A Filmmaker's Benaras Memoir and philosophy | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

যে শহরে মানুষ মৃত্যুকে হারাতে আসে

মণিকর্ণিকার সিঁড়িতে বসে বহুবার ভেবেছি, পৃথিবীর আর কোথাও এমন চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে কি? যেখানে মানুষ মৃত্যুর দিকে ছুটে আসে তাকে পরাজিত করার জন্য। যেখানে চিতার আগুন ভয়ের প্রতীক নয়, বরং মুক্তির দরজা। যেখানে শেষযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয় উৎসবের মতো এক প্রশান্ত মুখ নিয়ে।

শেষ আপডেট: জুন ১৭, ২০২৬, ১৯:২০   
Facebook WhatsApp Messenger

কিছু শহর আছে, যাদের আমরা ভ্রমণ করি। ট্রেন থেকে নেমে কয়েকটা ছবি তুলি, কিছু স্মৃতি জমা রাখি, তারপর ফিরে আসি নিজের জীবনে। আবার কিছু শহর আছে, যারা আমাদের ভ্রমণ করে। আমাদের ভিতরে ঢুকে পড়ে। আমাদের ঘুম, স্বপ্ন, বিশ্বাস, অবিশ্বাস, ভালোবাসা, ভয়– সবকিছুর মধ্যে নিজেদের স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নেয়। বেনারস আমার কাছে সেই দ্বিতীয় ধরনের শহর।

প্রথমবার সেখানে গিয়েছিলাম ২০১৪-’১৫ সালে। ‘ডেথ অফ ডেথ’ তথ্যচিত্রের শুটিং করতে। তখন ভাবিনি, ছবির কাজ শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু শহরটি থেকে যাবে! তারপর বহুবার গিয়েছি। বহু ছবির শুটিং করেছি। অথচ প্রতিবারই মনে হয়েছে, আমি যেন নতুন কোনও শহরে নয়, নিজেরই কোনও পুরনো স্বপ্নের মধ্যে ফিরে যাচ্ছি।

zoom
‘ডেথ অফ ডেথ’ তথ্যচিত্রের পোস্টার

বেনারসকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা আজও মনে আছে। ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি নামেনি। গঙ্গার ওপরে কুয়াশা ভাসছে। দূরে মন্দিরের ঘণ্টা বাজছে। সরু গলির ভিতর দিয়ে গরু হেঁটে যাচ্ছে রাজকীয় নিশ্চিন্ততায়। কোথাও ধূপের গন্ধ, কোথাও চন্দনের, কোথাও আবার সদ্য জ্বলে ওঠা চিতার ধোঁয়া। মনে হয়েছিল, শহরটি যেন একইসঙ্গে জীবন ও মৃত্যুর রাজধানী। এখানে জন্ম আর মৃত্যুর মধ্যে কোনও প্রাচীর নেই। এক ঘাটে আরতি হচ্ছে, আরেক ঘাটে চিতা জ্বলছে। একদিকে মানুষ সন্তান লাভের জন্য প্রার্থনা করছে, অন্যদিকে কেউ শেষবারের মতো বিদায় জানাচ্ছে তার বাবাকে।

গত এক দশকে শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে কত রাত যে মণিকর্ণিকা ঘাটে কাটিয়েছি, তার হিসেব নেই! জ্বলন্ত চিতার পাশে বসে ডায়েরির পাতায় লিখেছি এমন সব কথা, যা কাউকে কখনও বলা হয়নি। বুকের বাঁ-দিকে জমে থাকা পরাজয়, অপমান, বিচ্ছেদ, না-পাওয়া, ব্যর্থতা– সবকিছুকে শব্দের শরীর দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কখনও মনে হয়েছে আমি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নই, বরং একজন সাক্ষী। আগুনের পাশে বসে মানুষের শেষ অধ্যায় দেখছি আর ভাবছি, এত দৌড়ঝাঁপ, এত অহংকার, এত যুদ্ধের শেষ পরিণতি যদি এক মুঠো ছাই হয়, তাহলে আমরা আসলে কীসের জন্য লড়ে যাই?

মৃত্যুর পাশে দীর্ঘ সময় কাটালে মানুষের ভিতরে অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। প্রথমে ভয় লাগে। তারপর অভ্যেস হয়। তারপর একসময় মৃত্যু আর ভয়ের বিষয় থাকে না, বরং প্রশ্নের বিষয় হয়ে ওঠে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই হয়তো আমি বারবার ফিরে গিয়েছি বেনারসে।

zoom
মণিকর্ণিকা ঘাট

তবে বেনারস কখনও আমাকে সহজে গ্রহণ করেনি।

চলচ্চিত্রের রোমান্টিক গল্পে যেমন দেখানো হয়, বাস্তব মোটেই তেমন নয়। শুটিং করতে গিয়ে বহুবার অপমানিত হয়েছি। ক্যামেরা কেড়ে নেওয়ার হুমকি এসেছে। টাকা চাওয়া হয়েছে। ঘুষ চাওয়া হয়েছে। ডোম রাজা– প্রয়াত জগদীশ চৌধুরীর সাঙ্গপাঙ্গরা এসে দাঁড়িয়েছে তোলাবাজির দাবিতে। কখনও কখনও মনে হয়েছে, এই শহর যেন আমাকে পরীক্ষা নিচ্ছে। আমি সত্যিই এখানে থাকার যোগ্য কি না, তা যাচাই করছে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই শহরই আবার অদ্ভুত মমতায় আমাকে জড়িয়ে ধরেছে!

এক শীতের বাদামি দুপুরে মানমন্দিরে ডোম রাজা প্রয়াত জগদীশ চৌধুরীজির বাড়িতে শুটিং শেষ হওয়ার পরে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি থাকব না। এই ফিল্মটা থেকে যাবে।’

সেদিন কথাটাকে সাধারণ মন্তব্য বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর পরে, ২০১৯ সালে, যখন তাঁর মৃত্যুর খবর শুনলাম, তখন সেই বাক্যটি কানে ফিরে এল। মনে হল, মানুষ অনেক সময় নিজের অজান্তেই নিজের এপিটাফ লিখে রেখে যায়।

আমার তথ্যচিত্র নির্মাণের পদ্ধতি নিয়েও কম বিদ্রুপ শুনতে হয়নি। বহু ফিল্ম স্কুল-শিক্ষিত মানুষ বারবার বলেছেন, এভাবে তথ্যচিত্র তৈরি হয় না। তাঁদের মতে, আগে থেকে চিত্রনাট্য লিখতে হয়। দৃশ্যের পর দৃশ্য সাজিয়ে রাখতে হয়। কাঠামো স্থির করতে হয়। এমনকী অনেক সময় উত্তরটাও আগে থেকে জেনে নিতে হয়। যেন তথ্যচিত্র নয়, অঙ্কের খাতা– দুই আর দুই মিলে চার হবেই।

কিন্তু আমার কাছে তথ্যচিত্র কখনও উত্তর দেওয়ার শিল্প ছিল না। বরং উত্তর হারিয়ে ফেলার শিল্প। একটি প্রাথমিক খসড়া, একটি অস্পষ্ট মানচিত্র, কিছু দিকনির্দেশ– এসব অবশ্যই থাকে। কিন্তু লোকেশনে পৌঁছে বারবার দেখেছি, জীবনের নিজের আলাদা চিত্রনাট্য আছে। রেকি করতে গিয়ে এমন কিছু মুখ সামনে এসে দাঁড়ায়, এমন কিছু গল্প কানে এসে ফিসফিস করে, এমন কিছু নীরবতা ঘিরে ধরে, যাদের কথা কোনও বাউন্ড স্ক্রিপ্টে লেখা থাকে না। ক্যামেরা তখন আর যন্ত্র থাকে না; হয়ে ওঠে আবিষ্কারের মাধ্যম।

zoom
শুটিং চলছে তথ্যচিত্রের

সেই কারণেই বদ্ধ চিত্রনাট্য আঁকড়ে তথ্যচিত্র নির্মাণকারীদের দেখলে মাঝেমধ্যে একটু কাতুকুতু দিতে ইচ্ছে করে। কারণ জীবন বড় দুষ্টু চিত্রনাট্যকার। আপনি এক গল্পের খোঁজে বেরবেন, আর সে আপনাকে আরেক গল্পের সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে। আপনি একটি চরিত্র খুঁজবেন, আর হঠাৎ একটি শহর আপনার ছবির নায়ক হয়ে উঠবে। আপনি মৃত্যু নিয়ে ছবি করতে যাবেন, অথচ ফিরে আসবেন মানুষের অকারণ মমতা নিয়ে।

আমি কখনও উত্তর খুঁজতে ক্যামেরা হাতে নিইনি। আমি প্রশ্ন খুঁজতে ক্যামেরা হাতে নিয়েছি। একটি মুখ, একটি গন্ধ, একটি শোক, একটি অসমাপ্ত স্মৃতি কিংবা একটি মৃত্যু– অনেক সময় সেখান থেকেই শুরু হয়েছে আমার যাত্রা। অনেক সময় একটিমাত্র বাক্য, একটি চোখের দৃষ্টি বা বাতাসে ভেসে আসা একটি দীর্ঘশ্বাস আমাকে এমন পথে নিয়ে গিয়েছে, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে কয়েক মিনিট আগেও আমার কোনও ধারণা ছিল না।

আজ এত বছর পরে পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি বেনারসে ছবি বানাতে যাইনি। আমি ভেবেছিলাম আমি মৃত্যুকে পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছি। অথচ ধীরে ধীরে বুঝলাম, মৃত্যুই আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে। আমি ভেবেছিলাম ক্যামেরা হাতে নিয়ে শহরটাকে ধারণ করব। অথচ শহরটাই আমাকে নিজের ভিতরে ধারণ করে ফেলেছিল। আজ মনে হয়, আমি বেনারসে কোনও তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে যাইনি। মৃত্যুই আমাকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল।

zoom
প্রাচীন শহর বেনারস

এক শীতের ভোরে, ঘড়িতে তখন ৪টে ৩৭। টানা কয়েকদিন ধরে শুটিং চলছে। দিনে ১৪ ঘণ্টা কাজ করছি। শরীরের ক্লান্তি এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে বাস্তব আর স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন। হোটেলের দরজায় টোকা পড়ল। প্রথমে ভেবেছিলাম হ্যালুসিনেশন। তারপর আবার টোকা। দরজা খুলে দেখি, এক মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। কুয়াশা আর অন্ধকার তাঁর মুখটাকে স্পষ্ট হতে দিচ্ছে না। তিনি ঘরে ঢুকে বসলেন। কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পরে বললেন, ‘আপনি নাস্তিক, আমি জানি।’

আমি অবাক হলাম।

তিনি আবার বললেন, ‘আজ যেভাবে বেনারসে এসেছেন সিনেমা নির্মাণ করতে, জীবনের শেষ দিকে আবার ফিরবেন এখানে। একা। সম্পূর্ণ একা। কে জানে, তখন হয়তো নিজেকেই খুঁজে পাবেন।’

ঘরের ভিতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। তারপর তিনি আরও ধীরে বললেন,

‘মণিকর্ণিকার চিতার ছাই একদিন যখন উড়ে এসে আপনার গায়ে লাগবে, তখন বুঝবেন আপনিও নক্ষত্রের ধুলো। আপনার বাবা যেমন ছিলেন, আপনার দাদা যেমন ছিলেন। আমরা সবাই কোনও অজানা তারার শরীর থেকে এসেছি। কিছুদিন পৃথিবীতে অভিনয় করে আবার ফিরে যাই।’

কথাগুলো শুনে মনে হয়েছিল, বুকের ভিতরে কেউ একটি জীবন্ত সূর্য জ্বালিয়ে দিয়েছে।

আমি তাঁকে প্রশ্ন করতে চেয়েছিলাম।

আপনি কে?

কেন এসেছেন?

আমাকেই বা কেন এসব বলছেন?

কিন্তু প্রশ্নগুলো করার আগেই মানুষটা চলে গেলেন। কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে গেলেন।

তারপর আর কোনওদিন তাঁকে দেখিনি! আজও জানি না, তিনি কে ছিলেন।

সন্ন্যাসী?

পাগল?

নাকি আমার ক্লান্ত মস্তিষ্কের সৃষ্টি?

উত্তর আজও পাইনি।

zoom
‘ডেথ অফ ডেথ’ তথ্যচিত্রের একটি দৃশ্য

সেই সময় অনিশ্চয়তা আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গী ছিল। সে যেন আমার পাশেই শুয়ে থাকত। চারপাশে ঘুরে বেড়াত অগণিত অপূর্ণ ইচ্ছে। নিজেকে বড় গলায় নাস্তিক বলতাম। বলতাম, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মেই এই মহাবিশ্ব চলছে। সৃষ্টিকর্তার দরকার নেই। আমার গুরু স্টিফেন হকিং এই কথা বলেছেন। আর কারও কথা শোনার প্রয়োজন মনে করছি না।

কিন্তু মানুষ বড় অদ্ভুত প্রাণী। মা ফোন করে যখন বলতেন, ‘সোনা, শরীরটা ভালো নেই’, তখন আমার সব দর্শন, সব যুক্তি, সব নাস্তিকতা মুহূর্তে ভেঙে পড়ত।

আমি তখন মনে মনে আমার অদৃশ্য ২৪×৭×৩৬৫ হেল্প-লাইনে ফোন করতাম। বলতাম, ‘ঠাকুর, মাকে ভালো করে দাও। আর কিছু চাই না।’ সেই মুহূর্তে বুঝতাম, বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের মাঝখানে একটি অঞ্চল আছে, যেখানে আমরা সবাই সমান অসহায়।

বেনারস আমাকে আরও একটি জিনিস শিখিয়েছে। মানুষের অকারণ মমতা।

রিকশাচালক ব্যানার্জিদা, যার স্নেহে মায়ের গন্ধ ছিল। শুটিংয়ের সময় ক্যামেরা বাঁচিয়ে রাখা অচেনা মানুষগুলো। ঘাটে দেখা হওয়া নাম-না-জানা মুখগুলো। বারবার বুঝেছি, অচেনা মানুষ অনেক সময় যে গভীরতায় আমাদের গ্রহণ করতে পারে, পরিচিত মানুষও তা পারে না। পরে পরিচয় হয়েছিল ড্যারেনের সঙ্গে। ড্যারেন পভি ইংল্যান্ড থেকে আসা মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক। সংসার ছেড়ে, প্রায় সবকিছু ছেড়ে, তবলা শিখতে চলে এসেছেন বেনারসে। দিনের পর দিন চিতার পাশে বসে থাকেন। তাঁকে দেখলে মনে হত, পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে কেউ এসে মৃত্যুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে!

হয়তো আমিও তাই করেছিলাম। হয়তো হারানোর ভয় থেকে পালাতে পালাতে মৃত্যুর কাছে এসেছিলাম।

হয়তো বার্গম্যানের ‘সেভেন্থ সিল’ সিনেমার সেই নাইটের মতো আমিও মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলছিলাম।

অথবা বোঝার চেষ্টা করছিলাম, জীবন আমাকে এতটা সময় দিল কেন!

zoom
বার্গম্যানের ‘দ্য সেভেন্থ সিল’ সিনেমার বিখ্যাত দৃশ্য

আজও চোখ বন্ধ করলে দেখি, ঘাটের সিঁড়িগুলো অন্ধকারের দিকে নেমে যাচ্ছে। আগুন জ্বলছে। গঙ্গা বয়ে চলেছে সহস্রাব্দের ক্লান্তি নিয়ে। কোথাও দূরে ভোর হচ্ছে। আর আমি, ক্যামেরা কাঁধে, দাঁড়িয়ে আছি দুই জগতের মাঝখানে। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে। বিশ্বাস ও সংশয়ের মাঝখানে। একটি অসমাপ্ত ছবির ভিতরে। মাথার ওপর আবছা ছাইরঙা আকাশ। গঙ্গার দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। দূরে কোথাও আরতির ঘণ্টা বাজছে, আবার তারই কয়েকশো মিটার দূরে আর একটি চিতা জ্বলে উঠেছে। আগুনের রং আর ভোরের আলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত বিপরীত জিনিস এখানে পাশাপাশি বসবাস করে– আলো ও অন্ধকার, জন্ম ও বিলুপ্তি, বিশ্বাস ও সংশয়, কান্না ও মুক্তি।

ঠিক তখনই একটি শব্দ মাথার ভিতরে ঘুরপাক খেতে থাকে।

‘কেন?’

শব্দটি যতবার আসে, ততবার মনে হয়, এর উত্তর আমার জানা নেই। আরও আশ্চর্যের কথা, প্রশ্নটিকে উচ্চারণ করারও অধিকার যেন আমার নেই। কেন জন্ম? কেন বিচ্ছেদ? কেন ভালোবাসা? কেন মৃত্যু? কেন এত অকারণ দেখা হয়ে যাওয়া কিছু মানুষের সঙ্গে, যারা কয়েক মিনিটের জন্য এসে আমাদের জীবন বদলে দিয়ে চলে যায়? মণিকর্ণিকার আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুঝেছি, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো ভাষার নাগালের বাইরেই থেকে যায়। আমরা শুধু তাদের চারপাশে ঘুরি। তাদের নাম দিতে চাই। গল্প বানাই। সিনেমা বানাই। বই লিখি। অথচ প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত প্রশ্নই থেকে যায়।

হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত একটি গলা ভেসে এল।

‘স্যর, শট রেডি।’

আমার চিত্রগ্রাহক দাঁড়িয়ে আছেন ক্যামেরার পাশে। সকালের আলো ঠিক যে রকম দরকার ছিল, সেই রকম হয়েছে। ইউনিটের সবাই অপেক্ষা করছে। আমাকে ফিরে যেতে হবে কাজে। ফিরে যেতে হবে ছবির ভিতরে। আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।

তারপর মনে হল, ফিল্মে ফিরব মানে কী?

এতক্ষণ যা ঘটল, সেটাও কি কোনও ফিল্ম নয়?

এই ঘাট, এই আগুন, এই অচেনা মানুষ, এই ভবিষ্যদ্বাণী, এই ক্লান্তি, এই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল, এই অনন্ত প্রশ্ন– এসবই কি আরেক ধরনের সিনেমা নয়? এমন এক সিনেমা, যার কোনও চিত্রনাট্য নেই, কোনও পরিচালক নেই, কোনও ‘কাট’ নেই। যেখানে আমরা প্রত্যেকেই একসঙ্গে অভিনেতা, দর্শক এবং চরিত্র। ক্যামেরা তখনও অপেক্ষা করছে। গঙ্গা তখনও বয়ে চলেছে। চিতা তখনও জ্বলছে। আর আমার মনে হচ্ছিল, হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ চলচ্চিত্রটির মধ্যেই আমরা সবাই অভিনয় করে চলেছি– জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত।

zoom
যিনি আগুনের ভাষা জানতেন: প্রয়াত ডোম রাজা জগদীশ চৌধুরীর সঙ্গে পরিচালক

ক্যামেরার দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে পড়ল, এই শহরে আমি কত মানুষের মুখ দেখেছি, যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল মাত্র কয়েক মিনিটের। অথচ সেই মানুষগুলোর কেউ কেউ থেকে গিয়েছেন বহু বছরের পরিচিত মানুষের থেকেও বেশি স্পষ্ট হয়ে। বেনারসের এ এক অদ্ভুত ক্ষমতা! এখানে মানুষ আসে মুক্তি খুঁজতে, কিন্তু ফিরে যায় প্রশ্ন নিয়ে। গত এক দশকে মণিকর্ণিকার ঘাট, হরিশচন্দ্র ঘাট কিংবা মুক্তি ভবনের করিডরে অসংখ্য মৃত্যু দেখেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, স্বজন হারিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখেছি মাত্র একজনকে। প্রথমদিকে বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করত। পরে ধীরে ধীরে বুঝতে শিখলাম, এই শহরে মৃত্যু কেবল সমাপ্তি নয়, অনেকের কাছে তা এক যাত্রা। এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পাড়ি দেওয়া।

মুক্তি ভবনে শুটিং করার সময় এক মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছিল। তাঁদের মুখে শোকের ছায়া ছিল না, ছিল এক ধরনের শান্ত গ্রহণযোগ্যতা। তাঁরা বলেছিলেন, ‘উনি আর একটা জগতে ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন। দুঃখ কীসের?’ কথাটা শুনে আমি চুপ করে গিয়েছিলাম। কারণ আমার কাছে মৃত্যু মানে তখনও হারিয়ে যাওয়া, অনুপস্থিতি, শূন্যতা। অথচ তাঁদের কাছে মৃত্যু ছিল যাত্রা, প্রস্থান, স্থান পরিবর্তন মাত্র। সেই মুহূর্তে মনে পড়েছিল পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামার কিছু সম্প্রদায়ের মৃত্যুকে শোকের পাশাপাশি উদযাপনও করা হয়। মনে পড়েছিল মেক্সিকোর ‘ডে অফ দ্য ডেড’-এর কথা, যেখানে মৃতেরা স্মৃতির মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে আবার ফিরে আসেন উৎসবের রঙে। মনে পড়েছিল ইন্দোনেশিয়ার জাভা, সুমাত্রা কিংবা বালির নানা আচার-অনুষ্ঠানের কথা, যেখানে মৃত্যুকে জীবনের বিপরীত হিসেবে নয়, বরং তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়।

আমি ভাবছিলাম, মানুষ কী করে পারে? কীভাবে পারে এত সহজে প্রিয়জনকে বিদায় জানাতে? কীভাবে পারে কান্নার মধ্যেও উৎসব খুঁজে নিতে? আমি পারব না। অন্তত আজও পারিনি। মা অসুস্থ হলে আজও আমার ভিতরের সমস্ত দর্শন, সমস্ত নাস্তিকতা, সমস্ত যুক্তিবাদ মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে পড়ে। আজও প্রিয় মানুষ হারানোর কথা ভাবলে বুকের ভিতর কোথাও একটা অদৃশ্য শূন্যতা জন্ম নেয়। হয়তো সেই কারণেই মৃত্যুকে এত বছর ধরে ক্যামেরাবন্দি করেও আমি তাকে পুরোপুরি চিনতে পারিনি।

কিন্তু এই শহরে অনেকেই আসেন এক অদ্ভুত বিশ্বাস বুকে নিয়ে। তারা মনে করেন, এ শিবের নগরীতে শেষ নিঃশ্বাস ফেলতে পারলে, ডোম রাজার হাতের মোক্ষের আগুনে চিতার কাঠ জ্বলে উঠলে, মৃত্যু আর তাদের স্পর্শ করতে পারবে না। মৃত্যু তখন আর সমাপ্তি নয়, মুক্তি। শেষ নয়, উত্তরণ। যেন মৃত্যুরও একদিন মৃত্যু ঘটে।

zoom
এক আশ্চর্য শহর বেনারস

মণিকর্ণিকার সিঁড়িতে বসে বহুবার ভেবেছি, পৃথিবীর আর কোথাও এমন চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে কি? যেখানে মানুষ মৃত্যুর দিকে ছুটে আসে তাকে পরাজিত করার জন্য। যেখানে চিতার আগুন ভয়ের প্রতীক নয়, বরং মুক্তির দরজা। যেখানে শেষযাত্রার প্রস্তুতি নেওয়া হয় উৎসবের মতো এক প্রশান্ত মুখ নিয়ে।

মনে পড়ে যায়, বার্গম্যানের ‘The Seventh Seal’। দূর থেকে যেন দেখতে পাই, মৃত্যু কালো আলখাল্লা পরে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটে পরিচিত হাসি। সে বলছে, ‘আমার হাত থেকে কেউ পালাতে পারে না।’ তখন নাইট ব্লক মরিয়া হয়ে দাবার ঘুঁটি সাজায়। চাল দেয়। প্রতিরোধ করে। বাঁচতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মৃত্যু ঘুঁটিগুলোকে আবার যথাস্থানে ফিরিয়ে দেয়। খেলাটি জিতে যায়। ঘোষণা করে– পরবর্তী সাক্ষাৎ হবে শেষ সাক্ষাৎ। কিন্তু বেনারসে যেন সম্পূর্ণ উল্টো চিত্রনাট্য।

এখানে মৃত্যু দাবার বোর্ডে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু খেলোয়াড়েরা তাকে ভয় পায় না। বরং তার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসে। বলে, ‘তুমি জিতলেও হারবে। কারণ শরীরকে নিতে পারো, আত্মাকে নয়। ছাইকে নিতে পারো, যাত্রাকে নয়।’

আর সেই সময়েই পাশের ঘাটে শুরু হয়ে যায় সন্ধ্যারতি।

হাজার প্রদীপের আলো বাতাসে দুলতে থাকে। শঙ্খধ্বনি উঠতে থাকে গঙ্গার বুক জুড়ে। আগুনের শিখাগুলো যেন আকাশের দিকে উড়ে যেতে থাকে। একদিকে চিতা জ্বলছে, অন্যদিকে জন্মের জন্য প্রার্থনা করছে মানুষ। রাজস্থানের থর মরুভূমির ধারের কোনও দূর গ্রাম থেকে আসা এক তরুণী দুই হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সে সন্তানের জন্য প্রার্থনা করছে। নতুন জীবনের জন্য। একটি প্রথম কান্নার জন্য।

আর তার থেকে কয়েকশো মিটার দূরে আরেকটি শরীর ধীরে ধীরে আগুনে মিশে যাচ্ছে।

একই ফ্রেমে জন্ম এবং মৃত্যু। একই দৃশ্যে প্রথম শ্বাস এবং শেষ নিঃশ্বাস। একই নদীর ধারে বিদায় আর আগমনের অনুষ্ঠান। সবকিছু এতটাই অবাস্তব লাগে যে কখনও কখনও মনে হয় আমি কোনও শহরে নেই, সালভাদোর দালির আঁকা একটি গলতে থাকা স্বপ্নের ভিতর হাঁটছি। সময় এখানে সরলরেখায় চলে না। জীবন ও মৃত্যু– একে অপরের প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। একটি শিশুর ভবিষ্যৎ আর একটি বৃদ্ধের অন্তিমযাত্রা একই আকাশের নিচে, একই ঘণ্টাধ্বনির মধ্যে, একই আগুনের আলোয় মিলেমিশে যায়।

তখন সত্যিই ভাবি– এই চিত্রনাট্যটা কে লিখছে? কোন পরিচালক এমন দৃশ্য কল্পনা করতে পারেন, যেখানে একদিকে মানুষ মৃত্যুকে হারানোর জন্য আগুনের অপেক্ষায় বসে আছে, আর অন্যদিকে আরেক মানুষ জন্মের জন্য ঈশ্বরের দরজায় কড়া নাড়ছে?

কোন লেখক এমন গল্প লিখতে পারেন? না কি এই মহাবিশ্ব নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় চলচ্চিত্র নির্মাতা?

গঙ্গার দিকে তাকালাম। নদীটি যেন কোনও উত্তর দেয় না, আবার কোনও প্রশ্নও অস্বীকার করে না। হাজার হাজার বছর ধরে সে একইভাবে মৃতদেহ বহন করেছে, প্রার্থনা বহন করেছে, মানুষের কান্না বহন করেছে, আবার মানুষের উৎসবও বহন করেছে। কত রাজা, কত ভিখারি, কত প্রেমিক, কত নাস্তিক, কত সাধু– সবাইকে সমান নির্লিপ্ততায় বয়ে নিয়ে গিয়েছে। গঙ্গার কাছে ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি বলে কিছু নেই। আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাও তার কাছে হয়তো জলের উপর ভেসে ওঠা একটি ক্ষণিক বৃত্ত মাত্র।

zoom
বেনারসে গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যারতি

হঠাৎ মনে হল, আমি যে গল্পটার পিছনে এতদিন ধরে ছুটে বেড়াচ্ছি, সেটা হয়তো মৃত্যুর গল্প নয়। হয়তো সেটা মানুষের ক্ষণস্থায়িত্বের গল্পও নয়। হয়তো সেটা স্মৃতির গল্প। আমরা চলে যাই, কিন্তু কিছু দৃশ্য থেকে যায়। কিছু সংলাপ থেকে যায়। কোনও এক শীতের ভোরে দরজায় কড়া নাড়া এক অচেনা মানুষের কণ্ঠস্বর থেকে যায়। কোনও রিকশাচালকের স্নেহ থেকে যায়। কোনও মৃত মানুষের বলে যাওয়া একটি বাক্য থেকে যায়। সময়ের বিশাল অন্ধকারেও কিছু কিছু মুহূর্ত জোনাকির মতো জ্বলতে থাকে।

হয়তো সেই কারণেই শিল্পের জন্ম। হয়তো সেই কারণেই সিনেমা বানানো। কারণ আমরা জানি, আমরা থাকব না। তবু মরিয়া হয়ে চাই, আমাদের দেখা কিছু আলো, কিছু অন্ধকার, কিছু মানুষের মুখ, কিছু অসমাপ্ত প্রশ্ন সময়ের ভিতরে আরেকটু দীর্ঘকাল বেঁচে থাকুক।

ঠিক তখনই চিত্রগ্রাহক আবার ডাকলেন, ‘স্যর, আলো পালটে যাচ্ছে।’

আমি ক্যামেরার দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু মনে মনে জানতাম, সেই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শটটি হয়তো ইতিমধ্যেই নেওয়া হয়ে গিয়েছে। ক্যামেরায় নয়। কোথাও আরও গভীরে। স্মৃতির অন্ধকার নেগেটিভে, যেখানে আজও আগুন জ্বলছে, গঙ্গা বয়ে চলেছে, আর এক অচেনা মানুষ কুয়াশার ভিতর থেকে এসে আমাকে বলে যাচ্ছে– মৃত্যু শেষ নয়, হয়তো আরেকটি গল্পের শুরু।

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

………………………

benaras Crematorium Death documentary documentary Film Ganga ganges Indian ascetic Indian culture Ingmar Bergman life manikarnika Philosophy Pyre Rickshaw Saint Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar The Seventh Seal

Share this article on