


মা খেতে খেতে একটা গল্প বলে। দেবী অন্নপূর্ণা। চলেছেন নদী ডিঙিয়ে। তাকে নিয়ে যাবে যে মাঝি, নাম তার ঈশ্বরী। ঈশ্বরী কি ছেলে? ঈশ্বরী কি মেয়ে? মাঝিটি ছেলে হোক, মেয়ে হোক, সংসারী। সন্তান আছে তার। সাধারণ মানুষ। থাকতে চায় শান্তিতে, নিশ্চিন্তে। মা বলে, সেই মাঝি বলেছিল দেবীকে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ কথাটা তার কানে লেগে থাকে। সে ভাবে, নৌকায় দেবীর সঙ্গে দেখা হলে, দুধ-ভাত চাইবে না। কী চাইবে? দুপুরে, খাটে মায়ের পাশে শুয়ে সে না-দেখা দেবীকে বলে, ‘আমরা যেন থাকি ভাতে-ভাতে’!
৫.
একখানা মস্ত হাঁড়ি। উনুনে বসানো। জল ফুটিফুটি। পাতা উনুনের পাশে বাঁধানো ধাপ। কালো মেঝের মতো মসৃণ। সেখানে চুপটি করে বসে আছেন মা। আজ শনিবার, আজ ভাতে ভাত। গবগবিয়ে উনুনে জল ফুটলে চাল ছাড়া হবে। এবার রেশনের চাল ভালো, ভাঙা নয়– বেশ লম্বা। তাছাড়া খুদ আর কাঁকড় তত নয়। বারদুয়েক জলে ধুলেই চলে যাবে। জলে ধোওয়া রেশনের চাল অপেক্ষা করছে হিন্ডালিয়ামের বাটিতে। একটা সাদা কাপড়ে বাঁধা মুসুর ডাল। কাপড়টি সাদা। কলকাতা থেকে ফেরার সময় দিদিমার কাছ থেকে আনা। সে-কাপড় এসেছে গঙ্গাজলের পাত্রের সঙ্গে। বড় বনস্পতির কৌটো ভরে গঙ্গাজল যে প্যাকেটে আনা হয়েছিল, তাতেই রাখা ছিল দিদিমার কাপড়। পুরনো, সরু পাড়। থান নয়। নরম ধুতির মতো। দিদিমা থান পরে না। সেই কবে মায়ের ছোট অবস্থায় দাদু চলে গিয়েছে! সে দাদুকে দেখেনি, ছবি দেখেছে। বাবা তো ধুতি পরে না, প্যান্ট পরে। তাই ডাল সেদ্ধ করার কাপড় বাবা দিতে পারে না, দিদিমা পারে। একটা আনলেই অনেক দিন চলে যায়। একটু একটু করে কেটে নিলেই হল। ডাল সেদ্ধর জন্য পুটলি বানাতে কত কাপড়ই বা আর লাগে। একটা থালায় ডুমো ডুমো করে কাটা আলু, পড়ে আছে।

জল ক্রমে গবগবিয়ে উঠল। মা চাল ছেড়ে দিল তাতে। জল আর গবগব করে না। চাল পড়ায় আপাত শান্ত ভাব। মা হাতায় করে চাল উপর-নিচ করে দিল। তারপর কাটা-ধোয়া আলু ছেড়ে দিল তাতে। অনেকে গোটা গোটা আলু খোসা না-ছাড়িয়ে হাঁড়িতে ভাতের সঙ্গে দেয়। মা দেয় না। কেন দেবে? সংসারের শ্রী নেই বুঝি! শ্রী না-থাকলে লক্ষ্মী আসে না। শ্রীমন্ত নৌকায় লক্ষ্মীর অধিষ্ঠান। কাজে যত্ন চাই, তবে তো শ্রী। সংসারটি শ্রীমন্ত নৌকা। হয়তো সে-নৌকা ময়ূরপঙ্খী নয়। তবে নৌকাটি বড় মনোরম, ছোট তরী। চলেছে শ্রমের ফসল নিয়ে।
আজ তো আয়োজন বেশি না, ভাত, ডালসেদ্ধ, আলুসেদ্ধ। ভাতে-ভাত। তবে রান্নাটি পরিপাটি হওয়া চাই। ডালসেদ্ধর কাপড়টি সাদা, ধোওয়া। আলুগুলি খোসা ছাড়িয়ে সমান করে কাটা। ভাতের শরীরে যেন আলুর মালিন্য না-লাগে। ধুয়ে পরিষ্কার করে, তবে ভাতের জলে ছাড়া চাই। তারপর ভাত-আলু খানিক সেদ্ধ হলে ডালের পুটলি বসিয়ে দিতে হবে হাঁড়িতে। সাদা কাপড়ে মোড়া ডাল ধীরে ধীরে সেদ্ধ হবে। সাদা কাপড়ের মধ্য থেকে তার শরীরের নরম গন্ধ টের পাওয়া যাবে। যত সেদ্ধ হবে তত মৃদু হবে তার লাল আভা।
একই আঁচে তিনটি জিনিস সেদ্ধ হল। এ ওর গায়ে যেন দাগ না-রাখে। ভাতের ফ্য়ান গালার আগে আস্তে আস্তে গোল হাতা দিয়ে তুলে নিতে হয় আলু। যে-পাত্রে রাখা হবে, সে-পাত্রে একটু জল দেওয়া। সেদ্ধ আলুর শরীরে যে-ক’টা ভাত লেগে থাকে, তা জলে আলাদা হয়ে যায়। সেই ভাত নষ্ট করতে নেই। টানাটানির সংসার, তবে হাসিটি লেগে আছে মুখে। অপচয়হীন হলে হাসিটুকু থাকে। তারপর সেই ভাত-না-লেগে থাকা আলু যত্ন করে রাখা হল একটি সুগভীর-বাটিতে। মাখার জন্য সুসেদ্ধ সাদা আলুর টুকরোগুলি অপেক্ষায় বসে। আলুর পর খুব সাবধানে হাঁড়ি থেকে তোলা চাই সাদা-কাপড়-বন্দি সেদ্ধ ডাল। যেন সে-কাপড় খুলে না-যায়। ডালে ভাতে মাখামাখি হতে নেই। দিদিমার সাদা শাড়ি সেকথা জানে। সাদা কাপড় খুলে সেদ্ধ ডাল রাখা হল একটি পাত্রে, গলে পাঁক হয়ে যায়নি। আবার কাঁচাও নয়। সাবধানে ভাতের ফেন গালতে হবে শেষে। ফেন থাকবে একটি বাটিতে। বাবার অফিসের জামায় মাড় দেওয়ার কাজে লাগবে তা। আজ শনিবার, বাবা অফিস যায়নি। কী একটা ছুটি।
রেশনের চালটা এবার সত্যি ভালো। উদয়াস্ত জল ফুটিয়ে ফুটিয়ে কয়লা পোড়াতে হয়নি। উনুন এবার নিভিয়ে দিতে হবে। শিক দিয়ে খুঁচিয়ে আধপোড়া কয়লাগুলো আলাদা করতে হবে। আবার কাজে লাগবে তারা। মা আধপোড়া কয়লাগুলো আলাদা করে তবে চান করতে যাবে।

আজ শনিবার। আজ নিরামিষ। আজ ভাতে ভাত। মায়ের স্নান হল, বাবার আগেই হয়েছে, তাকেও মা স্নানের পর গা মুছিয়ে দিয়েছে। এবার খাওয়া। মা আলুভাতে মাখছে। মায়ের হাতের মাখা খুব ভালো লাগে তার। তার আলুভাতে মা আগেই তুলে রাখে। সামান্য সর্ষের তেল আর নুন দিয়ে মাখা। সে লঙ্কা খায় না। বাবা-মা খায়। ভাতের থালার একপাশে গোল করে আলুভাতে। দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। ডালসেদ্ধতেও মা সামান্য তেল দিল। পেঁয়াজ দেয়নি। তাকে মা ভাত দিয়েছে, পাশে সুন্দর করে আলুসেদ্ধ আর ডালসেদ্ধ। প্রথমের ভাতে একটু ঘি মাখা। শনিবারের দুপুরে তারা ভাতে ভাত খাচ্ছে। সে ভাতের গোল্লা পাকাতে পারে না। চারটে আঙুল দিয়ে একটু একটু করে খায়।

মা খেতে খেতে একটা গল্প বলে। দেবী অন্নপূর্ণা। চলেছেন নদী ডিঙিয়ে। তাকে নিয়ে যাবে যে মাঝি, নাম তার ঈশ্বরী। ঈশ্বরী কি ছেলে? ঈশ্বরী কি মেয়ে? নদীতে নৌকা চালায় বুঝি মেয়েরা? এই সব প্রশ্ন মনেই থেকে যায় তার। মায়ের গল্পে দেবীর পা-লেগে নৌকাটি সোনার হয়ে গেল। মাঝিটি ছেলে হোক, মেয়ে হোক, সংসারী। সন্তান আছে তার। সাধারণ মানুষ। থাকতে চায় শান্তিতে, নিশ্চিন্তে। মা বলে, সেই মাঝি বলেছিল দেবীকে, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে।’ কথাটা তার কানে লেগে থাকে। তবে তার দুধ খেতে ভালো লাগে না। বিকেলের দিকে গোয়ালা আসে। দুধ দেয়। মা বলে ‘আর কত জল মেশাবে?’ সে ভাবে নৌকায় দেবীর সঙ্গে দেখা হলে, দুধ-ভাত চাইবে না। কী চাইবে? খাওয়া শেষ হল। মা সব গুছিয়ে তুলে নেয়। তারা মাটিতে আসন বিছিয়ে খায়। মায়ের সেলাই করা আসন। তাদের বাড়িতে ডাইনিং টেবিল নেই। দুপুরে খাটে মায়ের পাশে শুয়ে সে না-দেখা দেবীকে বলে, ‘আমরা যেন থাকি ভাতে-ভাতে’!

মায়ের মাখা আলুসেদ্ধ আর ডালসেদ্ধর স্বাদ জিভে লেগে আছে। দিদিমা স্বাদকে নরম করে ‘সোয়াদ’ বলে। মা ঘুমিয়ে পড়েছে, দিদিমার জন্য তার মন কেমন করে। দিদিমা তো অনেকদিন আগে এসেছে এই পৃথিবীতে। দিদিমা কি দেবীকে দেখেছে?
… পড়ুন সিরিয়ালসি নেবেন না-র অন্যান্য লেখা …
৪. গলাগলি
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved