Robbar

বাদলের থিয়েটারে ধর্মের অ্যাবসার্ডিটি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 27, 2026 6:22 pm
  • Updated:July 27, 2026 6:22 pm  

বাদল সরকারের ধর্মতাত্ত্বিক রূপকগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য কোনও শূন্যবাদ বা নৈরাশ্য নয়। ‘মিছিল’ নাটকে এক পথহারা বৃদ্ধ যখন উন্মত্তের মতো একটি ‘আসল বাড়ি’ খুঁজতে থাকে, তখন তা আসলে বাইবেলে বর্ণিত ‘Kingdom of Heaven’ বা ‘নতুন জেরুজালেম’-এরই এক ধর্মনিরপেক্ষ ইউটোপিয়া। সেই রাজ্যটি ঠিক কেমন হতে পারে, তার এক নিখুঁত ও প্রায়োগিক রূপরেখা বাদল সরকার এঁকেছেন তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় নাটক ‘হট্টমালার ওপারে’ (১৯৭৭)-তে।

নীলাঞ্জন হালদার

গোঁড়া বিশ্বাসের প্রত্যাখ্যান কী আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে কোনও শূন্যতার সৃষ্টি করতে পারে? আসলে ‘সাচ্চা ধার্মিক’, ‘বক ধার্মিক’ ইত্যাদি নানা ধর্মীয় শব্দবন্ধে জেরবার আমরা এই প্রসঙ্গ থেকে কিছু কথা ভাবতে পারি।

কলকাতার এক বিশিষ্ট প্রোটেস্ট্যান্ট খ্রিস্টান পরিবারে সুধীন্দ্র সরকার হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পরে যাঁকে আমরা চিনেছি– বাদল সরকার নামেই। স্পষ্টভাবে গির্জার কট্টর নিয়মকানুন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন; লোক-দেখানো ধার্মিকতায় অংশ নিতে অস্বীকার করেছিলেন বাদলবাবু। কিন্তু তাঁর খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে ওঠার দিকে যদি তাকাই, তবে সেখানে খ্রিস্টীয় ভাবনার আদি পাপ (original sin), সম্মিলিত অপরাধবোধ, কৃচ্ছ্রসাধন ও ত্যাগের মাহাত্ম্য, শাহাদাত বা আত্মত্যাগ এবং মসিহ-সুলভ মুক্তির (messianic redemption) ভাবনা পরিশোধিত হয়ে তাঁর নাট্যচর্চায় সংশ্লেষিত হয়েছিল।

বাদল সরকার

তাঁর আত্মজৈবনিক লেখা ‘পুরানো কাসুন্দি’, ইউরোপে কাটানো বছরগুলিতে তাঁর ব্যক্তিগত ডায়েরি ‘প্রবাসের হিজিবিজি’ এবং তাঁর প্রধান নাটকগুলো– ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’, ‘বাকি ইতিহাস’, ‘স্পার্টাকাস’ এবং ‘মিছিল’ প্রভৃতিতে ধর্মনিরপেক্ষ অধ্যাত্মতত্ত্বের এক সহজ সংশ্লেষ দেখতে পাই।

ঔপনিবেশিক এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক কলকাতার সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ সংখ্যালঘু পরিবারের মানুষ ছিলেন তিনি। ‘পুরানো কাসুন্দি’-তে তাঁর বেড়ে ওঠার বছরগুলিতে আধিপত্য বিস্তারকারী ধর্মীয় পরিবেশের একটি বর্ণনা আমরা পাই– “রবিবার দু’বেলা গির্জায় উপাসনার অনুষ্ঠান… ছোটদের জন্যে সানডে স্কুল বড়ো একটা হলঘরে, সেটাকে চ্যাপেল বলা হয়।” চ্যাপেল; সাধারণত একটি নিরাভরণ স্থান– যেখানে খ্রিস্টধর্মীয় সম্প্রদায় বিনোদনের জন্য নয়, বরং নৈতিক চিন্তা এবং শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য একত্রিত হত। নাট্যকর্মী বাদল সরকারের পরবর্তী ‘অঙ্গনমঞ্চ’-এর প্রাথমিক স্থাপত্য মডেলেও আমরা এই নিরাভরণ ঘরকেই দেখতে পেয়েছি।

যখন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ও তুলনামূলক সাহিত্যে শিক্ষার মাধ্যমে তাঁর বৌদ্ধিক দিগন্ত প্রসারিত হয়, তখন তিনি গির্জায় যাওয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির সামাজিক লোক-দেখানো আচরণের সঙ্গে খ্রিস্টের নৈতিক শিক্ষার বৈষম্য টের পান। ‘পুরানো কাসুন্দি’-তে জানাচ্ছেন, ‘বড়দিনে গুড ফ্রাইডেতে চার্চে গিয়ে যদি নিয়মরক্ষাটা করি, খ্রিস্টীয় সমাজে বাবার সম্মানটা বাঁচে। অর্থাৎ– ভণ্ডামি করো।’ সামাজিক মুখরক্ষার জন্য প্রার্থনা প্রভৃতি ধর্মাচরণের ভান করার ভণ্ডামিকে তিনি যেমন প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তেমনই তিনি পরবর্তীতে প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ভণ্ডামিকেও প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যেখানে অভিনেতারা মেকআপ পরতেন এবং একটি ‘চতুর্থ দেওয়ালের’ পিছনে মুখস্থ লাইন বলতেন। যদিও তিনি পরাবাস্তব ঈশ্বরকে বর্জন করেছিলেন, কিন্তু বিশ্বাসের মানসিক অবকাঠামোকে বর্জন করেননি। পাঁচের দশকের শেষের দিকে লন্ডন এবং প্যারিসে থাকার সময়, ‘প্রবাসের হিজিবিজি’-তে ‘নিহিলিজম’ বা ‘শূন্যবাদ’ থেকে একটি লড়াকু ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদে উত্তরণের পথ তিনি উপলব্ধি করেছেন, “ঈশ্বর এবং ‘পরকাল’-এ কখনও সত্যিই বিশ্বাস না করা… মৃত্যুকে ‘অনন্ত জীবন’-এর বাহক হিসাবে মেনে নিতে অস্বীকার করা… মানুষ এক চিরন্তন যোদ্ধা। দুটি অস্ত্র নিয়ে। বাসনা এবং আশা।” ‘বাসনা এবং আশা’ হয়ে ওঠে খ্রিস্টান গুণাবলি ‘বিশ্বাস’ এবং ‘দান’ বা ‘ভালোবাসা’-র ধর্মনিরপেক্ষ, মানবতাবাদী প্রতিভূ।

তিনি ক্রমাগত অর্জনের ইঁদুর দৌড়ের নিরর্থকতা স্বীকার করেছেন। ঠিক যেমন আদি খ্রিস্টান সন্ন্যাসীরা মরুভূমির তপস্যার জন্য রোমান শহরগুলির প্রাচুর্য এবং দুর্নীতি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন, বাদল সরকার শিল্পের এক বিশুদ্ধতর রূপ আবিষ্কারের জন্য তেমনই যেন প্রসেনিয়াম মঞ্চের বুর্জোয়া আড়ম্বর থেকে পালিয়ে এসেছিলেন। তাত্ত্বিক গ্রন্থ ‘থিয়েটারের ভাষা’-তে তিনি এই পণ্যায়নের বিরুদ্ধে লিখেছেন, “বাণিজ্যিকীকরণের যুগে বাতাস, সূর্যের আলো বা বৃষ্টির জলের মতো অতি সামান্য কিছু প্রাকৃতিক উপাদান ছাড়া কোনো কিছুই আর বিনিময়হীন বা ‘ফ্রী’ অবশিষ্ট নেই।” স্বেচ্ছামূলক অনুদানের ওপর নির্ভরতা এই আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধন থিয়েটারকে ‘অর্থের থাবা’ থেকে মুক্ত করেছিল, নাট্য অনুষ্ঠানকে একটি বাণিজ্যিক লেনদেন থেকে সাম্প্রদায়িক পুণ্যকর্মে রূপান্তরিত করেছিল।

তাঁর ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ (১৯৬৩) নাটকে লেখক এবং মানসীর মধ্যকার সংলাপে ধর্মতাত্ত্বিক সংকট সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। মানসী এক ধর্মনিরপেক্ষ অনুগ্রহকে মূর্ত করে তোলে, এমন এক আশা যা যৌক্তিকতাকে ছাড়িয়ে যায়: “লেখক: ‘তুমি কী করে জানো?’ মানসী: ‘আমি জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না, আমি বোকা। আমি শুধু বিশ্বাস করি।’ লেখক: ‘বিশ্বাস? বিশ্বাস, এই পাতালপুরীর নরকে?’ ” এই সংলাপের পর ইন্দ্রজিৎ দাবি করে যে, মানবতা যেন ঐশ্বরিক মুক্তির পরিবর্তে যন্ত্রণাদায়ক আত্মসচেতনতাকে বেছে নিয়ে তার নিজস্ব মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা মাপার জন্য ‘অন্ধ বিশ্বাসের ঠুলি’ খুলে ফেলে।

মানসীর চরিত্রের মধ্য দিয়ে বাদল সরকার যে ‘Secular Grace’-এর বীজ বপন করেছিলেন, তারই এক মহাকাব্যিক এবং পূর্ণাঙ্গ রূপ আমরা দেখতে পাই তাঁর ‘গণ্ডী’ নাটকে। এই নাটকের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে– ‘সোমা’ নামের এক সাধারণ, খেটে-খাওয়া পরিচারিকা। তার এই আত্মত্যাগ কেবল মানবিক মায়া নয়; এটি হল খ্রিস্টীয় ‘চ্যারিটি’ বা শর্তহীন ভালোবাসার এমন এক রূপ, যেখানে স্বর্গের কোনও পুরস্কারের লোভ বা পারলৌকিক হিসেব-নিকাশ নেই।

নাটকে বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে শিশুটির প্রতি সোমার সেই আর্তি– ‘আমি তোকে ফেলে যাব না… ওরা আমাকে মেরে ফেলুক, তবু আমি তোকে এই বিপদের মুখে একা ফেলে যাব না।’– হয়ে ওঠে এক জাগতিক পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষাকর্ত্রীর অমোঘ প্রতিশ্রুতি। বিচারক কীর্তিচাঁদ রায়ের খড়ির গণ্ডীর বিচারে সোমা যখন সন্তানের ব্যথার কথা ভেবে হাত ছেড়ে দেয়, কীর্তিচাঁদের রায় তখন আধুনিক পৃথিবীতে ‘গ্রেস’ বা ঐশ্বরিক করুণার এক মানবিক রূপান্তর হয়ে ওঠে।

যদি ‘এবং ইন্দ্রজিৎ’ ঈশ্বরের অনুপস্থিতি অন্বেষণ করে, তবে ‘বাকি ইতিহাস’ (১৯৬৭) অমঙ্গলের সমস্যা এবং আদি পাপের ধারণার সঙ্গে বাদল সরকারের চূড়ান্ত মোকাবিলার ক্ষেত্র। সীতানাথকে একজন রূপক খ্রিস্ট-মূর্তি হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে, যে বিশ্বের পাপকে নিজের ভিতরে ধারণ করে। সে আত্মতুষ্ট শরদিন্দুর ওপর তার ক্ষোভ উগরে দেয়: ‘তুমি আমাকে প্রশ্ন করেছো– আমি কেন আত্মহত্যা করেছি? আমি জবাব দিচ্ছি– শোনো।… অর্থহীনতার ইতিহাস। রাশি রাশি মানুষের, রাশি রাশি কীটের অর্থহীনতার ইতিহাস।’

বাদল সরকারের নাট্যদর্শনে ‘Original Sin’ বা আদি পাপের ধারণাটি কেবল সমাজ বা রাষ্ট্রের বৃহত্তর ক্যানভাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, তা প্রবেশ করেছে ব্যক্তিমানুষের মনস্তত্ত্বের গভীরতম স্তরে। এর তীব্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ ঘটে ‘বিবর’ (১৯৬৬) নাটকে। প্রদ্যোৎ যখন প্রায় অনিচ্ছাকৃতভাবে নীতাকে খুন করে, তখন তার মধ্যে যে তীব্র অপরাধবোধ, তা কোনও আইনি ভীতি নয়; তা হল ধর্মনিরপেক্ষ আদি পাপের এক মর্মান্তিক জাগরণ। বাদল সরকারের ঈশ্বরবিহীন পৃথিবীতে প্রদ্যোতের কোনও ঈশ্বর নেই। তার ‘কনফেশন বক্স’ হল– খোদ থিয়েটারের অঙ্গন, আর তার ফাদার হল– তার নিজেরই দংশিত বিবেক। ‘আমি তো নীতাকে খুন করবো ঠিক করে যাইনি, তবু তো কনুইটা ওরকম করে…’ এই অসম্পূর্ণ বাক্যটি হল আধুনিক মানুষের সবচেয়ে সৎ কনফেশন। সে নিজেকে জাস্টিফাই করার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না। এটি ধর্মনিরপেক্ষ পাপবোধের চরম নিদর্শন।

‘প্যাশন প্লে’র আত্মত্যাগের অন্বেষণ আমরা পাই হাওয়ার্ড ফাস্টের ‘স্পার্টাকাস’-এ। থার্ড থিয়েটারের অন্তরঙ্গ, শারীরিক স্পেসে ‘স্পার্টাকাস’ মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে বাদলবাবু দর্শকদের গণ-ক্রুশবিদ্ধকরণ খুব কাছ থেকে দেখতে বাধ্য করেছিলেন। নিপীড়িতদের মুক্তির জন্য ক্রুশে মারা যাওয়া দাসেরা হল খ্রিস্টের প্যাশনের (যিশুর আত্মত্যাগ) একটি সরাসরি, ধর্মনিরপেক্ষ প্রতিফলন।

যদি স্পার্টাকাস শাহাদাত ভাবনা নিয়ে কাজ করে, ‘মিছিল’ (১৯৭৪) হল পুনরুত্থান এবং পারলৌকিক আশা নিয়ে বাদল সরকারের থিসিস। খোকা হল সেই সর্বোত্তম নির্দোষ ‘Lamb of God’; যার রক্তে শহরের রাজপথ রঞ্জিত। তার অমোঘ উচ্চারণ– ‘আমি খুন হয়েছি গতকাল। আমি খুন হয়েছি পরশু… আমি খুন হবো কাল’– যেন ক্রুশবিদ্ধ যিশুরই এক আধুনিক, রাজনৈতিক প্রতিধ্বনি। এই মৃত্যু শেষ কথা নয়; খোকা বারবার ফিরে আসে। এ-হল মেহনতি মানুষের অদম্য প্রাণশক্তির ‘Secular Resurrection’।

পুনরুত্থানের এই রূপকের পাশাপাশি বাদল সরকার তাঁর ‘ভোমা’ (১৯৭৬) নাটকে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বের সবচেয়ে পবিত্র আচার– ‘ইউক্যারিস্ট’ বা ‘হোলি কমিউনিয়ন’কে এক ভয়ংকর, তিক্ত আর্থ-রাজনৈতিক দর্পণে পরিণত করেছেন। যিশু যেমন বলেছিলেন, ‘যতক্ষণ না তোমরা মানবপুত্রের মাংস খাচ্ছ এবং তাঁর রক্ত পান করছ, ততক্ষণ তোমাদের মধ্যে কোনো জীবন নেই’, বাদল সরকার যেন আধুনিক পুঁজিবাদের সেই পৈশাচিক রূপটিকেই এখানে তুলে ধরলেন, যেখানে শোষিতের রক্তমাংস ছাড়া শহরের বাবুদের জীবন বাঁচে না– ‘ভোমাদের রক্ত খেয়ে আমরা বেঁচে থাকি শহরে’– আক্ষরিক অর্থেই মধ্যবিত্তের আত্মতুষ্টির মুখে এক সজোর চপেটাঘাত। এই ধর্মনিরপেক্ষ ইউক্যারিস্ট কোনও পারলৌকিক পুণ্য দেয় না, বরং জন্ম দেয় এক অমোচনীয় ‘কালেক্টিভ গিল্ট’-এর।

বাদল সরকারের এই ধর্মতাত্ত্বিক রূপকগুলোর চূড়ান্ত গন্তব্য কোনও শূন্যবাদ বা নৈরাশ্য নয়। ‘মিছিল’ নাটকে এক পথহারা বৃদ্ধ যখন উন্মত্তের মতো একটি ‘আসল বাড়ি’ খুঁজতে থাকে, তখন তা আসলে বাইবেলে বর্ণিত ‘Kingdom of Heaven’ বা ‘নতুন জেরুজালেম’-এরই এক ধর্মনিরপেক্ষ ইউটোপিয়া। সেই রাজ্যটি ঠিক কেমন হতে পারে, তার এক নিখুঁত ও প্রায়োগিক রূপরেখা বাদল সরকার এঁকেছেন তাঁর অত্যন্ত জনপ্রিয় নাটক ‘হট্টমালার ওপারে’ (১৯৭৭)-তে। খ্রিস্টীয় ধর্মতত্ত্বে ‘ম্যামন’ হল লোভ এবং জাগতিক সম্পদের প্রতি অন্ধ আসক্তির প্রতীক। বাইবেলে বলা হয়েছে– ‘তোমরা একই সঙ্গে ঈশ্বর এবং ম্যামনের দাসত্ব করতে পারো না।’ বাদল সরকার তাঁর এই নাটকে এক ধর্মনিরপেক্ষ ইউটোপিয়ার চিত্র এঁকেছেন, যা আক্ষরিক অর্থেই ম্যামন-বর্জিত এক নতুন জেরুজালেম।

তারা যখন খাবার খাওয়ার পর পকেট থেকে টাকা বের করে দাম দিতে যায়, তখন সেই দেশের মানুষ অবাক হয়ে বলে, ‘টাকা? সেটা আবার কী?’ বেচারাম যখন জানতে চায় বিনা পয়সায় এখানে খাবার কীভাবে মেলে, তখন উত্তর আসে: ‘বিনা পয়সায় কে বলল? কাজ তো করতে হয়! যে যেমন পারে কাজ করে… তারপর সবাই মিলে একসাথে বসে খাই।’ ব্যক্তিগত লোভ বা ম্যামনকে বর্জন করতে পারলেই পৃথিবীতে স্বর্গের রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। এখানে সম্পদের জায়গা নিয়েছে মানুষের শ্রমের মর্যাদা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা। এই শোষণহীন সমাজই হল– থার্ড থিয়েটারের সেই কাঙ্ক্ষিত ‘আসল বাড়ি’।

থার্ড থিয়েটারে, অভিনেতা এবং দর্শকের মধ্যকার শারীরিক নৈকট্য ‘চতুর্থ দেওয়াল’-এর আরাম দূর করে দেয়। দর্শকরা আর অন্ধকার অডিটোরিয়ামের নামহীনতায় পিছু হটতে পারে না। ‘বাসি খবর’-এর মতো নাটকে, ‘খুন হওয়া মানুষ’ পারফর্মার এবং দর্শকদের মধ্যে নীরবে ঘুরে বেড়ায়, তাদের সেই রক্তপাতের মুখোমুখি হতে বাধ্য করে, যা তাদের স্বাচ্ছন্দ্যকে নিশ্চিত করে। এই দ্বন্দ্ব, উদ্বেগ এবং অপরাধবোধের মুখোমুখি দাঁড়ানোর ‘Confession’ কক্ষ কি চার্চের সেই প্রথাকে মনে করিয়ে দেবে না একবারও?

এই কনফেশন পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রায়শ্চিত্ত হল তাদের সামাজিক আচরণে পরিবর্তন, তাদের রাজনৈতিক চেতনা এবং ‘আসল বাড়ি’-র জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হওয়ার সদিচ্ছা। সেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসের স্থাপত্যের মধ্যে গিয়ে রবিবার রবিবার মুখস্থ ধর্মগ্রন্থ আউড়ে যাওয়ার জায়গা নেই। অপরাধবোধে পিষ্ট সীতানাথ থেকে চিরন্তন পুনরুত্থিত খোকা পর্যন্ত তাঁর চরিত্রগুলি শহিদ এবং নবিদের একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেবমণ্ডলী গঠন করে। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, প্রকৃত ধর্মতত্ত্বের জন্য কোনও মন্দির বা গোঁড়ামির প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন কেবল মানুষের সংযোগের পবিত্রতার ওপর অটল বিশ্বাস এবং একটি ন্যায়সঙ্গত বিশ্বের জন্য নিরলস, আত্মত্যাগী সাধনা।

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন নীলাঞ্জন হালদার-এর অন্যান্য লেখা

…………………..