Robbar

সম্প্রচারের ধাঁধা

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 28, 2026 4:50 pm
  • Updated:May 28, 2026 5:11 pm  

দিন ১৫ পরই শুরু ফুটবল বিশ্বকাপ। কিন্তু এই ভূ-ভারতে সম্প্রচার কোথায় হবে, তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই এখনও! কাটছেই না জটিলতা। নেপথ্যে ফিফার বিপুল অঙ্কের টাকার চাহিদা। এদিকে ফুটবল খেলার আঙ্গিকেই বিজ্ঞাপনী ঝলকের কোনও জায়গা নেই। সরকারি নয়, বেসরকারি সংস্থাগুলোও সম্প্রচার থেকে সরে আসছে। তাছাড়া, বিশ্বকাপের অধিকাংশ ম্যাচই ভারতীয় সময়ানুসারে রাত ১২টা থেকে সাড়ে ৩টের মধ্যে। দর্শক পাওয়া যাবে? এই প্রশ্নে জ্বর আসছে না তো সম্প্রচার সংস্থাগুলির?

অরিন্দম মুখোপাধ্যায়

মনে করুন কাতার বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা-ফ্রান্স ফাইনাল। ফলাফল ২-০ থেকে হঠাৎ ২-২। লিও মেসি ও ডি’মারিয়ার ম্যাজিকের উত্তরে এমবাপের জোড়া গোল। এক্সট্রা টাইমে ৩-৩ হয়ে ম্যাচ গড়াল টাইব্রেকারে। অবশেষে, গঞ্জালো মন্টিয়েলের চতুর্থ গোলে, ৩৬ বছরের অপেক্ষার পর বিশ্বকাপ জিতল আর্জেন্টিনা। অথচ আপনি এসবের কিছুই চাক্ষুষ করতে পারছেন না। এই আনন্দ উপভোগ করার একমাত্র সম্বল অনলাইন স্কোর কিংবা অডিও কমেন্ট্রি!

বিশ্বকাপ জয়ের পর লিওনেল মেসি

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগছে তাই না? অথচ ঠিক এমনটাই হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আপামর ভারতবাসীর সঙ্গে। ২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচার নিয়ে পাকানো জট কাটতে চাইছে না কিছুতেই!

ধাঁধা কাটাই। আসলে ভারতে বিশ্বকাপের ফুটবলের সম্প্রচার স্বত্ব নিতে রাজি হচ্ছে না কোনও টেলিভিশন সংস্থা। ফিফার প্রাথমিক দাবি– ১০০ মিলিয়ন! এমন বিপুল অঙ্কের দাবির জন্যই সোনি এবং ফ্যানকোড শুরুতেই এই আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়। এরপর ফিফার পরিমার্জিত ৩৫ মিলিয়নের দাবির পরিবর্তে জিও-স্টার প্রস্তাব দেয় ২০ মিলিয়নের। সে প্রস্তাবে এখনও অরাজি ফিফা।

মে মাসের শুরুর দিকে এই সমস্যার সমাধানের জন্য দিল্লি হাইকোর্ট একটি পিটিশন জারি করে। স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং সিগনালস অ্যাক্টস, ২০০৭ অনুযায়ী, (জাতীয় তাৎপর্যপূর্ণ যে কোনও ক্রীড়া অনুষ্ঠান প্রসার ভারতী সম্প্রচার করবে) প্রসার ভারতীকে বিশ্বকাপ ফুটবলের সম্প্রচারের জন্য অনুরোধ জানায়। সেই নোটিশের উত্তরে, হাইকোর্টের অনুরোধকে সম্পূর্ণ খারিজ করে প্রসার ভারতী জানিয়ে দেয়, আইনিভাবে বিশ্বকাপ সম্প্রচার করতে তারা বাধ্য নয়। ফলস্বরূপ, জল আরও ঘোলা হয়ে ওঠে।

কিন্তু সম্প্রচার নিয়ে এই জটিলতা ঘনিয়ে ওঠার রহস্য কী? কারণ হিসেবে উঠে আসছে বেশ কিছু সামাজিক এবং আর্থিক বিপত্তি। প্রথমত, স্পোর্টস ব্রডকাস্টিং সিগনালস অ্যাক্টস, ২০০৭ অনুযায়ী, (Mandatory Sharing with Prasar Bharti) স্বত্ব অধিকৃত টেলিভিশন সংস্থাকে, প্রতিটি ম্যাচ বিজ্ঞাপনবিহীন স্ট্রিমিং করার অনুমতি প্রসার ভারতীকে দিতে হবে। এই আইনি বন্দিত্বের জন্য বিরাট অঙ্ক খরচ করে স্বত্ব-মালিকানা গ্রহণের পরেও টেলিভিশন সংস্থাকে বিপুল পরিমাণে ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। নিঃশুল্ক খেলা দেখার রাস্তা খোলা থাকায় অধিকাংশ উপভোক্তাই অর্থের বিনিময়ে সংস্থার পরিষেবার গ্রাহক হতে রাজি হন না। দ্বিতীয়ত, TRAI (টেলিকম রেগুলেটরি অথরিটি অফ ইন্ডিয়া)-র মুনাফার বণ্টনে ডিটিএইচ, ডিশ টিভি, লোকাল কেবল প্রভৃতি ডিস্ট্রিবিউটারের প্রতি পক্ষপাতিত্ব। ব্যবহারকারী প্রতি আয়ের ৮০ শতাংশ চলে যায় তাদের দখলে। সম্পূর্ণ স্বত্বের ভার বহন করেও টেলিভিশন সংস্থাকে সহ্য করতে হয় এই দ্বিচারিতা।

তৃতীয়ত, সীমিত বিজ্ঞাপন ব্যবহারের সুযোগ। ক্রিকেটের ক্ষেত্রে যে সমস্যা থেকে সংস্থারা সহজেই রেহাই পেয়ে পেয়ে যান। প্রতি ওভারের শেষে, কিংবা উইকেট পড়লেই বিজ্ঞাপন প্রচলিত হয়। কিন্তু ফুটবলে সেই সুযোগ নেই। টানা ৪৫ মিনিট খেলা চলার মাঝখানে বিজ্ঞাপন ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসন্তুষ্টি তৈরি করে এবং খেলা দেখার অভিজ্ঞতাকে তিক্ত করে দেয়। তাই এ কাজ করা থেকে তাঁরা নিজেদের বিরত রাখেন। চতুর্থ কারণ হিসেবে উঠে আসছে এবারের বিশ্বকাপের লোকেশন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং মেক্সিকোর স্থানীয় সময় অনুযায়ী, অধিকাংশ খেলা ভারতে সম্প্রচারিত হবে রাত ১২টা থেকে ভোর সাড়ে ৩টের মাঝামাঝি– যা বিশ্বকাপের ভিউয়ারশিপে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞের মত অনুযায়ী, ভারতে ফুটবল দেখার হার ক্রমশ কমছে। ২০১৩ সালে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সম্প্রচার স্বত্ব ১৪৫ মিলিয়নে বিক্রি হলেও বর্তমানে তার মান এসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬০ মিলিয়নে। ইন্ডিয়ান সুপার লিগের সম্প্রচার স্বত্বের মান গত কয়েক বছরে ৯৭% হ্রাস পেয়েছে। যে-কারণে ২০২২ বিশ্বকাপের স্বত্ব ৬২ মিলিয়ানে কিনলেও, এবারে ২০-র উপরে উঠতে রাজি হননি জিওস্টারের কর্তারা।

জেনে রাখা দরকার, সম্প্রচার স্বত্ব থেকে প্রাপ্ত অর্থই খেলাধুলোর পরিকাঠামো ও শৃঙ্খলাব্যবস্থার উন্নতিতে মূল ভূমিকা পালন করে। কোচ, রেফারি, সাপোর্ট স্টাফদের মাসমাইনে, স্টেডিয়াম পুনর্গঠনের কাজ, ইয়ুথ ডেভেলপমেন্টের প্রস্তুতি– কোনও কিছুই এই অর্থের সাহায্য ছাড়া সম্ভব হয়ে উঠবে না। আইপিএলের তুমুল জনপ্রিয়তা, প্রচার ও ক্রিকেট পরিকাঠামো গঠনের কাজ চলছে এই স্বত্ব থেকে আসা অর্থের ওপর ভিত্তি করেই, বর্তমানে যার মূল্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। তাই ফুটবল থেকে টেলিভিশন সংস্থাদের আগ্রহ ধীরে ধীরে উবে যাওয়া ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির জন্য একেবারেই ভালো সংকেত নয়।

তবে, খুব সম্প্রতি এক আশার আলো দেখা গিয়েছে। ‘এআইএফএফ’ (অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন)-র প্রাক্তন জেনারেল সেক্রেটারি, সাজি প্রভাকরণ, গত শনিবার টুইট করে জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফুটবল সম্প্রচারের জটিলতা আপাতত কাটতে চলেছে। ফুটপ্রেমীদের আশ্বস্ত করে তিনি জানান, সম্প্রচারের সরকারি ঘোষণাও চলে আসবে তাড়াতাড়ি। ট্রেড অ্যানালিস্টদের থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, ভারতের ফুটবল-ভক্তদের জন্য ত্রাতা হয়ে নেমে এসেছে জি গোষ্ঠী। নতুন সাতটি খেলার চ্যানেল আনতে চলেছে তারা। সম্ভবত তার একটিতেই দেখানো হবে ফুটবল বিশ্বকাপ!

এই ঘোষণার পর নিরাশার মেঘ সামান্য কাটলেও ভারতে ফুটবল সম্প্রচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে থেকে যাচ্ছে অনেক প্রশ্ন, যার উত্তর আমাদের অজানা। কেন্দ্রীয় সরকার এবং এআইএফএফ একত্রিত হয়ে সম্প্রচার আইনের সংশোধন ও সংস্থাদের মুনাফা আয়ের সুবন্দোবস্ত করে পুনরায় তাদের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে না-পারলে, ভারতীয় ফুটবলের মান এবং পরিকাঠামো যে আরও বেশি রুগন হয়ে পড়বে– এ-বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই!

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন অরিন্দম মুখোপাধ্যায়-এর অন্যান্য লেখা

………………………