


সত্যজিৎ রায়ের অতীব জনপ্রিয় ফেলুদা কাহিনিগুলিতে এবং গিরিডি-প্রবাসী বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক প্রোফেসর শঙ্কুর আখ্যানমালার মধ্যেও এই ধরনের চরিত্রের ক্ষণিক-আবির্ভাব– একটু খেয়াল করলেই তাঁদের খুঁজে নেওয়া যায়। এঁরা ঠিক প্রথাগত অর্থে গল্পের অদ্ভুতকর্মা নায়ক নন, সাধারণ চাকুরে– একক মধ্যবয়সি মধ্যবিত্ত– পাঁচ-ছয় দশক আগের গড়-বাঙালি মানুষ যেমন হতেন, তাঁদেরই প্রতিনিধি। কিন্তু এক অনুচ্চকিত ভদ্রতাবোধ, অক্ষয়-বর্মের মতো তাঁদের চরিত্রকে ঘিরে রেখে দিয়েছিল। হাজার প্রলোভনে কদর্য সরব আত্মঘোষণা থেকে যে বর্ম তাঁদের অক্ষত রেখে দিত।
১৯৯৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর সংখ্যার সাপ্তাহিক ‘দেশ’-এর বিমল দাস অঙ্কিত প্রচ্ছদটি স্মরণ করুন। ‘শীতের বৈঠকে’ সেই সংখ্যার প্রচ্ছদ-নিবন্ধ। তিন দশকের বেশি সময় ইতিমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। তথাপি সেখানে কুমারপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় রচিত ‘কিছু খুচরো আড্ডা’ শীর্ষক অসামান্য সুখপাঠ্য নিবন্ধটি অনেক তৎকালীন যুবক-প্রৌঢ়ই সোৎসাহে স্মরণ করতে পারবেন। কিন্তু কথা হচ্ছিল বিমল দাস অঙ্কিত প্রচ্ছদটি সম্বন্ধে। একটি ঘরোয়া আসরে হারমোনিয়াম নিয়ে বৈঠকি চালে এক স্বল্পকেশ ব্যক্তি গান ধরেছেন, তবলায় যিনি সঙ্গত করেছেন তাঁর কেশরেখা আরও ক্ষীণ, উপস্থিত শ্রোতারা কেউ উপবিষ্ট, কয়েকজন দণ্ডায়মান, স্মিতমুখে সেই গান শুনছেন। উপভোগ এবং অনুভবের অভ্রান্ত চিহ্ন তাঁদের শারীরবিভঙ্গে। অবিশ্বাস্য রকম জীবন্ত সেই ছবির মানুষেরা– দেখে মনে হবে, এঁদের মধ্যে কেউ অবিরাম পানের ডিবে পকেট থেকে বের করবেন, কেউ ধরাবেন সিগারেট। পোশাক, মুখভঙ্গিমা এবং কেশসজ্জা থেকে আন্দাজ করা যায়, গত শতাব্দীর চতুর্থ বা পঞ্চম দশকের কোনও সময়কে ছবিতে ধরে রাখার প্রয়াস করা হয়েছে। উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে সৌম্যকান্তি-প্রশান্ত মুখ কয়েকজনকে দেখলে মনে হবে অনিমেষদার চেহারা সম্ভবত এমনই ছিল। কিন্তু, অনিমেষদা কে?

২.
১৯৭৩ সালের (১৩৮০ বঙ্গাব্দ) আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকীতে (দাম, চার টাকা) প্রকাশিত হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের বিচিত্র গল্প ‘বারীন ভৌমিকের ব্যারাম’। তৎসহ মতি নন্দীর ‘স্টপার’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সত্যি রাজপুত্র’ উপন্যাস ছাড়াও প্রেমেন্দ্র মিত্রের অবিস্মরণীয় ঘনাদা-কাহিনি ‘পৃথিবী বাড়ল না কেন’ আর সতীকান্ত গুহের গল্প ‘ইচ্ছাপূরণ’ বা সুকুমার দে সরকারের গল্প ‘দেবীর অলঙ্কার’। ইশকুলের নিতান্ত নিচু ক্লাসের ছাত্র তখন আমরা। সৌভাগ্যবশত জ্বর-জারি অথবা অন্যান্য ছোটখাটো শরীর-খারাপ ছাড়া মানসিক রোগ সম্বন্ধে, বলা বাহুল্য, বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। কাজেই ‘ক্লেপ্টোম্যানিয়া’ নামক বিজাতীয় মানসিক ব্যাধিটির কথা জানার কোনও প্রশ্ন ওঠেনি। পুজোর ছুটির পরে ইশকুল খুললে বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে উত্তেজিত আলোচনা– চুরি করাও যে একধরনের মনোরোগ, তা নিয়ে নিবিড় বিশ্লেষণ নিজেদের মধ্যে। এবং সেই সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের বিচিত্র অলংকরণ-বিষয়ে সোৎসাহ বক্তব্য-বিনিময়, অন্তত সেই অতি-বালক বয়সে যতটা সম্ভব। বিশেষ করে, বারীন ভৌমিকের ঢেউ খেলানো চুল, সাদা-কালোর সঙ্গে রঙের অভাবনীয় সহাবস্থান। আশ্চর্য দক্ষতার সঙ্গে বারীন ভৌমিকের মোজা-পরা পা কীভাবে একটানে আঁকা হয়েছে, মুগ্ধ কথোপকথন তা নিয়েও। অনিমেষদার কথাও উঠেছিল তখনই। এমনই নির্বোধ এই ব্যক্তি যে, বাসের মধ্যে পকেট-কাটা হচ্ছে বুঝতে পেরেও, এ নিয়ে হইচই করলে বাসসুদ্ধু লোক তাঁকে নিয়ে আলোচনা করবে, ফলত তাঁকে অবাঞ্ছনীয়ভাবে বিব্রত হতে হবে– এই নিতান্তই ‘অযৌক্তিক’ কারণে, নিরুপদ্রবভাবে পকেটমারকে তিনি তাঁর ব্যাগ নিয়ে মসৃণভাবে উধাও হয়ে যেতে দেন।

কিন্তু ওই উল্লেখটুকুই। মূল আলোচনা সীমাবদ্ধ ছিল গল্পের অপ্রত্যাশিত সব বাঁক নিয়েই– অন্তত সেই বয়সে যেটুকু সম্ভব। এক রাত্রির ট্রেন যাত্রায় বারীন ভৌমিক এবং সহযাত্রী ‘চ’ অর্থাৎ একদা-বক্সার পুলক চক্রবর্তীর চরিত্রের নানাদিক। বিশেষ করে শেষ অংশটুকুতে, গল্পের ক্লাইম্যাক্স– বারীন ভৌমিক তো বটেই, স্বয়ং ‘চ’-ও একই রকমের ‘ঝাড়ুদার’ অর্থাৎ চুরি করার মনোরোগের রোগী সে-ও– এইসব অদ্ভুত কাণ্ড নিয়ে সপ্রশংস গভীর কথাবার্তা। একদা বারীনের হাতসাফাই করা ঘড়িটি ফের অপ্রত্যাশিতভাবে ফিরে পাওয়ার পর পুলক চক্রবর্তীর কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা আমাদের সে-বয়সে যেমন মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলেছিল, তাতে অনিমেষদার কোনও স্থান ছিল না।

৩.
উক্ত অনিমেষদার চরিত্র নিয়ে ভাবনা শুরু হতে লেগে যায় আরও প্রায় সাড়ে তিন দশক। দেখা যায়, বারীন ভৌমিক-পুলক চক্রবর্তী-দ্বিত্ব অতিক্রম করে সেই তিন লাইনে বর্ণনা করা চরিত্রটি ক্রমশ বৃহদাকৃতি হয়ে উঠতে থাকে। স্মৃতি বলছিল, বাসসুদ্ধু লোকের কৌতুহলের বিষয় হয়ে উঠবেন তিনি, ‘এ হয় না’। গল্পটি আবার পড়তে গিয়ে দেখা যায়, ‘পাবলিক বাসে একগাড়ি লোকের ভেতর একটা সীন হবে, আর তার মধ্যে একটা প্রমিনেন্ট পার্ট নেব আমি– এ হতে দেওয়া যায় না।’ ‘হয় না’ এবং ‘হতে দেওয়া যায় না’-র বিপুল পার্থক্য অবাক করে দেওয়ার মতো। এর মধ্যে একটি অকথিত নিষেধাজ্ঞা আছে, বাঙালি ভদ্রলোকের কতদূর পর্যন্ত ভদ্রতাবোধের সীমানা বিস্তৃত, লোকের সামনে নিজেকে জাহির করা যে একান্তই পরিহার্য, তা এই ‘হতে দেওয়া যায় না’-র মধ্যেই বলা হয়ে গিয়েছে। আজ থেকে অর্ধ-শতাব্দীরও বেশি আগে সত্যজিৎ রায় শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকের শালীনতাবোধের সীমানা নির্ধারণ করে গিয়েছেন ওই স্বল্পকথিত চরিত্রটির মধ্যে। এখানে ফুটে বেরিয়েছে ভদ্রতার সেইসব চিহ্ন, হাজার অসুবিধা-অবহেলা-দারিদ্র-বঞ্চনার মধ্যেও যা লুপ্ত হওয়ার নয়।
সত্যজিৎ রায় পূজাবার্ষিকীর অলংকরণের মধ্যে, অনিমেষদার চরিত্রটি এড়িয়ে গিয়েছেন, তবে পূর্বোক্ত বিমল দাস-কৃত প্রচ্ছদটির মধ্যে ধৃত চরিত্রগুলির কয়েকজনের মুখায়ববে অনিমেষদার শান্ত-স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্ব মূর্ত হয়েছে। সাড়ে দশক আগের শিক্ষিত বাঙালি চেহারা। তাঁর প্রথম দু’টি গল্প-সংকলন, ‘এক ডজন গপ্পো’ এবং ‘আরো এক ডজন’ বইতে এবং পরবর্তীকালের আরও কিছু বিক্ষিপ্ত গল্পে সেই শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকের ‘কর্তব্য’ এবং ‘কৃৎ’-এর বিশদ বিবরণ নিহিত আছে। ইঙ্গিত-ইশারায় জানানো হয়েছে তাঁদের কী কী করা মানায় না, এবং কী-ই বা করা কাম্য। সত্যজিৎ রায়ের অতীব জনপ্রিয় ফেলুদা কাহিনিগুলিতে এবং গিরিডি-প্রবাসী বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক প্রোফেসর শঙ্কুর আখ্যানমালার মধ্যেও এই ধরনের চরিত্রের ক্ষণিক-আবির্ভাব– একটু খেয়াল করলেই তাঁদের খুঁজে নেওয়া যায়। এঁরা ঠিক প্রথাগত অর্থে গল্পের অদ্ভুতকর্মা নায়ক নন, সাধারণ চাকুরে– একক মধ্যবয়সি মধ্যবিত্ত– পাঁচ-ছয় দশক আগের গড়-বাঙালি মানুষ যেমন হতেন, তাঁদেরই প্রতিনিধি। কিন্তু এক অনুচ্চকিত ভদ্রতাবোধ, অক্ষয়-বর্মের মতো তাঁদের চরিত্রকে ঘিরে রেখে দিয়েছিল। হাজার প্রলোভনে কদর্য সরব আত্মঘোষণা থেকে যে বর্ম তাঁদের অক্ষত রেখে দিত। এই অনিমেষদা তাঁদেরই এক প্রতিনিধি মাত্র।

প্রথম যৌবনে লেখা দু’টি ইংরেজি ছোটগল্পের কথা বাদ দেওয়া যাক। বাংলা ভাষায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্প যে ‘বঙ্কুবাবুর বন্ধু’ (সন্দেশ, মাঘ, ১৩৬৮) তা তাঁর উৎসাহী পাঠকরা অবগত আছেন। কাঁকুড়গাছি গ্রামের বাসিন্দা সেই গল্পের যে সব চরিত্র হাঁটছেন, চলছেন, কথা বলছেন, আড্ডাখানায় গিয়ে বসছেন, বঙ্কুবিহারী দত্তের পিছনে অকারণে লেগে কুৎসিত আমোদবোধ করছেন, তাঁদের বিপরীতে আপাতভাবে নিরীহ, ভালমানুষ, বাধ্যত সহনশীল বঙ্কুবাবু ভদ্রলোক বাঙালির উদাহরণ। গল্পের প্রথমাংশে বঙ্কুবাবুর অসহায় সহনশীলতা পাঠকের কাছে প্রায় বিরক্তিকর লাগতে পারে, কিন্তু ক্রেনিয়াস গ্রহের অ্যাং-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের পর তাঁর ঘুমিয়ে থাকা আত্মমর্যাদাবোধ জেগে ওঠে, অন্যায়ের সরব প্রতিবাদ করার মতো মনের জোর সংগ্রহ করে শ্রীপতি মজুমদার এবং তাঁর দলবলকে তিনি স্তম্ভিত করে দেন, মর্যাদাবোধ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত না-হয়ে। গ্রহান্তরের মহাশক্তিশালী জীবটির সঙ্গে পরিচিত না-হলে চিরকালই তাঁকে মুখ বুজে অপমান সহ্য করে যেতেই হত, বড়জোর গোপনে দু’-ফোঁটা চোখের জল ফেলতেন তিনি। অনিমেষদা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মর্যাদাবোধ থেকে আত্মঘোষণাকে পরিত্যজ্য মনে করতেন, বঙ্কুবাবুর কাছেও জোর করে নিজেকে জাহির করা অকল্পনীয় ছিল। পরিস্থিতি, পরিবেশ এবং ব্যক্তিগত রুচিবোধ তাঁকে এই শালীনতার শিক্ষা দিয়েছিল।
‘সন্দেশ’ পত্রিকায় এরপরের মাসে প্রকাশিত হয় ‘টেরোড্যাকটিলের ডিম’ (ফাল্গুন, ১৩৬৮)। বদনবাবু সাদামাটা চাকরি করা অতি সাধারণ একজন মানুষ। প্রতিদিনের শ্বাসরোধকারী ক্লান্তিকর পরিশ্রমের পর বাড়ি ফেরার পথে কার্জন পার্কে একবার ঘণ্টাখানেকের জন্য না-এসে পারতেন না। ‘দিনের মধ্যে একটা ঘণ্টা অন্তত একটু চুপচাপ বসে থেকে কলকাতার যেটুকু খোলামেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে সেটুকু উপভোগ করা– এ না-হলে বদনবাবুর যেন জীবনই বৃথা।…’ শয্যাশায়ী ছেলের জন্য রোজকার-বলা গল্পটি তিনি এখানেই বসে ভেবে নিতেন। কার্জন পার্ক ছাড়ার পর লালদীঘি। নিয়মিত নতুন-নতুন গল্পের বই কিনে নিয়ে যাওয়ার মতো স্বচ্ছল আর্থিকভাবে তিনি নিশ্চয়ই নন, কিন্তু নিজস্ব কল্পনাকে ব্যবহার করে রোজ বিকেলে একটি করে গল্প ভেবে তৈরি করার মতো শক্তি তাঁর আছে। ‘টেরোড্যাকটিলের ডিম’ দেখিয়ে যে, ব্যক্তিটি আজগুবি গল্প ফেঁদে তাঁর মানিব্যাগটি নিয়ে উধাও হয়, তার উপর তিনি ততটা ক্রুদ্ধ হতে পারেন না এই কারণেই যে, আগামী বেশ কয়েকদিনের জন্য ছেলেকে গল্প বলার খোরাক সে জুগিয়ে দিয়ে গিয়েছে। অনিমেষদার চরিত্রটি এর এক যুগ পরে সৃষ্টি করবেন কিন্তু তাঁর মধ্যে এই বদনবাবুর ছায়া কিছুটা হলেও থেকে যায় না! সাংসারিক যুদ্ধ পরাজিত এবং অবসন্ন– কিন্তু সৎ, কল্পনাপ্রবণ এবং আত্মমর্যাদাসম্পন্ন।
৪.
সত্যজিতের গল্পে ছেলেবেলার বন্ধুত্বের কথা বারবার ফিরে ফিরে আসে। একদা-নিবিড়ভাবে-আশ্লিষ্ট দুই বন্ধু, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাঁরা স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তিত হয়েছেন। একজন তার মধ্যে তুলনামূলকভাবে জাগতিক-অর্থে সফল, স্বাভাবিকভাবেই অতীতের বন্ধুর প্রতি উদাসীন, কিছুটা হয়তো নির্মম, কারণ সেই ব্যক্তি সাংসারিক বিচারে অর্থনৈতিকভাবে ব্যর্থ, দারিদ্রপীড়িত এবং একদা-প্রিয়-বন্ধুর সাহায্যপ্রত্যাশী। মস্ত আশ্বাসের বিষয় এই যে, প্রথমোক্ত কিঞ্চিৎ-উদাসীন সফল বন্ধুটিও শেষ পর্যন্ত বাঙালি শিক্ষিত মধ্যবিত্তসুলভ ভদ্রতাবোধকে উপেক্ষা করতে পারেন না। কোনও-না-কোনও ঘটনা তাঁদের সাময়িক বিভ্রমের নির্মোক ছিন্ন করে, অতীতের সুখস্মৃতি শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’, ‘চিলেকোঠা’, ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’– একের পর এক গল্প মনের মধ্যে স্নিগ্ধ অনুভূতি এনে দেয়। ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’ গল্পেরা অধুনা দুঃস্থ বন্ধু জয়দেব বোসের কিশোরবয়সি ছেলেটির চেহারায় ফিরে আসে ছেলেবেলার বন্ধুর চেহারা, জয়দেবকে প্রত্যাখ্যান করলেও মোহিত সরকার জয়ের ছেলে সঞ্জয়কে সস্নেহ গ্রহণ করেন।
৫.
সত্যজিৎ রায়ের সমস্ত গল্পের মধ্যে একটা বড় অংশই অলৌকিক রসের। ‘অনাথবাবুর ভয়’, ‘বাদুড় বিভীষিকা’, ‘খগম’– বাংলা সাহিত্যের এই বিশেষ ধারার শ্রেষ্ঠ গল্পগুলির অন্যতম। গত শতাব্দীর ষষ্ঠ-সপ্তম-অষ্টম দশকে যাদের শৈশব এবং কৈশোর কেটেছে– এইসব গল্পের মোহে তারা আজীবন আবদ্ধ থাকবে। এইসব গল্পের জনপ্রিয়তা এখনও অম্লান এবং হয়তো বা ক্রমবর্ধমান। নানাভাবে আলোচিত হয়েছে এইসব গল্প, লেখা হয়েছে প্রবন্ধ এবং এখনও হয়ে চলেছে। বিবিধ সংকলনের মধ্যে সেগুলির অনিবার্য উপস্থিতি। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের শ্রেষ্ঠ গল্পের মধ্যে কেবল ভূতের গল্পই নয়। মধ্যবিত্ত বাঙালির গল্পও লেখা হয়েছে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, বিমল কর, রমাপদ চৌধুরী, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়-কথিত মধ্যবিত্ত নয়; এইসব চরিত্র নানাভাবে অভিনব। এইরকম অনন্যসাধারণ দু’টি গল্পের উল্লেখ করে এই প্রসঙ্গ শেষ করা যেতে পারে। তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয় হওয়ার উপাদান এই দু’টি গল্পের মধ্যে স্বভাবতই অনুপস্থিত কিন্তু কোনও এক আশ্চর্য লাবণ্যের রসায়ণে এই দু’টি গল্প গত শতাব্দীর বাঙালি ভদ্রলোকের যথাযথ প্রতিবিম্ব নির্ধারণে সক্ষম হয়েছে।

‘পটলবাবু ফিল্মস্টার’ গল্প প্রকাশিত হয় ‘সন্দেশ’ পত্রিকার শ্রাবণ, ১৩৭০ সংখ্যায়। পটলবাবু নিম্নবিত্ত বাঙালি ভদ্রলোক। একদা নাটকে অভিনয় করতেন এবং ভালো অভিনয়ই করতেন, তাঁর তৎকালীন জনপ্রিয়তাই তার প্রমাণ। প্রথমবার ছায়াছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে তিনি স্বভাবতই উত্তেজিত, কারণ এই ছবির পরিচালক বরেন মল্লিক, যাঁর ‘তিনখানা ছবি পরপর হিট করেছে’, এবং সহ-অভিনেতা চঞ্চলকুমার, ইদানীং চলচ্চিত্র জগতের তারকা। সুতরাং, বরেন মল্লিকের ছবিতে সবাক চরিত্র অভিনয় করার সুযোগ পেয়ে তাঁর কৃতার্থ হয়ে যাওয়ার কথা এবং তা তিনি হয়েছেনও। সংলাপের কাগজ হাতে পেয়ে যখন তিনি দেখেন যে, তাঁর কথা কেবলমাত্র ‘আঃ’– এই অব্যয়টির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তখন তিনি সাময়িকভাবে হতোদ্যম হয়ে পড়েন বটে, কিন্তু খানিকক্ষণের মধ্যে নিজেকে সামলেও নেন। মাত্র দু’টি বর্ণের এই সংলাপ তাঁর মনে অনন্ত সম্ভাবনার দরজা হাট করে খুলে দেয়। ক্ষোভ থেকে প্রশান্তি– পটলবাবুর এই পরিবর্তিত মানসিক অবস্থা, তাঁর সংবেদনশীলতার পরিচয়। অভিনয়টুকু করে পারিশ্রমিক না-নিয়েই চলে গিয়ে, পটলবাবু সিনেমা ইউনিটের সবাইকে বিস্মিত করেন বটে, তাঁর মানসিকতা যা অর্থকে পরিস্থিতির বিনিময়ে ত্যাগ করতে শিখিয়েছে। তা তাঁকে জানায়, ‘… এই সামান্য কাজ নিখুঁতভাবে করার জন্য তাঁর যে আগ্রহ আর পরিশ্রম। তার কদর কি এরা করতে পারে? সে ক্ষমতা কি এদের আছে? এরা বোধহয় লোক ডেকে এনে কাজ করিয়ে টাকা দিয়ে খালাস। টাকা! কত টাকা? পাঁচ, দশ, পঁচিশ? টাকার তাঁর অভাব ঠিকই– কিন্তু আজকের এই যে আনন্দ, তার কাছে পাঁচটা টাকা আর কী?…’
‘সন্দেশ’ পত্রিকার ১৩৮১ সালের শারদীয়া সংখ্যায় ছাপা হয় সত্যজিৎ রায়ের গল্প ‘ভক্ত’। অরূপরতন সরকার, বলা বাহুল্য, একা মানুষ, পুরী বেড়াতে এসে কেবলমাত্র ভদ্রতাবশত লোকের ভুল না-ভেঙে বিখ্যাত লেখক অমলেশ মৌলিকের ভূমিকায় অভিনয় করে যান, যতক্ষণ না স্বয়ং লেখক পুরীতে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। ফাঁকতালে বিখ্যাত ব্যক্তির পাওনা খ্যাতি, সাময়িকভাবে উপভোগ করে নেওয়া তাঁর উদ্দেশ্য নয়। শিশুসাহিত্যিক মৌলিক মহাশয়ের আগ্রহী পাঠক-পাঠিকাদের মনে নৈরাশ্য না-আনার জন্য তাঁর এই অভিনয়– ‘… এদের ধারণা যে ভুল সেটা জানানো দরকার, কিন্তু সরাসরি কাটখোট্টাভাবে জানালে এঁরা কষ্ট পাবেন ভেবে অরূপবাবু কিঞ্চিৎ দ্বিধায় পড়ে গেলেন।…’

সত্যজিৎ রায়ের বাংলা গল্প লেখা শুরু ৪০ বছর বয়সে, ১৯৬১ সালে। অতি দ্রুত জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে তাঁকে গল্প লিখতে হয়েছে প্রায় আমৃত্যু (১৯৯২), তাঁর অজস্র গল্প জুড়ে ছড়িয়ে আছে এইসব অতি সাধারণ কিন্তু নিজের কথা বলতে না-চাওয়া মানুষ। বড়াই করা, নিজেই জাহির করা যাদের কাছে ব্যক্তিগত রুচির অতীত। গল্পে-গল্পে ছড়িয়ে থাকা ইঙ্গিতগুলি বুঝে এদের নিজের মতো করে খুঁজে নিলে আজকের এই সশব্দ-সময়ে মনের মধ্যে ভারি আরাম বোধ হয়।
……………………..
রোববার.ইন-এ পড়ুন দেবাশিস গুপ্ত-র অন্যান্য লেখা
……………………..
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved