


আমাদের প্রত্যেকের ভেতর লুকিয়ে আছে একজন ‘নধর’। আর আমাদের প্রান্তিকতাকে লক্ষ্য করে সমাজ ছুড়ে দেয় মানসিক ও শারীরিক ভায়োলেন্স। সময়মতো বিয়ে করতে না-পেরে, সময় মতো রোজগার না-করতে পেরে, সমাজ ও সময়োপযোগী ‘মরদ’ না-হতে পেরে রোজ নধরদের মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে। ছবিতে নধর লড়ে যায় শেষ অবধি। তাই ভায়োলেন্স বাড়ে।
এক গামলা পপকর্ন, দু’মগ কফি কোলা আর খানিক সিনেমা– এই অভ্যেসকে ভেলায় ভাসিয়ে তবেই নধরের মুখোমুখি হওয়া সম্ভব। যোগেশ মাইম সেন্টার অডিটোরিয়ামের আলোগুলো নেভার পরবর্তী তিন ঘণ্টা দু’মিনিট ‘নধরের ভেলা’ দেখতে দেখতে নিজের অগোচরেই আমার জীবনের গতি খানিক কমে এসেছিল। তার প্রথম আভাস পাই ইন্টারভ্যালে। তারপর আবার ছবি শেষ হলে। এই তিন ঘণ্টা সময়ে পরিচালক প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য তাঁর নির্মাণের মুনশিয়ানায় আমাকে পরিচিত ফিজিক্যাল স্টেট ও ডাইমেনশনের বাইরে এমন এক পৃথিবীতে পৌঁছে দেন, হলের সিটে বসে মনে হয়– I am ‘Comfortably Numb’।
ছবির ট্রেলার যাঁরা দেখেছেন, জানবেন, ‘নধর’ নামের এক প্রায় গতিহীন মানুষের জীবনের আশপাশে দানা বেঁধেছে এ-ছবির গল্প। নধরের প্রায় গতিহীনতা একমাত্র শ্লথ প্রজাতির প্রাণীর সঙ্গেই তুলনা করা যায়। এই গতিহীনতা নধরকে প্রগতিশীল মানুষের ভিড়ে অচল, নিষ্কর্মা, অকেজো, বেকার করে দেয়। এই স্বভাব অস্বাভাবিক এবং আমাদের কাছে অপরিচিত। বিজ্ঞানের ভাষায় এই বিশেষ অবস্থাকে ‘ব্রাডিকাইনেশিয়া’ বলা হয়েছে। আসি ছবির কথায়।

চিত্রনাট্য লেখার ক্ষেত্রে প্রোটাগনিস্টের অ্যাকশন গল্পের নিয়তি ঠিক করে দেবে– এই থিওরিকে ১০ গোল দিয়েছেন চিত্রনাট্যকার। কারণ, নধরের ফিজিক্যালিটি তাকে আজন্ম অ্যাকশন নিতে দেয় না। অথবা ওর একটি কার্য সম্পন্ন করতে যে-পরিমাণ সময় লাগে, ততটা সময় কারওর হাতেই থাকে না, ফলে নধর অকেজো হয়ে যায়। নিউটনের ক্রিয়ার ওপর বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ার তত্ত্বও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়ায়। বাপ-মা হারা নধরকে গ্রামের পরোপকারী প্রতিবেশীরা বিক্রি করে দেয় সার্কাসে। সার্কাসের রগচটা মালিক হারু, হারুর ডিপ্রেশনে ভোগা, অত্যাচারিত, লাঞ্ছিত, উপেক্ষিত, প্রায় ভূত হয়ে যাওয়া বউ, কিছু কর্মচারী আর দু’টি নারী চরিত্র– শ্যামা ও রূপা। ওদের হারু নিজের ইচ্ছেমতো ব্যবহার করে, ভোগ করে আবার বাজারে বিক্রিও করে। ছবির শুরুতেই মরা মা-কে বাদ দিলে, নধর গোটা ছবিতে শ্যামা ও রূপা– এই দুই নারী চরিত্রের কাছাকাছি আসে।
মনে পড়ে যায়, ‘মেরা নাম জোকার’-এর কথা। সেখানেও প্রোটাগনিস্ট রাজুর জীবনের তিন নারী এবং একটি সার্কাস নিয়েই গল্প আবর্তিত হয়েছে। তবে নধরের সঙ্গে ‘মেরা নাম জোকার’-এর মারাত্মক তফাত রয়েছে। ‘মেরা নাম জোকার’ ছবিতে রাজু চরিত্রটি বারবার সোশাল সার্কাসে গা ভাসাতে চেয়েছে, প্রেম চেয়েছে, উদ্যাপন চেয়েছে। এবং সবথেকে বড় ব্যাপার– তার মা ছবিতে অসুস্থ, কিন্তু জীবিত থাকছেন। রাজু মাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে। এখানে অধরের মা আচমকাই শেষ হয়ে যায়। ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই আমরা জানতে পারি নধরের বাবা সার্কাসে খেলা দেখাতেন। ট্র্যাপিজের খেলা। এখানেও একটা মিল রাজুর সঙ্গে নধরের। তবে কি পরিচালক ‘মেরা নাম জোকার’-কে হোমাজ দিতে চেয়েছেন?

মা মরলে নধরের কিছুই করার থাকে না। সে নিজের মায়ের চিতায় আগুনটুকু দিতে পারবে কি না, এই নিয়ে সন্দেহ জন্ম নেয় আমাদের মনে। কারণ, আমরা বুঝে গিয়েছি হিসি পেলে নধরের বাথরুম অবধি পৌঁছতে যে-পরিমাণ সময় নষ্ট হয়, তা নিয়ে ওর লিঙ্গের স্ফিংটার পেশিরাও বিরক্ত। তারা হিসি লিক করিয়ে নিজেদের অবজেকশন প্রকাশ করে বারবার। মায়ের মৃত্যুর পরও নধরকে গ্রামের লোকজন টেনে-হিঁচড়ে ভ্যানে চাপিয়ে শ্মশানে নিয়ে আসে। ঠেলে গুঁতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। নধরের ভিতরের যন্ত্রণা চোখের জল হয়ে গাল ভেজায় না। সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে মরা পৃথিবীর দিকে। নধর নিজেকে ‘উইথ ড্র’ করে নেয়। আরও গুটিয়ে আসতে চায়। সে সময়ের স্রোতে গা ভাসাতে চায় না। বরং, সার্কাসে দেখা ‘মনসার পালা’-য় ভেলায় শোয়া লখিন্দরের লাশের সঙ্গে একাত্মবোধ করে। তার একমাত্র ইচ্ছে সে ভেলায় ভেসে যাবে।
এখানে মনে পড়ে যাবে নবারুণ ভট্টাচার্যর লেখা ‘মসোলিয়াম-এ লেখা সামাজিক মমিফিকেশন-এর কথা। আজ থেকে বছর ২০-২৫ আগে হলেও নধরের এই শ্লথতা, এই নিজেকে তুলে নেওয়ার প্রবণতাকে হয়তো ক্ষমা ঘেন্না করে দেওয়া যেত। বর্তমানের ডিজিটাল ইন্ডিয়ায় বাজারজাতকরণের যুগে তা একেবারেই দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে নধরের আশপাশের মানুষ তাকে নিয়ে ক্ষুব্ধ। যে সোশাল সার্কাস বাঘ, সিংহ, হাতি– প্রত্যেককেই পায়ে ঘুঙুর পড়িয়ে নাচায়, সে নধরকে কোনওভাবেই এই উল্লাসের উৎসবে ভাসিয়ে দিতে পারে না। খাঁচাবন্দি পশুদের থেকেও হিংস্র হয়ে ওঠে সার্কাস মালিক হারু। সে নধরকে মাত্র ক’টা টাকায় সার্কাসের প্রোডাক্ট করে নিয়েছে। হারু জাত বানিয়া। সে ব্যবসা বোঝে। সে জানে, বাজারে ‘পারফেক্ট প্রোডাক্ট’ বলে কিচ্ছুটি হয় না। সব প্রোডাক্টেই ভেজাল আছে। শুধু বুঝতে হবে, প্রোডাক্ট-টি ‘মার্কেটেবল’ কি না। এক্ষেত্রে হারুর ‘বানিয়ে কা দিমাগ’ নধরের গতিহীনতাকেই পণ্য করতে চায়। কিন্তু সেই অ্যালগোরিদম ফেল করিয়ে দেয় নধর। শুরু হয় পাশবিক অত্যাচার। নধর তো জ্যান্ত লাশ। সে নিউটনকে মানবে কেন? কেঁপে ওঠে হারু। তীব্রতর হয় আঘাত। আমার মনে পড়ে সুকুমার রায়, ‘সেই সাপ জ্যান্ত/ গোটা দুই আন তো/ তেড়ে মেরে ডান্ডা/ করে দিই ঠান্ডা!’ তবে এখানে মনে রাখতে হবে, ঠান্ডা নয়, পিটিয়ে গরম করতে চাইছে হারু। ইঞ্জিন গরম না-থাকলে বাজার চলবে না।

মনে পড়ে যায়, আর্টিস্ট ‘মারিনা আব্রামোভিচ’-এর দুঃসাহসিক ‘রিদম ও’ পারফরম্যান্সটির কথা। তিনি ছ’ঘণ্টা ধরে নিশ্চল থাকবেন। এবং উপস্থিত দর্শকরা মঞ্চে রাখা বাহাত্তর রকমের আইটেম থেকে যা কিছু নিয়ে মারিনার সঙ্গে যা ইচ্ছে তাই করতে পারবেন। সেই বাহাত্তর রকম আইটেমে গোলাপ ফুল থেকে, ছুরি, কাঁচি, বন্দুক– সবই মজুত ছিল। পারফরম্যান্সটির পরিণতি ও ভয়াবহতা নিয়ে এখন কথা বাড়াচ্ছি না। নধর আপনাদের চোখে আঙুল দিয়ে তা দেখিয়ে দেবে। নধরের শরীরে নেমে আসা প্রত্যেক আঘাত মনে করিয়ে দিচ্ছিল, প্রত্যেক দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠা আর বাবার ছুড়ে দেওয়া বেদবাক্য, ‘২৫ বছর অবধি খাওয়াব। তারপর চাকরি না-জোটাতে পারলে লাথি মেরে বের করে দেব।’ অবশ্যই আমার বাবা আমাকে ‘মরদ’ বানাতে চেয়েছিলেন। খেয়াল করে দেখবেন, আমরা এভাবেই মাঝেমধ্যে আশপাশের মানুষদের মরদ বানাতে চেগে উঠি। ধরুন, কারও সঙ্গে খেতে বসেছেন। আপনার সহপাঠী অঙ্কটা বুঝতে পারছে না। আপনার বা সিস্টেমের নির্ধারিত সময়ের থেকে বেশি সময় নিচ্ছে। আপনি বলবেন, স্ক্রু ঢিলে না কি? শিক্ষক বলবে, ‘মাথামোটা। বাবাকে বলো দোকান খুলে দিতে।’ ছোট থেকে আমাদের শেখানো হবে, ‘আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ’। ফলে যে একটু বেশি বেলায় বিছানা ছাড়ে, সে ক্রিমিনাল। যে দিনে ঘুময় রাতে জাগে, সে সমাজদ্রোহী। এছাড়া ধরুন, আপনাকে ওমুক সময়ের মধ্যে এত পরিমাণ টাকা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স রাখতেই হবে। অমুক বয়সের মধ্যে বিয়ে করতে হবে। নইলে আপনি ভিতু শামুক! সমাজের তৈরি করে দেওয়া এই বাঁধা সময়ে গাধা সাজার সিস্টেমকে আমরা বিজ্ঞানের ভাষায় বলব, ‘ক্রোনোনরম্যাটিভিটি’। সামাজিক প্রত্যাশা আর প্রাতিষ্ঠানিক চাপের দ্বারা নির্মিত সমসত্ত্ব জীবনপ্রণালী।

একটু ভেবে দেখলে, আমরা প্রত্যেকেই জীবনের কোনও-না-কোনও প্রান্তে এসে এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হই, ডেডলাইন মিস করি, বুঝতে পারি, আমাদের প্রত্যেকের ভেতর লুকিয়ে আছে একজন ‘নধর’। আর আমাদের প্রান্তিকতাকে লক্ষ্য করে সমাজ ছুড়ে দেয় মানসিক ও শারীরিক ভায়োলেন্স। সময়মতো বিয়ে করতে না-পেরে, সময় মতো রোজগার না-করতে পেরে, সমাজ ও সময়োপযোগী ‘মরদ’ না-হতে পেরে রোজ নধরদের মৃত্যু ঘটে নিঃশব্দে। ছবিতে নধর লড়ে যায় শেষ অবধি। তাই ভায়োলেন্স বাড়ে।
‘নধরের ভেলা’ প্রদীপ্ত ভট্টাচার্যর সবথেকে ভায়োলেন্ট ছবি। তবে ভায়োলেন্সের উদযাপন বা বিজ্ঞাপন নয়। ভায়োলেন্সের শেকড়ে পৌঁছে যান নির্মাতা কলম ও লেন্সের মেলবন্ধনে। আমরা বুঝতে পারি, নধরের প্রতি এই সামাজিক ভায়োলেন্সের আসল কারণ ‘ভয়’! এক্ষেত্রে নৈতিকতার অবনমনকে আমি কারণ হিসেবে ভাবছি না। আমার মনে হয়, আমরা অনৈতিকতাকে জাপটে ধরে ভালোবাসতে শিখে গিয়েছি। আমাদের বেঁচে থাকা পরজীবিতার পরাকাষ্ঠা হয়ে উঠেছে। তার আভাস বহুদিন আগেই পেয়েছিলাম মতি নন্দীর ছোটগল্পে। হিন্দিতে ‘বাজিগর’ বা ‘ডর’-এর মতো ছবিতে আমরা এই অনৈতিকতার উদযাপন দেখেছি। বাংলায় সম্ভবত ‘অটোগ্রাফ’ ছবিতে প্রথম কোনও প্রোটাগনিস্ট এই অনৈতিকতাকে আঁকড়ে ধরে বাজারে গা ভাসাতে চেয়েছিল। গত কয়েক বছরে বং জুন হো বা পার্ক চ্যান উকের ছবির নিয়মিত উপজীব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সেসব। সদ্য মুক্তি পেয়েছে নেটফ্লিক্স-এ ‘বিফ’-এর সেকেন্ড সিজন। অতএব, অনৈতিকতা আমাদের নিউ নর্মাল-নৈতিকতা। নধরের জগতেও সার্কাসের কর্মচারীরা একে-অপরকে যেভাবে শুষে নিয়ে বেঁচে থাকে, বিশেষ করে শ্যামা, রূপা ও রহমানের গল্পের বৃত্তে তা সুস্পষ্ট।
হারুর ভায়োলেন্সের সোর্স আসলে ভয়। নধরের নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া বাজারের মালিকদের বুকে ভয় ধরায়। কারণ বিকিকিনির আসর ততক্ষণ, যতক্ষণ আপনি আমি খরিদ্দার। ওরা আমাদের মুক্ত জল-আলো-বাতাস-মাটি রাংতামুড়ে আমাদের কাছে বিক্রি করবে। আমরা কিনে যাব। পণ্যের ভিড়ে আমরা বিপন্ন হব। আমাদের পকেটে টাকা থাকবে না। থাকবে সিবিল স্কোর। যে শিশু ভূমিষ্ঠ হচ্ছে আজ, তার জন্য রাখা থাকবে ঋণের বোঝা। খোলা মাঠে নয়, নদীর ধারে বা পাহাড়ের বুকে নয়, ফ্ল্যাটের কফিনে মাথা গুঁজে মরে যাব আমরা। তবে, এই বিষাক্ত ফরম্যাট ভেঙে যেতে পারে, যদি আপনাকে আমাকে গ্রাস করে নধরের ‘গতিহীনতা’। যদি আমরা নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে পারি এই অসভ্যতার পণ্যভূমি থেকে, অভ্যস্ত হতে পারি পরিমিত ও সংযত জীবনে। এবং এখানেই হোমাজ নয়, বরং ‘মেরা নাম জোকার’-এর থিসিসের উল্টোদিকে তীব্র অ্যান্টি-থিসিস হয়ে দাঁড়ায় ‘নধরের ভেলা’। নধর জোকার সাজে না, মুখোশগুলো খুলে বের করে আনে সোশাল সার্কাসের ভিতরে লুকিয়ে থাকা শূন্যতাকে। শেষে নধরের প্রতিক্রিয়াহীনতাই কনজুমারিজমের ভিত ভেঙে ফেলার শক্তি জোগায়। নধর প্যান্টে হিসি করে না, হিসি করে আমাদের সিস্টেমে।

নধরের চরিত্রে, অমিত সাহা আবারও অবাক করলেন। ছবি-জুড়ে এই গতিহীনতাকে মস্তিষ্কে, পেশিতে ধরে রেখেছেন। নধরের ভিতরে জমে থাকা পোটেনশিয়াল এনার্জির যথাযথ ব্যবহার করেছেন। ঋত্বিক চক্রবর্তী আমাদের বারবার চমকে দেন। প্রতিবার অভিনয়ে নতুন কিছু নিয়ে হাজির হন। এবারেও ‘হারু’-র চরিত্র স্ক্রিনে ফিরে আসলেই শরীরে জ্বালা ধরছিল। ভেতরের পাশবিক চেহারা কতটা কদর্য হতে পারে হারুর মধ্য দিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম। প্রিয়াঙ্কা সরকার এবং শতাক্ষী নন্দীর শ্যামা ও রূপা আপনাদের হাসাবে আর লাথাবে। সঙ্গে থাকবেন শায়ন রহমানের চরিত্রে। আমার দেখা প্রিয়াঙ্কা সরকার অভিনীত কঠিনতম চরিত্র ‘শ্যামা’। শ্যামা ও নধরের সম্পর্ককে ভিত করে প্রদীপ্তদা সেক্সুয়ালিটি, সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স নিয়ে যে বিশ্লেষণ করেছেন ছবিতে, তা নিয়ে একটা গোটা অধ্যায় লেখা হয়ে যেতে পারে।
হারুর বউয়ের নির্বাক চরিত্রে অবাক করে দিয়েছেন, অপরাজিতা ঘোষ দাস। একমাত্র হারুর বউ, নধরের সঙ্গে সবথেকে বেশি একাত্মবোধ করে গোটা ছবিতে। নধর যেমন ভেলায় ভাসা লখিন্দরের মধ্যে নিজেকে দেখে, তেমনই। নধরের উপর ঘটে চলা ফিজিকাল, মেন্টাল, সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স আমাদের চোখের সামনে ঘটছে। হারুর বউয়ের যাবতীয় যন্ত্রণা ধরা দেয় ওর চোখে। আমরা দেখি, যখন সার্কাসের শো চলছে না, অডিয়েন্স খিস্তোচ্ছে, হারুর– স্ত্রীয়ের মুখে তৃপ্তির হাসি।

আমাদের সমাজের যাবতীয় অপদার্থতা, পরিবেশ ও সমাজের ক্রমাগত অবক্ষয়, এই ছবির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। তবে তা কখনই গল্প থেকে বেরিয়ে এসে দেখনদারি হয়ে দাঁড়ায় না। ছবির আবহ এবং সংগীত নির্মাণে সাত্যকী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্বতার ছাপ রেখেছেন। ওঁর সুর আর স্বরে নধরের হাহাকার এখনও কানে লেগে আছে। গানগুলি সামাজিক মাধ্যমে মুক্তি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকলাম। নধর আমাদের মতো নয়। বিঞ্জ-ওয়াচ করতে জানে না। রিল স্ক্রোল করতে জানে না। সে অনেকক্ষণ ধরেই একইভাবে তাকিয়ে থাকে সামনের দৃশ্যপটের দিকে। নধরের এই দর্শনকে ক্যামেরায় অবলীলায় ধরেছেন সিনেমাটোগ্রাফার জয়দীপ দে। প্রতিটি দৃশ্যই এক একটা চিত্রকলা।
খেয়াল করে দেখবেন, শপিং মলে ঢুকলেও টাইম আর স্পেসের খেয়াল থাকে না। বড় বড় স্টোর জানলা রাখে না। ঘড়ি রাখে না। চারদিকে শুধু পণ্য। এর কারণ আপনাকে সাইকোলজিকালি আপনার টাইম স্পেসের রিয়ালিটির বাইরের শুধুমাত্র বাজার সর্বস্ব করে তোলা। পণ্যের ভিড়ে আপনার অস্তিত্ব চুরি হয়ে যাওয়ার জাঁতাকল। এই ছবিতেও, পরিচালক এবং চিত্রগ্রাহকের যুগলবন্দি আমাদের একই টাইম ও স্পেসে অনেকক্ষণ ধরে আটকে রাখেন। আমরা আমাদের যাবতীয় জীবনের ডামাডোল থেকে বিচ্যুত হই। যেমন ধরুন, সার্কাসে ‘মনসার পালা’ অভিনয় হয়। সেই অভিনয় আমাদের এমন ভাবে দেখান পরিচালক, কিছুক্ষণ পর মনে হয় আমিও সেই সার্কাসেরই একটা অংশ হয়ে গিয়েছি। ইচ্ছে করেই এই টাইম ও স্পেসের সঙ্গে একাকীকরণ করেছেন পরিচালক, আমাদের ভিতর ‘নধরেপনা’ জাগিয়ে তোলার জন্য। আপনার অস্তিত্বকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।

শুরু থেকে শেষ পুরোটাই ছকভাঙার প্রকল্প। ছবি জুড়ে যে উল্টোযাপনের রথ নির্মিত হয়, শেষ অবধি তার জয়ধ্বজা অক্ষুণ্ণ থাকে? নাকি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় পুঁজিবাদের বুলডোজার? বোঝার জন্য, ছবির শেষ অবধি দেখে যেতে হবে, একবার নয়, বারবার। এ-ছবি শুধু দেখার নয়, দেখা বোঝা ও ভাবার। সিনেমা শেখার টেক্সটবুক এই কাজটি।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved