Robbar

আজও কেন পড়ব সুকান্ত?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 15, 2026 6:03 pm
  • Updated:August 15, 2026 6:09 pm  

সুকান্তের নানা কবিতায় এই সমব্যথার প্রকাশ রাজনীতির চেয়েও প্রগাঢ়। ‘চারাগাছ’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘সিঁড়ি’, ‘কলম’ শুধু রাজনীতির কবিতা নয়। সমব্যথারও কবিতা। আবার তাঁর এই প্রতীকী কবিতাগুলি নির্বিচার সমব্যথার কথা বলে না। ‘চিল’ কবিতার মরাচিল তাই তাঁর সমব্যথা আকর্ষণ করে না, সেখানে অত্যাচারী চিলের পরিবর্তে নিরাপদ মুক্ত ইঁদুরছানার প্রতি তাঁর সুস্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব। এই রাজনৈতিক সমব্যথার সুস্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের নন্দনই সুকান্তের কবিতা।

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার

সুকান্তকে কখনও মনে হয় একটি প্রাণচঞ্চল পাখি, যে আকাশের নীলে পাড়ি দেবে বলে অস্থিরভাবে ডানা ঝাঁপটে উড়াল দেওয়ার মুহূর্তেই স্থিরচিত্রে পরিণত হয়ে গেল। গত ৭৯ বছর ধরে সে আর ওড়েনি, মাটিতেও পড়ে যায়নি। সেখানেই স্থির। আকাশের নীলের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন আমাদের শোনা হল না! শুধুমাত্র উড়ালটুকুই হয়ে রইল তাঁর স্থিরচিত্র। ওই স্থিরচিত্রকে সম্বল করেই আমাদের কাছে তাঁর নানা পরিচয়। কারও কাছে কিশোর কবি, কারও কাছে বিপ্লবী। কেউ বলেন কাব্যপ্রতিভা বিকশিত হওয়ার আগেই তাঁর জীবনদীপ নিভে গিয়েছে। কেউ বলেন, ওই স্বল্প আয়ুর জীবনেই তিনি পূর্ণ দীপ্তিতে প্রকাশিত হতে পেরেছিলেন। তাঁর পংক্তি, ‘পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি’, সাধারণ বামপন্থীদের অসম্ভব প্রিয়। আবার আরেক গোত্রের বামপন্থীদের কাছে ওটাই সবচেয়ে না-পসন্দ। ওই পংক্তিটিই না কি তাঁকে বামপন্থাচ্যুত করেছে, এটাই তাঁদের নিদান। রাজ্যের বর্তমান শাসক দলের এক প্রবীণের মতে, তিনি ‘হাফ-কবি’। বৈশাখের সেই দিন থেকে তাঁকে ঘিরে আমাদের তর্ক চলমান। অথচ তিনি হয়ে আছেন একটি স্থিরচিত্র।

সুকান্ত ভট্টাচার্য

স্থিরচিত্রে থমকে যাওয়ার মুহূর্ত থেকে সুকান্ত আমাদের নানা জনের কাছে আটকে আছেন একেকটি খাঁচায়। কেউ বলে কাঁচা, কেউ বলে যথার্থ পরিণত। আমরা যারা তাঁকে নিয়ে মুগ্ধ কিংবা যারা নিন্দামুখর, তাদের একজনও কি আরেকবার ফিরে তাকিয়েছি তাঁর লেখালেখির দিকে বা নতুনভাবে বুঝতে চেয়েছি তাঁর স্বল্পায়ু জীবনটিকে। আমাদের নিজেদের তৈরি খাঁচাতে বন্দি হয়ে আছি আমরা সেই থেকেই।

একটা সময় গিয়েছে, যখন এক নিশ্বাসে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-সুকান্তের নাম উচ্চারণ এবং একত্রে তাঁদের উদযাপন করাটা এক ধরনের আচারে পরিণত হয়েছিল। এই একসূত্রে গেঁথে দেওয়াও একধরনের খাঁচা, যেখানে ব‍্যক্তিস্রষ্টাদের বিশিষ্টতার চর্চাও আড়ালে চলে যায়। একটি ৮০ বছরের দীর্ঘ সৃষ্টি ও চিন্তাপ্রবাহের সঙ্গে মধ‍্যজীবনে জীবন্মৃত হয়ে থমকে যাওয়া বা যৌবনের প্রথম মুহূর্তে জীবন নিশেষ হওয়া স্রষ্টাকে যে একপাল্লায় তোলা যায় না, সেই উপলব্ধি আমাদের হয়নি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

এটা সত‍্যি নজরুল বা সুকান্ত– দু’জনেই রবীন্দ্রনাথে ডুবে ছিলেন। দু’জনের কাছেই ঝঞ্ঝামুখর সমুদ্রে রবীন্দ্রনাথ বাতিঘর। কিন্তু দু’জনের জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রজ্জ্বলন হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে। রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই তাঁর গুণমুগ্ধ অনুরাগী হয়েও নজরুল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। নিজস্বতায় বিশেষায়িত তাঁর সৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথকে আবিষ্কার করা খুব সহজ নয়। বহিরঙ্গের মিল হয়তো রবীন্দ্রনাথের ‘অল্প লইয়া থাকি’-র সঙ্গে নজরুলের ‘শূন‍্য এ বুকে’-র সহজ বোধগম্য। এই প্রকট মিলের একটি প্রেক্ষাপটও আছে।

অন‍্যদিকে, সুকান্তের সৃষ্টিতে বা উচ্চারণে রবীন্দ্রনাথ ফিরে আসেন বারবার। কখনও রবীন্দ্রনাথের উচ্চারিত সতর্কবাণীতে তিনি তাঁর ঘটমান বর্তমানে শান্তির ললিতবাণী বর্জনের প্রেরণা পান, আবার কখনও নিজের ঘটমান বর্তমানে রবীন্দ্রনাথকে তিনি নতুনরূপে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন চোখে যাঁর বিপ্লবের স্বপ্ন, কণ্ঠে গণসংগীতের সুর। কখনও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাযুজ্য, কখনও স্বাতন্ত্র্যের সন্ধান, এই দুইয়ের নিরন্তর আসা-যাওয়া সুকান্তে। রবীন্দ্রনাথ জীবন শেষে বলেন– নিজের অপারগতা, অপূর্ণতার কথা, ‘সেই স্বরসাধনায় পৌঁছিল না বহুতর ডাক’। তাঁর আক্ষেপ, ‘রয়ে গেছে ফাঁক’। ‘পৃথিবীর কবি’-র শিরোপাকে মাথায় ধারণ করেও তাঁর উপলব্ধি, ‘বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি’। অথচ তাঁর সমসময়ে ভারতের আর কোন কবি ‘বিপুলা এ পৃথিবী’ সম্পর্কে সচেতনতা ছিল!

সুকান্তের মনে রবীন্দ্রনাথের তারপরও ‘উজ্জ্বল উপস্থিতি’, যদিও বিপরীত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে তিনি নিজের পরিচয় দেন– ‘আমি দুর্ভিক্ষের কবি’ বলে। বাইরে অনাহার, মৃত‍্যুমিছিল, জঠরে ক্ষুধার ভ্রুকুটি, বিনিদ্র রাতে সাইরেনের কর্কশ চিৎকার, তারপরও ‘প্রাণের স্তরে স্তরে’ রবীন্দ্রনাথের ‘দানের মাটি সোনার ফসল তুলে ধরে’। রবীন্দ্রনাথের বসন্তে তাঁর জয়ের মালা গেঁথে যায় প্রস্ফূটিত ফুল, সুকান্তের ‘বসন্ত কাটে খাদ‍্যের সারিতে প্রতীক্ষায়’। অন্তরপ্রদেশে রবীন্দ্রনাথ, বাইরের ঘটমান পৃথিবীতে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ‍্যত নেই। এক সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। মারী মন্বন্তর কঙ্কালকায় ভুখা মানুষের ভিক্ষার ক্রন্দন। দুয়ারে ফ‍্যাসিবাদের অশনি সংকেত। দাঙ্গায় রক্তাক্ত বিদীর্ণ কলকাতা। আবার সংগ্রামী মজুরের মিছিল, লড়াকু কৃষকের নিজের গোলায় ফসল তোলার মরণপণ সংগ্রাম। রবীন্দ্রনাথ এই বাংলাকে দেখেননি। দেখেননি দাঙ্গার মন্বন্তরে শীর্ণ, মজুর কিষাণের জঙ্গি লড়াইয়ে দীপ্ত বাংলাকে। অথচ রবীন্দ্রনাথকে সহযাত্রী করে নেওয়া চাই। সেজন‍্যই ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’-র পর আবার ফিরে আসেন পৃথিবীর কবি ‘পঁচিশে বৈশাখের উদ্দেশ্যে’-তে। শুধু রবীন্দ্রনাথকে নতুনরূপে চাওয়া নয়, কবিতার বয়ানেও রবীন্দ্রনাথের অনেকটাই প্রতিসরণ। আগের কবিতায় রবীন্দ্রনাথের কাছে ফেরা, পরের কবিতায় রবীন্দ্রনাথকেই ডেকে আনা। সাযুজ্য ও স্বাতন্ত্র‍্য যাওয়া আসা করতেই থাকে।

একটি বিকল্প নন্দনেরও জন্ম হয় এই প্রক্রিয়ায়। আধুনিক বাংলা কবিতায় রাজনৈতিক প্রতিবাদের জোরালো প্রকাশ আমরা এর আগে দেখেছি নজরুলে। নজরুল ওই সময়ে একাধারে সাংবাদিক, কবি, সংগীতস্রষ্টা এবং রাজনৈতিক কর্মী। স্রষ্টা ও সংগঠকের যুগলসত্তা সুকান্তেও। সুকান্তের সময়ে এসে প্রতিবাদী বামপন্থা যেমন আরেকটু সুগঠিত হয়েছে, তেমনই তারই আলোয় প্রতিবাদী সাহিত্য আরও সুনির্দিষ্ট চেহারা ধারণ করছে। শ্রেণি রাজনীতির চিহ্ন স্পষ্টতর হচ্ছে কবিতায়। সুকান্তের আবির্ভাব কাল নজরুলের অসুস্থতার নির্বাসনে চলে যাওয়ার পর্ব। তবে রাজনৈতিক আন্দোলন বা রাজনীতির কবিতা গান থেকে জীবনের বাধ‍্যতায় নজরুল সরে গিয়েছেন আরও এক দশক আগেই। ফলে এই নতুন নন্দনের বয়ানের উত্তরাধিকার যেন অর্পিত হল সুকান্তের ওপর। কবিতার ভাষায় আড়াল-রচন বর্জন করেছিলেন নজরুল। যদিও রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক সময় অনেক সময়েই নানা প্রতীকের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। কবিতার জন‍্য রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও কারাবাস সম্ভবত প্রথম নজরুলের ক্ষেত্রেই। অর্থাৎ, নজরুলের কবিতা সঠিক স্থানে ঘা দিতে সমর্থ হয়েছিল। বাংলা কবিতার এই বিকল্প নন্দনটি, যা সুকান্তের স্বল্পায়ুর কবিতা জীবনে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত হয়েছিল– তার অঙ্কুরোদগম নজরুলে।

সুকান্তের কবিতা একইসঙ্গে সাহিত‍্যের দায় বহন করেছে, আবার মতাদর্শের, রাজনীতির এবং নিজের রাজনৈতিক দলের হয়েও ভূমিকা পালন করেছে। সুকান্ত যখন কবিতায় ডানা মেলছেন, তখন তিনি কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছেন। ফলে তাঁর বোধে মতাদর্শ ও দল একইভাবে সক্রিয়। আন্তর্জাতিক স্তরে ফ‍্যাসিবাদ-বিরোধী লড়াইয়ের সঙ্গে মতাদর্শগতভাবে সম্পৃক্ত হওয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি দেশের অভ্যন্তরে ’৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দেয়নি, এটা সত‍্য। কিন্তু এটাও সত‍্য, ব্রিটিশ সৈন‍্যবাহিনীতে যোগ দিতে জনগণের কাছে কোনও আবেদন করেনি কমিউনিস্ট পার্টি, ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করা অন‍্য রাজনৈতিক শক্তিগুলির মতো। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা এবং মহাযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের চক্রান্তে নেমে আসা মন্বন্তরের সময়ে জনগণের প্রতিদিনের সংগ্রামের সঙ্গী ছিল তারা।

কাজী নজরুল ইসলাম

ফ‍্যাসিবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসন, যুগপৎ বিরোধিতার স্বাক্ষর বহন করছে সুকান্তের কবিতা। ‘লেনিন’ কবিতায় লিখেছেন একইসঙ্গে, ‘দরজায় চিহ্নিত নিত‍্য শত্রুর উদ্ধত পদাঘাত’, আর তার একটি পংক্তি পরই বলেছেন, ‘বিদেশী শৃঙ্খলে পিষ্ট, শ্বাস তার ক্রমাগত ক্ষীণ’। স্মর্তব‍্য, ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতি তখন সরাসরি দু’ভাগে বিভক্ত। একদল ব্রিটিশের প্রতিপক্ষে থাকা হিটলার, মুসোলিনি, তোজোকে বন্ধু ভাবছে, আরেকদল ব্রিটিশ শাসকের পক্ষে বন্দুক হাতে নিতে প্রস্তুত। হাজারও নিন্দামন্দ সত্ত্বেও এই দ্বিপদের বাইরে যে একটি সুস্পষ্ট তৃতীয় রাজনীতি ছিল– সেটারও সাক্ষ্য বহন করে সুকান্তের কবিতা।

কবিতা এভাবেই রাজনৈতিক ইশতেহার হয়ে ওঠে। লাতিন আমেরিকার প্রতিবাদী কবিতার সঙ্গে এভাবেই সমগোত্রে অবস্থান করে সুকান্তের কবিতা। এভাবেই বাংলা কবিতার প্রতিবাদী ধারার নন্দন মূর্ত হয় পূর্ণাঙ্গভাবে যেখানে মতাদর্শ একটি সুস্পষ্ট ভূমিকা গ্রহণ করে। এটা আধুনিক বাংলা কবিতার একটি পালাবদল বলা যায়, ঠিক যেভাবে ওই সময়পর্বের সলিল চৌধুরী সৃষ্ট গণসংগীত শুধু প্রতিবাদী সংগীত নয়, আধুনিক বাংলা গানেরও পর্বান্তরকে সূচিত করে। সুকান্ত পূর্ণ আয়ু নিয়ে বাঁচলে তাঁর কবিতা কোন পথে এগত বলা সম্ভব নয়, তবে এই চেহারা প্রকরণ বা অন্তর্বস্তুতে স্থিত থাকত না, সেটা বলাই বাহুল্য। সুভাষ মুখোপাধ্যায় বা বিষ্ণু দে বা সিদ্ধেশ্বর সেন– কার সহগামী হত তাঁর কবিতা, সেটা এখন শুধুই অনুমানের।

তবে সুকান্ত যে একটি জায়গায় স্থিত থাকেননি, তার স্বাক্ষরও আছে কিছু কবিতায়। যিনি লেখেন ‘… আর এ কাব‍্য নয়/ এবার কঠিন, কঠোর গদ‍্যে হানো,/ পদ-লালিত‍্য-ঝঙ্কার মুছে যাক’, তিনিই উদাস হাওয়ার নুপূর নিক্কণের ভাষায় লেখেন, ‘আজ রাতে যদি শ্রাবণের মেঘ হঠাৎ ফিরিয়া যায়/ তবুও পড়িবে মনে,/ চঞ্চল হাওয়া যদি ফেরে কভু হৃদয়ের আঙিনায়/ রজনীগন্ধা বনে,/ তবুও পড়িবে মনে’। সুকান্তের উচ্চকিত রাজনৈতিক আহ্বানের কবিতায় যিনি আটকে থাকবেন, তাঁর পক্ষে বোঝা মুশকিল এই কবিতাও সুকান্তেরই।

শতবর্ষে আবার যখন সুকান্তের কবিতা সমগ্র নিয়ে বসি, তখন আরও নতুন কিছু বিষয়ে চোখ আটকে যায়। সুকান্তের কবিতার সময়পর্ব ফ‍্যাসিবিরোধী যুদ্ধ, ফ‍্যাসিবাদের পরাজয়, ঔপনিবেশিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের দুর্বার হয়ে ওঠা, নৌবাহিনীর বিদ্রোহ আর কলকারখানার শ্রমিকদের ধর্মঘট হয়ে ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের প্রাক্মুহূর্ত অবধি বিস্তৃত। এর মধ‍্যেই ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্ট থেকে তাঁর শেষ নিশ্বাস ত‍্যাগের মুহূর্ত পর্যন্ত কলকাতা শহর বীভৎস দাঙ্গা দেখেছে, যা খেপে খেপে বারবার আত্মপ্রকাশ করেছে। ১৯৪৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারির রশিদ আলি দিবসে যে অভূতপূর্ব সাম্প্রদায়িক ঐক‍্য দেখেছিল কলকাতা মহানগরী, যার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ২৯ জুলাইয়ের সর্বভারতীয় ধর্মঘটের ব‍্যাপকতা, তা খানখান হয়ে গেল ১৬ আগস্ট মুসলিম লিগের প্রত‍্যক্ষ সংগ্রামের ডাককে কেন্দ্র করে সংঘটিত হওয়া বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায়। ট্রাম শ্রমিকরা এর মধ‍্যেই রাজপথে নেমে দাঙ্গা মোকাবিলা করে আক্রান্ত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছে দিয়েছে। এই বীভৎস সময়খণ্ডের প্রতিফলন বাংলা কবিতায় খুব বেশি নেই।

সাম্প্রদায়িকতা বা দাঙ্গা নিয়ে যা কিছু কবিতা, তা সম্ভবত দেশভাগের সময় বা দেশভাগের স্মৃতি হিসেবে পরে লেখা। শতবর্ষে ‘সুকান্ত সমগ্র’-এর পাতা ওল্টানোর সময় চোখ আটকে গেল একটি কবিতায়– “সেপ্টেম্বর ’৪৬”। কবি হৃদয়ের রক্তক্ষরণ প্রথম পংক্তিতেই স্পষ্ট। ‘কলকাতায় শান্তি নেই’। এমন নিরাভরণ নিরালঙ্কার সহজ উচ্চারণও খুবই ব‍্যতিক্রম সুকান্তের কবিতায়। “কোথায় সেই দোকানপাট?/ কই সে জনতার স্রোত?/ সন্ধ‍্যার আলোর বন‍্যা/ আজ আর তোলে নাকো/ জনতরণীর পাল/ শহরের পথে/ ট্রাম নেই, বাস নেই–/ সাহসী পথিকহীন এ শহর আতঙ্ক ছড়ায়।/ সারি সারি বাড়ি সব/ মনে হয় কবরের মতো,/ মৃত মানুষের স্তূপ বুকে নিয়ে পড়ে আছে/ চুপ ক’রে সভয়ে নির্জনে।… হয়তো অনেক রাত্রে/ পথচারী কুকুরের দল/ মানুষের দেখাদেখি/ স্বজাতিকে দেখে/ আস্ফালন, আক্রমণ করে।/ রুদ্ধশ্বাস এ শহর/  ছটফট করে সারা রাত-/ কখন সকাল হবে?” দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিতে হল, কারণ সুকান্ত চর্চায়, অনুষ্ঠান মঞ্চ বা গবেষকের নিবন্ধ, দুয়েতেই এই কবিতা অনালোকিত।

বিষাদী হৃদয়ের সংবেদন যদি কবিতার ওপরে উদ্ধৃত পংক্তিতে ফুটে উঠে থাকে তবে দায়বদ্ধ রাজনৈতিক কর্মীর আহ্বান আছে শেষের দু’টি স্তবকে। ২৯ জুলাইয়ের ধর্মঘটে ঐক্যবদ্ধ কলকাতার প্রত‍্যাবর্তন চান সুকান্ত। “ ‘জুলাই! জুলাই’ আবার আসুক ফিরে/ আজকের কলকাতার এ প্রার্থনা/ দিকে দিকে শুধু মিছিলের কোলাহল–/ এখনো পায়ের শব্দ যাচ্ছে শোনা”। আরও একটি কবিতা ‘ঐতিহাসিক’। ১৯৪৭-এ লেখা। স্বাধীনতা আসছে। আসছে সুকান্তের মৃত‍্যুর ক্ষণও। দুর্ভিক্ষের সময়ে খাদ‍্যের সারিতে এক কাতারে পাশাপাশি দাঁড়ানো হিন্দু-মুসলমান তখন স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা করছে একে অপরের বুকে ছুরি মেরে রক্তাক্ত হয়ে, ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গায়। বললেন, ‘তোমরা কি দেবে আমার প্রশ্নের কৈফিয়ৎ:/ কেন মৃত্যুকীর্ণ শবে ভরলো পঞ্চাশ সাল? আজ বাহান্ন সালের সূচনায় কি তার উত্তর দেবে?/ …দেরি হয়ে গেছে অনেক, অনেক দেরি।/ লাইনে দাঁড়ানো অভ্যাস কর নি কোনোদিন,/ একটি মাত্র লক্ষ্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে/ মারামারি করেছো পরস্পর,/ তোমাদের ঐক্যহীন বিশৃঙ্খলা দেখে/ বন্ধ হয়ে গেছে মুক্তির দোকানের ঝাঁপ/ …একদা দুর্ভিক্ষ এল/ ক্ষুধার ক্ষমাহীন তাড়নায়/ পাশাপাশি ঘেঁষাঘেঁষি সবাই দাঁড়ালে একই লানে/ ইতর-ভদ্র, হিন্দু আর মুসলমান/ একই বাতাসে নিলে নিঃশ্বাস/ চাল, চিনি, কয়লা, কেরোসিন?/ এসব দুষ্প্রাপ্য জিনিসের জন্য চাই লাইন।/ কিন্তু বুঝলে না মুক্তিও দুর্লভ আর দুর্মূল্য,/ তারো জন্যে চাই চল্লিশ কোটির দীর্ঘ, অবিচ্ছিন্ন এক লাইন।/ মূর্খ তোমরা/ লাইন দিলে: কিন্তু মুক্তির বদলে কিনলে মৃত্যু/ রক্তক্ষয়ের বদলে পেলে প্রবঞ্চনা’। এই কবিতা দু’টিতে রাজনীতি রয়েছে, তার চেয়েও রয়েছে গভীর সংবেদন, যাকে আজকের সময়ে সমব্যথা বা এমপ্যাথি বলতে পারি। ন্যায্য দাবিতে লড়াই জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি প্রাথমিকভাবে সমব্যথার অনুভূতি।

বাবার কোলে বসে ছোট্ট সুকান্ত

সুকান্তের নানা কবিতায় এই সমব্যথার প্রকাশ রাজনীতির চেয়েও প্রগাঢ়। ‘চারাগাছ’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘সিঁড়ি’, ‘কলম’ শুধু রাজনীতির কবিতা নয়। সমব্যথারও কবিতা। আবার তাঁর এই প্রতীকী কবিতাগুলি নির্বিচার সমব্যথার কথা বলে না। ‘চিল’ কবিতার মরাচিল তাই তাঁর সমব্যথা আকর্ষণ করে না, সেখানে অত্যাচারী চিলের পরিবর্তে নিরাপদ মুক্ত ইঁদুরছানার প্রতি তাঁর সুস্পষ্ট পক্ষপাতিত্ব। এই রাজনৈতিক সমব্যথার সুস্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের নন্দনই সুকান্তের কবিতা।

……………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদারএর অন্যান্য লেখা

……………………….