


জীবনের শেষপর্বে তিনি জনসমক্ষে খুব কমই আসতেন। ২০২৩ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানপ্রাপ্তির পর, দূরদর্শনে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তার জীবনে কিছু অপ্রাপ্তি আছে কি না জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন– ‘আমি গান গেয়েছি, মানুষ পছন্দ করেছেন। যা যা করতে চেষ্টা করেছি– ছবি আঁকা, গান, সবই ভালোবেসে করেছি। জীবনে আমার কোনও ক্ষোভ বা আক্ষেপ নেই। আমি খুব কনটেন্ড।’
সময়টা পাঁচ-ছয়ের দশক, সে সময়ে ঘরে ঘরে বোকাবাক্সের অমন সন্ত্রাস ঢুকে পড়েনি। তখন মার্ফি রেডিও বড় আপন বড় মূল্যবান ছিল জীবনে। দিনের একটা সময় গোল হয়ে বসে একসঙ্গে রেডিও শোনা বা একাকিত্বের শুকনো দুপুরবেলায় বসার ঘরে সঙ্গী তখন ছিল বেতারের জগৎ। রেডিও সিলোনে, বিবিধ ভারতীতে– গীতমালা বা ছায়াগীত বেজে উঠত ঘরে ঘরে। আর বেজে উঠত প্রিয় শিল্পীদের গান, বাজনা। শাস্ত্রীয়, উপশাস্ত্রীয় সংগীতের তুলনায় চিরদিনই সাধারণ জনমানসে ছায়াছবির গান ছিল বেশি গ্রাহ্য এবং উপাদেয়। সেই সময়টা ছিল ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের সুবর্ণ যুগ। ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের সে যুগের ইতিহাস অনেকটা নক্ষত্রখচিত আকাশের মতো ছিল। সেখানে কিছু নক্ষত্র এমন ছিল, যাদের দীপ্তি এত প্রবল যে সহজেই সকলের চোখে পড়ে; আবার কিছু নক্ষত্র এমনও ছিল, যারা অপেক্ষাকৃত শান্ত আলোয় জ্বলে থেকেও নিজগুণে আকাশকে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে গিয়েছে। একদিকে দাপটে সেই সময়ে সেখানে রাজত্ব করছেন গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, তালাত মামুদ, মুকেশ, মুহম্মদ রফি, কিশোর কুমার; আর তারই মধ্যে সুমন কল্যাণপুর ছিলেন সেই দ্বিতীয় শ্রেণির বিরল শিল্পীদের একজন। তিনি না-ছিলেন প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু, না-ছিলেন বিতর্কের আলোচ্য বিষয়; কিন্তু তাঁর কণ্ঠের স্নিগ্ধতা, গায়কির সৌকর্য এবং সুরের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ ভাব তাঁকে ভারতীয় ছায়াছবির সংগীতের ইতিহাসে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে।

১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ঢাকা শহরে সুমন হেম্মাডির জন্ম। তাঁর পরিবারের শিকড় ছিল কর্নাটকের দক্ষিণ কানাড়া অঞ্চলে। দেশভাগের আগেই তাঁর বাবা বদলি হয়ে মুম্বইয়ের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় চলে আসেন এবং সেখানেই সুমনের বেড়ে ওঠা। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। পরিবারে সাংস্কৃতিক পরিবেশও ছিল কিন্তু, গান গাওয়া চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। অনুষ্ঠানে গাইবার অনুমতি ছিল না। সংগীতের প্রতি তাঁর আকর্ষণকে প্রত্যক্ষ করে, তাঁর বাবাই তাঁকে পণ্ডিত কেশবরাও ভোলের কাছে হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীত শেখাতে শুরু করেন। পুণের প্রভাত ফিল্মের সংগীত পরিচালক এবং তাদের একজন পারিবারিক বন্ধু পণ্ডিত কেশব রাও ভোলেজির কাছে উচ্চাঙ্গ কণ্ঠ-সংগীতে তালিম নেওয়াটা তার সামনে এক অন্য দরজা খুলে দেয়। সুমনের মত অনুযায়ী, প্রথমদিকে গান গাওয়া এবং ছবি আঁকা ছিল তার শখ, কিন্তু ক্রমে ক্রমে সংগীতের ওপর তার অনুরাগ বেড়ে যায়, আর এর ফলস্বরূপ তিনি পেশাদারিত্বের সঙ্গে উস্তাদ খান আবদুল রহমান খান এবং গুরুজি মাস্টার নবরং-এঁর কাছে সংগীত শিক্ষা করতে আরম্ভ করেছিলেন। এই কঠোর ও নিয়মতান্ত্রিক প্রশিক্ষণ তাঁর কণ্ঠকে দিয়েছিল অসাধারণ স্থিতি, সুরের শুদ্ধতা এবং আবেগ প্রকাশের সূক্ষ্ম ক্ষমতা। পরবর্তীকালে চলচ্চিত্রের গানে তাঁর যে স্বচ্ছ উচ্চারণ, নিখুঁত সুরনিয়ন্ত্রণ এবং পরিমিত অলংকার ব্যবহারের পরিচয় পাওয়া যায়, তার ভিত্তি ছিল এই শিক্ষাই।
পাঁচের দশকের শুরুর দিকে তাঁর পেশাদার সংগীত-জীবনের শুরু। গুরু কেশব রাও ফুলে তাঁকে রেডিওতে গাইবার সুযোগ করে দিলেন, বাড়িতে প্রথমে অমত থাকলেও পণ্ডিতজি সুমনের বাবার বন্ধু ছিলেন বলে শেষমেশ রাজি হতেই হল। সেই রেডিও প্রোগ্রামের হাত ধরেই তাঁকে শুনে ফেললেন তালাত মামুদ সাহেব। আর তার বছরখানেক বাদেই তার ডাক পড়ল তালাত সাহেবের সঙ্গে ‘দরোয়াজা’ ছবিতে ডুয়েট গাইবার জন্য। গানটি ছিল ‘এক দিল দো হ্যায় তলবগার’। এরই মধ্যে প্রথমদিকে সুমন কিছু মারাঠি ছবিতে কণ্ঠদান করেন। ‘মঙ্গু’ ছবিতে ও পি নাইয়ারের সংগীত পরিচালনায় একটি লোরি গেয়েও ধীরে ধীরে তাঁর প্রতিভা সংগীত পরিচালকদের নজরে আসে। সেই সময়ে হিন্দি সিনেমার গানে লতা মঙ্গেশকরের আধিপত্য ছিল সর্বব্যাপী। সুমন কল্যাণপুরের কণ্ঠের সঙ্গে লতার কণ্ঠের বেশ কিছুটা সাদৃশ্য থাকায় অনেক শ্রোতাই বিভ্রান্ত হতেন। আবার একটা সময় এমন ছিল, যখন এই সাদৃশ্যের জন্যই তিনি ডাক পেয়েছেন বেশ কিছু বড় প্রজেক্টে গাইবার। কিন্তু গভীরভাবে শুনলে বোঝা যায়, সুমনের নিজস্ব গায়কির একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল– এক ধরনের কোমল আবেগ, সংযত অভিব্যক্তি এবং গলার জোয়ারির স্বাভাবিক সুরপ্রবাহ, যা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল।

ছয়ের দশক ছিল তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বিবাহিত সুমন তখন কল্যাণপুর পদবি নিয়ে গাইছেন। স্বামীর যৌথ পরিবারে চারজন জায়ের মধ্যে তিনিই একমাত্র গান গাইতেন এবং রোজগেরে ছিলেন। তবে স্বামীর পূর্ণ সহযোগিতায় তিনি জোর পেয়েছিলেন অন্যরকম করে নিজের জীবন নিজের মতন বাঁচার। এই সময়ে হিন্দি চলচ্চিত্রে একের পর এক জনপ্রিয় গান তিনি গেয়েছেন। বিশেষ করে মহম্মদ রফির সঙ্গে তাঁর ডুয়েটগুলি আজও ভারতীয় ছায়াছবির সংগীতের অমূল্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর পেছনেও আবার রয়ে গিয়েছে আরেকটি গল্প। সেই সময় হিন্দি ছায়াছবির গানের রয়্যালটি বিষয়ে একটি মিটিং-এ লতাজি ও রফি সাহেবের মধ্যে বিরোধ বাধে। লতাজি ছিলেন গায়কের রয়্যালটি পাওয়ার পক্ষে আর রফি সাহেব মনে করেছিলেন যে, গায়ক যে পারিশ্রমিক দাবি করে পান সেটিই যথেষ্ট, ক্ষতির বোঝা যখন গায়ক বহন করেন না তখন লাভের গুড়ও তার প্রাপ্য নয়। এই বিবাদের জেরে দু’জনেই মিটিং ছেড়ে বেরিয়ে যান এই বলে যে, তাঁরা আর কেউ কারওর সঙ্গে গাইবেন না। এমতাবস্থায় রফি সাহেবের সঙ্গে ডুয়েট গাইবার জন্য সুমন কল্যাণপুরকেই সর্বপ্রথমে মনে পড়ে। আর সেই সময়েই আসতে থাকে ওঁর গাওয়া কালজয়ী সমস্ত গান– ‘আজকাল তেরে মেরে পেয়ার কে চর্চে’, ‘না না করতে পেয়ার তুমহি সে কর বেঁঠে’, ‘তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে’, ‘দিল এক মন্দির হ্যায়’ গানগুলি যেন তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য ও দক্ষতার উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থেকে গিয়েছে। অথচ এমন বহু মানুষ আছেন যারা এখনও মনে করেন এই গানগুলি লতাজির গাওয়া।

সুমন তাঁর নিজস্বতায় ভাস্বর ছিলেন ঠিকই, যোগ্যতাও ভরপুর ছিল তাঁর মধ্যে, কিন্তু লতা মঙ্গেশকর নামটির ছায়া থেকে নিজেকে আলাদা করে নিতে তিনি সারা জীবনেও পারেননি। অনেকক্ষেত্রে শোনা গিয়েছে, লতাজি মনঃক্ষুণ্ণ হতে পারেন এই ভয়েও অনেকে তাঁকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও গাওয়াতে পারেননি। ছয় ও সাতের দশকে বিভিন্ন কারণে লতা মঙ্গেশকর ও কিছু সংগীত পরিচালকের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলে, অনেক সুরকার বিকল্প নারীকণ্ঠের সন্ধান করতে শুরু করেন। শচীন দেববর্মণ তার মধ্যে অন্যতম। এবং ওই সময়েই শচীনকত্তার সুরে ‘বাত এক রাত কি’ (১৯৬২) ছবিতে সুমন গেয়ে ফেললেন কালজয়ী ‘না তুম হমে জানো, না হম তুমহে জানে’ গানটি। এছাড়াও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শংকর-জয়কিষন, রোশন, রবি, কল্যাণজি-আনন্দজি, উষা খন্না প্রমুখ সুরকার তাঁর কণ্ঠকে বিভিন্ন গানে ব্যবহার করেন। যদিও সুমন কখনও বাণিজ্যিক জনপ্রিয়তার দিক থেকে শীর্ষস্থানে পৌঁছতে পারেননি, তবু তাঁর গাওয়া বহু গান সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আজও শ্রোতাদের প্রিয়।
হিন্দি গানের পাশাপাশি মারাঠি সংগীত-জগতে তাঁকে ভাবগীত সম্রাজ্ঞী বলা হত । মারাঠি ভাবগীত, ভক্তিগীত এবং চলচ্চিত্র সংগীতে তিনি এক অনন্য উচ্চতা অর্জন করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে গাওয়া ‘কেশভা মাধভা’, ‘সাওল্যা ভিঠঠলা’, ‘আসাভে ঘরকুল আপুলে ছান’ প্রভৃতি গান মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ হয়ে রয়েছে। ভক্তিমূলক গানে তাঁর কণ্ঠে যে আন্তরিকতা ও আধ্যাত্মিকতার প্রকাশ ঘটত, তা শ্রোতাদের মনে গভীর ছাপ ফেলত। আর শুধু হিন্দি ও মারাঠি নয়, তিনি বাংলা, গুজরাটি, পাঞ্জাবি, ভোজপুরি, ওড়িয়া, অসমিয়া, কন্নড় এবং অন্যান্য ভাষাতেও গান গেয়েছেন। এই বহুভাষিক দক্ষতা তাঁর শিল্পীসত্তার ব্যাপ্তিকে আরও বিস্তৃত করেছে। বিভিন্ন ভাষার উচ্চারণ ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যকে সম্মান জানিয়ে গানকে পরিবেশন করার ক্ষমতা আসলে তাঁকে একজন প্রকৃত সর্বভারতীয় শিল্পীর মর্যাদা দিয়েছে।

সুমন কল্যাণপুরের ব্যক্তিত্ব ছিল তাঁর শিল্পের মতোই মার্জিত। তিনি ছিলেন অত্যন্ত আত্মপ্রচারবিমুখ। যে সময়ে চলচ্চিত্রজগতে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য প্রচার ও জনসংযোগ ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল, সেই সময়েও তিনি নিভৃতচারী জীবনযাপন করতে পছন্দ করতেন। সংবাদমাধ্যমের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি নিজের কাজকেই প্রধান পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই বিনয় এবং আত্মমর্যাদাবোধ তাঁকে সহকর্মীদের কাছেও অত্যন্ত সম্মানিত করে তুলেছিল।
তাঁর শিল্পীজীবনের একটি বেদনাদায়ক দিক হল, তিনি অনেক সময়ই তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ইতিহাসে তাঁর অবদান যে পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ, তার তুলনায় পুরস্কার ও আনুষ্ঠানিক সম্মান তুলনামূলকভাবে কম এসেছে। তবে শিল্পীর প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত শ্রোতাদের ভালোবাসাতেই নিহিত থাকে। সেই বিচারে সুমন কল্যাণপুর ছিলেন অত্যন্ত সফল। তাঁর গান কয়েক দশক পরেও সমান জনপ্রিয়, যা তাঁর শিল্পের স্থায়িত্বের প্রমাণ।

সংগীত-বিশারদদের মতে, সুমন কল্যাণপুরের গায়কির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর স্বচ্ছতা এবং সংযম। তিনি কখনও কণ্ঠের শক্তি প্রদর্শনের জন্য অযথা অলংকারের আশ্রয় নিতেন না। বরং গানের কথা ও সুরের অন্তর্নিহিত আবেগকে গুরুত্ব দিয়ে অত্যন্ত মসৃণ ও পরিমিতভাবে পরিবেশন করতেন। তাঁর কণ্ঠে এমন এক আন্তরিকতা ছিল, যা শ্রোতার হৃদয়ে সরাসরি পৌঁছে যেত। এই গুণই তাঁকে সমকালীন বহু শিল্পীর মধ্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।
জীবনের শেষপর্বে তিনি জনসমক্ষে খুব কমই আসতেন। ২০২৩ সালে ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মভূষণ’ সম্মানপ্রাপ্তির পর, দূরদর্শনে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে তার জীবনে কিছু অপ্রাপ্তি আছে কি না জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি বলেন– ‘আমি গান গেয়েছি, মানুষ পছন্দ করেছেন। যা যা করতে চেষ্টা করেছি– ছবি আঁকা, গান, সবই ভালোবেসে করেছি। জীবনে আমার কোনও ক্ষোভ বা আক্ষেপ নেই। আমি খুব কনটেন্ড।’ কিন্তু তাঁর গান নিয়ে গবেষণা, স্মৃতিচারণ এবং পুনর্মূল্যায়ন ক্রমশ বাড়তে থাকে। নতুন প্রজন্মের সংগীতপ্রেমীরাও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে আজও তাঁর গান আবিষ্কার করছেন, শুনছেন, ভালোবাসছেন। ফলে তাঁর শিল্পীসত্তা নতুন করে আলোচনায় আসে।

সুমন আজ আমাদের মধ্যে নেই, গত ৩১ মে, রবিবার তাঁর আন্ধেরি, লোখান্ডওয়ালার বাসভবনেই দেহ রেখেছেন। কিন্তু সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায়, পুরোনো রেডিওর মৃদু শব্দে, কিংবা কোনও সংগীতপ্রেমীর স্মৃতির অলিন্দে তাঁর কণ্ঠ এখনও ভেসে আসে। সেই কণ্ঠে আছে প্রেমের মাধুর্য, ভক্তির নিবেদন, বেদনার কোমলতা এবং জীবনের সৌন্দর্যের প্রতি এক গভীর আস্থা। তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় সংগীত-জগৎ শুধু একজন গায়িকাকে হারায়নি; হারিয়েছে এক মূল্যবোধের প্রতীককে। এমন এক সময়ে, যখন জনপ্রিয়তার পরিমাপ প্রায়শই সামাজিক উপস্থিতি ও প্রচারের ওপর নির্ভরশীল, তখন সুমন কল্যাণপুরের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃত শিল্পের শক্তি নিহিত থাকে তার সৌন্দর্য, সততা এবং স্থায়িত্বে। আজ যখন তাঁর জীবনের দিকে ফিরে তাকানো হয়, দেখা যায় এক দীর্ঘ সংগীত-সাধনার কাহিনি। সেখানে আছে নিষ্ঠা, অধ্যবসায়, শৃঙ্খলা এবং শিল্পের প্রতি গভীর ভালোবাসা। ভারতীয় ছায়াছবির সংগীতের ইতিহাসে সুমন কল্যাণপুর চিরকাল স্মরণীয় থাকবেন এক সুরময়, মার্জিত এবং নীরব দীপ্তির শিল্পী হিসেবে। তাঁর জীবন ও সংগীত আমাদের মনে করিয়ে দেয়– সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো সবসময় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে না; কখনও কখনও সবচেয়ে স্থায়ী আলো সেই, যা নীরবে, দূরত্বে থেকেও নিরলঙ্কারভাবে, দীর্ঘকাল ধরে জ্বলে থাকে। সুমন কল্যাণপুর সেই আলোরই নাম।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved