Robbar

আবাদ করলে ফলবে সোনা?

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 2, 2026 6:13 pm
  • Updated:June 2, 2026 8:06 pm  

ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ– শস্যের এই নতুন রাজনীতি ভারতের সামনে যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনই বয়ে এনেছে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। একদিকে এটি আমেরিকা-নির্ভরতা থেকে ভারতকে মুক্তি দিয়ে জাতীয় খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; অন্যদিকে, ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলির মধ্যে আমদানি পুরোপুরি অবাধ হয়ে যাওয়ার ফলে রাশিয়ার বিশাল ও যন্ত্রচালিত খামারভিত্তিক কৃষির সামনে ভারতের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। 

দেবাশিস মিথিয়া

বিশ্ব রাজনীতিতে ‘তেল’ বা ‘সেমিকন্ডাক্টর চিপ’-এর মতো ‘খাদ্য’-কেও আজ এক শক্তিশালী ‘ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার’ (Food as a Weapon) হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে তৈরি হওয়া সংকট বিশ্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, গমের জোগান সামান্য বিঘ্নিত হলে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিতে কেমন হাহাকার পড়ে যেতে পারে। এই মুহূর্তে পশ্চিমের দেশগুলি খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে এক কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্যসংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারের টালমাটাল পরিস্থিতি বিবেচনা করে ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলি– ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চিন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নতুন সদস্য রাষ্ট্রসমূহ ‘ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর ফলে সদস্য দেশগুলির খাদ্য নিরাপত্তা আরও মজবুত ও সুরক্ষিত হবে।

কাজানে অনুষ্ঠিত ব্রিকস-এর সম্মেলন, ২০২৪

​২০২৪ সালের অক্টোবরে রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত ১৬-তম ব্রিকস সম্মেলনে এই ‘ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ’ বা শস্য-বিনিময়ের বিষয়টি চূড়ান্ত হয় এবং ‘কাজান ঘোষণা পত্রে’ সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গোটা ২০২৫ সাল জুড়েই ‘ব্রিকস প্লাস’ সদস্য দেশগুলির অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ‘ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ’-এর পরিকাঠামো নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন; যেখানে সরাসরি সহযোগিতা করেছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির কৃষি মন্ত্রণালয়গুলি। এমনকী ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকেও এই ‘কমন এগ্রিকালচারাল ফুড এক্সচেঞ্জ’ দ্রুত কার্যকর করার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। সব কিছু ঠিক থাকলে, ২০২৬ সালের জুন-জুলাই নাগাদ এই শস্য বিনিময় ব্যবস্থার একটি পাইলট প্রকল্প চালু হয়ে যাবে।

এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হল: এক, এখানে খাদ্যশস্য কেনাবেচার জন্য মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হবে না। সদস্য দেশগুলি তাদের নিজের দেশের মুদ্রা (যেমন, ভারতের টাকা বা রাশিয়ার রুবল) ব্যবহার করে শস্য কেনাবেচা করতে পারবে। এতে ডলারের সংকট বা আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার ভয় থাকবে না। ​দুই, এটি একটি আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। যেখানে এক দেশের বিক্রেতা অন্য দেশের ক্রেতার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন। ফলে ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে থাকা বড় বড় বহুজাতিক সংস্থার প্রভাব কমবে।

কিন্তু কেন এই নতুন ব্যবস্থার প্রয়োজন পড়ল? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিশ্ববাজারের দীর্ঘদিনের একপেশে ও অন্যায্য নিয়মের মধ্যে। যেখানে পশ্চিমের দেশগুলি কেউই শস্যের বড় উৎপাদকও নয়, আবার বড় ক্রেতাও নয়– অথচ, দশকের পর দশক ধরে বিশ্ববাজারে গম বা ভুট্টার দাম নির্ধারণ করে আসছে আমেরিকার ‘শিকাগো বোর্ড অফ ট্রেড’। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত গমের ৪২ শতাংশ এবং অন্যান্য খাদ্যশস্যের এক বিশাল অংশ এখন ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলির দখলে। ২০২৪-’২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে রাশিয়া ও ভারত যথাক্রমে গম এবং চালের শীর্ষ রফতানিকারক দেশ হিসেবে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছে। এমতাবস্থায়, ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলির যুক্তি অত্যন্ত সহজ– পণ্য আমাদের, ক্রেতাও আমরা, তবে তার দাম কেন ঠিক করবে পশ্চিমি দুনিয়া?

ব্রিকস-এর সম্মেলনে ভারত ও রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী

‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলির এই আত্মবিশ্বাস থেকেই জন্ম নিয়েছে ‘ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ’-এর ধারণা, যা বিশ্ব-অর্থনীতির প্রচলিত মেরুকরণকে বদলে দিতে সক্ষম। ধান ও গমের দুই শীর্ষ রফতানিকারক দেশ একই জোটে আসায়, বিশ্বের শস্য-বাণিজ্যের ভরকেন্দ্র এখন শিকাগো বা লন্ডন থেকে সরে আসা শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল– সদস্য দেশগুলি সরাসরি নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেনের সুযোগ পাবে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের দামের ওঠানামা এড়িয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে খাদ্যদ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। এর সফল রূপায়ণ, সদস্য (‘ব্রিকস প্লাস’) দেশগুলির শুধু বৈদেশিক মুদ্রারই সাশ্রয় করবে না, বরং এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির প্রান্তিক কৃষকদের জীবন ও জীবিকার ওপর।

পশ্চিমি দেশগুলির কৃষিতে চ্যালেঞ্জ 

​এই এক্সচেঞ্জ চালু হলে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পশ্চিমি দেশগুলির দীর্ঘদিনের একাধিপত্য সংকটের মুখে পড়বে। গত কয়েক দশক ধরে ‘শিকাগো বোর্ড অফ ট্রেড’ বিশ্ববাজারে শস্যের দাম নির্ধারণ করে ‘প্রাইস মেকার’-এর ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলি যদি নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন শুরু করে, তবে এই পশ্চিমি এক্সচেঞ্জগুলির প্রাসঙ্গিকতা দ্রুত ফুরিয়ে আসবে। এর ফলে শস্য-বাণিজ্যে ডলারের যে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল, তাতে বড় ধরনের ফাটল ধরবে।

বিশ্বের উৎপাদিত খাদ্যশস্যের প্রায় অর্ধেক নিয়ন্ত্রণকারী ‘ব্রিকস প্লাস’ জোট যদি ডলার বর্জন করে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি, এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সরাসরি সরকার-টু-সরকার বা উৎপাদক-টু-ক্রেতা যোগাযোগের পথ প্রশস্ত করবে। এর ফলে, বিশ্বজুড়ে শস্য বাণিজ্যের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণকারী সেই চার পশ্চিমি বহুজাতিক সংস্থার (ADM, Bunge, Cargill, Louis Dreyfus) মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে মুনাফা লোটার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

সর্বোপরি, রাশিয়া বা ভারতের মতো দেশগুলি যদি ‘ব্রিকস প্লাস’-ভুক্ত অন্যান্য দেশগুলিকে (যেমন মিশর বা ইথিওপিয়া) তাদের নিজস্ব মুদ্রায় সুলভে শস্য সরবরাহ নিশ্চিত করে, তবে আমেরিকান বা ইউরোপীয় কৃষকরা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন। সহজ কথায়, এই ব্যবস্থা পশ্চিমি দেশগুলির দীর্ঘকালীন ‘খাদ্য-আধিপত্য’-এর ভিতকে নাড়িয়ে দেবে। তবে এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিমি দেশগুলি সম্ভবত ইউরোপীয় ‘গ্রিন ডিল’-এর মতো কঠোর পরিবেশগত নীতিগুলিকে নতুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। সেখানে অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ বা পরিবেশগত মানদণ্ডের অজুহাতে ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলির শস্যের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হতে পারে। এই রেষারেষির হাত ধরেই বিশ্ববাজারে এক নতুন ধরনের ‘সবুজ বাণিজ্য যুদ্ধ’ (‘Green Trade War’) শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। শস্যের এই নতুন রাজনীতি প্রকারান্তরে বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটাতে চলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে– ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ কি ভারতীয় কৃষকের জন্য বিশেষ কোনও সুযোগ বয়ে আনবে? না কি তাদের এক নতুন সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করাবে?

​সুযোগ বনাম অস্তিত্বের লড়াই 

ভারতের খাদ্য নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করতে এই ব্যবস্থা এক অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। কীভাবে? তা দেখে নেওয়া যাক। ভারত প্রায়ই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য সংকটের মুখে পড়ে, কখনও গম রফতানি বন্ধ করতে হয়, তো কখনও ডাল আমদানি করতে হয়। এই এক্সচেঞ্জ চালু হলে সংকটের সময় সরাসরি ‘ব্রিকস প্লাস’-এর বাকি দেশগুলির কাছ থেকে সহজ শর্তে খাদ্যশস্য আমদানি করা সম্ভব হবে, যা ভারতের খাদ্য-নিরাপত্তাকে এক শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করাবে। অন্যদিকে, রফতানির ক্ষেত্রেও খুলবে নতুন দিগন্ত। ‘ব্রিকস প্লাস’ জোটে মিশর, ইথিওপিয়া বা আরব আমিরশাহীর মতো দেশগুলির অন্তর্ভুক্তি ভারতীয় কৃষকদের সামনে বাসমতী ও সাধারণ চালের এক সুবিশাল বাজার উন্মোচিত হবে। সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট কমবে, ফলে আমাদের কৃষকরা ফসলের প্রকৃত লাভের মুখ দেখতে পাবেন। স্বাভাবিকভাবেই, পশ্চিমি দেশগুলির মর্জির ওপর নির্ভর না-করে ভারত বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য ও স্থায়ী বাণিজ্যিক অংশীদার খুঁজে পাবে।

অত্যাধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি

তবে এই ব্যবস্থার একটি নেতিবাচক দিকও আছে, যা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ভারত মূলত প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকদের দেশ, অন্যদিকে রাশিয়া বা ব্রাজিলের কৃষিব্যবস্থা বিশাল খামারভিত্তিক এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তি-নির্ভর। এই উচ্চ প্রযুক্তির কারণে সেখানে উৎপাদন ব্যয় অনেক কম। যদি ব্রিকস এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে সেখান থেকে অত্যধিক সস্তায় শস্য ভারতীয় বাজারে ঢুকতে শুরু করে, তবে দেশীয় কৃষকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষে দেশীয় চাষিদের স্বার্থরক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি এক গভীর সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।

কৃষি-প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা

রাশিয়ার কাজান সম্মেলন এবং পরবর্তী টেকনিক্যাল কমিটিগুলির আলোচনা থেকে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে– ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলি একে অপরকে কেবল শস্য সরবরাহ করবে না, বরং শস্য উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে কারিগরি সহায়তাও দেবে। আসলে, ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ শুধু একটি বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্মই নয়, এটি সদস্য দেশগুলির মধ্যে উন্নত কৃষি-প্রযুক্তি আদান-প্রদানের এক অনন্য মঞ্চও বটে।

​রাশিয়া বর্তমানে উন্নত কৃষি-প্রযুক্তি এবং কৃষিতে এআই-চালিত যন্ত্রপাতির ব্যবহারে বিশ্বের প্রথম সারিতে রয়েছে। প্রযুক্তিগত এই উৎকর্ষ ভারতের ‘প্রিসিশন ফার্মিং’-এর ক্ষেত্রে বড় পাওনা হতে পারে। ভারতের পঞ্জাব ও হরিয়ানার মতো বড় খামারগুলিতে যেখানে শ্রমিকের অভাব প্রকট, সেখানে এই রুশ প্রযুক্তির স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি চালু করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। এছাড়া রাশিয়ার অত্যাধুনিক কৃষি ড্রোনগুলি মাটির গুণাগুণ মাপতে ও নিখুঁতভাবে ওষুধ ছড়াতে অত্যন্ত দক্ষ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত এই প্রযুক্তি মাটির সঠিক চাহিদা অনুযায়ী ওষুধের সুনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগ নিশ্চিত করে এবং এর ব্যবহারকে সীমিত রাখে, যা প্রকারান্তরে চাষের খরচ অনেকটাই কমিয়ে দেয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই আধুনিক প্রযুক্তি চাষের খরচ প্রায় ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে সক্ষম– যা বর্তমানে ভারতের জাতীয় কৃষি নীতিতেও বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

টয়োটার ফ্লেক্সিবল ফুয়েল মডেলের প্রথম গাড়ি

​প্রযুক্তিগত সহযোগিতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল ব্রাজিলের ‘ফ্লেক্স-ফুয়েল’ প্রযুক্তি ও জৈব-সার মডেল। ভারত বর্তমানে ব্রাজিলের এই বিশেষ প্রযুক্তি আমদানিতে অত্যন্ত আগ্রহী, যা কৃষিজাত বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনে সহায়ক হবে। পাশাপাশি, ব্রাজিলের উন্নত জৈব-সার বা বায়ো-ফার্টিলাইজার প্রযুক্তি ভারতের মাটির স্বাস্থ্য ফেরাতে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বিশেষ সাহায্য করবে। অর্থাৎ, নিজেদের মধ্যে প্রযুক্তির হাতবদল ঘটিয়ে পশ্চিমি দেশগুলির পেটেন্ট-করা দামি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং প্রযুক্তিগতভাবে স্বনির্ভর হয়ে ওঠাও এই গ্রেন এক্সচেঞ্জের অপর এক লক্ষ্য।

এই প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক পরিবর্তনের পাশাপাশি ‘ব্রিকস প্লাস’-এর এই নতুন উদ্যোগ ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়নেও এক নতুন দিশা দেখাতে পারে।

গ্রামীণ অর্থনীতি ও নারীর ক্ষমতায়ন 

‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলির এই নতুন কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হল– গ্রামীণ অর্থনীতিতে ‘নারী কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি’-র মাধ্যমে এক নতুন জোয়ার আনা। ভারতের কৃষি ব্যবস্থায় এক করুণ বাস্তবতা হল– নারীরা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও, জমির মালিকানা বা দলিল তাঁদের নামে থাকে না। ফলে, ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ পাওয়া তাঁদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই অচলায়তন ভাঙতে, ‘ব্রিকস প্লাস’ রাষ্ট্রগুলি ‘BRICS Pay’-এর মতো ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। এর পরবর্তী লক্ষ্য হল একটি ‘ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং’ ব্যবস্থা চালু করা। এই পদ্ধতিতে জমির দলিলের বদলে চাষির দক্ষতা এবং ফসলের সম্ভাব্য ফলন দেখে সরাসরি ঋণ দেওয়া হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের কোটি কোটি ভূমিহীন নারী-কৃষকের সামনে এক নতুন দিগন্ত খুলে যাবে।

একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকি মোকাবিলায় রাশিয়া ও চিন বর্তমানে এমন কিছু উন্নত বীজ আবিষ্কার করেছে, যা প্রচণ্ড খরা বা অতিরিক্ত তাপেও নষ্ট হবে না। ‘ব্রিকস প্লাস’ জোটের আওতায় যদি এই বীজের একটি ‘কমন সিড ব্যাংক’ (Common Seed Bank) তৈরি করা যায়, তবে ভারতের প্রান্তিক চাষিরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে এক শক্তিশালী রক্ষাকবচ পাবেন।

সিড ব্যাংক

​এর পাশাপাশি, কৃষি-প্রযুক্তিতে লিঙ্গ-বৈষম্য দূর করার বিষয়টিও এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। নারী কৃষকদের শারীরিক গঠন ও প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে বিশেষভাবে তৈরি হালকা ও সাশ্রয়ী কৃষি যন্ত্রপাতি বাজারে আনার যে উদ্যোগ ‘ব্রিকস প্লাস’ নিয়েছে, তা সফল হলে ভারতের গ্রামীণ নারীদের শারীরিক পরিশ্রম কমবে এবং উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়বে। মূলত, ২০২৬ সালের ‘আন্তর্জাতিক নারী কৃষক-বর্ষ’-কে কেন্দ্র করে ‘ব্রিকস প্লাস’-এর এই আর্থিক ও কারিগরি ভাবনাগুলি ভারতের কৃষি-কাঠামোয় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

​অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ 

​ব্রিকস গ্রেন এক্সচেঞ্জ– শস্যের এই নতুন রাজনীতি ভারতের সামনে যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, তেমনই বয়ে এনেছে কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। একদিকে এটি আমেরিকা-নির্ভরতা থেকে ভারতকে মুক্তি দিয়ে জাতীয় খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে; অন্যদিকে, ‘ব্রিকস প্লাস’ দেশগুলির মধ্যে আমদানি পুরোপুরি অবাধ হয়ে যাওয়ার ফলে রাশিয়ার বিশাল ও যন্ত্রচালিত খামারভিত্তিক কৃষির সামনে ভারতের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তবে এই কঠিন চ্যালেঞ্জকে সুযোগে রূপান্তর করার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে ভারতের নিজস্ব সমবায় মডেল এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঠিক ব্যবহারের মধ্যে। এই শক্তির ওপর ভর করেই নতুন বাজারগুলিতে যেমন রফতানি  বাড়াতে হবে, তেমনই আবার আমদানির ক্ষেত্রে এমন এক ‘নিরাপত্তা বেষ্টনী’ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভিনদেশি সস্তা শস্যের দাপটে দেশের প্রান্তিক কৃষকরা সর্বস্বান্ত না হন। তবেই ভারতীয় কৃষিতে সাফল্য আসবে। 

পরিশেষে বলা যায়, শস্যের এই নতুন বিন্যাস কেবল ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর উত্থান নয়, বরং পশ্চিমের ‘ফুড হেজিমনি’ বা খাদ্য-আধিপত্যের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার এক সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে খাদ্য যখন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার, তখন ভারতের কৌশল হওয়া উচিত দ্বিমুখী– একদিকে প্রান্তিক চাষিদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে বিশ্ববাজারে রফতানির প্রসার ঘটানো। ‘ব্রিকস প্লাস’-এর এই নতুন মেরুকরণ এবং পশ্চিমি দেশগুলির সম্ভাব্য পাল্টা পদক্ষেপ– সব মিলিয়ে আগামী দিনে কৃষি-বাণিজ্যকে ঘিরে এক নতুন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন দেবাশিস মিথিয়া-র অন্যান্য লেখা

…………………..