

আটের দশক। সে এক লড়াইয়ের সময়, ঘুম ভেঙে জেগে উঠে অন্যকে জাগিয়ে দেওয়ার সময়। কেবল শিল্পরসিক নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ছবি নিয়ে আগ্রহ গড়ে ওঠার সময়। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়েছে শিল্প বিপণনের বীজ, যার চূড়ান্ত ফসল ফলেছে নব্বইয়ের পরবর্তী ধাপে।
আমাদের শিল্পকলায় কি এখন খানিক ভাঁটার টান? আজকের এই শিল্প-চালচিত্রকে কীভাবে দেখতে হবে? যদি একটু পিছনের দিকে চোখ ফেরাতে চাই, কী দেখবো সেখানে? ফেলে আসা সময়ের ফসল কি বাতিলের তালিকায় ঠাই পাবে? না কি সময়ের পলেস্তারা খসিয়ে সে আরও ঝলমলে হয়ে উঠছে? অতি-আধুনিকেরা হয়তো কিঞ্চিৎ নাসাকুঞ্চনের সঙ্গে পুরনোর গায়ে ‘সেকেলে’ তকমা সেঁটে দিতে চাইবেন। পুরাতন তাঁদের কাছে তোরঙ্গে তুলে রাখার জিনিস। তা কি সত্যি? তাহলে কি আলোকিত হয়ে আছে সাম্প্রতিক ছবির পসরা? এ প্রশ্ন সহজ নয়। আবার এও ঠিক, এমন করে প্রবীণ আর নবীনের দ্বন্দ্ব উজিয়ে তোলা কতটা সমীচীন? দ্বন্দ্ব বাধলে এই হার্ডল রেসে সামনের সারিতে এগিয়ে কে? নতুন না পুরাতন? নবীনা না প্রাচীনা? কীভাবে এর বিচার হবে? পূর্বতন শিল্পীদের কাজ প্রাচীনের দলে ফেলে কলমের এক খোঁচায় সরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু শিল্পে সমকালের চিহ্নই কি তার একমাত্র পরিচয়? ‘একটু পিছনের দিকে’ শব্দের বিস্তার কতদূর? কতটা দূর পর্যন্ত পিছু হাঁটবার সীমানা? যদি আশির দশকে গিয়ে থেমে যাই তাহলে সামনে কী ভেসে ওঠে? আশির দশক বলার কারণ হঠাৎ এমন এক ঢেউ উঠেছে– আশির দশক ছুঁয়ে দেখার ঢেউ। না। যদিও এ স্রোত গভীরে প্রবেশ করেনি, কেবল উপর দিয়ে বয়ে চলেছে। অনেকটা দিলীপকুমার রায়ের গানের কলির মতো– ‘আমরা এমনিই এসে ভেসে যাই’ অবস্থা। সেই সুরের নেশা ধরানো গাজনে আশির দশক নিয়ে সবাই মাতাল। সত্যিকার আশির দশক বললে প্রায় বছর চল্লিশেক পিছনে ফিরতে হবে আমাদের। নতুন জেনারেশনের কাছে তা প্রস্তর যুগের সামিল। সেটা স্বাভাবিক, যেখানে গতদিনের স্মৃতির গায়ে ‘প্রাচীন’ লেবেল– সেখানে আশির দশক রীতিমতো অতীত, সুদূর অতীত। কিন্তু কী আছে সেই দৃশ্যময় অতীতে? উপরকার লঘু আস্তরণ সরিয়ে একবার অতীতের গভীরে ডুব দেওয়া যাক। দ্রুত দেখে নিই সেই সময়ের শিল্পের একটা ঝলক।

আশির দশক। কলকাতা শহর তখন টগবগ করছে শিল্পীদের প্রবল উন্মাদনায়। তাঁদের কাজ নিয়ে, বোহেমিয়ান জীবন নিয়ে মাঝেমাঝে বিতর্কের ঝড় বয়ে চলেছে। সেই সময় ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে যাঁরা অন্যতম, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন প্রবীণ শিল্পী চিন্তামণি কর, পরিতোষ সেন, মীরা মুখার্জি, প্রকাশ কর্মকার, রবীন মণ্ডল, বিজন চৌধুরী, সুনীল দাস, বিকাশ ভট্টাচার্য, গণেশ পাইন, শ্যামল দত্তরায়, যোগেন চৌধুরী, ধর্মনারায়ণ দাশগুপ্ত, ওয়াসিম কাপুর, শানু লাহিড়ী, বীণা ভারগব প্রমুখ এক ঝাঁক শিল্পীতারকা। হ্যাঁ, তারকাই বটে– যাঁরা নিজের আলোকে জ্বালিয়ে নিয়েছেন শিল্পের প্রদীপ। এঁদের কাকে বাদ দিয়ে কার কথা বলব! অন্যদিকে কলকাতা থেকে কয়েক ক্রোশ দূরে রবি ঠাকুরের শান্তিনিকেতনে দুর্বার গতিতে কাজ করে চলেছেন আরেকদল শিল্পী। সেখানে রয়েছেন সোমনাথ হোর, কে জি সুব্রহ্মণ্যন, সনৎ কর, সুহাস রায়, শর্বরী রায়চৌধুরী, লালুপ্রসাদ সাহুর মতো শিল্পী। শহরের কোলাহল থেকে দূরে রুক্ষ মাটি আর গাছের নিবিড় ছায়ায় চলেছে তাঁদের শিল্পসাধনা। অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে কলকাতার সমীর মণ্ডল, সুব্রত গাঙ্গুলি, অশোক ভৌমিক, চিত্রভানু মজুমদার প্রমুখের নাম এক লহমায় মনে পড়ে।

আজকের মতো সেদিন এত আর্টগ্যালারি গড়ে ওঠেনি। প্রদর্শনীর জন্যে লেডি রাণু মুখার্জির অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস ছিল অন্যতম জরুরি ক্ষেত্র। এছাড়াও তুলনায় আধুনিক ব্যবস্থার বিড়লা অ্যাকাডেমি। তবুও অধিকাংশ শিল্পীর পছন্দের তালিকায় অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস, সে প্রধানত লোকেশনের জন্যে। মনে পড়ে, অ্যাকাডেমির বার্ষিক প্রদর্শনীর জন্যে নবীন থেকে প্রবীণ সকলে অপেক্ষা করে থাকতেন। সে এক বিশেষ উন্মাদনা। আর শিল্পীর ব্যক্তিগত পরিসরে গেলে দেখব, জীবন বাজি রেখে কাজ করে চলেছেন সকলে।

সোমনাথ হোরের কথাই বলি। দীর্ঘকাল তিনি কলাভবনের ছাপাই ছবি বিভাগের অধ্যাপক, নিয়মিত এচিং, লিথোগ্রাফ, ইনতাগ্লিও ইত্যাদি করতে গিয়ে অ্যাসিডে ধ্বস্ত তাঁর শরীর। ইতিমধ্যে শুরু করেছেন ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য, সেখানেও পরিশ্রম কম নেই। আশির দশকের গোড়ায় ছাপাই ছবির কাজ কমিয়ে দিতে হয়েছে, ছোট করে দিয়েছেন ছবির আকার। তবে কাজের বিরাম নেই, সর্বদা বুঁদ হয়ে আছেন কাজের মধ্যে। এই সময় তিনি কলাভবন থেকে অবসর নিয়ে শান্তিনিকেতনের অভিজাত পল্লি থেকে দূরে সরে গিয়েছেন। ডেরা বেঁধেছেন সাধারণ মানুষজনের ভিড়ে। শারীরিক কারণে ছাপাই ছবি থেকে ঝুঁকেছেন ছোট-ছোট ব্রোঞ্জ ভাস্কর্যের দিকে। ছবির বিষয়েও বদল এসেছে। এসেছে চারপাশের জীবজগৎ, আশেপাশে ঘুরে বেরানো কুকুরছানা, ছাগলের চঞ্চল ভঙ্গি। আর সনৎ করের কাজে এই সময় মাধ্যমের পরিবর্তন এসেছে। ছাপাই ছবি থেকে ঝুঁকেছেন জলরঙের দিকে, নাম লিখিয়েছেন টেম্পেরা ছবির দরবারে। এই পর্বে তাঁর ‘ঝরা পাতা’ সিরিজের ছবি মনে রাখার মতো। যে কাজ শান্তিনিকেতনের বাসিন্দা না-হলে তিনি করতেন কি না সন্দেহ। শীতের হাওয়ায় মাটিতে ঝরে পড়া পাতা হয়ে উঠেছে তাঁর ছবির বিষয়। পাতার দুমড়ে যাওয়া আকারের মধ্যে ফুটে উঠছে মানুষের বেদনাহত মুখমণ্ডল। সারা পট জুড়ে আর কিছু নেই, কেবল শুকনো বাদামি পাতা তার বিদায়বার্তা জানিয়ে যাচ্ছে। এ তো ছবি নয়, এ যে কবিতা।

পাশাপাশি লালুপ্রসাদের স্টুডিওতে উঁকি দিলে দেখা যাবে, আশির দশকে তিনি শুরু করেছেন ‘বাবুবিবি’ সিরিজ। কালীঘাট পটচিত্রের এ এক নতুন রূপান্তর। উনিশ শতকের বাবুবিবিরা সার বেঁধে নেমে এসেছে চিত্রপটে। কখনও মনে হবে, সময় যেন কার ইশারায় থমকে দাঁড়িয়ে। অন্যদিকে কাকের সিরিজ ছাড়িয়ে সুহাস রায় এগিয়ে চলেছেন তাঁর ‘রাধা’ সিরিজের দিকে। সেও এক দীর্ঘ পরিক্রমা।

তবে শান্তিনিকেতনের পটভূমিতে আশির দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হচ্ছে বরোদা থেকে কে জি সুব্রহ্মণ্যনের কলাভবনে যোগদান। অনায়াস আন্তরিক সহজ সম্পর্কে তিনি মুহূর্তে হয়ে উঠেছেন আশ্রমের একান্ত আপনজন, সকলের ‘মানিদা’। তাঁর আগমনে বদলে গিয়েছে কলাভবনের আবহাওয়া, শিক্ষক ছাত্রদের মনে উৎসাহের ঝড় বইয়ে দিয়েছেন। ১৯৮০-র ‘নন্দন মেলা’য় সেবারে তিনি শিখিয়ে দিলেন গ্লাস পেইন্টিং– যা ‘রিভার্স পেইন্টিং’ বলে খ্যাত। একাধিক কাজ নিজে করলেন আর ছাত্রদের দিয়ে করালেন। সরা আঁকলেন অনেকগুলো। সেবার ‘নন্দন মেলা’য় ক্রেতার ভিড় উপচে পড়ল। ‘মানিদা’র কাজ নিয়ে প্রবল কাড়াকাড়ি। কলাভবনের অধ্যাপক হিসেবে যোগেন চৌধুরী এসেছেন আরও কয়েক বছর পরে, সম্ভবত ১৯৮৬ সালে। দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে তাঁকে আনানোর পিছনে ‘মানিদা’র ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শান্তিনিকেতনের মাটিতে এসে যোগেন চৌধুরীর ছবিরও কিছু পরিবর্তন ঘটে গেল। কলমের ক্রিসক্রস লাইনের সঙ্গে ক্যানভাসে দেখা দিল ক্যালিগ্রাফির জোরালো আঁচড়। ক্রমে যা হয়ে উঠেছে শিল্পীর আজীবনের সঙ্গী। তাই আশির দশক শান্তিনিকেতনের শিল্পীদের কাছে অনেকটা বসন্তের উতলা হাওয়ার মতো। সেই বসন্তে ঋতুরাজ হিসেবে দেখা দিয়েছেন শিল্পী কে জি সুব্রহ্মণ্যন। সংক্ষেপে এই হল আশির দশকে শান্তিনিকেতনের শিল্পপট।

ওদিকে কলকাতার দিকে তাকানো যাক। আশির দশকে বিকাশ ভট্টাচার্যের ক্যানভাস ভরে উঠেছে ‘দুর্গা’ সিরিজের ছবিতে। দল বেঁধে মণ্ডপে গিয়ে সিঁদুর খেলার ছবি, আবার কখনও ছাদের আলসের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা নারীর কপালে ত্রিনয়ন জানিয়ে দেয়– এই মেয়ে নিজেই তো দুর্গা। কোথাও বা দশমীতে প্রতিমার বিদায়বেলায় সিঁদুরমাখা অবগুণ্ঠিতা নারী নিজেই হয়ে উঠেছে দেবী প্রতিমা। বিকাশের ছবি আমাদের মনে সজোরে আঘাত করে যায়, ছবি থেকে দর্শকের চোখ সরিয়ে নিতে দেয় না। কী এক পরাবাস্তব অনুভুতি মেশানো ছবির দিকে সম্মোহিতের মতো নিস্পলক তাকিয়ে থাকতে হয়।

কেবল ‘দুর্গা’ সিরিজ নয়, জলরঙে আঁকা এই সময়ের অন্য ছবির মধ্যে শ্রীচৈতন্যদেব কখনও হয়ে ওঠেন সাধারণ মানুষ। মহাপ্রভুর দেবত্ব ভাব সরিয়ে রেখে চৈতন্যকে তিনি করে তোলেন পথের কিশোর। তেলরং থেকে স্বচ্ছ জলরঙের কাজে বিকাশের অনায়াস দক্ষতা এখানে বিস্তার পেয়েছে। বলতে হবে ধর্মনারায়ণের কথাও, উনিশ শতকীয় নারীপুরুষের ছবি কল্পনার ডানা মেলেছে। গণেশ পাইনের কাজ বরাবর রহস্যের ঘনছায়ায় আবৃত। গুয়াশ পদ্ধতিতে আঁকা ‘গুপ্তঘাতক’ থেকে ‘বণিকের রাত’ বা কুটিরের সামনে শীর্ণকায় পুরুষ-শরীর অথবা মুখে হাত-চাপা দেওয়া অভিনেত্রী, শিল্পীর নিজস্ব দৃশ্যভাষা রচনা করেছে। আশির দশকে তাঁর ছবির বিন্যাস আরও সংহত, আকারের জ্যামিতি হয়ে এসেছে সরলতর। বাঘের মুখোশ পরে মেয়ে, কাঁচের টেবিল ল্যাম্প ও নারী, ‘ফল এবং ফুলদানি’ ইত্যাদি ছবি তাঁর আশির দশকের আলোকিত ফসল।

এভাবে সেই সময় ছড়িয়ে পড়েছে শিল্পীদের ভাবনার ভাঁজে ভাঁজে। সে এক লড়াইয়ের সময়, ঘুম ভেঙে জেগে উঠে অন্যকে জাগিয়ে দেওয়ার সময়। কেবল শিল্পরসিক নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যে ছবি নিয়ে আগ্রহ গড়ে ওঠার সময় দানা বেঁধেছে এখানেই। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে অঙ্কুরিত হয়েছে শিল্প বিপণনের বীজ, যার চূড়ান্ত ফসল ফলেছে নব্বইয়ের পরবর্তী ধাপে। তবে এমন আলোর পাশে ওৎ পেতে ছিল একমুঠো অন্ধকার। আশির দশকেই আমারা হারিয়েছি কয়েকজন কিংবদন্তি শিল্পীকে। তাঁদের মধ্যে রামকিঙ্কর, বিনোদবিহারী, গোপাল ঘোষ আর নীরদ মজুমদার অন্যতম। একদিকে আশির দশক যেমন আমাদের উজ্জ্বল আলোকের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, তেমনই চোখের সামনে মেলে ধরেছে একরাশ কালো আন্ধকার।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved