Robbar

এক সাহিত্যপ্রেমিকের সত্যজিৎ দর্শন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 18, 2026 9:30 pm
  • Updated:May 18, 2026 9:30 pm  

তিনি নিজে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে বলেছেন, “People say that I don’t commit myself. I commit myself to human beings, that’s a good enough commitment for me.” তাঁর এই বিশুদ্ধ, স্বতন্ত্র অঙ্গীকার জ্বলে উঠেছে ‘সীমাবদ্ধ’-র প্রতিটি মূহুর্তে, তিনি যাকে বলে বাণিজ‌্যিক সংস্থাসমূহের বা মুনাফা-অন্ধ ধনতন্ত্রের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলেছেন অনুচ্চ একাগ্রতায়। একই চেতনা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র নায়ককে উদ্বুদ্ধ করেছে বলতে, ‘এই শতাব্দীর মহত্তম ঘটনা চাঁদে পা রাখা নয়, পক্ষান্তরে ভিয়েতনামের মরণজয়ী সংগ্রাম।’

শুভরঞ্জন দাশগুপ্ত

‘My admiration for Satyajit Ray is total. I am very thankful to him because through his films I have known India with a deep insight.’

–Michelangelo Antonioni

‘The secret of good film-making is editing. This Calls for an uncanny sense of timing. Satyajit Ray is the only director who has it.’ 

–Ritwik Ghatak

সত‌্যজিৎ রায়ের সৃজন ও প্রতিভাকে সম্মানজ্ঞাপন করে ম‌্যারি সিটন এবং রবিন উড যে বই লিখেছেন, আমি পড়েছি। জর্জ সাদুল থেকে শুরু করে পাওলিনে ফেয়ল– বিশ্বখ‌্যাত চিত্রমোদীরা তাঁর সঙ্গে যে সংলাপে প্রবৃত্ত হয়েছেন, সেগুলির সঙ্গেও আমি বিলক্ষণ পরিচিত। কিন্তু এই সুদীর্ঘ এবং সশ্রদ্ধ বন্দনা-পর্যটনের পরেও, আমি মনে করি, আলোচ‌্য বইটি আমাদের অবশ‌্যই পড়তে হবে। কারণ এর পাতায়- পাতায় বিচিত্র ও বহুস্তরী মানুষটির বিকাশ অনন‌্য শৈলীতে চিত্রায়িত হয়েছে। উপরন্তু, চিন্ময় তাঁর সৃষ্টি ও চৈতন‌্যের এমন কয়েকটি অঞ্চল উদ্‌ঘাটন করেছেন, যা অন‌্যরা হয়তো সেভাবে করেনি। 

আমি কেন এই দাবিটি করছি? কারণ, বইটির কুড়িটি পরিচ্ছেদ জুড়ে মূল‌্যায়নের একটি প্রবল সিম্ফনি ধ্বনিত হয়েছে, যার উৎস বা উপাদান দু’টি স্বতন্ত্র উৎস বা উপাদান। এই দু’টি মুভমেন্ট হল প্রাচ‌্য ও প্রতীচ‌্য, পূর্ব ও পশ্চিম। অন‌্যভাবে বললে, একমাত্র সত‌্যজিতই একই নিঃশ্বাসে জাঁ রেনোয়ার চিত্রময় আঙ্গিক এবং শিক্ষক নন্দলাল বসুর শিল্পাদর্শকে গ্রথিত করতে পেরেছেন অত‌্যাশ্চর্য সাফল‌্যের সঙ্গে। সেই প্রথম ‘অপু ট্রিলজি’ থেকে শুরু করে শেষ প্রয়াস ‘আগন্তুক’ পর্যন্ত। 

পথের পাঁচালী ছবির শুটিং-এ সত্যজিৎ রায়, ছবি: বংশী চন্দ্রগুপ্ত, কৃতজ্ঞতা: রায় সোসাইটি

এই দ্বৈত অঙ্গীকারের প্রতি নিবেদিত থাকতে গিয়ে তিনি সর্বব‌্যাপ্ত মানব অস্তিত্ব বা human condition মূর্তায়িত করেছেন, যা একদিকে একটা সুনির্দিষ্ট জমিন থেকে উত্থিত এবং অন‌্যদিকে Universal বা বৈশ্বিক নির্যাসের স্পন্দনসম। এই দ্বৈততাকে সেলাম জানিয়েই রবিন উড লিখেছেন, ‘He has twined Apu and Durga into incomparable archetypes’। তাঁর ভাষায়, “Ray is arguably the cinema’s greatest director of children.”

বা, অন‌্য একটি পরাক্রান্ত দৃষ্টান্ত নেওয়া যাক। যে ‘জলসাঘর’ দেখে প‌্যারিসের দর্শকেরা মোহিত হয়েছিল, সেই ছবিটির বিয়োগান্ত নায়ক বিশ্বম্ভর বাংলার গ্রামের সীমানা অতিক্রম করে দুনিয়া জুড়ে অভিজাত, একদা সম্পদশালী সামন্ততন্ত্রের অবধারিত ক্ষয় প্রতিবিম্বিত করে ডিটেলের কী অনবদ‌্য সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন। ঠিক যেভাবে বালজাক তাঁর স্মরণীয় উপন‌্যাসে রাজকীয় ফ্রান্সের ক্রমাবলুপ্তি অঙ্কন করেছিলেন। সেই অভ্রান্ত human condition-এর চিত্রায়ন যা দেখে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস্‌ বলে উঠেছিলেন, ‘What unflinching veracity, what revolutionary dialectic!’

‘জলসাঘর’ ছবির বুকলেট

যে কারণগুলি উপরে উল্লেখ করেছি, সেগুলি ছাড়াও অন‌্য একটি বিশেষ মাত্রা বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে। তা হল, চিন্ময়ের গভীর সাহিত‌্যবোধ। সত‌্যজিতের সৃষ্টির মর্ম অনুধাবন করতে গিয়ে, তিনি ইংরেজি ও ইউরোপীয় সাহিত‌্যের প্রতিচ্ছায়া মেলে ধরেছেন নৈপুণ‌্য সহকারে। মাত্র একটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। টি এস এলিয়টের ঐতিহাসিক নিবন্ধ ‘Tradition and Indivrdual Talent’ এবং তাঁর অবিস্মরণীয় কবিতা ‘Four quartet’-এর স্মরণ আমাদের প্রতিক্রিয়াকে এক্ষেত্রে সূক্ষ্মতর করেছে; সৃজনের দু’টি প্রবাহ সাহিত‌্য ও সিনেমার ভিতর আমরা সেই অন্তরঙ্গতম সেতুটি নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছি। আর যাঁরাই সত্যজিতের সৃষ্টির অন্তরে প্রবেশ করেছেন, তাঁরাই জানেন, তিনি কীভাবে সাহিত‌্যকে ব‌্যবহার করেছেন, কী বিস্ময়কর নান্দনিক বোধ ও চেতনার সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, প্রেমচন্দ যেন নতুন আয়তন অর্জন করেছে তাঁর প্রতিস্থাপনে।

বইটির এই বিশেষ অংশটি পড়তে পড়তে ফ্রাঁসোয়া ক্রুফোর প্রশস্তিটি ফিরে আসে, ‘He is a master of auteur (author) cinema, capable of creating music with images’।

ক্রুফোর প্রশংসা ‘চারুলতা’-র ক্ষেত্রে সর্বাংশে প্রযোজ‌্য। ছবিটি দেখতে যাওয়ার আগে আমি ‘নষ্টনীড়’ আর একবার পড়ি, তারপর ভাবি– ‘না, এই ছবি দেখতে যাব না’ কারণ এই মণিরত্নটিকে সৃজনের অন্য কোন‌ও মাধ‌্যমে রূপান্তর করা অসম্ভব। কিন্তু সত‌্যজিৎ তো ‘auteur’, তাই সেই নিখুঁত নভেলাটিকে তিনি রূপান্তরিত করলেন নিখুঁত ছবিতে। একটি দাম্পত‌্য সম্পর্কের বিদীর্ণ অবশিষ্টের মধ‌্য দিয়ে তিনি একটি অতীব জটিল সমাজপর্বকে তুলে ধরলেন। বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘চারুলতা’ দেখে একজন নামী জার্মান সমালোচক লিখেছিলেন, ‘He has painted a society layered with the shades of new impulses and emerging tensions– a colonial society trying to bask in the sunshine of segmented reform.’

এই বইটির আর একটি বৈশিষ্ট‌্য হল যে, লেখক বারবার সত‌্যজিতের রাজনৈতিক নন্দন-ভাবনা এবং সামাজিক অঙ্গীকারের স্পর্শকাতর বিষয়টির উপর আলোকপাত করেছেন। তিনি নিজে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে বলেছেন, “People say that I don’t commit myself. I commit myself to human beings, that’s a good enough commitment for me.” তাঁর এই বিশুদ্ধ, স্বতন্ত্র অঙ্গীকার জ্বলে উঠেছে ‘সীমাবদ্ধ’-র প্রতিটি মূহুর্তে, তিনি যাকে বলে বাণিজ‌্যিক সংস্থাসমূহের বা মুনাফা-অন্ধ ধনতন্ত্রের মুখোশ ছিঁড়ে ফেলেছেন অনুচ্চ একাগ্রতায়। একই চেতনা ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’-র নায়ককে উদ্বুদ্ধ করেছে বলতে, ‘এই শতাব্দীর মহত্তম ঘটনা চাঁদে পা রাখা নয়, পক্ষান্তরে ভিয়েতনামের মরণজয়ী সংগ্রাম।’ সবশেষে, যখন তিনি বর্হিদৃশ‌্য নিতে পারছেন না শারীরিক কারণে, তখন চার দেওয়ালের ভিতরেই ‘আগন্তুক’-এ স্পন্দিত হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধবাদী মানবতা। গ্রন্থটির এই পরিচ্ছেদ, এককথায়, অনবদ‌্য। অন্তরের মমতা নিয়ে চিন্ময় দেখিয়েছেন, ব‌্যথিত সত‌্যজিৎ চারিদিকের ভাঙন দেখে কী সবল প্রচেষ্টা করেছেন অন্ধজনকে আলো দিতে, মৃতজনকে দিতে প্রাণ। হাল হিনসন-এর মূল‌্যায়ন অভ্রান্ত– ‘This film shows all the virtues of a master artist in full maturity.’

অঙ্গীকারের এই বৈশিষ্ট‌্য নিঃসন্দেহে অভিপ্রেত। এই মাত্রাটি তাঁকে অন‌্য দুই স্তম্ভ ঋত্বিক ঘটক এবং মৃণাল সেনের থেকে স্বতন্ত্র করে। এবং আমরা, দর্শকেরা, এই প্রণম‌্য ত্রয়ীর কাছ থেকে অঙ্গীকারের বিবিধ বয়ান পাঠ করি, বিমুগ্ধ কৃতজ্ঞতায়।

সর্বোপরি তিনি একজন অতুলনীয় কথক, Superb narrator, বালজাক আর মানিক বন্দ‌্যোপাধ‌্যায়ের মতো তাঁর ক্ষেত্রে আখ‌্যান গড়ে উঠেছে ছেনে ছেনে কাটা সংলাপের ওপর নির্ভর করে। লেখক তাই একেবারে শেষে, পাঁচটি ছবির পাঁচটি সংলাপ পরিবেশন করেছেন। এই সংলাপগুলি পড়ি, আর ফিরে যাই ভি এস নায়পলের প্রশস্তিতে, ‘He seems to achieve more and more with less and less…’ এত সংহত, এত সংক্ষিপ্ত তা সত্ত্বেও দিগন্তবিস্তারী।

সত্যজিৎ রায় ও মৃণাল সেন

নায়পলের এই অভিবাদনই আমাকে তাঁর নিজস্ব একটি মূল‌্যায়নের কথা মনে করায়। আমি তাঁকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, “এত দারুন সব নাটক হয়েছে। তবু আপনি কেন ‘টিনের তলোয়ার’-কে শ্রেষ্ঠতম বলে অভিহিত করেছেন?”

প্রশ্নের উত্তর ছিল তীক্ষ্ণ ও বাঙ্ময়, ‘উৎপল মাত্র আড়াই ঘণ্টায় মঞ্চের উপর আমাদের বহুশ্রুত রেনেসাঁসের বিয়োগান্ত দ্বন্দ্ব আর অপূর্ণতাকে নির্ভীক সততার সঙ্গে উপস্থাপন করেছে। নামী ইতিহাসবিদরা এই কাজটি করার জন‌্য পাতার পর পাতা লিখে যান।’ এই উত্তরই তাঁর খোদাই করা সৃজনের চাবিকাঠি। ‘চারুলতা’-র শেষ দৃশ‌্যে ভূপতি আর চারুর আঙুল বিচ্ছিন্ন রইল, মিলল না। এই নিদারুণ নীরব ব‌্যবধানই সবকিছু সবাক করে দেয়, শব্দের কোনও প্রয়োজন পড়ে না।

‘চারুলতা’-র শেষ দৃশ্যে ভূপতি আর চারু

আমি আরও সুখী হতাম, যদি চিন্ময় একটি ক্ষুদ্র পরিচ্ছেদে সত্যজিতের স্মরণীয় তথ‌্যচিত্র ‘রবীন্দ্রনাথ’ সম্পর্কে অভিমত জানাতেন। তিনি নিজেই ভাষ্যটি লিখেছিলেন এবং তাঁর জলদমন্ত্র কণ্ঠে পাঠ করেছিলেন। তাঁর এই সার্থক প্রচেষ্টা স্বর্গ আর মর্তের দু’টি ঠিকানার প্রতি অনুগত ছিল– একদিকে রবীন্দ্রনাথের ব‌্যক্তিময় লিরিক সত্তা, অন‌্যদিকে সর্বদা মুখর, প্রতিবাদী সামাজিক ভূমিকা, যেহেতু তিনি ছিলেন গান্ধির ভাষায়, ‘The great sentinel’।

‘রবীন্দ্রনাথ’ তথ্যচিত্র পরিচালনার সময় আমানুল হকের তোলা ছবি

চিন্ময় হয়তো বা পশ্চিমের স্তবগান সংকলনের সময় আর একজন মুগ্ধপ্রতিভাকে স্মরণ করতে পারতেন। আমি বিশ্বখ‌্যাত ঔপন‌্যাসিক সলমন রুশদির কথা বলছি, যিনি জানিয়েছেন, ‘I simply grow up with the films of Ray and Godard and the novels of Grass and Kundera.’ উল্লেখনীয়, রুশদির আলোকোজ্জ্বল রূপকথা ‘Haroun and the sea of Stories’-এর দুই মুখ‌্য চরিত্রের নাম গুপী আর বাঘা। এই নামসর্বস্ব নির্ভরতা প্রমাণ করে, আমাদের পর্বের অন‌্যতম শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী অন‌্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রপরিচালককে কী চোখে দেখতেন, কী অর্ন্তলীন সহৃদয়তার সঙ্গে।