Robbar

দামু: হারিয়ে পাওয়ার গ্রাম্য রূপকথা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 17, 2026 12:27 pm
  • Updated:August 17, 2026 12:27 pm  

বাংলার গ্রাম-জীবনের চিত্র– কৃষিভিত্তিক বাংলাকে, যে বাংলা চর্চিত হত সবুজ ধানের শীষে জমে এক বিন্দু শিশিরের জন্য। সেই সারল্য ধরা পড়ে গ্রামের প্রতিটি পশুপাখির মধ্য দিয়ে, যে পশুপাখি কোনও আলাদা জীব না– তারা সেই গ্রাম্য জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গল্পের নায়ক দামুর সঙ্গে সেইসব প্রাণের অপূর্ব এক সখ্য চোখে পড়ে। যে সারল্য আজকের নিদারুণ চালাকি আর শঠতার যুগে একেবারে বিরল। বিরল বললেও হয়তো কম বলা হয়, গতির যুগের মেশিনের জাঁতাকলে ফেলে এমনভাবে পিষে দেওয়া হয়েছে আমাদের যে, সেই সারল্যের শেষ বিন্দুটুকু মেশিনের উত্তাপে মিলিয়ে গেছে। সেই সারল্যকেই কি রাজা সেন জিতিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ‘দামু’ ছবিতে?

শুভজিৎ নস্কর

নয়ের দশকে আমরা যারা জন্মেছি, মানে আজকের হিসেব নিকেশে আমরা যারা ‘মিলেনিয়াল’, সে রকম বাঙালির প্রায় প্রত্যেকের সঙ্গেই বোধহয় সদ্যপ্রয়াত পরিচালক রাজা সেনের পরিচয় তার অমর সৃষ্টি ‘দামু’র হাত ধরে। এখনও মনে পড়ে, স্কুল থেকে ফিরে দূরদর্শনের সামনে বসলে যে সিনেমাগুলো বারবার ফিরে ফিরে আসত, ‘দামু’ তাদের অন্যতম।

১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমার ম্যাজিক্যাল হিরো ছিলেন অভিনেতা রঘুবীর যাদব। আজকের ‘পঞ্চায়েত’ খ্যাত রঘুবীর সেদিনের নেহাৎ এক তরুণ। আর সেই তারুণ্যই বোধহয় হাতিয়ার ছিল পরিচালকের। তথাকথিত হিরোইজমের বাক্সকে বাস্তবিকতার মাটিতে নামিয়ে একেবারে ভেঙেচুরে তৈরি করা এক গ্রাম্য ‘ক্যাবলা’ চরিত্র। একেবারে সরল, যে সরলতা আজকের নিদারুণ চালাকি আর শঠতার যুগে একেবারে বিরল। বিরল বললেও হয়তো কম বলা হয়, গতির যুগের মেশিনের জাঁতাকলে ফেলে এমনভাবে পিষে দেওয়া হয়েছে আমাদের যে, সেই সারল্যের শেষ বিন্দুটুকু মেশিনের উত্তাপে মিলিয়ে গেছে।

দামু় তেমনই এক চরিত্র যা আমাদের হারিয়ে যাওয়া নস্টালজিয়া। কিন্তু শুধু নস্টালজিয়ার মোড়কে যদি দামুকে দেখা হয় তাহলে অনেকগুলো আলোচনা আসলে অব্যক্ত থেকে যায়। দামু শুধুমাত্র আমাদের হারিয়ে যাওয়া জীবনের কথা বলে না, বরং এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে আমাদের হারিয়ে যাওয়া প্রাণ-প্রকৃতি এবং তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক– যা আমরা ধারণ করতে পারিনি, বহন করতে পারিনি– সেই ব্যর্থতার কথা বলে।

দামু চরিত্রে রঘুবীর যাদব

একেবারে ছবির মতো, যাকে তাত্ত্বিক ভাষায় বলে ‘Picturesque’– যেমন গ্রাম খুঁজতে আমরা ক্লান্ত শহুরে জীবন ছেড়ে নিরিবিলির খোঁজে মাঝেমধ্যে গাড়ি হাঁকিয়ে এদিক-ওদিক ছুটে মরি আজকাল। তেমনই এক ছায়াসুনিবিড় গ্রামের এক ছোট্ট পরিবারের আশ্রিত এক তরুণ দামু। সকলের আদরের দামু। গোটা মন জুড়ে এতটাই সারল্য তার যে, অচিরেই তাকে ঠকিয়ে নেওয়া যায়। আঁধারের কোণে পয়সা হারিয়ে গেলে সে আলোতে এসে খোঁজে– যদি অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া না যায় সেই ভয়ে।

এই সারল্যের রূপকে আমরা খুঁজে পাই বাংলার গ্রাম-জীবনের চিত্র– কৃষিভিত্তিক বাংলাকে, যে বাংলা চর্চিত হত সবুজ ধানের শীষে জমে এক বিন্দু শিশিরের জন্য। সেই সারল্য ধরা পড়ে গ্রামের প্রতিটি পশুপাখির মধ্য দিয়ে, যে পশুপাখি কোনও আলাদা জীব না– তারা সেই গ্রাম্য জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। গল্পের নায়ক দামুর সঙ্গে সেইসব প্রাণের অপূর্ব এক সখ্য চোখে পড়ে। দামু প্রতিটি পশুপাখির ডাক অবিকল ডাকতে পারে। আজকের নগরকেন্দ্রিক প্রাণহীন এই শহরের বুকে পথ চলতে চলতে যখন কোনও পার্কে কোনও নকল পশুমূর্তি দেখি কিংবা রাস্তার কোণে কোণে হনুমানকে ডাস্টবিন ধরে থাকতে দেখি, তখন দামুর কথা বারবার মনে পড়ে। প্রতিদিন খবরের কাগজের পাতা খুললে যে হারে পশুমৃত্যুর দৃষ্টান্ত তৈরি করে চলেছি আমরা, তাতে কে বেশি ক্যাবলা ‘দামু, না আমরা?’– এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

সত্য বন্দ্যোপাধ্যায় ও রঘুবীর যাদব, দামু ছবির দৃশ্য

লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পঞ্চাননের হাতি’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমার ঘটনাপ্রবাহে আমরা খুঁজে পাই– দামু যে পরিবারে থাকে সেই পরিবারের গৃহকর্তার একমাত্র কন্যা বিবাহের পর মারা যায়। সেই কন্যার একমাত্র কন্যাসন্তান, ছোট্ট রুণকু থাকে তার বাবা ও দাদু-ঠাকুমার সঙ্গে বহু দূরের এক গ্রামে। সেখানে পৌঁছতে পায়ে হেঁটে প্রায় গোটা একবেলা পথ চলতে হয়। রুণকুর চিঠি পেয়ে তার মামারবাড়ির দাদু দামুকে সঙ্গে নিয়ে চললেন রুণকুর বাড়িতে, তাকে কিছুদিনের জন্য তার বাড়িতে এনে রাখবেন বলে। এরকমই নিপাট সরল এক মধুর সম্পর্কের পথ ধরে গল্পের প্রবাহ শুরু হয়।

অনেকখানি পথ হেঁটে তাঁরা দু’জন অর্থাৎ দামু ও তার গৃহকর্তা পৌঁছন সেই গন্তব্যে। পেছনে ফেলে আসেন সুজলা সুফলা বাংলার চিত্র। কথা ছিল দামু ও তার গৃহকর্তা সেই রাতটি সেখানেই কাটাবেন। রাতের সে দৃশ্য আজও চোখে ভাসে। ছাদে বসে তার রুণকু দিদিমণিকে কতরকমের গল্প শোনাচ্ছে দামু। সে গল্পে বারবার উঠে আসছে এই বাংলার পাখিদের কথা, পশুদের কথা– যে কথা একদিন আমাদেরও গল্পকথার অংশ ছিল। যে কথা শুনে হয়তো আমাদেরও চোখ জুড়ে রাতের ঘুম নেমে আসত একদিন। যে কথাগুলো আজ আমরা শুধু হারিয়েছি বললেও কম বলা হয়, সেসব গল্পকথার অংশ যেমন আমাদের সাহিত্য থেকে দূরে গেছে তেমন হারাতে বসেছে অভিধান থেকেও।

দামু আর রুণকু দিদিমণি

চলচ্চিত্রে দেখতে পাই, সে রাতের আড্ডায় রুণকুকে গান শোনায় দামু। গানের কথাগুলি ছিল এরকম–

‘গাছগাছালির সঙ্গে যদি চলত কথা
ভারি মজা হত
ফুলটা ফোটার আগেই তোমায় বলে দিত
কোন ডালেতে কেমন রঙে ফুটবে…’

জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের সুরে, ওঁরই কণ্ঠে এই গান আমাদের হারিয়ে ফেলা সেই সম্পর্কগুলোর স্বাক্ষী। এই গানের প্রতিটি ছন্দে যখন দামু নেচে ওঠে আর সেই দেখে শিশু রুণকু যেভাবে সাড়া দেয়– তা প্রমাণ করে এককালে এই সম্পর্কের মূল্যবোধ এক প্রজন্ম থেকে পরের প্রজন্মে কীভাবে সঞ্চারিত হত। এক গবেষণা বলছে, এই সঞ্চারন আর হয় না আমাদের মধ্যে– যার ফল হল আমাদের উন্নাসিকতা। রাজা সেনের দামু আসলে সেই গ্রাম্য জীবনের কথা বলে, যা আমরা কোনওদিনই ধরে রাখতে চাইনি। আমাদের সীমাহীন লোভ আর ঔপনিবেশিক শিক্ষা তাকে ধরে রাখতে শেখায়নি।

সদ্যপ্রয়াত পরিচালক রাজা সেন

সে রাতের আড্ডায় শিশু রুণকুর মন ভোলাতে দামু বলে বসে তাকে হাতির পিঠে চড়িয়ে দাদুর বাড়ি নিয়ে যাবে, আর সেখানেই ঘটে বিপত্তি। পরের দিন বাড়ি যাওয়ার পথে রুণকু দিদিমণির জেদ সে হাতির পিঠে চড়েই যাবে। আর ঘটনাক্রমে দামুর মাথাতেও জেদ চাপে সেও হাতিতে করেই তার রুণকু দিদিমণিকে নিয়ে যাবে– কথা যখন সে দিয়ে ফেলেছে, কথা রাখবেই।

সিনেমার গল্পতে আমরা খুঁজে পাব কীভাবে হাজার বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে দামু সেই হাতির সন্ধান পাবে এক সার্কাস কোম্পানিতে এবং তাকে নিয়েও আসবে রুণকুর কাছে। গোটা গল্পটা সেই সরল দামুর প্রতি মুহূর্তের লড়াইয়ের গল্প। সে লড়াইয়ে সে কখনও তারই মতো সরল কোনও বন্ধু পাবে, আবার পাবে এক দারোগাকে যে তার এই ‘পাগলামি’ ওষুধ দিয়ে সারানোর চেষ্টা করবে। হয়তো এভাবেই রাষ্ট্রের কাঠামো আমাদের সরলতার ডালপালাকে ‘পাগলামি’র নাম দিয়ে ছেঁটে ফেলতে চায় প্রতিদিন!

মিলে গেল হাতি কী বাহারে

সে লড়াইয়ে দামুর সাথে দ্বন্দ্ব বাধবে কখনও কোনও কুটিল চোরের, তো কখনও কোনও ডাকাতের। জুটবে মার। চলবে তামাশা। কিন্তু দামু থামবে না। হাতি কিন্তু সে শেষমেশ জোগাড় করবেই। হাতি পাওয়ার আনন্দে দামু যখন গেয়ে উঠবে– ‘দেখো রে, দেখো রে, আহা দেখো রে/ মিলে গেল হাতি কী বাহারে’, তখন দামুকে নিয়ে যারা এতদিন ঠাট্টা করে এসেছে, তারাই কুর্নিশ জানাতে এগিয়ে আসবে। দামু তখন বলে উঠবে– 

‘দুনিয়ায় সব মেলে, সব মেলে
হাতি মেলে, চাঁদ মেলে, সব মেলে’

এই কথা দামুর মুখ দিয়ে বলিয়ে পরিচালক রাজা সেন বোধহয় শুধু ওই চরিত্রগুলোকে নয়, এই সমাজের ভেঙে পড়া, ন্যুব্জ হয়ে থাকা মেরুদণ্ড নিয়ে চলা আমাদের উদ্দেশে বলেন। যা হারিয়ে এসেছি তাকে আবার বোধহয় ফিরে পাওয়ার চেষ্টা শুরু করতেই হবে। সে দিন আসন্ন। সেই গল্পকথার নটেগাছকে মুড়োতে দেওয়া যাবে না। ওদের বাঁচতে দিতে হবে।

সকলকে নিয়ে চলার কথাই তো দামু এভাবে বলে যায়।