে যেন রয়েছে এক অমোঘ আলোকসেতু। ‘দ্য তুরিন হর্স’-এর শুরুর দৃশ্য থেকেই বেলা তার-এর সিনেমার ফর্ম, দর্শন ও রাজনীতি হয়ে উঠেছে মূর্ত। নিৎসের ঘোড়ার কিংবদন্তিকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই ছবি নিরবচ্ছিন্ন বাস্তবের নির্মমতা তুলে ধরে। দীর্ঘ শট, নৈঃশব্দ্য, ক্যামেরা মুভমেন্ট ও সাউন্ডের মাধ্যমে তৈরি হয় এক সহমর্মী অথচ নির্মম অভিজ্ঞতা। কোনও ‘ডিস্টোপিয়া’ নয়, বরং অর্থহীন বিষাদের দৈনন্দিন পুনরাবৃত্তি। বেলা তার-এর ‘কমেডি’, দারিদ্রচিত্রণ ও নৈসর্গিক নির্মাণশৈলী এখানে পুরোপুরি উপস্থিত। নিছক একটি চলচ্চিত্র নয়,বরং সিনেমা কীভাবে দর্শন হয়ে ওঠে তারই প্রামাণ্য দলিল এই ছবি।

শেষ আপডেট: জানুয়ারি ৯, ২০২৬, ১৭:১২   
Facebook WhatsApp Messenger
From Tarkovsky’s Dream to The Turin Horse of Bela Tarr by Prithu Halder

আন্দ্রেই তারকোভস্কির ‘ইভানস চাইল্ডহুড’-এর সেই বিখ্যাত স্বপ্নদৃশ্যটা মনে আছে?

ইভান ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে, সে আর মাশা চলেছে ট্রাকে চেপে? ট্রাক ভর্তি আপেল– একগাদা আপেল ছড়িয়ে পড়ল ট্রাক থেকে– গড়িয়ে গড়িয়ে সে-সব আপেলে সমুদ্রতট ভরে গেল। অনেকগুলো ঘোড়া দাঁড়িয়ে ছিল। তারা ধীরে ধীরে আপেল খেতে লাগল…

zoom
ট্রাক ভর্তি আপেল— একগাদা আপেল ছড়িয়ে পড়ল ট্রাক থেকে

বিখ্যাত মার্কিন ফিল্ম ক্রিটিক জোনাথন রোজেনবাম বেলা তার-কে অভিধা দিয়েছিলেন– ‘আধ্যাত্মিকতা-বর্জিত তারকোভস্কি’ (de-spiritualized Tarkovsky)। বেলা তারের জীবনাবসানের খবর শুনে প্রথমে ওই সমুদ্রতটের ঘোড়ার ছবিটাই ভেসে উঠল। ছবির এমনই আশ্চর্য ক্ষমতা। কোন আলোকসম্পাতে যেন তারকোভস্কির প্রথম সিনেমা এসে মিশে যায় বেলা তারের শেষ সিনেমায়। যদিও তাঁর সিনেমাকে বেশিরভাগ সময়তেই ডিস্টোপিক, পেসিমিস্ট, নিহিলিস্ট– এসব বলা হয়েছে, পরিচালকের নিজের মতে কিন্তু তাঁর শেষ সিনেমা ‘দ্য তুরিন হর্স’ ছাড়া বাকি সব সিনেমাই কমেডি!

‘তুরিন হর্স’ কেন অনন্য, সে বিচারে যাওয়ার আগে, সিনেমার শুরুটা একটু তলিয়ে আলোচনার করার লোভ সামলাতে পারছি না। যে অংশটুকু নিয়ে আলোচনা করব, তার দৈর্ঘ্য শুরুর টাইটেল কার্ড ইত্যাদি সহকারে মাত্র ৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ড! বেলা তার-এর মুনশিয়ানা বোঝার জন্য এই ৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ডই যথেষ্ট।

zoom
‘দ্য তুরিন হর্স’ এক গভীর বিষাদগাথা

‘দ্য তুরিন হর্স’ শুরু হয় কালো স্ক্রিনে শুধু কণ্ঠস্বর দিয়ে। পুরুষ কণ্ঠস্বর বলে চলে– তেসরা জানুয়ারি ১৮৮৯, চার্লস আলবার্ট স্ট্রিটের ছয় নং দরজা দিয়ে বের হন ফ্রেড্রিখ নিটসে। হয়তো নিছক পায়চারি করতে, হয়তো বা ডাকবাক্সে কোনও চিঠি ফেলতে। বেশি দূরে নয়, অথচ যেন কোনও অজানা জগতে, কোথাও এক কোচোয়ান তার জেদি ঘোড়াকে নিয়ে খুব সমস্যায় পড়েছে, অনেক সাধাসাধি করেও ঘোড়াকে একটুও নড়ানো যাচ্ছে না। কী যেন নাম তার… ‘গিউসেপ্পে’, ‘কারলো’, ‘এত্তোরে’…সে তার ধৈর্য হারিয়ে ফেলে হাতে তুলে নেয় চাবুক। এইসময় অকুস্থলে এসে পৌঁছয় নিটসে। লোকটা ততক্ষণে রাগে ফুঁসছে। গাট্টাগোঁট্টা চেহারার পুরুষ্ট গোঁফওয়ালা নিটসে লাফিয়ে পড়ে সেই ঘোড়ার গলা জড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। প্রতিবেশী তাঁকে ঘরে নিয়ে যায়। দু’দিন খাটে পড়ে থাকার পর, নিটসে সেই অমোঘ শেষ বাক্যটি উচ্চারণ করেন– ‘Mutter, ich bin dumm.’ (মা, আমি নির্বোধ)। তারপর চিরতরে উন্মাদ। আরও ১০ বছর বেঁচে ছিলেন মা আর বোনের শুশ্রুষায়। সেই ঘোড়ার ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না।

এরপর পর্দায় আমরা সেই ঘোড়াকে দেখতে পাই। ইতিমধ্যে তিন মিনিট ন’-সেকেন্ড কেটে গিয়েছে, অর্থাৎ বাকি শুধু চার মিনিট ৩১ সেকেন্ড। এই চার মিনিট ৩১ সেকেন্ড কোনও কথা নেই। শুধু ভিজ্যুয়াল আর সাউন্ড। সিঙ্গেল শট। ক্যামেরায় দেখা যায় একটা জনবিরল, জনবসতিহীন পাতলা জংলা রাস্তা ধরে ঘোড়া এগিয়ে চলেছে। লো-অ্যাঙ্গেল শট। ঘোড়াকে দেখতে পাচ্ছি শুধু। ঘোড়া নায়ক। হাওয়ায় উড়ছে পাতলা কালো ছাই। মহাকাব্যিক স্কোর। ঝড়ো হাওয়া কেটে হাঁটতে থাকা ঘোড়া যেন নিজের নিয়তির মালিক।

ক্যামেরা কিন্তু একই শটে চলছে। হালকা ডানদিকে হেলে, একটু একটু করে দেখা গেল, পিছনে কেউ একটা বসে আছে: যে চালাচ্ছে। তখনও দর্শক অতটা মনোযোগী হয়নি, ঘোড়াই মুখ্য। যেহেতু ঘোড়ার সামনে থেকে ক্যামেরা ধরা, লং শটে চালককে দেখা যাচ্ছে বটে, কিন্তু সে যেন বিষণ্ণ দূরের কেউ। অতটা জরুরি নয়। এবার ক্যামেরা হালকা পিছিয়ে এসে ধীরে ধীরে চালকের দিকে এগতে থাকে, ক্রমশ চালক স্পষ্ট হয়। আমরা দেখতে পাই, শক্ত হাতে কষে ধরে থাকা লাগাম। ক্যামেরা আবার ধীরে ধীরে নীচে নামতে থাকে। এবার চালকের দিকে লো-অ্যাঙ্গেল শট। এবার চালক নায়ক। শক্ত হাতে লাগাম ধরে আছে।

মহাকাব্যিক আবহ চলতে থাকে। ক্যামেরা আর সাউন্ড ট্র্যাকে এবার চালককে ঈশ্বরপ্রতিম মনে হতে থাকে। যেন সারথি রথে চড়ে লাগাম কষে চলেছে। আবার ক্ষণিকের লো-অ্যাঙ্গেল শট ঘোড়াটার ওপর, কিন্তু এতক্ষণে দর্শক সারথিকে দেখে ফেলেছে। ইতিমধ্যে ঘোড়াটার ওপর সেই অত্যাচারের প্রাককথন মনে পড়ে গিয়েছে। অবলা ঘোড়াটা এখনও কী সেই মালিকের জিম্মাতেই আছে, নাকি এ নতুন মালিক, এসব চিন্তা খেলে গিয়েছে তখন দর্শকের মাথায়। এবার ক্যামেরা ঘোড়ার সাইড প্রোফাইল অনুসরণ করে। ক্যামেরা আর লো-অ্যাঙ্গেল শটে নেই। সে ঘোড়ার পাশাপাশি চলছে। ক্যামেরা সহমর্মী।

zoom
ঘোড়ার সামনে থেকে ক্যামেরা ধরা, লং শটে চালককে দেখা যাচ্ছে

যাই হোক, মহাকাব্যিক আবহ চলতেই থাকে। ক্যামেরা একটু পিছিয়ে আসে, কুয়াশা গাঢ় হয়। মিড শট। ঘন কুয়াশার মধ্যে দিয়ে পথ করেই মাথা নামিয়ে ঘোড়াটা চলতে থাকে। দ্বিধার কুয়াশা। নিয়তি অনিশ্চিত। ক্রমশ ক্যামেরা লং শটে গিয়ে আবার কাঁটাবন, ঝোপঝাড় পেরিয়ে এগিয়ে আসে ঘোড়ার মিড ক্লোজ-আপ সাইড প্রোফাইলে। তারপর আবার সেই শুরুর লো-অ্যাঙ্গেল শট, এরপর চালককেও দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে ঘোড়াটা ক্লান্ত। মাথাটা হালকা নুইয়ে হাঁটছে। যেন কোন অনির্দিষ্ট নিয়তির পথে এগিয়ে চলেছে। কুয়াশার মধ্যে দূরের সূর্যের মতো হঠাৎ এক চিলতে আলো। ক্ষণিকেরই। তারপর আবার ক্যামেরা ঘোড়ার সঙ্গে সঙ্গে চলছে। সহমর্মী, সমব্যথী। সাত মিনিট ১৯ সেকেন্ড-এর আগুপিছু মহাকাব্যিক আবহ ছাপিয়ে ধীরে ধীরে ঘোড়ার বেল্টের শব্দ, ধাতব আওয়াজ, খুরের শব্দ, এসব একটু একটু করে শুনতে পাওয়া যায়। পাঁচ-ছয় সেকেন্ড পর মহাকাব্যিক আবহ বন্ধ হয়ে শুধুই চামড়ার শব্দ, ধাতুর শব্দ, খুরের শব্দ। রক্তমাংসের ক্লান্ত ঘোড়া পথ হেঁটে চলেছে। হেঁটে চলেছে।

গোটা দৃশ্যটা কোনও এডিটিং ছাড়া শুধু ক্যামেরা মুভমেন্টের খেলা। সঙ্গে আবহ আর পারিপার্শ্বিক ন্যাড়া জংলা প্রকৃতি। সাদা কালো ছাড়া এ-দৃশ্য কখনওই এই প্রভাব ফেলতে পারত না দর্শকের মনে। পাঠকের পড়তে পড়তে যদি ঈষৎ বিরক্তির উদ্রেক হয়– শুধু লো-অ্যাঙ্গেল শট আর লো-অ্যাঙ্গেল শট, সাইড প্রোফাইল আর সাইড প্রোফাইল, তাহলে এখানে বলে রাখি, সেটা ইচ্ছাকৃত। বেলা তার-এর সিনেমায় এই একই ক্যামেরা মুভমেন্টে ঘুরে ঘুরে পর্যায়ক্রমে ফিরে ফিরে আসা সেই নিটসের ইটার্নাল রিটার্নের ধারণারই অনুসারী। দৃশ্যটা আবার শুরু থেকে ভেবে দেখুন। শুরুতে মনে হল ঘোড়াটা নায়ক, তারপর দেখা গেল কোচোয়ান নায়ক, তারপর কুয়াশা, তারপর ক্রমশ মহাকাব্যিক স্তব্ধ হয়ে শুধুই রক্তমাংসের নির্মম বাস্তব। কোনও মুক্তি নেই, অর্থ নেই, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য নেই, মোক্ষ নেই। আছে শুধু নিরবিচ্ছিন্ন একঘেয়ে বাস্তবের চাবুক। পুরো সিনেমাটা কী হতে চলেছে, তার নির্যাস এই ওপেনিং সিন– এই ৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ড।

বিশ্বজুড়ে ছয়ের দশক থেকে ধীরে ধীরে যখন অ্যাভারেজ শট লেন্থ (এএসএল) কমে আসছিল, অর্থাৎ, একেকটা দৃশ্যের দৈর্ঘ্য (যদিও সিন আর শট সম্পূর্ণ আলাদা ইউনিট, তাও খানিক বোঝার সুবিধার্থে) ক্রমশ ছোট হচ্ছিল, তখন বেলা তার এবং আরও কিছু পরিচালক অন্য পথে হেঁটেছিলেন। সিনেমার এই শট-এর দৈর্ঘ্য কমে যাওয়ার নেপথ্যে আবার ক্যাপিটালিজমেরও সুগভীর ভূমিকা আছে। মার্কিন দেশে শট-এর দৈর্ঘ্য হ্রাস আরও ত্বরান্বিত হয়েছিল আটের দশকে এম টিভি-র মিউজিক ভিডিও এর দৌলতে। তবে বেলা তার চলচ্চিত্রের সঙ্গে সহবাস শুরু করেছিলেন আরও অনেক আগে। তাঁর জীবনের প্রথম ছবির নাম ‘গেস্ট ওয়ার্কার্স’। ১৪ বছরের জন্মদিনে বাবার কিনে দেওয়া একটা ৮ মিলিমিটারের ক্যামেরা দিয়ে বানানো সে ছবি হারিয়ে গিয়েছে! তবে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর হাত মকশো হয়েছিল প্রথম ছবি ‘ফ্যামিলি নেস্ট’ দিয়েই। এ সিনেমার প্রযোজনা করে ‘বেলা বালাৎস স্টুডিও’। যাঁর নামে এই স্টুডিও, তিনি নিজেও ছিলেন ডাকসাইটে সিনে-তাত্ত্বিক। শুরুতে যে দৃশ্য বললাম, সেটা বালাৎস-এর নিজের খুবই পছন্দের ঘরানার হতে পারত। কোনও কথা ব্যবহার না করে, কীভাবে শুধু সিনেমার বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করেই এত দুর্দান্ত দৃশ্য তৈরি করা গেল, সেটাকে ফর্মালিস্ট দৃষ্টিতে অবশ্যই দেখা চলে।

যাই হোক, শুরুর দিকে বেলা তার যখন সিনেমা বানাতে শুরু করেছিলেন তখন তাঁর কাছে ক্যামেরা ছিল সবকিছু নথিবদ্ধ করে রাখার অস্ত্র। তাই ১৬ বছর বয়সেই বানিয়ে ফেলেছিলেন ‘জিগা ভেরতভ গ্রুপ’। তখন তাঁর বিশ্বাস ক্যামেরার দিয়ে যতটা সম্ভব সত্যকে ধরে রাখা যায়। তাই তাঁর বেশিরভাগ ছবিতেই পেশাদার অভিনেতা নেই। ক্যামেরায় ধরা পড়েছে  যূথবদ্ধ শ্রমজীবী মানুষ। বিশৃঙ্খল, দরিদ্র, বেআব্রু।

কিন্তু বেলা তার-এর সিনেমায় হাভাতে দারিদ্রের রোমান্টিকতা নেই। তাই, এমনকী তাঁর শুরুর দিকের সিনেমাতেও ‘poverty porn’ (দারিদ্র রতি) নেই। বরং আছে শুকনো ঠাট্টা। যে মশকরা দৈনন্দিন জীবন থেকে উঠে আসে। বেলা তার-এর মৃত্যুর পর অনেক অবিচুয়ারিতেই দেখলাম তাকে ‘ডার্ক হিউমর’ বলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে তো বেলা তার-এর আশপাশের মানুষজনের যাপিত জীবনেরই অংশ। তারা ঝগড়া করে, গান বাজনা করে, কখনও গান বাজনা করতে করতেই ঝগড়া করে। যেমন ‘সাতানট্যাঙ্গো’-র শুঁড়িখানায় নাচের দৃশ্য।

একজন অ্যাকর্ডিয়ন বাজাচ্ছিল। যে মাঝবয়সী মহিলার সঙ্গে একজন লোক নাচছিল, তার সঙ্গে আরেকজন নাচতে চায়। নাচতে নাচতেই দুই পুরুষের হাতাহাতি, ঠোকাঠুকি চলতে থাকে। বা ‘আ ম্যান ফ্রম লন্ডন’-এও একইভাবে আনন্দ করে এক মহিলা অ্যাকর্ডিয়ন বাজায়, অন্যদিকে দুই চরিত্র নাচে। এসব সিনেমায় তুলনামূলকভাবে এরকম মুহূর্ত অন্তত আছে, যেখানে কিছু সান্ত্বনা পাওয়া যায়। গড়পড়তা মানুষের ঝগড়া-কোন্দল-গুলতানির মধ্যে যে প্রশ্রয় আছে, সেটাকেই বেলা তার কমেডি বলেছিলেন।

ছোট থেকেই বেলা তার ৮ মিমি আর ১৬ মিমি ক্যামেরায় তোলা সাধারণ মানুষের বিভিন্ন প্রকারের সমস্যা ও শোষণ দেখাতেন খেটে খাওয়া মানুষেরই জটলায়। সেইসব ক্যান্টিন, গেরাজ, মাঠঘাটে দেখানো সিনেমাই একদিন ক্ষমতাকে সতর্ক করল। হুকুম হল, সরকারি ফিল্ম স্কুলে তাঁর ভর্তি হওয়া বন্ধ। কিন্তু তাতে সিনেমা বানানো বন্ধ করলেন না, তারপর একদিন সেই সিনেমা বানানোর জন্যেই তিনি আবার ডাক পেলেন ফিল্মস্কুল থেকে। তাঁর প্রথম ছবি ‘ফ্যমিলি নেস্ট’ দেখেই বোদ্ধারা সেই ছাড়পত্র দেন। একদিকে যেমন তাঁর ছবিতে দেখি জঁ লুক গোদার, জন কাসাভিটিস, রাইনার ওয়ার্নার ফ্যাসবাইন্ডার, আন্দ্রেই তারকোভস্কি, মিকলোস ইয়াঙ্কো, রবার্ট ব্রেসঁ, মিখেলঅ্যাঞ্জেলো আন্তোনিওনি, থিও অ্যাঞ্জেলোপুলোস-সহ আরও বহু ওত্যরের (auteur) ছায়া, অন্যদিকে ধীরে ধীরে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর নিজস্ব নির্জন স্বাক্ষর।

zoom
‘সাতানট্যাঙ্গো’ ছবিতে শুঁড়িখানায় নাচের দৃশ্য

বেলা তার বারবার বলেছেন, শেষের দিকের সিনেমাগুলোয় তাঁর যে ‘ব্র্যান্ড বেলা তার’ হয়ে ওঠা, সেটার কারণ মূলত তিনি ছাড়া আরও তিনজন– আগনেস হ্রানিটস্কি, তার অধিকাংশ ছবির এডিটর এবং পরবর্তীকালে তাঁর স্ত্রী, মিহালি ভিগ, তাঁর সিনেমার অনবদ্য আবহ সংগীত তাঁরই সৃষ্টি; আর অবশ্যই সাম্প্রতিক নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিপুল আলোচিত লেখক লাজলো ক্রাজনাহোরকাই। আরেকজন যে মানুষের কথা না বললেই নয়, তিনি বেলা তার-এর ডিরেক্টর অফ ফটোগ্রাফি, ফ্রেড কেলেমেন। ‘দ্য তুরিন হর্স’ ছবিতেও তিনিই ছিলেন ডিওপি।

zoom
বেলা তার ও লাজলো ক্রাজনাহোরকাই (১৯৯০)। আলোকচিত্র: ইকো ফন শ্যুইখভ

তারের বক্তব্য তাঁর সিনেমা নিয়ে এত গুরুগম্ভীর তত্ত্ববিশ্ব খাড়া করার কোনও কারণ নেই। যখন তাঁরা সবাই মিলে কোনও সিনেমা নিয়ে ভাবেন, তখন শুধু বস্তুগত বিষয়গুলো নিয়েই ভাবেন। সিনেমা আদপে একটা এমন শিল্প যেখানে ঠিক জায়গায় ঠিক জিনিসের অবস্থান খুবই জরুরি। সে-সময় তিনি অত থিয়োরি ইত্যাদি নিয়ে ভাবেন না। ছবি করার ক্ষেত্রে তিনি এতটাই বস্তুকেন্দ্রিক, বা বলা ভালো নৈসর্গকেন্দ্রিক, যে তাঁর ছবিতে আগে স্থান নির্বাচন হয়, তারপর চরিত্র এবং সবশেষে স্ক্রিপ্ট। তাঁর মতে, স্ক্রিপ্ট তো আদপে প্রোডিউসারের কাছে টাকা পাওয়ার জন্য কাজে লাগে। তার আগে বাকিসব নিজেদের মধ্যে আড্ডা দিতে দিতেই ভাবা হয়ে যায়।

বন্ধু ভাগ্য করে এসেছিলেন বটে বেলা! পৃথিবী থেকে বিদায়ের দিনটি ঠিক কেলেমেনের জন্মদিনের দিনেই, আর বন্ধু লাজলোর জন্মদিনের ঠিক পরের দিনই। লাজলো ক্রাজনাহোরকাই ‘তুরিন হর্স’ ছোট্ট গদ্য হিসেবে লিখেছিলেন নিটসের ঘোড়ার সঙ্গে মোলাকাতের ঠিক ১০০ বছর পরে, ১৯৮৯ সালে।

‘‘A horse, a horse! My kingdom for a horse!

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন পৃথু হালদার-এর অন্যান্য লেখা

………………………

Andrei Tarkovsky Béla Tarr Ivan's Childhood jean luc godard John Cassavetes Jonathan Rosenbaum lászló krasznahorkai Michelangelo Antonioni Nietzsche Rainer Werner Fassbinder Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Sátántangó The Man from London The Turin Horse

Share this article on