Robbar

রাজনীতির কীটনীতি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 15, 2026 12:09 pm
  • Updated:June 15, 2026 12:09 pm  

দলটার সবকিছুই আবার অসম্ভবের উঁচু তারে বাঁধা। দলের পাঁচ দফা ইশ্‌তাহারে তারা বলে দিয়েছে অবসরের পর কোনও বিচারপতির রাজ্যসভার সদস্য হওয়া না-মুমকিন, তালিকা থেকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে হাতকড়া পড়বে খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারেরই হাতে, তেমনই আবার যেসব সাংসদ বা বিধায়ক নিজের মর্জিমাফিক দলের জার্সি বদলাবেন, পরের ২০ বছরের জন্যে তাঁর বাতিল হয়ে যাবে ভোটে দাঁড়াবার বা কোনও সরকারি তখ্‌তে বসার ছাড়পত্র।

কৃষ্ণ শর্বরী দাশগুপ্ত

রান্নাঘরে তাকের নিচে অন্ধকারে বসে পচা আমের টুকরোটাকে বাগিয়ে ধরে বেশ তারিয়ে তারিয়ে খাচ্ছিল সে। হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এল একটা ফচকে উচ্চিংড়ে। আর এসেই– যেমন স্বভাব ওদের– অকারণ লাফালাফি জুড়ে দিয়ে বলতে লাগল, ‘কী কাকু, মেজাজটা বেশ ফুরফুরে মনে হচ্ছে! তা তোমাদেরই তো পোয়াবারো এখন, পচাধসা জিনিস আর খাচ্ছ কেন? গাড়িগাড়ি ভালোমন্দ খাবারদাবার এই এল বলে।’ আড়চোখে ছোকরাকে একবার দেখে নিতে গিয়ে তার অনুশোচনা হল। বয়সকালে না-জানি এরই কত পূর্বপুরুষের প্রাণহীন দেহ তেলেভাজার মতো আয়েসে কুড়মুড় করে খেয়েছে সে, তবে এখন এই শেষ বয়সে আমিষে আর রুচি হয় না। তা নয় নয় করে এক বছর আট মাস বয়স হতে চলল কি না। তাদের প্রজাতির যা গড় আয়ু, তাতে আর বড়জোর মাস তিন-চার। বিচ্ছুটা সেটা জানে বলেই মাঝেমধ্যে দেখা হলে নির্ভয়ে এসে গল্প জোড়ে। 

–উফ, একেবারে খবরের কাগজের প্রথম পাতায়, অ্যাঁ! কেউ কখনও ভাবতে পেরেছে, পোকা-মারা ওষুধের বিজ্ঞাপনে ছাড়া আমাদের পোকামাকড়দের কথা এত বড় করে ছাপবে মানুষের কাগজে? কাকে যে ফিটিং করেছিল তোমাদের হাইকম্যান্ড!

কচি বয়সের চাপল্য ভেবে এতক্ষণ চুপচাপ শুনে যাচ্ছিল সে, এবার ‘ফিটিং’ কথাটা কানে যেতেই মাথাটা তেতে উঠল ঝট করে। ‘মুখ সামলে কথা বলো, খোকা। আমাদের জাতের ইতিবৃত্ত জানা আছে কিছু? এই পৃথিবীতে মানুষ জাতটা উড়ে এসে জুড়ে বসার বহু আগে থেকেই রাজ করছি আমরা। সে আজ ৩০ কোটি বছর আগের কথা। কত প্রাণী এল-গেল, আমাদের নিশ্চিহ্ন করতে পারল কেউ? অবশ্য করবেই বা কী করে! তোমাদের আন্টিরা, মানে আমাদের গিন্নিরা এক জীবনকালে মোটামুটি তিন থেকে চারশো পর্যন্ত ডিম পাড়তে পারেন। এই রক্তবীজের ঝাড়কে নির্মূল করে কার সাধ্যি? আমাদের নিয়ে তো অনেক আগেই মহাকাব্য লেখা উচিত ছিল। তাও যে মানুষের এতদিনে টনক নড়েছে এটাই মন্দের ভালো।’ 

তরুণ উচ্চিংড়েটি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে তিড়িং-বিড়িং করতে পর্যন্ত ভুলে গিয়েছিল। সে এবার সামনের দু’-ঠ্যাং জোড়া করে অবাক বিস্ময়ে বলল, ‘পেন্নাম হই কাকু, কত জানো তুমি! আমাদের পরিবারে এমন গল্প কখনও শুনিনি।’ 

পরিপূর্ণ আত্মপ্রসাদে চকচকে মেহগিনি রঙের পাখনাটা একটু ঝেড়ে নিয়ে সে বলে, ‘আরে বাবা, এমন যুগ-যুগান্তের ঐতিহ্য থাকলে তো শুনবে! তবে আমরাও কি আর জানতাম, এসবই আমাদের মহাপ্রাজ্ঞ আশুখুড়োর উদ্ধার করা তথ্য। আরশোলা-কুলে উনি এক ক্ষণজন্মা যুগাবতার।’ বলতে বলতে তার গলা ধরে আসে। ‘যে বাড়িতে খুড়োর জন্ম– মানে, আবির্ভাব আর কী, সেখানে ছিল ঘরভর্তি বইপত্র। মা ষষ্ঠীর কৃপায় খুড়োর পরিবারটির কলেবরও কিছু কম না। তা ওই কাগজের আস্তানায় তাদের খাওয়ার কোনও কষ্ট ছিল না। সে বাড়ির ছোট ছেলেটিকে তার মা সকাল-সন্ধে রোজ পড়াতে বসে। খুড়ো দিস্তে দিস্তে পত্রপত্রিকা চিবতে চিবতে শোনে। শুনতে শুনতে তার অক্ষর পরিচয় হয়ে গেল। অসীম অধ্যবসায়ে ধীরে ধীরে পড়তেও শিখে গেল। ব্যস, আর সে কাগজ খেতে পারে না। বই-কাগজ দেখলেই খালি তখন পড়তে ইচ্ছে করে। একদিন ওই বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেল। বইপত্র সব তারা দিয়ে গেল একটা লাইব্রেরিতে। খুড়োর পরিবারের অনেকেই বইয়ের সঙ্গে প্যাকিং বাক্সে করে এসে পড়ল বইয়ের সেই আরও বড় সমুদ্দুরে। খুড়ো এ বই থেকে ওই বইয়ে গিয়ে বসেন, আর নাওয়া-খাওয়া ভুলে পড়তে থাকেন। জানো তো, আমরা একটানা একমাসও না-খেয়ে থাকতে পারি, জল ছাড়া থাকতে পারি এক সপ্তাহ।’

–বল কী গো! আমার তো একটা বেলাও পোকা না-খেয়ে চলে না। 

উচ্চিংড়ের দিকে তাকিয়ে সে করুণার হাসি হাসল। ‘এতেই অবাক হচ্ছ? গুপী গাইনের সেই গানটা জানা আছে– ‘মুন্ডু গেলে খাবটা কী?’ যেহেতু আমরা সারা শরীরে ছড়িয়ে থাকা ছিদ্র দিয়ে নিঃশ্বাস নিই, আর আমাদের শরীরের রক্ত সংবহন বা স্নায়ুর কাজকর্ম কোনওটাতেই মাথার কোনও ভূমিকা নেই, তাই মুন্ডু কেটে নিলেও আমরা কিন্তু দিনসাতেক অবধি বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকতে পারি।’

–লেগডাস্ট দাও, কাকু। এহেন আশ্চর্য জীবকে নিয়ে মানুষের সমাজে, রাজনীতিতে তোলপাড় হবে না তো হবেটা কাকে নিয়ে!

–না হে, তোলপাড় যে হচ্ছে, সে ঠিক আমাদের নিয়ে নয়, আমাদের সঙ্গে মানুষের তুলনা টানা নিয়ে। ভারতের সুপ্রিমকোর্টের মাননীয় জজসাহেব না কি রাগের চোটে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন, ‘দেশের বেকার, আলসে তরুণেরা এক-একজন চাকরি-বাকরি না পেয়ে সাংবাদিকতা, সামাজিক মাধ্যম কিংবা তথ্যের অধিকার আইনের সব দিগ্‌গজ বনে যাচ্ছে আর পরজীবী আরশোলার মতো সমাজব্যবস্থাটাকে ভেতর থেকে আক্রমণ করে একেবারে ধ্বংস করে দিচ্ছে।’ ব্যস! গোঁসা হয়ে গেল বাবুদের। তাঁরা হলেন জীবশ্রেষ্ঠ, মনিষ্যি বলে কথা, তাঁদের কি না ঘিনঘিনে আরশোলার সঙ্গে এক দাঁড়িপাল্লায় বসানো! দু’পেয়েগুলোর কী আস্পর্ধা! বলে কি না সমাজকে আমরা কুরেকুরে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছি? এদিকে সেই সমাজটারই যে শিকড় পর্যন্ত আলগা হয়ে আছে তাদেরই বজ্জাত স্যাঙাতদের মুঠোমুঠো দুর্নীতি আর অনাচারে– তার বেলা!
গোটা নেট-দুনিয়ায় শুরু হয়ে গেল প্রলয়-নেত্য, চাপান-উতোর, শাসক আর শাসিতের রাজনীতি। লাগ ভেলকি লাগ। হাল এতটাই খারাপের দিকে যেতে লাগল যে শেষমেশ বিচারপতিকে পর্যন্ত সাফাই গাইতে হল, ‘আরে বাবাসকল, তোমাদের বলিনি, ভুয়ো ডিগ্রি নিয়ে যারা আইন বা সাংবাদিকতার মতো সম্মানজনক পেশায় নাক গলিয়ে তাকে কলুষিত করছে, আরশোলা বলেছি তাদের।’ তা সে তিনি যাকে যা-ই বলে থাকুন না কেন, শুনতে ভারি বয়েই গেছে জনগণের, তাদের চাই ‘ইস্যু’। কে না জানে, মুখ থেকে কথা একবার যে-ই না বেরিয়ে গেছে, অমনি সে ‘পাবলিক প্রপার্টি’, জনগণেশের হাতের মোয়া। বিধানসভা ভোটের ঝকমারি মোটামুটি মিটে যাবার পর যে-ই না পরিস্থিতিটা একটু পেঁপের তরকারির মতো মিইয়ে আসছিল, আমাদের পাতলা ডানার ফরফরানিতে ডজন ডজন খবরের কাগজ, টিভি চ্যানেল আর নেট-জমানা যেন গা-ঝাড়া দিয়ে ‘কামেন ফাইট, কামেন ফাইট’ বলে আস্তিন গুটিয়ে চনমনিয়ে উঠল।

–যা-ই বল, কাকু, আরশোলার সঙ্গে তুলনা করতেই লোকগুলো যে খেপচুরিয়াস হয়ে উঠল, এটা কিন্তু ঠিক নয়। এমন প্রাচীন একটা মহাপ্রাণী বলে কথা! মানুষের সমাজে দেখেছি, বিশেষ করে ন্যাকা মেয়েগুলো, আরশোলা দেখলে নিজেরাই এমন ওড়াউড়ি শুরু করে যে হাড়পিত্তি জ্বলে যায়।

–ওই ভয়টার একটা নাম আছে, ‘ক্যাটসারিডাফোবিয়া’। অথচ দ্যাখ, আমরা কেমন সর্বংসহা অহিংস, এত যে খাবারে বিষ দিয়ে রাখছে, হিট স্প্রে করছে, ঝাঁটা নিয়ে তাড়া করছে, পেস্ট-কন্ট্রোল ডাকছে, তবু সচরাচর তেমন কামড়াইও না। সেদিন দেখি, নালার ধরে পেটমোটা বিটলে ব্যাঙটাকে দেখে এক আদুরি ‘ছো ছুইইত’ বলে একেবারে গলে পড়ছে। পারলে কোলে নেয় আর কী! নিজে পোকা হলে টেরটি পেত ওই নচ্ছার ব্যাঙা লম্বা জিভ বার করে কপ করে যখন গিলে নিত এক নিমেষে।
আরশোলা বিতর্কের শুরুতে আমরাও বেজায় উত্তেজিত হয়েছিলাম মহান এই জাতির অসম্মানে। আশুখুড়োর নেতৃত্বে আমাদের প্রতিনিধিরা স্মারকলিপি দিতে যাবেন– সব ঠিকঠাক (এই প্রজন্মের দু’-চারটে লক্কা-মার্কা বদ-মেজাজি আরশোলা না কি আবার বেট ধরেছিল, সোজা বিচারপতির নাকে শুঁড় দিয়ে হাঁচিয়ে আসবে। আদালত অবমাননার দায়ে টিকটিকির সঙ্গে এক খাঁচায় পুরে দেবে, এই ভয় দেখিয়ে আশুখুড়ো কোনওমতে তাদের নিরস্ত করেছেন); ঠিক তখনই আমেরিকার বোস্টন থেকে ভেসে এল একটি ‘টুইট’– ‘সব আরশোলারা একজোট হলে কেমন হয়?’

–আর তখনই তো তোমাদের তেলাপোকাদের নামে আস্ত একখানা পার্টি পর্যন্ত তৈরি হয়ে গেল, তাই না? রাতারাতি জাতে উঠে গেলে তোমরা।

–অ্যাই খবরদার, ওইসব তেলতেলে অনার্য নামে ডাকবে না আমাদের। বরং সংস্কৃতে কেমন সুন্দর নাম ‘আরসক’, হিন্দিতে আদর করে বলে ‘তিলচট্টা’। সবচেয়ে পরিচিত প্রজাতির আরশোলার বৈজ্ঞানিক নাম হল, ‘পেরিপ্ল্যানেটা আমেরিকানা’।
পার্টির কথা বলছিলে না? মজাটা খেয়াল করেছ কি, এ পার্টি কিন্তু পুরোটাই বায়বীয়। মানে ‘ভার্চুয়াল’। নেট মাধ্যমেই তার জন্ম, ওয়েবসাইটে বিস্তার। পায়ের নিচে মাটি বলে কিছু নেই। তবু না কি তাদের সেই ‘হাওয়াই’ সদস্য সংখ্যা কোটি ছাড়িয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।
হ্যাঁ, যে কথা বলছিলাম। বোস্টন থেকে অভিজিৎ বলে সেই দাড়িওলা ছেলেটা যেই না একজোট হবার কথা বলল, মনটা নরম হল আমাদের বিক্ষুব্ধ নেতাদের। একমাত্র এ-ই তাহলে আরশোলা-গোষ্ঠীর জোরের জায়গাটা ঠিক ধরতে পেরেছে। একতাই তো শক্তি আমাদের। যা করি দলবেঁধে করি। খাবারের খোঁজ পেলেও দলকে ডাকি, আবার বিপদের গন্ধ পেলেও দলকে সতর্ক করি। মানুষ এত উন্নত প্রাণী, কিন্তু এই জোট বেঁধে থাকার কায়দাটা রপ্ত করতে পারেনি বলেই ওদের সভ্যতার আজ এই হাল! 

–বল কী গো! মানুষের হাল আবার বেহাল দেখলে কোথায়? বড় বড় বাড়ি, গাড়ি, ঠান্ডা মেশিন, কাপড়জামা, ভুরিভুরি খাবারদাবার…

–আরে হাঁদারাম, ওসব হল বাইরের খোলস। ভেতরটা ওদের ঝাঁঝরা। তাই তো সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকে। দুনিয়া জুড়ে যুদ্ধ, মারামারি, খুন-জখম, মেয়েদের হেনস্থা, চুরি-বাটপাড়ি, জায়গা দখল, ক্ষমতা দখলের সার্কাস আর সেইসঙ্গে আছে হরেকরকম অসুখের খোল-করতাল। সব সমস্যা ওদের নিজেদের সৃষ্টি। আমাদের মতো জোট বেঁধে থাকতে পারলে যার বেশিটাই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যেত। কিন্তু মুশকিল হল, নিজেদের ওরা সবজান্তা ভেবে বসে আছে, কারওর কাছে শিখতে মান যায়।

–তোমরা সবাই বুঝি খুব পড়াশোনা করো?

–আরে না না, আমাদের মধ্যে আশুখুড়ো– ওই একজনই। আমার নেশা টিভির খবর দেখা। সবটা বুঝতে পারি না, আমাদের চোখে সব ছবিই তো ভেঙে ভেঙে যায়। তবু যখনই খবর শুরু হয়, আমি দেওয়ালের খাঁজ কি বইয়ের ফাঁক থেকে টুকি-টুকি করে দেখে নিই। টিভিতেই তো দেখলাম, আরশোলা পার্টি প্রথম এবার নেট থেকে নেমে বিরাট সভা করল। এখন ওরা দেশের কী সব পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়া নিয়ে দেখলাম চিল্লামিল্লি করছে। এই ব্যাপারটা অবশ্য আমি ঠিক জানি না। পরীক্ষার খাতা খেয়েছি কয়েকবার, মাকড়সার জালে আত্মীয়-বন্ধুদের ফেঁসে যেতেও দেখেছি, কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসলে কেন যে একটা মন্ত্রীকে ধরে টানাটানি– সেইটা একটু আশুখুড়োর কাছে জেনে আসতে হবে।

–এই আরশোলা দলের সদস্য হবার শর্তগুলো কিন্তু ফাটাফাটি। বদ্ধ বেকার, হদ্দ কুঁড়ে, সারাদিনের অন্তত ১১ ঘণ্টা যারা কাজে-অকাজে অনলাইনে কাটায় এবং যাদের গলা ফাটিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের এলেম আছে, একমাত্র তারাই এখানে স্বাগত। অথচ গেরস্থের বাড়িতে তো দেখি কমবয়সি ছেলেপুলেদের এর কোনও একটা বদগুণ থাকলেই ‘অপদার্থ’ বলে উদয়াস্ত বাপ-জ্যাঠার গালমন্দ শুনতে হয়।

 

খবরাখবর সে-ও যে একটু-আধটু রাখে, কিশোর উচ্চিংড়ে সুযোগ পেতেই সেটা জাহির করতে ছাড়ে না।

–সিজেপি দলটার সবকিছুই আবার অসম্ভবের উঁচু তারে বাঁধা। দলের পাঁচ দফা ইশ্‌তাহারে তারা বলে দিয়েছে অবসরের পর কোনও বিচারপতির রাজ্যসভার সদস্য হওয়া না-মুমকিন, তালিকা থেকে বৈধ ভোটারের নাম বাদ গেলে হাতকড়া পড়বে খোদ মুখ্য নির্বাচন কমিশনারেরই হাতে, তেমনই আবার যেসব সাংসদ বা বিধায়ক নিজের মর্জিমাফিক দলের জার্সি বদলাবেন, পরের ২০ বছরের জন্যে তাঁর বাতিল হয়ে যাবে ভোটে দাঁড়াবার বা কোনও সরকারি তখ্‌তে বসার ছাড়পত্র।

–তা ককরোচ জনতা পার্টির প্রথম সমাবেশটা কেমন দেখলে, কাকু? আরশোলার নাম শুনলে যারা অজ্ঞান হয়ে যেত সেই মেয়েগুলোও আরশোলা-মুখোশ পরছে?

–মন ভরে গেল হে। ওই কাঁঠাল-পাকানো গরমে ছেলেমেয়েগুলো দরদর করে ঘামছে, তবু উৎসাহে ঘাটতি নেই। এ যাবৎ এদের নিজের কথা বলার জায়গাটা তো ছিল না। অন্য হাজারো দাবি-দাওয়ার মধ্যে গুঁজে দেওয়া ছন্নছাড়া একটা-দুটো চাহিদা আতসকাচ দিয়ে খুঁজে দেখতে হত। এখানে ওরা নিজেদের সমস্যার কথা, নিজের মতো করে বলবে বলেই তো এসেছে। আশপাশে শ্রীলঙ্কা, নেপাল, বাংলাদেশ– পরপর সবক’টা রাষ্ট্র দেখেছে যুবশক্তি কীভাবে পাশার দান বদলে দিতে পারে। এবার ভারতের পালা। 

সিজেপি-র প্রতিবাদ মিছিলে সোনম ওয়াংচুক

–এজন্যে আরশোলা পার্টির কাছে তাদের আজন্ম কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

–আমি কিন্তু তা মনে করি না। এদের ভাবনাটা ভালো সন্দেহ নেই, তবে আরশোলাদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা এটাই তো প্রথম নয়। যদিও ১৯১৬ সালে ডন মারকুইসের আর্চিই হোক কিংবা হাল আমলে ছোটদের প্রিয় কার্টুন সিরিজ ‘অগি অ্যান্ড দি ককরোচেস’ তৈরি হয়েছিল নানা বয়সের পাঠক/দর্শকের নিছক মনোরঞ্জনের জন্যে, আরশোলাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও তাদের ছিল না। সেদিক থেকে দেখলে প্রথম যুগান্তকারী কাজটি করেছিলেন মেক্সিকান-মার্কিন লেখক অস্কার জেটা অ্যাকোস্টা, ১৯৭৩ সালে। তাঁর ‘রিভোল্ট অফ দি ককরোচ পিপল’ উপন্যাসে আরশোলারা ছিল প্রান্তিক এবং নিপীড়িত মেক্সিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের প্রতীক– ‘সেই ছোট্ট প্রাণী, সবাই যাকে মাড়িয়ে চলে যায়’। কাহিনির শেষে প্রধান চরিত্রটি এখানে শুধু আর একক নায়ক থাকে না, হয়ে দাঁড়ায় একপাল আরশোলার একজন, যারা জোট বেঁধে সমাজের বদল আনতে পারে, পারে বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বেলে দিতে।

–ছোটমুখে বড় কথা হয়ে যাবে, তবু না-বলে পারছি না, কাকু, পুরো ব্যাপারটাই যে তোমাদের জন্যে খুব নিরাপদ, তা কিন্তু আমার মনে হচ্ছে না। এখনও অবধি না-হয় শুধু আরশোলার ছবি ছেপেই ক্ষান্ত দিচ্ছে ওরা, কিন্তু দল যদি শক্তপোক্ত হয়ে এগতে শুরু করে, আর আরশোলা হয় তাদের প্রতীক– তখন কিন্তু তোমাদের কিলো কিলো ভাই-ভাতিজাকে বস্তায় করে প্রচার মিছিলে, চ্যানেলে চ্যানেলে কি দলের সদস্যদের ঘরে ঘরে পাচার হতে হবে– জ্যান্ত কিংবা…

–আরে অত ভেব না। বলেছি না, সৃষ্টির শুরু থেকে হাজারো প্রতিকূলতা আমরা সামলে এসেছি, এটা তো সে তুলনায় নস্যি। মানুষের ভাষায় বললে, ‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা, মারী নিয়ে ঘর করি’। পাচারের ভয় করছ, সে তো তবু চিড়িয়াখানায় সাপ, টিকটিকির খাবার হিসেবে যাওয়ার থেকে ভালো, তাই না? আর তাছাড়া তুমি হয়তো শোনোনি, ভারতের নির্বাচন কমিশন এখন ভোটের প্রতীক হিসেবে জীবজন্তুর ছবি আর অনুমোদন করছে না। আগে যারা পেয়ে গেছে, তারা ছাড়া নতুন কেউ প্রতীক নিতে চাইলে তাদের যে ‘ফ্রি লিস্ট’ থেকে ছবি বাছতে হবে, তাতে তালাচাবি, টুথব্রাশ, নেলকাটার– এইসব হাবিজাবিই শুধু আছে। 

–পতঙ্গকে জীবজন্তুর মান্যতা দেবে তো শেষমেশ?

উচ্চিংড়ের পাখায় শুঁড় বুলিয়ে আদর করে তার আরশোলা-কাকু সস্নেহে বলে যায়, ‘দেখতে থাকো, ভাইপো, শুধু দেখে যাও। ভবিষ্যৎ কী হতে চলেছে তা তুমি-আমি কোন ছার, আশুখুড়ো পর্যন্ত জানে না।’

দুই ভিনবয়সী, ভিনজাতের পতঙ্গ হাতে হাত মিলিয়ে উড়ে যায়। আবহে ঝমঝমিয়ে বেজে ওঠে আরশোলা দলের প্রচার-সংগীত–

সোচো সোচো
ককরোচো
ক্যায়সে নাম সে পুকারা তুম্‌হে