basic differences among love sex desire marriage | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এই কামসূত্রের দেশেও গুলিয়ে যায় কামনা-প্রেম-বিয়ে!

পুরুষতান্ত্রিক ঔদ্ধত্যময় বোহেমিয়ান পুরুষ কবি ও লেখকদের মডেল করে যখন আমরা, নব্বই দশকের সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত, বহিরাঙ্গে সদ্যবিশ্বায়িত এক দেশে যৌবনে চোখ মেললাম, আমরা যারা গোঁফ গজানোর কালে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় নামক রোগে আক্রান্ত হলাম– তারা কেবলই যৌনতাকেই প্রেম এবং প্রেমকে যৌনতা ভেবে, অজান্তে শোপেনহাওয়ার কথিত জীবনের ইচ্ছায় ভেসে যৈবনে আসিতেই কবীর সুমনের খপ্পরে পড়লাম– তাদের হয়তো মনে হল মাঝবয়েসই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। এমন গুলিয়ে যাওয়া অবস্থায় আমাদের মধ্য-বিশের যুবকমুখ অনেকবার ‘বয়স্ক এই মুখটা আমার তোমার চুলে ঢাকব চলো’ লিখে এসএমএস পাঠিয়েছি! আর মাঝবয়স আসতেই হাড়ে হাড়ে বুঝলাম, শোপেনহাওয়ার লিখিত সেই বাণী, প্রেমকে শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ের চোখে দেখা উচিত– যেমনটা দেখা/করা হয় কোনও হারিকেন ঝড় বা বাঘকে!

শেষ আপডেট: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ১২:৩৯   
Facebook WhatsApp Messenger

মনে পড়ে যাচ্ছে রুশি কবি মারিনা স্বেতাইয়েভার কথা, যিনি বিবাহিত অবস্থায় একইসঙ্গে কবি ওসিপ মান্দেলস্তাম এবং কবি সোফিয়া পারনোকের সঙ্গে প্রেম চালান অনেকগুলো বছর। সেই বিশ শতকের শুরুর উত্তাল রাশিয়ায় কবি ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি, তাঁর বন্ধুপত্নী লিলিয়া ব্রিকের সঙ্গে থাকতেন একই বাড়িতে। প্রেমের ইতিহাসকারেরা বলছেন, সেটাই পশ্চিমের ইতিহাসে প্রথম ঘোষিত বহুকামী প্রেম। মনে রাখতে হবে, লিলিয়া তাঁর স্বামী ওসিপ ব্রিকের সঙ্গেও রাত কাটাতেন সেই একই বাড়িতে। সেটা ছিল– তাঁদের প্রেম যে কারও ব্যক্তি সম্পত্তি নয়, সেই বিষয়ের পরীক্ষা। একই সময়কালে দেখা যাচ্ছে, লু আন্দ্রেয়াস সালোমে নাম্নী এক রুশি মনঃসমীক্ষক নারীকে। শেষ বয়সের দার্শনিক নিটশে, যুবক কবি রিলকে এবং শেষে সিগমুন্ড ফ্রয়েড সকলেই তাঁর প্রেমে হাবুডুবু। কিছুদিন আগে লু আন্দ্রেয়াস সালোমেকে নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘লু আন্দ্রেয়াস সালোমে মুক্ত থাকার ঔদ্ধত্য’ (‘Lou Andreas-Salomé, The audacity to be free’, 2016) এই মহিয়সী নারীর জীবনকে নিয়ে আমাদের মুখ থেকে ঝরা পুরুষতান্ত্রিক লালা মুছিয়ে দেয়। এর কিছুদিন পরে প্যারি নগর কেঁপে যায় যখন কবি পল এল্যুয়ারের স্ত্রী গালা-কে নিয়ে পালিয়ে যান শিল্পী সালভাদর দালি। দালি এবং পিকাসোর যৌন বিকৃতি নিয়ে অজস্র সন্দর্ভ লেখা হয়েছে। এবং এই সমস্ত ঘটনাই বিশ শতকের প্রথম ৫০ বছরে ঘটে গিয়েছে। 

zoom
ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি ও লিলিয়া ব্রিক

পুরনো ঔপনিবেশিক অভ্যাস অনুযায়ী, আমাদের চোখ পশ্চিমের দিকে থাকে। আগে লেখা সমস্ত ঘটনার প্রভাব বাংলা শিল্পমহলে পড়েছিল। পুরুষতান্ত্রিক ঔদ্ধত্যময় বোহেমিয়ান পুরুষ কবি ও লেখকদের মডেল করে যখন আমরা, নব্বই দশকের সম্পূর্ণ বিভ্রান্ত, বহিরাঙ্গে সদ্যবিশ্বায়িত এক দেশে যৌবনে চোখ মেললাম, আমরা যারা গোঁফ গজানোর কালে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় নামক রোগে আক্রান্ত হলাম– তারা কেবলই যৌনতাকেই প্রেম এবং প্রেমকে যৌনতা ভেবে, অজান্তে শোপেনহাওয়ার কথিত জীবনের ইচ্ছায় ভেসে যৌবনে আসিতেই কবীর সুমনের খপ্পরে পড়লাম– তাদের হয়তো মনে হল, মাঝবয়েসই জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়। এমন গুলিয়ে যাওয়া অবস্থায় আমাদের মধ্য-বিশের যুবকমুখ অনেকবার ‘বয়স্ক এই মুখটা আমার তোমার চুলে ঢাকব চলো’ লিখে এসএমএস পাঠিয়েছি! আর মাঝবয়স আসতেই হাড়ে হাড়ে বুঝলাম, শোপেনহাওয়ার লিখিত সেই বাণী, প্রেমকে শ্রদ্ধামিশ্রিত বিস্ময়ের চোখে দেখা উচিত– যেমনটা দেখা/করা হয় কোনও হারিকেন ঝড় বা বাঘকে! আধা ঔপনিবেশিক, সম্পূর্ণ পুরুষতান্ত্রিক মাথা অনেক পরে আবিষ্কার করবে সন্দীপন আসলে নারীবিদ্বষী। আমার আগে বলা সমস্ত ঘটনাতে আপনি স্পষ্ট দেখতে পাবেন, আমি পুরুষদেরই প্রাধান্য দিয়েছি, লিলিয়া ব্রিক এবং লু আন্দ্রেয়াস সালোমে যে স্বেচ্ছায় নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা কিন্তু আমি আমার পুরুষতান্ত্রিক ঔপনিবেশিক ঝুলনমায়ায় লিখতে পারলাম না। 

এই কথাগুলো আমি লিখলাম, কারণ সেই একই বিভ্রান্ত, অনুন্নয়নের স্মৃতিবাহী মাথা নিয়ে আমি যখন ইউরোপে হাজির হলাম, আমার চারপাশের দুনিয়া এগিয়ে গেছে ১০০ বছর। সেখানে কবি-লেখক-শিল্পী কেউই সামাজিক তারকা নন। আর সবচেয়ে মজার বিষয় হল– যে অনুন্নয়ন আমাদের ‘ছেলেরা সেক্স চায়, মেয়েরা প্রেম’ মার্কা উপপাদ্য পড়িয়েছে, সেটা ভেঙে গিয়েছে সমাজের সর্বস্তরে। আমাদের এত সফল মানুষ ইউরোপে থাকেন, তাঁদের লেখায় কখনও জানতে পারিনি যে, মুষ্টিমেয় কয়েকটি পরিবার ছাড়া মূল ইউরোপে শ্রেণি বিভাজন ভেঙে পড়েছে। এতটাই ভেঙে পড়েছে যে, স্পেনের যুবরাজ প্রেমে পড়েন এক অখ্যাত সাংবাদিকের, সহজে, ডিস্কো-থেকে যেমনটা পড়ে থাকে অন্যান্যরা। 

zoom
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়

এইখানেই আমার কাছে খুলে গেল মুক্ত যৌনতার দেশের চেহারা। আমি থাকতাম একটা মেসবাড়ির মতো ফ্ল্যাটে। সেখানকার বাকি পুরুষেরা প্রতি সপ্তাহান্তে বেরিয়ে পড়ত উদ্দাম নেশা ও ডিস্কোর দুনিয়ায়। তারা প্রত্যেকেই শ্রমিক শ্রেণির মানুষ। সেই ডিস্কোতে নারী-পুরুষ অবারিত। কাউকে কারওর ভালো লাগলে প্রথমে যৌনতা, তারপর, তার বহু পরে আসে একত্রবাসের সিদ্ধান্ত। হয়তো যাঁরা ইংরেজি সিনেমা-সিরিয়াল দেখেন, তাঁরা ব্যাপারটা জানেন। কিন্তু আমার মতো সাধারণের পক্ষে এই উলটপুরাণ বেশ মনে ধরেছিল। আমরা যারা সরস্বতী পুজোর দিন হলুদ শাড়িদের দেখার জন্য উঁকি মারতাম, তারা বুঝিনি সবই (নচিকেতার গানের কথা) হরমোনের খেলা! প্রথমে শরীর, তারপর গভীর মন। নারী, পুরুষ, সমকামী, না-সমকামী, উভকামী, দ্বৈততার ঊর্ধ্বে থাকা মানুষ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদের ঠিক উল্টো। আরও মজা পেলাম, আমার সেই মেসবাড়ির মালিকের ১৭ বছরের কিশোরী কন্যার প্রেমিক এসে থেকে যেত রাতের পর রাত। সামান্য সময়ের জন্য এলেও মেয়ের ঘরের দরজা বন্ধ থাকত সভ্যতার নিয়মে। না, এসব নিয়ে আমাদের সবজান্তা নাগরিক সমাজের কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমাদের দেশে সহস্র কোটি অসুখী দাম্পত্য এবং বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের অ্যাপ গ্লিডেন-এর গগনচুম্বি সাফল্য দেখে মনে হয়, আমাদের বোধহয় একটু অন্যভাবে দেখা দরকার।

কিন্তু আমার আসল চমক অপেক্ষা করেছিল লাতিন আমেরিকায়। ইউরোপ না হয় উন্নত দুনিয়া, আমরা অনুন্নয়নের স্মৃতি, কিন্তু আমাদের সমতুল্য লাতিন আমেরিকায় দেখলাম বিয়ে ব্যাপারটাই প্রায় উঠে গেছে! কেবল সমকামীরা উদ্‌যাপনের জন্য করেন অনেক সময়। এবং তার চেয়েও বড় ব্যাপার আমার প্রজন্মের খুব কম মানুষ নিজের জৈবিক পিতাকে চেনে! বিবাহ নামক সংস্থা যে আসলে পুরুষতন্ত্রেরই নির্মাণ, তা লাতিন আমেরিকার মেয়েরা প্রমাণ করে দিয়েছেন। এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় বিবাহ অভিজাতদের মধ্যে বেঁচে আছে বা আছে কোনও বিশেষ দেশে যাবার ভিসার কারণে! মনে পড়ছে, সান্তো দোমিঙ্গো কবিতা উৎসবের আমাদের কবিবাহী মিনিবাসের চালক এমিলিও-র সঙ্গে সবাই এই বলে মজা করছিল যে, সে প্রাচীন শহরের সাতটা পাড়ায় তাঁর সাতটা সন্তান থাকলেও তাঁর কোনও সঙ্গিনী তাঁকে বিয়ে করেনি! অর্থাৎ, পছন্দটা মেয়েদের।

zoom
দক্ষিণ আমেরিকার রিও ডি জেনেইরো-র কার্নিভাল যেন যৌনতার উদযাপন

এখন এই প্রেমের মাসে, গ্রেট ইন্ডিয়ান মেটিং সিজনে, কোটি মানুষের বিয়ে হচ্ছে, এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা মেয়েটির অনিচ্ছায়, মুখ্যত সামাজিক চাপে। আর অনেক ক্ষেত্রে সামাজিকভাবে অনুমোদিত যৌনতার জন্য। এখানেই সন্দেহ হয় কামসূত্র সত্যি আমাদের দেশে লেখা হয়েছিল? আর কতকাল আমরা কামনা-প্রেম গুলিয়ে ঘুলিয়ে বেঁচে থাকব? 

মনে পড়ে গেল, বিশ শতকের স্পেনীয় ভাষার এক প্রধান কবি আংখেল গিন্দাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তুমি এতবার প্রেমে পড়ো কী করে! আমাদের বাংলা কবিতা জগতের হিসেবে তাঁকে আমার ‘দাদা’ বলা উচিত। কিন্তু সে দেশের রীতি নাম ধরে ডাকা। আর পাকেচক্রে আমি তাঁর দলের একজন, অতএব এই প্রশ্ন যৌন অবদমিত গরিব দেশের অবোধ যুবকের ভেবে তিনি এড়িয়ে গেলেন না। সে সন্ধে বারোটার মাদ্রিদ শহরে বেশ শারদীয় বাতাস। আমরা, মানে আংখেল, আমি আর মিশরের কবি আহমাদ জামানি বসেছি আড্ডায়। আমাদের ওয়াইন পানের তৃতীয় রাউন্ড চলছে। আংখেলের কবি ও প্রেমিক খ্যাতি সে দেশের কবিতা মহলে উজ্জ্বল। বিয়ে করেছেন তিনবার। বিবাহহীন সংসারে থেকেছেন অগুনতিবার। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক দেশে সেসব না হয় পুং-কবির মেডেল হতে পারত, কিন্তু স্পেনে এমন হওয়া কঠিন। পাশ থেকে পিকাসো সামনে থেকে নেরুদা, উচ্চতায় সাড়ে পাঁচ ফুট, ভীষণ ছটফটে, টাকমাথা ষাটোর্ধ্ব যুবক আহত বাঘের মতো মাথা নামিয়ে বলেছিলেন, কেবল নিঃসঙ্গতা থেকে বাঁচতে তিনি প্রেমে পড়েন।

……………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন মিনি সিরিজ-এর অন্যান্য লেখা

……………………

kamasutra Love osip mandelstam Pablo Picasso Salvador Dalí Sandipan Chattopadhya Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar sigmund freud vladimir mayakovsky

Share this article on