Robbar

ডিমক্রেসি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 6, 2026 4:16 pm
  • Updated:June 6, 2026 6:04 pm  

কোনও প্রতিবাদের লক্ষ্য সবসময় প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে আঘাত করা নয়। অনেক সময় তাকে জনসমক্ষে বিব্রত করা, তার সামাজিক মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো বা তাকে হাস্যকর করে তোলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। ডিম এই কাজটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে করতে পারে। কারণ, একটি ডিমের আঘাতে গুরুতর শারীরিক ক্ষতি না-হলেও, জনসমক্ষে কারও গায়ে ডিম ফেটে যাওয়ার দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে তাকে উপহাসের কেন্দ্রে পরিণত করে। ফলে ডিম এক ধরনের প্রতীকী অস্ত্র, যার লক্ষ্য শরীরের চেয়ে বেশি ব্যক্তির ভাবমূর্তি।

আদিত্য ঘোষ

ডিম! স্বল্পমূল্যের এই পুষ্টিকর খাদ্যটি ইদানীং হয়ে উঠেছে ক্ষোভের হাতিয়ার। ‘সানডে হো ইয়া মনডে, রোজ খাও আন্ডে’– এই ট্যাগলাইন বদলে হয়েছে, ‘সানডে হো ইয়া মনডে, রোজ ফেকো আন্ডে’।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার মাটিতে ডিম হয়ে উঠেছে আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ। যে-ডিম গ্লাসে কটকট ফটফট আওয়াজ করে ফেটিয়ে অমলেট বানানো যায়, সেই ডিম ছুড়ে সহজেই ক্ষোভ মেটানো যায়। একদিকে গ্লাসে ফাটানো ডিম যে অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ করে, অপরদিকে ডিম ছোড়াও ডোপানিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়। কিছু হলেই ডিম ছোড়ো! দুর্নীতির দায়ে নেতা-মন্ত্রীরা যখন জেলযাত্রা করছেন, তখন সাধারণ জনগণ ডিম ছুড়ে তাদের হতাশা পূরণ করছেন। দু’দলের মারপিট হচ্ছে। একে অন্যকে ডিম ছুড়ে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। ডিম ছাড়া এখন বাংলার রাজনীতি অচল। যদিও এর আগেও বাংলার রাজনীতির আঙিনায় ডিম ছিল এক অনন্য আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তখন ডিমের কদর ছিল ওপরে। এখন সেই ডিমকেই নিয়েই লোফালুফি খেলা হচ্ছে। বাংলার রাজনীতির মতো বর্তমানে ডিমকে নিয়ে এমন লীলাখেলা যে শেষ কবে দেখা গিয়েছে, কে জানে! তবে শুধুমাত্র বাংলার রাজনীতি বলে নয়, ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশে ডিমকে হাতিয়ার করার ইতিহাস বহু প্রাচীন।

ডিম ছোড়ার আদিম সূত্রপাত প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের থিয়েটারগুলোতে। সেখানে কোনও অভিনেতার নিম্নমানের অভিনয় বা নাটকের বিষয়বস্তু পছন্দ না-হলে, দর্শকরা তাৎক্ষণিক অসন্তোষ প্রকাশ করতেন মঞ্চে থাকা শিল্পীদের লক্ষ্য করে পচা ডিম ও শাকসবজি ছুড়ে। পরবর্তীতে মধ্যযুগীয় ইউরোপে, বিশেষ করে চোদ্দো থেকে আঠারো শতক পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে, এই প্রথাটি অপরাধের শাস্তির অঙ্গ হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি রূপ পায়। যেখানে অপরাধীদের ‘পিলোরি’ নামক কাঠের ফ্রেমে হাত ও মাথা আটকে শহরের ব্যস্ত মোড়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হত এবং সমবেত সাধারণ মানুষকে তাদের সামাজিকভাবে চরম হেনস্তা ও অপদস্থ করতে পচা ডিম, আবর্জনা ও পচা ফল ছুড়ে মারার বৈধ অনুমতি দেওয়া হত। ১৮৩৭ সালে যুক্তরাজ্যে এই অমানবিক ‘পিলোরি প্রথা’ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলে সাধারণ মানুষ এই পদ্ধতিটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিজেদের হাতে তুলে নেয়।

উনিশ শতকের দিকে ব্রিটিশ নির্বাচনী সংস্কৃতিতে অপছন্দের প্রার্থীদের লক্ষ্য করে ডিম বা পচা টমেটো ছোড়া এতটাই নিয়মিত রূপ নেয় যে, তৎকালীন সমাজ একে ভোটারদের স্বাভাবিক ও বৈধ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে মেনে নিয়েছিল। বিশ শতকে এসে এই প্রথাটি পুরোপুরি বৈশ্বিক রাজনৈতিক প্রতিবাদের রূপ ধারণ করে। যার অন্যতম বড় নজির দেখা যায় ১৯১৭ সালে, যখন যুক্তরাজ্যের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ নারীদের ভোটাধিকার আন্দোলনের বিরোধিতা করায় আন্দোলনকারী নারীরা সরকারি সভায় তাঁর ওপর ডিম ছুড়ে মারে। এর কিছুদিন পর, ১৯৩২ সালে গ্রেট ডিপ্রেশন বা চরম অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হার্বার্ট হুভার যখন নির্বাচনী প্রচারে বের হন, তখন ক্ষুধার্ত সাধারণ মানুষ তাঁর ট্রেন লক্ষ্য করে পচা ডিম ও শাকসবজি ছুড়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে।

একুশ শতকে এই ‘এগিং’ সংস্কৃতি সংবাদমাধ্যমে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে নেতাদের অহংকার ভাঙার হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার প্রমাণ মেলে ২০০১ সালে যখন যুক্তরাজ্যের উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকট নির্বাচনী প্রচারে এক বিক্ষোভকারীর ডিমের আঘাতে জর্জরিত হন এবং তৎক্ষণাৎ প্রটোকল ভেঙে ওই বিক্ষোভকারীকে পাল্টা ঘুসি মেরে বসেন। ২০০৩ সালে হলিউড-তারকা আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারও ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর পদের নির্বাচনী প্রচারের সময় ছোড়া ডিমের শিকার হন। তবে রসিকতা করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন শোয়ার্জনেগার।

তবে সবচেয়ে চর্চিত ঘটনাটি ঘটে ২০১৯ সালে, যখন নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্ট চার্চের মসজিদে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর অস্ট্রেলিয়ার সেনেটর ফ্রেজার অ্যানিং মুসলিম বিদ্বেষী মন্তব্য করেন এবং এর প্রতিবাদে মেলবোর্নে একটি লাইভ সাক্ষাৎকার চলাকালীন ১৭ বছর বয়সি কিশোর উইল কনোলি (‘এগ বয়’ নামে পরিচিত) ওই সেনেটরের মাথার পিছনে ডিম ভেঙে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে ডিম ছোড়ার নায়ক হয়ে ওঠে। ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের রাজা চার্লস এবং কুইন কনসর্ট ক্যামিলা ইয়র্ক শহরে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেলে রাজতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলনকারীরা তাদের লক্ষ্য করে ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ জানায়। সুতরাং, প্রাচীন থিয়েটার থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় শাস্তি, উনিশ শতকের নির্বাচনী মাঠ কিংবা আধুনিক গণমাধ্যমের যুগ, কোনও গুরুতর শারীরিক ক্ষতি না-করে জনসমক্ষে প্রতিপক্ষকে চরমভাবে লজ্জিত, অপদস্থ ও তাদের সামাজিক মর্যাদা ধূলিসাৎ করার এক সস্তা, সহজলভ্য এবং তীব্র প্রতীকী ভাষা হিসেবে ডিম ছোড়ার এই ইতিহাস যুগ যুগ ধরে টিকে রয়েছে।

ডিম ছোড়া হয়েছিল আর্নল্ড শোয়ার্জনেগারের ওপরও

ডিমকে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে শুধু এর সহজলভ্যতা বা কম দাম কারণ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক প্রতীক এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে বিদ্রুপের দীর্ঘ ইতিহাস। মনোবিজ্ঞানীরা মনে করেন, কোনও প্রতিবাদের লক্ষ্য সবসময় প্রতিপক্ষকে শারীরিকভাবে আঘাত করা নয়। অনেক সময় তাকে জনসমক্ষে বিব্রত করা, তার সামাজিক মর্যাদাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো বা তাকে হাস্যকর করে তোলাও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। ডিম এই কাজটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে করতে পারে। কারণ, একটি ডিমের আঘাতে গুরুতর শারীরিক ক্ষতি না-হলেও, জনসমক্ষে কারও গায়ে ডিম ফেটে যাওয়ার দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে তাকে উপহাসের কেন্দ্রে পরিণত করে। ফলে ডিম এক ধরনের প্রতীকী অস্ত্র, যার লক্ষ্য শরীরের চেয়ে বেশি ব্যক্তির ভাবমূর্তি।

ডিমের ভঙ্গুরতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ডিম খুব সহজে ভেঙে যায়, আর সেই ভেঙে যাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি প্রতীকী-বার্তা। প্রতিবাদকারী যেন বলতে চায়, যে ক্ষমতা বা কর্তৃত্বকে এতদিন অটুট বলে মনে করা হত, তা আসলে ততটা শক্তিশালী নয়। একটি সাধারণ ডিমই তার মর্যাদার আবরণে ফাটল ধরিয়ে দিতে পারে। এই কারণেই ডিম নিক্ষেপ অনেক সময় ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতীকী প্রতিরোধ হিসেবে দেখা হয়

খাদ্যবস্তু হিসেবে ডিমের আরেকটি সাংস্কৃতিক তাৎপর্য রয়েছে। মানবসমাজে একসঙ্গে খাবার খাওয়া বা খাদ্য ভাগ করে নেওয়া গ্রহণযোগ্যতা, বন্ধুত্ব এবং সামাজিক সম্পর্কের প্রতীক। তার বিপরীতে খাদ্য নিক্ষেপ করা বোঝায় প্রত্যাখ্যান ও অসন্তোষ। অর্থাৎ, ডিম ছোড়া কেবল ক্ষোভ প্রকাশ নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক বার্তা, যার মাধ্যমে বলা হয় যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তার বক্তব্য আর জনসমর্থনের যোগ্য নয়। বিশেষ করে পচা ডিম ব্যবহারের ঐতিহ্য এই অর্থকে আরও স্পষ্ট করে। পচা ডিমের দুর্গন্ধ যেন প্রতীকীভাবে জানিয়ে দেয়, যে ব্যক্তি বা তার ধারণা সমাজের চোখে নষ্ট, অগ্রহণযোগ্য বা দূষিত হয়ে উঠেছে।

মনস্তত্ত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল নিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন। মানুষ যখন রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে চায়, তখন সবসময় সহিংসতার আশ্রয় নেয় না। বরং এমন একটি উপায় খোঁজে, যাতে ক্ষোভও প্রকাশ পায়, আবার প্রাণঘাতী সংঘাতও সৃষ্টি না-হয়। ডিম সেই ভারসাম্যটি তৈরি করে। এটি প্রতিবাদকারীকে আক্রমণের অনুভূতি দেয়, কিন্তু একইসঙ্গে তাকে তুলনামূলকভাবে অহিংস সীমার মধ্যেও রাখে। ফলে ডিম নিক্ষেপ এক ধরনের সামাজিকভাবে স্বীকৃত প্রতীকী আগ্রাসনে পরিণত হয়েছে। এই কারণেই ইতিহাসের নানা সময়ে পাথর, লাঠি বা অস্ত্রের বদলে ডিম বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ডিমের শক্তি তার আঘাতে নয়, তার বার্তায়। এটি একইসঙ্গে বিদ্রুপ, প্রত্যাখ্যান, অপমান এবং প্রতিরোধের ভাষা বহন করে।

ডিমের রাজনৈতিক যাত্রাপথে অর্থনীতিরও একটি মজার ভূমিকা রয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ডিম জনপ্রিয় হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ ছিল এর সহজলভ্যতা ও তুলনামূলক কম দাম। পাথর বা লাঠি আঘাত করতে পারে, কিন্তু ডিম অপমান করতে পারে। আর সেই অপমানের খরচও খুব বেশি নয়। তাই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা এই খাদ্যবস্তুটি ধীরে ধীরে ক্ষোভ প্রকাশের এক গণতান্ত্রিক অস্ত্রে পরিণত হয়। তবে সময় বদলেছে, বদলেছে ডিমের বাজারও। একসময় যে ডিমকে গরিবের প্রোটিন বলা হত, আজ মূল্যবৃদ্ধির বাজারে সেই ডিমও অনেক পরিবারের কাছে হিসেব কষে কেনার জিনিস। ফলে একটি মজার প্রশ্নও উঠে আসে। প্রতিবাদের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির প্রভাব কতটা? যে ডিম একসময় ক্ষোভ প্রকাশের সস্তা মাধ্যম ছিল, তার দাম যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে কি প্রতিবাদকারীদেরও নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে?

এই প্রশ্ন যতটা রসিকতার, ততটাই সমাজতাত্ত্বিক। কারণ ডিম ছোড়ার ঘটনাগুলি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে অর্থনীতির প্রভাব শুধু রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা কখনও কখনও রাজপথের প্রতিবাদের ভাষাকেও বদলে দিতে পারে। বাংলার রাজনীতিতে ডিমের উপস্থিতি এক অদ্ভুত বিবর্তনের গল্প বলে। একসময় ডিম ছিল পুষ্টি, জনকল্যাণ এবং উন্নয়ননীতির প্রতীক। নয়ের দশক থেকে শুরু করে দীর্ঘ সময় ধরে স্কুলের মিড-ডে মিল প্রকল্পে ডিম অন্তর্ভুক্ত করা, দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ এবং প্রোটিনের সহজলভ্য উৎস হিসেবে ডিমকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক ও নীতিনির্ধারণ হয়েছে। কোন জেলায় সপ্তাহে কতদিন ডিম দেওয়া হবে, ডিমের পরিবর্তে অন্য খাদ্য দেওয়া উচিত কি না, এসব প্রশ্নও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে বাজারে ডিমের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সূচক হিসেবে সামনে আসে। পেঁয়াজ, আলু কিংবা রান্নার গ্যাসের মতো ডিমও হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ডিমের সামাজিক পরিচয় আবার বদলে যায়। এখন তা কেবল খাদ্য নয়, প্রতিবাদ ও বিদ্রুপেরও ভাষা।

রাজনৈতিক নেতা, মন্ত্রী বা বিরোধী শিবিরের কর্মীদের লক্ষ্য করে ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ক্রমশ বেড়েছে, আর সামাজিক মাধ্যমের যুগে সেই দৃশ্য মুহূর্তের মধ্যে জনমানসে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বাংলার রাজনীতিতে ডিম আজ এক বিরল দ্বৈত পরিচয়ের অধিকারী। একদিকে এটি গরিবের প্রোটিন, অন্যদিকে ক্ষুব্ধ জনতার প্রতীকী অস্ত্র। পুষ্টির থালা থেকে রাজপথ পর্যন্ত ডিমের এই যাত্রা আসলে বাংলার সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরই এক অনন্য প্রতিচ্ছবি।

ডিমের ইতিহাস আসলে কেবল একটি খাদ্যদ্রব্যের ইতিহাস নয়। এটি জনরোষ, বিদ্রুপ, অপমান এবং প্রতিবাদেরও ইতিহাস। যে ডিম একসময় মানুষের পাতে প্রোটিন জুগিয়েছে, শিশুর পুষ্টির প্রতীক হয়েছে, সেই ডিমই আবার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্ষমতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভের ভাষা হয়ে উঠেছে। প্রাচীন রোমের থিয়েটার থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চ, ডিম বারবার প্রমাণ করেছে, প্রতিবাদের শক্তি সবসময় বড় অস্ত্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। অনেক সময় একটি ছোট্ট ডিমই হাজার স্লোগানের চেয়ে বেশি বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।

তবে এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে এক ধরনের সামাজিক বিদ্রুপও রয়েছে। যে দেশে এখনও বহু মানুষ ডিমকে পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস বলে মনে করেন, সেই সমাজেই ডিম ক্রমশ রাজনৈতিক ক্ষোভের উপকরণে পরিণত হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে কোনও সভামঞ্চে উড়ে আসা ডিম দেখলে তাকে শুধুই একটি খাদ্যবস্তু বলে ভাববেন না। তার খোলসের ভিতরে হয়তো লুকিয়ে আছে বহু বছরের জমে থাকা ক্ষোভ, ব্যঙ্গ এবং প্রতিবাদের এক নিঃশব্দ ইতিহাস।

………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন আদিত্য ঘোষ-এর অন্যান্য লেখা

………………..