Robbar

স্যাটা নিয়ে স্যাটায়ার

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 18, 2026 9:21 pm
  • Updated:June 18, 2026 9:21 pm  

সম্প্রতি একটি দু’-অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ বাংলার নিউজাকাশে প্রবল উৎসাহে উড়ে বেড়াচ্ছে। বিবিধ জ্ঞানসূত্র অনুযায়ী, তার মানে একটাই। পশ্চাদ্দেশ। অনেকের মতে, সেটি এসেছে ‘সত্য’ থেকে। সোজা ব্যাপার, জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এটি তাপ সংযোগের প্রক্রিয়া অর্থাৎ প্রয়োজনে ঘটি গরম রাখা হবে। এবারে কি হয় না-হয়, সেটা দেখার। আপাতত কলকাতায় বেশ একটা খুশি খুশি ভাব। পিসি, মেসি, কত কি আছে আমাদের। এদিকে কিন্তু নির্দেশিত ঘোষণা মতো ছুটে আসছে বাবলু-বু!

শুভময় মিত্র

আদিযুগে কল্পনার দিগন্ত ছাড়িয়ে বহুদূরে, প্রবল সংঘাত ও অগ্ন্যুৎপাতে, কেউ কোনও একদিক থেকে ভয়ংকর আঘাত করেছিল বৃহৎ কাউকে। সেই পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত বর্ণনা পাওয়া যায় স্ট্যানলি কিউব্রিকের বিখ্যাত সিনেমা ‘টু থাউজেন্ড ওয়ান স্পেস ওডিসি’র শুরুতে। এরপর প্রাণের সৃষ্টি। জল, পাতা, জীবজন্তু, মানুষের মাথা। পরের দৃশ্যে দুর্বলের ওপর সবলের ফ্যাশনেবল অত্যাচারের বিজয় প্রতীক স্বরূপ একটা হাড়-কে ক্ষমতা দখলকারী এক জানোয়ার ছুড়ে দেয় আকাশে। নীল আকাশে পাক খেতে খেতে তা বদলে যায় আরও ঘন কালচে নীল মহাকাশে একটা আস্ত স্পেসশিপ হয়ে। এই ঘটনার দৃশ্যায়নকে ফিল্মি দুনিয়ার গ্রেটেস্ট জাম্পকাট হিসেবে স্বীকার করা হয়। গল্প সেখান থেকে পৌঁছে যায় ভবিষ্যতে, যা মোটামুটি আজকের বর্তমান। আপন কোচিংয়ে আমরা দ্রুত পাশবিকতাকে পাশ কাটিয়ে পৌঁছে যাই ধাতুযুগে। হয়ে উঠি আগুনখেকো। লজ্জার কলিযুগ কোনওমতে পার করে আমরা আবিষ্কার করি সভ্যতা, যা বেজায় অসভ্য এক সংস্কৃতি। অগ্নিযুগ অব্যাহত আছে। সব জ্বলছে। পুড়ছে। আমরাও পুড়ছি। এর মাঝখানে কোথাও একটা ছিল সময়ের ঝলসানো রুটির চাপে চ্যাপ্টা মধ্যযুগ। সেসময় চারপাশ বেশ অন্ধকার ছিল। এনার্জি ক্রাইসিস ছিল না। নিকটতম সোর্স সূর্যের এন্তার গ্যাসভরা রিজার্ভের সদ্ব্যবহার করা হত না। অসুবিধে হয়নি। আগুন বরাবরই ছিল মানুষের মনে। তারপর আসে রাজ। সঙ্গে তাদের নীতিকথা।

মধ্যযুগের একটা ঘটনা, বাল্যকালে যা আমার কানে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল কার্বাইড হিসেবে। সে-সময় আমার সর্বাঙ্গ দ্রুত পেকে উঠছিল অকল্পনীয় গতিতে। এখন মনে হয়, ওই হাসির আখ্যান ছিল সভ্য হয়ে ওঠার সময় সরণীতে আইনসঙ্গত অসভ্যতার এক উত্তেজক উদাহরণ। এক ভিন্নধর্মী, ভিনদেশী বা অনুপ্রবেশকারী জাতীয় কিছু একটা লোক ধরা পড়ে যায়। তখনও, ঠিক আজকের মতোই, ভিন বলেই তার শাস্তির ব্যবস্থা হয়। জনপ্রিয় শাস্তিটির নাম ‘বাবলু-বু’! মানবিকতার খাতিরে সেই লোকটাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না-দেওয়া হলেও বিকল্প শাস্তি গ্রহণের চয়েস ছিল। মৃত্যু অথবা বাবলু-বু! উপায়হীন আসামি দ্বিতীয়টিকে বেছে নিতে বাধ্য হয়। অন্তত প্রাণে বাঁচবে সেই আশায়। তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়নি। ভরদুপুরে বধ্যভূমিতে আনা হয়েছিল অপরাধীকে। গ্যারান্টিযুক্ত বীভৎস আমোদের আশায় হাজির হয়েছিল লক্ষ লক্ষ দর্শক। তখন কাউকে অফিসে যেতে হত না। মানুষ তখনও ডিমের অপব্যবহার শেখেনি। ‘বাবলু-বু’ ঘোষণা করা মাত্র প্রশিক্ষিত এক মহাষণ্ড ছুটে এসে আমাদের বর্ণিত চরিত্রের পশ্চাতে জোড়া শিং দিয়ে আঘাত করেছিল। দুর্ভাগ্য, তার মৃত্যু হয়নি!

শো এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে। তাই রক্তাক্ত লোকটাকে আবার সুযোগ দেওয়া হল। রিপিট টেলিকাস্ট। এবারে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর মানুষটা চাইল মৃত্যু! ডেথ! শুনে খুশির তুফান উঠল সবার প্রাণে। তার শেষ ইচ্ছেকে মান্যতা দিয়ে আকাশ জুড়ে বেজে উঠল সুপ্রিম ডিজে ধ্বনি, ‘মৃত্যু… বাবলু-বু-র মতে।’

সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ ও অমানুষদের তফাতগুলো অন্ধজনেরও দৃষ্টিগোচর হতে শুরু করে। বিকশিত গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত যে, কোনও ব্যাপারে অগ্রিম নোটিশ দেওয়া। লুকিয়ে নয়, অ্যাকশন শুরু হবে জানিয়ে। খুবই জনপ্রিয় সাম্প্রতিক মরুসমরে ট্রাম্পও অ্যাকশনের আগে অগ্রিম ঘোষণা করেছিলেন। আগ্রাসনের ঘটনা সামনে থেকে পরিচালিত হলেও আশ্চর্যের ব্যাপার, ব্যাপক ক্ষতির চিত্রটি ফুটে উঠেছিল প্রেসিডেন্টের পশ্চাদ্দেশে।

এই গণতান্ত্রিক দেশে আমরা ভাবি যে, আমরা সবাই রাজা। অমন মনে হয়। আসল কাজ হয় গোপনে, এটাই রাজধর্ম। সেলফোনের মতো রিয়ার ক্যামেরা না-থাকায় নিজেদের পশ্চাদ্দেশ নামক জায়ান্ট স্ক্রিনে জ্বলে ওঠা বিবিধ তথ্য ও পরিসংখ্যান দেখতে আমরা অপারগ হই। আসলে রিলে, ঝোলে, গোলমালে আমরা ব্যস্ত থাকি বিবিধ অকাজে। এরই মধ্যে ঘটে যায় একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা। সহ্যের সীমানায় পৌঁছে ভয়ানক রাগ হয়। আপত্তিগুলো জনরোষে পরিবর্তিত হয়। মারাত্মক গতিতে বৃদ্ধি পাওয়া ছয় পা-বিশিষ্ট অশান্ত কীটরা এনক্রোচ করতে শুরু করে সংবিধানের অবমাননাকারী, ক্ষমতাশালীদের অন্দরমহলে। এদিককার খবর, এক দলকে বিতাড়নের আনন্দে আত্মহারা অনেকে না কি শুনতে পাচ্ছেন ছুটে আসা সেই ষণ্ডের খুরধ্বনি।

এই মুহূর্তে দেখতে পাচ্ছি, প্রচুর বিগব্যাং শব্দ-ভরা রকেটরা উঠে যাচ্ছে স্পেসে। কথার মালায় ঝলমল করে উঠছে আকাশ। ওসব যে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি, তারা যে পোড়ামুখো হয়ে ফিরে আসবে পুরনো অভ্যাসমতো, এমন সন্দেহ করছেন অনেকে। কিন্তু নতুন ঘটনা ঘটছে। আধুনিক আকাশ যুদ্ধের নতুন প্রযুক্তি, অনেক রকেট আবার জ্বলে উঠছে। ছুটে আসছে আমাদের দিকে। বলবৎ হচ্ছে নতুন নতুন আইন। যা একাধারে জনকল্যাণকর। অন্যদিকে পাপের বিনাশকারী। মুশকিল হল, আমাদের মধ্যে কারা নির্দোষ, কারা যে আসলে পাপী, সেটা স্পষ্ট নয়। ধরে নিচ্ছি, নোটিফিকেশন পাওয়া যাবে শিগগিরই। পশ্চাৎপটের এলসিডিতে ব্লিঙ্ক করবে লাল বিন্দুরা। ঘোষণা মতো প্রতিশ্রুতির খেলাপ, কালাপাহাড়ি আগ্রাসন, দূরদেশি রিমোটের নির্দেশে মানুষের মন কি বাত-কে অগ্রাহ্য করে, সাধারণ মানুষের ব্রেনের অক্সিপিটাল লোবের ওপর চাপ সৃষ্টিতে মাথা শুধু নয়, অগ্নিসংযোগ ঘটছে আমাদের আজকের চর্চিত অঞ্চলেও। সম্প্রতি একটি দু’-অক্ষর বিশিষ্ট শব্দ বাংলার নিউজাকাশে প্রবল উৎসাহে উড়ে বেড়াচ্ছে। বিবিধ জ্ঞানসূত্র অনুযায়ী, তার মানে একটাই। পশ্চাদ্দেশ। অনেকের মতে, সেটি এসেছে ‘সত্য’ থেকে। সোজা ব্যাপার, জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এটি তাপ সংযোগের প্রক্রিয়া অর্থাৎ প্রয়োজনে ঘটি গরম রাখা হবে।

এবারে কি হয় না-হয়, সেটা দেখার। আপাতত কলকাতায় বেশ একটা খুশি খুশি ভাব। পিসি, মেসি, কত কি আছে আমাদের। এদিকে কিন্তু নির্দেশিত ঘোষণা মতো ছুটে আসছে বাবলু-বু!

…………………..

রোববার.ইন-এ পড়ুন শুভময় মিত্রর অন্যান্য লেখা

…………………..