


পৃথিবীর কোন দেশে সব থেকে বেশি সংখ্যক মহিলা সংসদে আছে? না আমেরিকা, না ইউরোপের তাবড় তাবড় দেশ। ৬৩% মহিলা সাংসদ নিয়ে প্রথম স্থানে আছে রুয়ান্ডা, তারপরেই কিউবা ৫৫%, এরপর নিকারাগুয়া ও বলিভিয়া। সুতরাং, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা জেন্ডার গ্যাপকে পরাস্ত করার দিক দিয়ে এগিয়ে উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের থেকে।
গত সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হল জি-৭ সম্মেলন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর ইতালির প্রধান জর্জিয়া মেলোনি করমর্দন করলেন। এই সৌজন্য সাক্ষাতে তাঁদের মধ্যে ঠিক কী কী বিষয় কথা হয়ে গেল, তা নিয়ে জোর চর্চা চলেছে কয়েকদিন। সর্বসমক্ষে সেই কথা না-শোনা গেলেও সাংবাদিকরা তা অনুমান করতে পিছপা হননি। মোদি-মেলোনির দুরন্ত রসায়ন, না কি গত মাসে মেলোডি টফি উপহার: কোনটা জায়গা করে নিয়েছে তাঁদের কথাবার্তায়, এই জল্পনা সাড়া ফেলেছে ইন্টারনেটে। আন্তর্জাতিক রাজনীতির মঞ্চে এমন হালকা চাল, উপঢৌকন কিংবা মিষ্ট ভাষণ এখন মানুষকে আকর্ষণ করে বেশি। ডিজিটাল জার্নালিজমের যুগে, যেখানে ক্লিকবেটের মাহাত্ম্য কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, সেখানে মেলোনির বেশভূষা, অলংকার বা ফ্যাশন নিয়ে ফিচার লেখা গেলে তার কাটতি হয় ভালো। সুতরাং প্রধানমন্ত্রী যদি মহিলা হয়, তাহলে কূটনৈতিক আলোচনা বা বিদেশনীতি সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে, তার কেশবিন্যাস, ব্যক্তিগত জীবন কিংবা পরিধান নিয়ে কথা বলাই শ্রেয়। শুধু ভারত কেন, জি-৭ সম্মেলনে মেলোনি আর ইউক্রেনের প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির জেলেনোস্কি আদৌ চুম্বনে বাঁধা পড়তে চেয়েছিলেন কি না, সেই নিয়েও মিম, ছবি আর রিলে ভেসে গিয়েছে নেট দুনিয়া। ইতিমধ্যে ট্রাম্প আবার মন্তব্য করেছেন, মেলোনি না কি একটি সেলফি তোলার জন্য প্রবল কাকুতি-মিনতি করেছেন তাঁকে!
মেয়ে বলেই হয়তো আর পাঁচজনের মতো সে ঘন ঘন সেলফি তুলতে চায়, তাই আপাদমস্তক রাজনীতির মঞ্চে এই ক্ষুদ্র বিষয়গুলি শিরোনামে জায়গা করে নিচ্ছে। যদিও মেলোনি এই সেলফি পর্বের কথা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন, তবু আমরা দেখব যে, এই ধরনের মন্তব্য মহিলা রাজনীতিবিদদের মুখে বসিয়ে দেওয়া নতুন কিছু নয়। যতই হোক প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু অবশেষে তো ‘মেয়েমানুষ’; ক্ষমতার শিখরে বসলেও তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি যাবে কোথায়– এমন মনোভাবাপন্ন দর্শককে আনন্দ দিতে মেলোনির পোশাক কিংবা যৌন আবেদন নিয়ে ভুরিভুরি লেখা বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কোন দর্শককে তুষ্ট করার জন্য এমন প্রতিবেদন গুরুত্ব পায় সর্বত্র? কারা মনে করেন যে, মহিলা রাজনীতিবিদ হলেই তার প্রেম, যৌনতা বা চুম্বন নিয়ে অনায়াসে বক্তব্য রাখা যায়, যা একজন পুরুষ নেতার সম্পর্কে আমাদের মাথাতেও আসে না। মোদি-মেলোনি মিম, তাদের বারান্দা-সেলফি বা জেলেনেস্কির সাথে আলিঙ্গন আবারও একবার প্রমাণ করিয়ে দেয় যে, আমরা সকলেই আদতে একটা মেল গেজের মধ্যে রয়েছি।

ট্রাম্পের মন্তব্য, ‘She begged me for a photo together’: লিঙ্গ রাজনীতির বাঁধা-ধরা ছকের কথা বলে। লালুপ্রসাদ যাদব বলেছিলেন, আমি বিহারের রাস্তা এমন বানিয়ে দেব যাতে তা হেমা মালিনীর গালের থেকেও বেশি মসৃণ মনে হয়। গাল, ঠোঁট, চোখ বা চুল নিয়ে এমন প্রশংসা আমরা পুরুষ রাজনীতিবিদদের প্রসঙ্গে কল্পনাও করতে পারি না। আসলে জেন্ডার স্টিরিওটাইপ প্রসঙ্গে বলা হয়ে থাকে যে, পুরুষ মাত্রই মাইন্ড, আর মেয়েমানুষ মানেই তার শরীর। ঠিক যেমন ধ্রুপদী উপন্যাসে মেয়েদের শরীর বর্ণনায় তিনটি অনুচ্ছেদ ব্যয় হলেও, পুরুষ চরিত্রের ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে ওঠে তার মনের দ্বন্দ্ব; তেমনই মহিলা রাজনীতিবিদ হলে তার গালের মসৃণতা নিয়ে ভাষণ দেওয়া যায়, তার কাজ বা অভিমতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে (বিহারে যখন লালুপ্রসাদ এই বক্তব্য রাখছেন, তখন হেমা মালিনীর পলিটিক্যাল কেরিয়ার শুরু হয়ে গিয়েছে)। বিষয়টি হল, ট্রাম্প থেকে লালু আসলে একদল পুরুষ দর্শকের (মেল অডিয়েন্সের) টেস্ট বা রুচিকে মান্যতা দিতে চায়। মেল গেজ থাকা মানে প্রথাগত যে খোপে আমরা পুরুষ ও নারীকে দেখে এসেছি, মেয়েরা রাজনীতি, চাকরি বা পাবলিক স্পিয়ারে অংশগ্রহণ করলেও সেই ধাঁচাটাকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। কারণ, এতে ট্রাম্প বা লালুর মতো জননেতাদের পপুলিস্ট সমর্থন পেতে সুবিধা হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা) পরিসংখ্যান বলছে যে, ভারতে মহিলা রাজনীতিবিদরা অনেক বেশি কটু মন্তব্য বা অনলাইন ট্রোলের শিকার হন তাদের পুরুষ কলিগদের তুলনায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমালোচনা তাদের কর্মপদ্ধতি বা বুদ্ধিমত্তাকে কেন্দ্র করে না-হয়ে শরীর বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে টেনে আনে। রাজনীতিবিদ সাজিয়া ইলমি মন্তব্য করেন:
“অনেক বেশি সংখ্যক মহিলাদের রাজনীতিতে প্রবেশ করা দরকার, কিন্তু তার জন্য যে মূল্য তাদের দিতে হয়… আমি যে অনলাইন হ্যারাসমেন্টের শিকার হয়েছি তার বেশিরভাগটা ছিল আমি কেমন দেখতে, আমার দাম্পত্য জীবন কোথায় দাঁড়িয়ে কিংবা আমার সন্তান আছে কি না সেই বিষয়ে… এগুলির বিরুদ্ধে উত্তর দিতে গেলে ট্রোলাররা আমায় ‘whore’ (বারবনিতা) বলে দাগিয়ে দেন।”

কথাতেই আছে ‘স্লাট শেমিং’, অর্থাৎ প্রথাগত ইমেজের বাইরে মেয়েরা বেড়িয়ে গেলেই তাদের যৌনকর্মী আখ্যা দেওয়া। আম আদমি পার্টির নেত্রী অতসী মারলেনা মনে করছেন যে, ডিজিটাল স্পেস এই মেল গেজ ও তার পরবর্তী অ্যাবিউসের (নির্যাতনের) সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, এগুলি বন্ধ করার পিছনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। প্রশ্ন হল, সবটা আইন বা জরিমানা দিয়ে পালটানো যায় কি? মনোভাবের পরিবর্তন ব্যতীত এই ধর্ষণকামী সংস্কৃতিকে (রেপ কালচার) ঠেকানো মুশকিল। ২০১৯ সালে সমাজবাদী পার্টির নেতা আজম খান, জয়া প্রদার বিষয় মন্তব্য করেন:
‘আমি তাকে রামপুরে এনেছি, তার গায়ে যাতে কেউ হাত দিতে না পারে সেই ব্যবস্থা আমি করেছি, ১৭ বছর ধরে… কিন্তু এখন ১৭ দিনের মধ্যেই জানতে পারছি, সে না কি খাকি রঙের অন্তর্বাস পরে।’
একসময় সমাজবাদী পার্টির সদস্য হয়েও পরে ভারতীয় জনতা পার্টিতে যোগ দিলে এই কথা জয়াকে বলা হয়। পুরুষ নেতাদের দলবদল নিয়ে ‘ওয়াশিং মেশিন’ বা অন্যান্য বিদ্রুপাত্মক কৌশল থাকলেও, মহিলা নেত্রীদের ক্ষেত্রে সমস্ত ভর্ৎসনা কেন যে তাদের শরীরকে ঘিরে আবর্তিত হয়– সেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে। ২০১৯ সালে ইউনিয়ন মিনিস্টার অশ্বিনী চৌবে রাবড়ি দেবীকে লক্ষ্য করে বলেন যে, তিনি যেন তার ‘ghoonghat’-এ-ই থাকেন। বিজেপি নেতা বিনয় কাটিয়ার সোনিয়া গান্ধিকে উদ্দেশ্য করে বলেন, রাহুল গান্ধির বাবার পরিচয় আদৌ সঠিক কি না– সেই বিষয়ে তিনি কোনও প্রমাণ দিতে পারবেন না কি!

সমালোচনার এই ভাষাগুলো নিয়ে আমরা যদি একটু তলিয়ে ভাবি তাহলে দেখব: ঘোমটা, চুম্বন, অন্তর্বাসের রং, পিতৃপরিচয় প্রমাণ– সবটাই তার শরীর, যৌনতা কিংবা মডেস্টি (আব্রু) নিয়ে। পার্লামেন্টের সদস্য হোক কিংবা মুখ্যমন্ত্রী, মেল গেজ মহিলা রাজনীতিবিদদের তাদের শরীরেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায়। তাদের গাল, প্রজননের ক্ষমতা, অন্তর্বাস নিয়ে চুটকি সাধারণ ভারতীয় পুরুষদের কাছে যৌন উদ্রেককারী বিষয়। তাই কোনও এক নেতা যখন প্রকাশ্য মঞ্চে মহিলা নেত্রীর শরীর নিয়ে কথা বলে, সেই ইঙ্গিত ‘রেসিপ্রোকেট’ করার মতো (বুঝে সম্মতি দেওয়ার জন্য) হাজার হাজার দর্শক সবসময় প্রস্তুত থাকে। নারীবিদ্বেষী কথাবার্তা প্রতি ইলেকশনের আগেই মাত্রায় বাড়ে-কমে; কখনও গাল, ঠোঁট বা চোখের সৌন্দর্যের উপমা দেওয়া হয়, কখনও বা মাত্রা ছাড়িয়ে তা হয়ে যায় সন্তানের পিতৃপরিচয় বা বেশ্যাবৃত্তির ইঙ্গিত। অবজেক্টিফাই, মিসোজিনি এই শব্দগুলো আমরা পশ্চিমের দেশ থেকে টেনে এনে অবলীলায় ব্যবহার করি বটে, কিন্তু ভারতীয় সমাজের প্রেক্ষিতে সেগুলিকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়াস কম দেখা যায়। কোনও মেয়ের চোখ, তার গয়না বা সুতন্বী গঠন নিয়ে মন্তব্য করা কেন তার অবমাননা– সেই যুক্তি ভারতের বেশিরভাগ পুরুষ বুঝেই উঠতে পারে না। ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’– এই স্বরলিপির বাইরে এসে তার মতামত, যুক্তি বা পরামর্শ নেওয়ারও যে সময় এসেছে, সেকথা ভুলে যাই।
রাজনীতি সমাজের থেকে বিচ্ছিন্ন কোনও অংশ নয়, সমাজের যৌথ মনোভাবই প্রতিধ্বনিত হয় নেতাদের ভাষণে, তাই কোনও পুরুষ মন্ত্রী যখন সগর্বে নারী শরীর নিয়ে কোনও বাক্য উচ্চারণ করেন, তখন গড়পড়তা ভারতীয়দের পছন্দের কথা ভেবেই এই পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এ কোনও আকস্মিক বা কাকতলীয় ঘটনা নয়, বরং সচেতন সিদ্ধান্ত (কনশাস চয়েজ)। একেই আমরা বলে থাকি মেল গেজ; অর্থাৎ পুরুষ দৃষ্টিভঙ্গিতে যেটা জুতসই, সেটাই রেঁধে, বেড়ে, সাজিয়ে পরিবেশন করা প্রকাশ্য সমাবেশে।
‘মেল গেজ’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন লওরা মলভে তার বিখ্যাত লেখা ‘ভিজুয়াল প্লেসার এন্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ প্রবন্ধে। মূল ধারার সিনেমায় ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, সংলাপ, চিত্রনাট্য বা চরিত্র নির্মাণ কীভাবে পুরুষ দর্শককে আনন্দ দেওয়ার জন্যই নির্মিত হয়ে চলেছে– তার খোঁজ করাই ছিল এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য। শুধু সিনেমা কেন, মূল ধারার গান, বিজ্ঞাপন, চিত্রকলা কিংবা রাজনৈতিক ভাষ্য– সব ক্ষেত্রেই এই মেল গেজের উদ্যাপন আমরা দেখতে পাই। তাই ‘আজকালকার মেয়েগুলো সব স্মার্ট’ হয়ে ওঠে তাদের স্কার্টের দৈর্ঘ্যে, কিন্তু ‘ডানপিটে ছোকরা’র সঙ্গে মানানসই ‘আলাভোলা কবি’, ‘নির্বোধ বুদ্ধিমান’। মন, চিত্ত, বুদ্ধিমত্তা বা বুদ্ধিহীনতা সবটাই যেন পুরুষের; আর শরীর, প্রজনন আর যৌনতা কেবলই মেয়েদের সাতকাহন।
বিজ্ঞাপনেও কি আমরা মেল গেজ দেখি না? ইনসিওরেন্সের বিজ্ঞাপনে মধ্যবয়স্ক বাবা আর সন্তানের হেলথ ড্রিংক খাওয়ানোর বেলায় মা। শ্রমের ভাগ হোক কিংবা শরীরী প্রশংসা, আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে মেল গেজের সংকেত চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে। কিছুদিন আগে সংবাদমাধ্যমের নেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বামপন্থী নেত্রী দীপ্সিতা ধরকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি উক্ত পার্টির ‘পোস্টার গার্ল’ কি না? ‘পোস্টার গার্ল’ বা ‘ক্যালেন্ডার গার্ল’ বলে সিনেমা আছে জানি, কিন্তু একজন মহিলা রাজনীতিবিদকে এমন তকমা চট করে দিয়ে দেওয়ার পিছনে কীভাবে মেল গেজ কাজ করে– তা ভাবা দরকার।
ভোটের আগে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর একটি কুৎসিত মিম বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল, সেখানেও দেখি মহিলা নেত্রীর সঙ্গে শরীর, যৌনতা বা প্রজননকে যুক্ত করে কার্টুন আঁকার প্রবণতা। মনে রাখতে হবে, পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র পুরুষরা বহন করে না। মেল গেজের সঙ্গে নিজেকে সাযুজ্যপূর্ণ করে তোলার জন্য মহিলা নেত্রীরাও সচেতন থাকেন। অন্য কোনও পেশা থেকে রাজনীতিতে ঢুকলেই শাড়ি বা পরিমিত সাজগোজকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। জননেত্রী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে খোলামেলা পোশাক, জিন্স, এমনকী হাত-কাটা ব্লাউজও সীমা লঙ্ঘন বা ‘transgression’ হতে পারে। পুরুষ নেতাদের পোশাকের ক্ষেত্রে শালীনতার প্রশ্ন থাকলেও, তাদের বেশভূষার আমূল পরিবর্তন কম দেখা যায়। কিন্তু মহিলা নেত্রীদের ক্ষেত্রে এই রূপান্তর অত্যন্ত প্রকট ও মেল গেজের সঙ্গে মানানসই।

ইলেকশন কমিশন অফ ইন্ডিয়ার (ECI) রিপোর্ট অনুযায়ী, পার্লামেন্টের ১০.৫% সদস্য মহিলা (MP) এবং ৯% মহিলা বিধানসভায় রয়েছে (MLA)। যেখানে ৯০% সংসদ পুরুষ এবং ৯১% বিধায়কও পুরুষ, সেই বৈষম্যের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘মেল গেজ’ বা ‘অবজেক্টিফিকেশন’ নিয়ে কথা বলা বাতুলতা মাত্র। এবার একটা চিন্তাকর্ষক পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। পৃথিবীর কোন দেশে সব থেকে বেশি সংখ্যক মহিলা সংসদে আছে? না আমেরিকা, না ইউরোপের তাবড় তাবড় দেশ। ৬৩% মহিলা সাংসদ নিয়ে প্রথম স্থানে আছে রুয়ান্ডা, তারপরেই কিউবা ৫৫%, এরপর নিকারাগুয়া ও বলিভিয়া। সুতরাং, আফ্রিকা বা দক্ষিণ আমেরিকা জেন্ডার গ্যাপকে পরাস্ত করার দিক দিয়ে এগিয়ে উত্তর আমেরিকা বা ইউরোপের থেকে। ভারতে তো বললাম ১০%। আমাদের দু’-দিকের প্রতিবেশী দেশ কিন্তু ভারতের থেকে কিছুটা এগিয়ে। বাংলাদেশে মহিলা সাংসদের পরিমাণটা ঘোরাফেরা করে ২০%-এর আশেপাশে আর পাকিস্তানেও ২০% থেকে ২২%। এই পরিসংখ্যান দিয়ে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি কতটা বোঝানো যাবে সেটা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, কিন্তু প্রতিনিধিত্ব বাড়লে যে অদূর ভবিষ্যতে মেল গেজ থেকে বেরনোরও সুযোগ আছে, সেই আশা রাখা যায়, অন্তত ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে।
সবশেষে এটাই বলার যে ‘মেল গেজ’ বা ‘মিসোজিনি’ আসলে প্রত্যেকটা মানুষ শৈশব থেকেই নিজের মধ্যে লালন-পালন করে। স্কুল, বাড়ি, পাড়া, সবই হল জেন্ডার ট্রেনিং-এর উৎসস্থল। আজকের দিনে কর্পোরেট অফিস বা অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে ট্রেনিং, অডিট কিংবা নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করে লিঙ্গসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয় বটে, কিন্তু সেটা জীবনের ২০-৩০ বছর কাটানোর পর। দেশে বন্যা হলে শুধু ত্রাণ দেওয়ার উপদ্রব না-করে, যদি ভেবে দেখি যে, ঠিক কী কী ম্যান মেড বা পরিবেশগত কারণে বন্যাটা প্রতি বছর ফিরে ফিরে আসছে? তেমনই নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করলে, তারপর শাস্তি-জরিমানার পথে না গিয়ে, কোন মানসিকতা থেকে অন্তর্বাস/যৌনাঙ্গ নিয়ে কার্টুন আঁকতে মন চায়– সেটা ছোটবেলা থেকেই অনুধাবন করা জরুরি মনে হয়। মেল গেজ চিহ্নিত করার জন্যও একটা আনলারনিং দরকার, যেটা ভারতের মতো দেশে আরও প্রাথমিক স্তর থেকে হওয়াই কাম্য।
……………………
রোববার.ইন-এ পড়ুন সম্প্রীতি চক্রবর্তী-র অন্যান্য লেখা
……………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved