a memoir of film director dinen gupta by his daughter | Robbar
Robbar
  • ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩
  • শুক্রবার
  • ১৬ অক্টোবর ২০২৬

আমার বাবা দীনেন গুপ্ত

‘নতুন পাতা’-র জাতীয় পুরস্কার থেকে ‘বনজ্যোৎস্না’-এর ফ্লপ। সত্যজিৎ রায়ের টেপ রেকর্ডার ধার করা থেকে বুদ্ধদেব বসুর বাড়িতে ‘শুদ্ধ মাংস’ খাওয়া। ভি বালসারার বাড়ির সরস্বতী পুজো থেকে শুটিং-এর বকুনি। পরিচালক দীনেন গুপ্ত, বাবা দীনেন গুপ্তের স্মৃতিচারণ।

প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: সোনালী গুপ্ত-র সংগ্রহ থেকে প্রাপ্ত

শেষ আপডেট: অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ১৬:০৯   
Facebook WhatsApp Messenger

বাবা মোটের ওপর একজন হাসিখুশি লোক। আলাদা করে দেমাক ছিল না কোনও। বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির আর পাঁচটা মানুষের মতোই সাধারণ তাঁর জীবনযাপন। বাইরে থেকে আলাদা করা যাবে না। বাবা আলাদা ছিল ভিতরে। ওঁর কাজে, চিন্তায়, একাগ্রতায়, শৃঙ্খলায়। খুব ছোটবেলার কথা তো মনে নেই, কিন্তু যখন থেকে স্মৃতি গড়ে উঠেছে, মনে পড়ে, আনোয়ার শাহ রোডের বাড়িতে বাবা স্টুডিওপাড়া থেকে ফিরেই চালিয়ে দিতেন গান। তখন বড়জোর ছ’-সাত বছর বয়স আমার। গান চালিয়ে নিজের কাজের মধ্যে ডুবে যেতেন বাবা। হয়তো পড়ছেন। বা স্ক্রিপ্ট কারেকশন। বা অন্য কিছু। কিন্তু গান চলছে। আমিও নিজের মনে নাচ করতাম সেই গানে।

zoom
দীনেন গুপ্ত

মামার বাড়ির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল খুবই। মামাবাড়ি বড় পরিবার। মানিকতলা কারবালা ট্যাঙ্ক লেনে। উল্টোদিকের বাড়িতে থাকতেন অতুল্য ঘোষ। অতুল্য ঘোষের স্ত্রী ভাড়া থাকতেন আমার মামার বাড়িতে। আমি নিজেও অতুল্য ঘোষের খুব কাছের ছিলাম। এমনকী, ওঁর অফিসঘরে পর্যন্ত খেলাধুলো করতাম। যেহেতু তখনও ওঁর কোনও সন্তান ছিল না, আমরা যারা ছোট ছিলাম, তাদের খুবই ভালোবাসতেন। পরে খুব সম্ভবত দত্তক নিয়েছিলেন এক কন্যাসন্তান। সেই মেয়ে, বুুুধু, আমাদের বন্ধু হয়ে উঠেছিল। ও বাড়িতেই লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে দেখেছি, দেখেছি ইন্দিরা গান্ধীকেও। একবার লরিতে করে অতুল্য ঘোষের জন্য স্পেশাল সন্দেশ এসেছিল। আর-একবার এত ফুলের বোকে এসেছিল যে, লরি করে ফেরত পাঠাতে হয়েছিল। আসলে অতুল্য ঘোষ কিছুই নিতেন না। আমার মামার বাড়ি প্রবল কমিউনিস্ট। আর বাবা ছিলেন কংগ্রেস। ফলে মা-বাবার মধ্যে রাজনীতি নিয়ে একটু তর্ক, ঝগড়া, রাগারাগি হতই। আর আমি কিছু বুঝতাম না ব্যাপারটা কী হচ্ছে।

zoom
অতুল্য ঘোষ

বাবা বাড়ি ফেরার পথে, চাচার কাটলেট নিয়ে আসত প্রায়শই। বাড়িসুদ্ধু সক্কলের জন্য। সেটাই আমাদের ‘ইভনিং স্ন্যাক্স’। বাবা বলতেন, জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ– সব করতে পারেন। আখেরে করেছেনও তাই। বাবার সঙ্গে বাজার করতে শিখেছি লেক মার্কেটে। পরে, নিজের সংসার হওয়ার পর আমি মানিকতলায় বাজার যেতাম। অবশ্য সে বাজারে প্রথম গিয়েছিলাম দিদার সঙ্গে। বাবা ভীষণই লুচি-মাংস, আলু-ছেঁচকি খেতে ভালোবাসতেন। ‌‘মাংস’ বলতে অবশ্যই পাঁঠা। আর খাওয়ার পর একটু মিষ্টিমুখ মাস্ট। এখনও সেই ট্রাডিশন আমি বজায় রেখেছি। সারাজীবন নিজের অসম্ভব ছিপছিপে মেদহীন শরীরটা বজায় রেখেছিলেন বাবা। রাত্তিরে কোননওভাবেই তিনটের বেশি রুটি খেতেন না।

zoom
ছিপছিপে মেদহীন শরীরটা বজায় রেখেছিলেন

শুটিংয়ের সময় মনে আছে, সমস্ত কলাকুশলী খেতে বসতেন মাটিতে। এককালে বাঙালির মাটিতে আসন পেতে খাওয়ার অভ্যেস ছিল যেমন। আমাদের বাড়িতেও, একইভাবে মেঝেয় বসে খাওয়ার চল ছিল। শুটিংয়ের সময় বাবার নিজস্ব বামুন ঠাকুর ছিল। তিনিই রান্না করতেন সক্কলের। একেবারে প্রথম ছবি থেকেই এই নিয়ম। বাবা কখনও আর্টিস্টদের সঙ্গে খেতেন না, খেতেন টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে। বাবা বলতেন ‘আই অ্যাম আ টেকনিশিয়ান’। ক’দিন আগে বিশ্বকর্মা পুজো গেল। এই বিশ্বকর্মা পুজোর উদ্যোগ বাবা নিয়েছিলেন ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে। নিজে যা রোজগার করেছেন, সেই টাকা জমিয়ে, পুজোর খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করাতেন। বাবার অফিস ছিল ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতেই। বাবার করা ছবির পোস্টার অফিসে লাগানো থাকত, ওইখানেই মিটিং, ওইখানেই কথা, স্ক্রিপ্ট পড়া– বেশিরভাগ সময়ই। ইন্দ্রপুরী স্টুডিও ছিল বাবার প্রাণ। তপন সিনহার দু’নম্বর নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওটা যেমন।

zoom
ক্যামেরার পিছনে

বাবার জীবনে ‘রবিবার’ বলে কিছু ছিল না। দিন-রাত্রি বলেও কিছু না। বাবার কাছে কাজ মানে কাজ– সে যে-দিনই হোক না কেন! একবার, সকালের দিকে একটা ছবির শুটিং করছিলেন, আর রাতের বেলা রাজেন তরফদারের ‘আকাশছোঁয়া’র শুটিং। তাও আবার সার্কাসের। রাত ন’টা থেকে শুরু হয়ে সার্কাসের শুটিং চলত প্রায় ভোরবেলা পর্যন্ত। দিন ১০-১২ টানা এরকম শুটিং করেছিলেন বাবা। সকালবেলা এসেই বাবা ঘুমিয়ে পড়তেন। বাবাকে কেউ ডেকে না-দিলেও, দেখেছি, বাবা ঠিক নিজের সময়ে উঠে পড়তেন। ভিতর থেকে এতটাই ডিসিপ্লিনড।

zoom
টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে

একবার, বাবা যে সময়ে ওঠেন, সেই সময় পেরিয়ে গিয়েছে। বাবা বিছানায়। চোখ বোজা। মা আস্তে আস্তে বাবার নাকের কাছে হাতটা নিয়ে গিয়েছে। দেখছে যে, শ্বাস পড়ছে কি না! বাবার চোখ বন্ধ রেখেই বললেন, ‘কী দেখছ? বেঁচে আছি কি না?’ হয়তো বেশি একটু ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলেন সেদিন। এবং বাবার শিডিউল যে দেরিতে শুরু হবে, তা তো আর মা জানেন না।

zoom
বাবা আর মা

আনোয়ার শাহ রোডের দুটো বাড়িতে আমরা ছিলাম। প্রথমে ছোট বাড়ি, তারপর বড় বাড়িতে চলে আসি। হেন লোক নেই যে, এই দুটো বাড়িতে আসেননি। নাটকের কথা বললে– বাহাদুর খাঁ, শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শেখর চট্টোপাধ্যায়। বাবা ভীষণ নাটক ভালোবাসতেন। নাটক দেখতেন। এবং নাটকের মানুষজন বাবার ছবিতে এবং স্ক্রিপ্টে প্রচুর কাজ করেছেন। পাহাড়ী সান্যালও চলে আসতেন বহু সন্ধেবেলায়। সঙ্গে থাকত ওঁর হারমোনিয়াম। মাঝেমধ্যে শমিত ভঞ্জও। বাড়িতেই খাওয়াদাওয়া হল। সাধারণ খাওয়াদাওয়া, এমন না যে বিরাট কিছু হচ্ছে!

ভীষণ বই পড়তেন। প্রচুর গানও শুনতেন। এমন কোনও মাস ছিল না, বাবা নতুন বই বা ক্যাসেট কেনেননি। পুজোর সময় সেসবের সংখ্যা বাড়ত। মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় নিজেরাই লং প্লে রেকর্ড আমাকে দিয়ে যেতেন। লেখা আছে সেসবে এখনও– ‘বাবুইকে হেমন্ত মুখার্জি’– এরকম। মান্না দে, আরতি মুখোপাধ্যায়, বনশ্রী সেনগুপ্ত, পিন্টু ভট্টাচার্য, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়– কাকে ছেড়ে কার কথা লিখি? ভি বালসারার সঙ্গে আমাদের একটা পারিবারিক সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। ওঁর বাড়ির সরস্বতী পুজোতেও আমরা যেতাম সকলে। বাবা সম্ভবত কিছুদিন গান শিখেছিলেন। কারও কাছে। বাঁশি, পিয়ানো, সন্তুর তিনটে যন্ত্রই উনি চমৎকার বাজাতে পারতেন। কিন্তু কোনওটাই কারও কাছে শেখেননি। মিউজিক রেকর্ডিং যখন হত, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে দেখতেন, শেখার চেষ্টা করতেন। আমি পিয়ানো বাজাই। পিয়ানো বাজানোয় একটা সময়ে বাবা-মা দু’জনেই আমাকে খুব উৎসাহ দিয়েছেন। গানের পাশাপাশি বই। এমনও দেখেছি, যেদিন শুটিং নেই, বাবা সারাদিন একটা বইয়ে ডুবে আছেন। তখন তো মোবাইল ছিল না। পরে যখন ফোন হল, দেখেছি বাবা ফোনে কথা বলা বিশেষ পছন্দ করছেন না। বলতেন, ‘বাড়ি আসুন, কথা বলছি।’

zoom
জীবনে ‘রবিবার’ বলে কিছু ছিল না

একবার বাবা সোনি কোম্পানির একটা টেপ কিনেছেন। রেকর্ড করা যায় তো বটেই, স্লো-মোশন প্রযুক্তিও আছে তাতে। তখনও সে জিনিস বাংলা বাজারে তেমন প্রচলিত হয়নি। সত্যজিৎ রায়ের কাছে খবর গিয়েছিল কোনও সূত্রে যে, বাবার কাছে এই বস্তুটি আছে। সত্যজিৎ রায় ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর যে ভূতের গলার রেকর্ডিং করেছিলেন, তার প্রাথমিক কাজটুকু হয়েছিল বাবার ওই টেপে। বাবা ধার দিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়কে।

তপন সিনহার সঙ্গেও ছিল খুব সখ্য। অরুন্ধতী দেবীর সঙ্গেও। ওঁদের সঙ্গে কাজও করেছেন যথেষ্টই। অসীম দত্ত, বলা চলে বার ‘বেস্ট ফ্রেন্ড’– প্রিয়া সিনেমার মালিক। তিনি প্রডিউসার ছিলেন। সবসময় চাইতেন বাবা ছবি করুক। পুরনো ছবিতে ওই যে ‘পিয়ালী ফিল্মস’, ‘পূর্ণিমা পিকচার্স’ দেখতে পান, সবই বাবার দেওয়া নাম। মাঝেমাঝে ওঁদের বাড়িতেও সন্ধেবেলা স্ক্রিপ্ট পড়া হত। আমিও যেতাম বাবার সঙ্গে। অনেক সময়, ওঁরা কথা বলছেন, আমি সিনেমা দেখতে চলে গেলাম। বক্সে বসে রইলাম। মনে আছে, ‘গুমনাম’ দেখছি, আর ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছি। বক্সের দরজাটাই খুলতেই পারছি না ভয়ের চোটে! তখন তো একেবারে অল্পবয়স।

zoom
শুটিং-এ, অপর্ণা সেনের সঙ্গে

পুজোর সময়টায় আমরা উত্তর কলকাতাতেই থাকতাম বেশি। বাবাই প্ল্যান করে সবাইকে নিয়ে ঠাকুর দেখতে বেরনোর উদ্যোগ নিতেন। গাড়ি ভর্তি করে আমরা বেরতাম একেবারে। বাবাই ড্রাইভার! বাবা খুবই ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ এবং মা কালীর দুরন্ত ভক্ত যাকে বলে। মা-বাবা দু’জনেই ঠাকুর বিশ্বাসী ছিলেন। মা সরস্বতী পুজো করতেন বাড়িতে।

উত্তমকুমার বাবাকে ‘খোকো’ বলে ডাকতেন। ‘খোকা’ নাম ছিল বাবার, কিন্তু ডাকতেন ‘খোকো’ বলে। দু’জনেই প্রচণ্ড সিগারেট খেতেন। ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে ‘ড্যাডি’ নামের একজন সাউন্ড রেকর্ডিস্ট ছিলেন। এই রেকর্ডিং রুমের বাইরে, অনেক সময়ই দেখতাম উত্তমবাবু আর বাবা সিগারেট খাচ্ছেন। গল্প করছেন। ড্যাডিও আছেন সঙ্গে।

zoom
ক্যামেরার সামনে

বাবা একদম আমার জন্যে স্ট্রিক্ট ছিল না।

বাবার কাছে অনেক শিল্পীই আসতেন যাঁদের ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল না। ট্যাক্সি করে এদিক-ওদিক যাবেন তাঁরা, এমন বিলাসিতাও ছিল না বোধহয় একসময় বাংলার শিল্পীদের। সাধারণ মানুষের মতোই বাসে, ট্রামে-হেঁটে তাঁরা চলে আসতেন বাড়িতে। লেক গার্ডেনসে থাকাকালীন বাবাকে দেখেছি বেশিরভাগ মানুষকেই স্ক্রিপ্ট পড়া হয়ে গেলে, দেশপ্রিয় পার্কে নামিয়ে দিতেন গাড়ি করে। রাত্রি হলে তো বটেই। আমি ছিলাম বাবার সারথি। বাবার সঙ্গে আসতাম, তাঁদের নামাতাম, বাড়ি ফেরত চলে যেতাম।

তবে, শুটিংয়ের একটা বকা খাওয়া খুবই মনে পড়ে। ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’র শুটিং। একটা ডায়লগ বলতে বলতেই চোখ থেকে জল টপটপ করে পড়ার কথা। ডায়লগ বলছি, চোখে জল টলটল করছে, অথচ পড়ছে না। বারবার টেক হচ্ছে। আমার চোখ জলে ভরে যাচ্ছে, কিন্তু জল আর পড়ার নাম করছে না! আমি সমস্ত চেষ্টা করেও পারছি না। বাবা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমরা কি বসে আছি, কাজ করছি না? আমরা কি জানোয়ার?’ ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করলাম! বাবা বললেন, ‘ক্যামেরা অন’। ক্ল্যাপস্টিক! আমি ফের অভিনয়ে। এবার হু হু করে চোখের জল। ওই শটটা হয়ে যাওয়ার পরও এত কেঁদেছি, ভাবাই যায় না! ১৩ বছর মাত্র বয়স! বাড়ি গিয়ে মাকে অভিযোগ করেছিলাম: ‘মা আমি আর শুটিংয়ে যাব না, বাবা বড্ড বকে।’ বাবার কানে গিয়েছিল কথাটা। বলেছিলেন, ‘আমি তোকে বকিনি, বকেছিলাম টেকনিশিয়ানদের, লাইটে ভুল করছিল বলে।’

zoom
‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’ ছবির বিজ্ঞাপন

বাবার ছবি ‘নতুন পাতা’ রিলিজ হয়েছিল যখন তার পরপরই তো জনপ্রিয়তা পেলেন বাবা। জাতীয় পুরস্কারও পেলেন! পুরো উদ্যমে পরের ছবি– ‘বনজ্যোৎস্না’। বুদ্ধদেব বসুর মেয়ে নায়িকা– মীনাক্ষী দত্ত। রয়েছেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, শমিত ভঞ্জও। আমরা চলে গেলাম চা বাগানে। টানা একমাসের জন্য। সেখানে হাতির পিঠে চড়া। পাহাড়ের ওপরে যাওয়া। সে এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা। ‘বনজ্যোৎস্না’ বাবা খুব যত্ন করে বানিয়েছিলেন। অনেক স্টার। ফলে শুটিংয়ে হইহই রইরই। কিন্তু সাংঘাতিক ফ্লপ করল! মাত্র দু’সপ্তাহ চলেই উঠে গেল! বাবা অসম্ভব বিষণ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। সিলভার জুবলি না হলে, বাবা ভীষণ আপসেট হয়ে যেতেন।

zoom
‘বনজ্যোৎস্না’ ছবির বিজ্ঞাপন

২০০ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ছিল বাবার ঠিকানা। আর ২০২ রাসবিহারী অ্যাভিনিউ বুদ্ধদেব বসু-প্রতিভা বসুর ঠিকানা। বাবার প্রিয় বন্ধুদের মধ্যে পড়তেন কবি অজিত দত্ত। সেই সূত্রেই বোধহয় বসুবাড়ির সঙ্গে বাবার আলাপ। বলা চলে আমাদের ‘সেকেন্ড হোম’। পরে বাড়ি করলেন বাঁশদ্রোণীতে। সেখানেও গিয়েছিলাম। রুমিমাসি– মানে দময়ন্তী বসু আমার বাবার খুব বন্ধু ছিলেন। ওঁর বিয়েতে বাবাই সব জোগাড়যন্ত্র করেছিলেন। ওই বাড়িতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বেলাল চৌধুরী ছাড়াও আরও কতজনকে যে আড্ডা মারতে দেখেছি!

খুব মজার একটা ঘটনা আছে বুদ্ধদেব বসুর বাড়ির খাওয়াদাওয়া নিয়ে। সেকালেই, ওঁদের বাড়িতে বিফ খাওয়ার চল ছিল যথেষ্টই। আমার মামার বাড়ি ছিল ব্রাহ্মণ, ফলে মা একেবারেই বিফ পছন্দ করতেন না। বাবা ওদের খুশি করতে হামেশাই বিফ খেয়ে নিতেন। তবে ‘বিফ’ বলতেন না ওঁরা কেউই, বলতেন ‘শুদ্ধ মাংস’। একদিন আমি, বাবা, মা– তিনজনেই উপস্থিত হয়েছি বসুবাড়িতে। সেই শুদ্ধ মাংস এসেছে প্লেটে করে। বাবা বললেন, ‘কাজল, তোমার মেয়ে কি শুদ্ধ মাংস খাবে?’ মা বললেন, ‘না।’ বাড়ি ফিরে, বাবা বললেন, ‘কেন তুমি না বললে? তুমি খাও না আলাদা কথা।’ ‘আমি চাই না। আমার মেয়ে নিজে যখন খাবে, খাবে।’

zoom
একেই বলে শুটিং

এত লেখক-শিল্পী-অভিনেতা বন্ধু ছিল বাবার। এত বই পড়তেন। অথচ বিশেষ লেখালিখি করতে দেখিনি বাবাকে। মনে পড়ে, একটা গল্পের কথাই। বাবার এক কুকুর ছিল– মিকি। মিকি, মা আর একটা ওল্ড এজ হোম। এই নিয়েই ছিল গল্পটা। সে গল্প শুনেছি। ছবি হওয়ার কথাও ছিল। তা আর হল কই!

ছবি সৌজন্য: সোনালী গুপ্ত

Basanta Bilap Buddhadeb basu Dinen Gupta Indian cinema Indian movie Pratham Pratishruti Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray Sonali Gupta Uttamkumar

Share this article on