

বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের বিবর্তন এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের মেলবন্ধন কেবল একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ ছিল না, ছিল বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবশ্যম্ভাবী ঐতিহাসিক পরিণতি। গিরিশচন্দ্র ঘোষের পৌরাণিক ও ভক্তিগীতিমূলক নাটকের যুগ পার হয়ে বাংলা থিয়েটার যখন সমাজ ও জীবনের বাস্তব দর্পণে নিজেকে খুঁজতে চাইছে, তখন শরৎচন্দ্রের গল্প ও উপন্যাসগুলোই হয়ে উঠেছিল সেই উত্তরণের প্রধান হাতিয়ার।
ভাগলপুরে মামাবাড়িতে দারুণ গল্পের আসর বসত। সেই আসরে একদিন মাসিমা কুসুমকামিনী দেবী ‘কপালকুণ্ডলা’ পড়ে শোনাচ্ছেন। নভেল শুনতে শুনতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিশু ‘শোরো’-র মনে জিজ্ঞাসা এল, তবে কি নবকুমারকে কাপালিক কেটেই ফেলবে? কিন্তু পরক্ষণেই ওইটুকু বালকের উপলব্ধি, এত সহজে কি নায়ক মরে? তবে তো গল্পটাই শেষ! উত্তরাধিকার সূত্রে এই বালক পেয়েছিল তার বাবার বাক্স হাতড়ে পাওয়া অসমাপ্ত কিছু পাণ্ডুলিপি। সেইসব পাণ্ডুলিপির শেষটুকু কেমন হতে পারে, এই ভেবে ভেবে কেটে যেত তার বিনিদ্র রাত। বাল্যকালের এই যে কাহিনির বুনন বোঝার অসামান্য ক্ষমতা, আখ্যানের পরিণতি বা ক্লাইম্যাক্স নিয়ে এই যে গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি– এটাই যেন ভবিষ্যৎ জীবনের এক অমোঘ ইঙ্গিত ছিল। কে জানত, গল্পের পরিণতি নিয়ে বিনিদ্র রাত কাটানো সেই শিশুটিই একদিন তাঁর লেখনী দিয়ে সমগ্র বাঙালি সমাজকে মোহগ্রস্ত করে রাখবেন। শুধু উপন্যাস নয়, তাঁর উপন্যাসের সার্থক নাট্যরূপ মাতিয়ে বাংলা রঙ্গমঞ্চ অবধি।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে, ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সার্ধশতজন্মবার্ষিকীতে যখন আমরা তাঁর সাহিত্য ও তার নাট্যরূপগুলোর দিকে ফিরে তাকাই, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করি, ওই ছোট্ট ‘শোরো’-র ভেতরেই লুকিয়ে ছিল আজকের আধুনিক বিনোদন দুনিয়ার এক নিখুঁত ‘শো-রানার’, যিনি নিপুণভাবে জানতেন দর্শকের নাড়ি কীভাবে ধরতে হয়। মনে হয়, ইস্! আজকের দিনের সিরিয়ালওয়ালারা যদি একটু তালিম নিতেন তাঁর কাছে!

সেই সময়ে বাংলা সাধারণ রঙ্গমঞ্চ বা পাবলিক থিয়েটারও এক বিশাল পালাবদলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। উনিশ শতকের শেষভাগে গিরিশচন্দ্র ঘোষ বা দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের হাত ধরে যে নাট্যধারার বিকাশ ঘটেছিল, তা মূলত পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও অতিকথনের জগতেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বাঙালি সমাজে যখন নানাবিধ আর্থ-সামাজিক জটিলতা দেখা দিতে শুরু করে, তখন নাট্যমঞ্চ সামাজিক বাস্তবতার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়। এই সন্ধিক্ষণেই বাংলা থিয়েটারে আধুনিকতা ও বাস্তবধর্মী অভিনয়ের কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, আধুনিক দর্শকের মনস্তত্ত্বকে ছুঁতে গেলে শরৎচন্দ্রের রক্তমাংসের চরিত্রগুলিই সর্বোত্তম মাধ্যম। মনে রাখবেন পাঠক, এই সময় কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বহাল তবিয়তে বাংলা সাহিত্যাকাশে ভাস্বর, তবুও শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয় আখ্যানগুলি একের পর এক নাট্যরূপে মঞ্চে অবতীর্ণ হতে শুরু করে। রবীন্দ্রনাথের নাটক (যেমন ‘রক্তকরবী’, ‘ডাকঘর’ বা ‘অচলায়তন’) হল রূপক ও প্রতীকাশ্রয়ী। সেখানে সংলাপের আড়ালে লুকিয়ে থাকে গভীর দার্শনিক তত্ত্ব। দর্শককে মস্তিষ্ক খাটিয়ে সেই অন্তর্নিহিত দর্শন বুঝতে হয়। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাট্য যেখানে মূলত দর্শকের ‘মস্তিষ্ক’-কে উদ্দীপ্ত করতে চেয়েছিল সেখানে, শরৎচন্দ্র আঘাত করেছিলেন দর্শকের সরাসরি ‘গাট ফিলিং’ বা আবেগের জায়গায়। তাঁর চরিত্ররা রূপক নয়, তারা রক্তমাংসের মানুষ– তারা কাঁদে, রাগে, ঈর্ষা করে, ভুল করে। ‘বিরাজ বৌ’-এর চরম দারিদ্র ও ট্র্যাজেডি, কিংবা ‘গৃহদাহ’ (অচলা)-এর ত্রিকোণ প্রেমের সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক দোদুল্যমানতা সরাসরি দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে।
শরৎচন্দ্রের উপন্যাসকে মঞ্চে আনার প্রথমদিকের প্রচেষ্টাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল যোগেশচন্দ্র চৌধুরীর উদ্যোগ। তাঁর হাতেই প্রথম সফল নাট্যরূপ পায় ‘দেবদাস’ ও ‘চরিত্রহীন’। কিন্তু শরৎচন্দ্র যখন স্বয়ং শিশিরকুমার ভাদুড়ীর অনুরোধে তাঁর উপন্যাসের নাট্যরূপ দিতে শুরু করলেন, তখন তাঁর মধ্যে একজন আধুনিক ‘শো-রানার’-এর ছায়া দেখতে পাওয়া যায়। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল ‘দেনাপাওনা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘ষোড়শী’ (১৯২৭)। উপন্যাসের সমাপ্তি ঘটেছিল একটি অপেক্ষাকৃত মিলনান্তক আবহে। কিন্তু মঞ্চের দাবি ও নাটকীয় উৎকর্ষের কথা মাথায় রেখে শিশিরকুমারের অনুরোধে শরৎচন্দ্র নাটকের সমাপ্তিটি পরিবর্তন করে এক অসামান্য ট্র্যাজিক রূপ দেন। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, এই উপন্যাসের প্রাথমিক খসড়াটি তৈরি করেছিলেন শিবরাম চক্রবর্তী। কিন্তু চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার সময় শরৎচন্দ্র জানতেন, বাঙালি দর্শক থিয়েটারে এসে কাঁদতে ভালোবাসে। এই যে মনস্তাত্ত্বিক নির্গমন বা ‘ক্যাথারসিস’-এর সুযোগ করে দেওয়া, এটা তাঁর দুর্দান্ত ‘বক্স অফিস সেন্স’ প্রমাণ করে। আজকের দিনের ওটিটি প্ল্যাটফর্মের যুগে একজন সফল ওয়েব সিরিজের শো-রানার ঠিক যে কাজটা করেন– দর্শকের পালস বুঝে, সিজনের শেষে একটা বড় ধাক্কা বা ট্র্যাজেডি দিয়ে চিত্রনাট্য শেষ করা– শরৎচন্দ্র সেই যুগে দাঁড়িয়ে সেই প্রফেশনালিজম দেখিয়েছিলেন। কিন্তু এতে কি তাঁর সাহিত্যগত সিদ্ধান্ত কেবল বাজার বা পুরুষতান্ত্রিক আবেগের দ্বারাই পরিচালিত হয়েছিল? এর উত্তর খোঁজার জন্য আরও দীর্ঘ গবেষণা প্রয়োজন!

এই পুরুষতান্ত্রিক আবেগের প্রসঙ্গ উঠলেই অবধারিতভাবে এসে পড়ে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘দেবদাস’-এর কথা। যোগেশচন্দ্র চৌধুরীর নাট্যরূপে এবং শিশিরকুমারের পরিচালনায় ‘দেবদাস’ যখন মঞ্চস্থ হয়, তখন ব্যর্থ প্রেমের তাড়নায় একজন অভিজাত যুবকের নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কাহিনি– মঞ্চে এক অভাবনীয় আবেগের সঞ্চার করেছিল। দীর্ঘকাল ধরে দেবদাসকে বাঙালি মানসে এক রোমান্টিক ট্র্যাজিক হিরো হিসেবেই দেখা হয়েছে। কিন্তু আজকের আধুনিক নারীবাদী এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেবদাস এক চরম ‘ফ্লড’ ক্যারেক্টার। দেবদাস পার্বতীকে ভালোবাসলেও নিজের সামাজিক অবস্থান ও পারিবারিক অহংকারের ভয়ে তাকে গ্রহণ করতে পারে না। অথচ, পার্বতী যখন অন্য কারও হতে চলেছে, তখন অধিকারবোধের দম্ভে সে পার্বতীকে ছিপের বাড়ি মেরে আঘাত করে। এই অধিকারবোধ এবং প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর নিজেকে ধ্বংস করার প্রবৃত্তি– এটাই হল টক্সিক ম্যাসকুলিনিটির আদিরূপ। আজকের বিনোদন জগতে আমরা বাজারসফল সিনেমা ‘কবির সিং’ বা ‘অ্যানিম্যাল’-এর রণবিজয় চরিত্রগুলোকে দেখি। তারা যখন প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয় বা আঘাত পায়, তখন সেই হিংসাটা সমাজ বা নারীর দিকে ছুঁড়ে দেয়। আর ‘দেবদাস’ সেই হিংসাটা নিজের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল। কিন্তু উভয়েরই শেকড় ওই পুরুষতান্ত্রিক ইগো এবং ইমোশনাল অপরিপক্বতার মধ্যে প্রোথিত। শরৎচন্দ্র তাঁর আখ্যানে পুরুষের এই মনস্তাত্ত্বিক পঙ্গুত্বকে নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছিলেন। আজকের দর্শক যখন কবির সিং-কে দেখে চমকে ওঠে, তখন তাদের মনে রাখা প্রয়োজন যে, এই পুরুষতান্ত্রিক সংকটের মনস্তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ শরৎচন্দ্র বহু আগেই বঙ্গীয় রঙ্গমঞ্চে করে দেখিয়েছিলেন। ‘দেবদাস’-এর অভূতপূর্ব সাফল্যের পর, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী শরৎচন্দ্রের অন্যতম বিতর্কিত ও সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘চরিত্রহীন’-এর নাট্যরূপ প্রদান করেন। ১৯০০ শতকের প্রথম দশকের বাঙালি সমাজের পটভূমিকায় রচিত এই আখ্যানে সাবিত্রী, কিরণময়ী, সুরবালা এবং সরোজিনী– এই চার ভিন্ন মেরুর নারীর জীবনসংগ্রাম ও মনস্তত্ত্ব উন্মোচিত হয়েছে। নাট্যমঞ্চে ‘চরিত্রহীন’ কেবল একটি প্রেমকাহিনি হিসেবে নয়, বরং তৎকালীন হিন্দু সমাজের তথাকথিত ‘চরিত্র’ ও ‘নৈতিকতা’র সংজ্ঞার প্রতি এক প্রচ্ছন্ন প্রশ্নচিহ্ন হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল। অন্যদিকে সুরবালার মতো অন্ধ ধর্মবিশ্বাসী ও পতিব্রতা নারী এবং সরোজিনীর মতো পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিতা আধুনিক নারীর বৈপরীত্য– এই নাটকের দ্বন্দ্বকে আরও ঘনীভূত করেছিল।
পুরুষতান্ত্রিক ইগোর সমান্তরালেই শরৎচন্দ্রের নাটকে উঠে এসেছে নারীসত্তার এক অভূতপূর্ব জাগরণ। তাঁর নায়িকারা কেবল চোখের জল ফেলা অবলা নারী নন; তাঁদের মধ্যে রয়েছে ফিনান্সিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স এবং নিজস্ব এজেন্সির এক জোরালো প্রকাশ। ‘দেনাপাওনা’-র নাট্যরূপ ‘ষোড়শী’-তে চণ্ডীগড়ের ভৈরবী যখন মদ্যপ জমিদার জীবানন্দের লালসার শিকার হয় এবং সমাজ তাকে একঘরে করে, তখন সে মাথা নত করে না। সে নিজের প্রাপ্য জমিদারি বুঝে নেয় এবং একা হাতে চণ্ডীগড় পরিচালনার ভার গ্রহণ করে। সে আজকের দিনের একজন স্বাধীন কর্পোরেট নারীর মতোই ক্ষমতাবান। ‘চরিত্রহীন’ নাটকে মেস-দাসী সাবিত্রী কিংবা অতৃপ্ত কিরণময়ীর চরিত্র তৎকালীন হিন্দু সমাজের তথাকথিত ‘চরিত্র’ ও ‘নৈতিকতা’র সংজ্ঞার প্রতি এক প্রচ্ছন্ন প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল। ১৯৩৪-’৩৫ সালে মঞ্চস্থ ‘দত্তা’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ‘বিজয়া’। এই নাটকটি ১৩৪১ বঙ্গাব্দের ৬ পৌষ (ডিসেম্বর ১৯৩৪-’৩৫) স্টার থিয়েটারে শিশিরকুমার ভাদুড়ীর ‘নাট্যমন্দির’ সম্প্রদায়ের দ্বারা প্রথম মঞ্চায়িত হয়। এখানে বিজয়া চরিত্রটি সম্পত্তি এবং নিজের প্রেমের অধিকার রক্ষায় রাসবিহারীর মতো এক চতুর খলনায়কের বিরুদ্ধে বুদ্ধির লড়াই লড়ে। শরৎ-নায়িকাদের এই আর্থিক স্বাধীনতা এবং নিজের জীবনসঙ্গী নির্বাচনের অধিকার আজকের ফেমিনিজমের অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি দিক। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দাঁড়িয়েও শরৎচন্দ্র তাঁর নারী চরিত্রগুলোকে যে ‘এজেন্সি’ দিয়েছিলেন, তা আজও বিস্ময়কর।

শরৎচন্দ্রের আখ্যান কেবল মধ্যবিত্ত ড্রয়িংরুম বা জমিদারবাড়ির অন্দরমহলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতপাতের রাজনীতি আজ যখন আধুনিক ভারতের খবরের শিরোনামে, তখন শরৎচন্দ্রের ‘অভাগীর স্বর্গ’ বা ‘পল্লীসমাজ’-এর মতো কাহিনিগুলো নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ‘পল্লীসমাজ’-এর নাট্যরূপ ‘রমা’-তে গ্রামের অত্যাচারী মোড়ল বেণী ঘোষালের চক্রান্ত এবং গ্রামীণ রাজনীতির যে রূপ আমরা দেখি, তা আজকের ভারতের পঞ্চায়েত স্তরের দুর্নীতিরই প্রতিচ্ছবি। এই নাটকটি ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের ১৯ শ্রাবণ (আগস্ট ১৯২৮) প্রথম ‘আর্ট থিয়েটার’ কর্তৃক স্টার রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হয় এবং পরবর্তীতে শিশিরকুমারের পরিচালনায় ‘নাট্যমন্দির’-এ বিপুল সাফল্যের সঙ্গে মঞ্চস্থ হয়। ‘রমা’ নাটকের সম্পূর্ণ নাট্যরূপ প্রথমাবস্থায় শরৎচন্দ্র দেননি। এর প্রাথমিক নাট্যরূপ প্রস্তুত করেছিলেন হরিদাস চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তীতে শরৎচন্দ্র স্বয়ং সেই খসড়াকে পরিমার্জন ও সংশোধন করে একটি পূর্ণাঙ্গ নাটকের রূপ প্রদান করেন। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে জাতপাত ও শ্রেণিবৈষম্যের এক মর্মান্তিক চিত্র ফুটে ওঠা গল্প ‘অভাগীর স্বর্গ’ অবলম্বনে বহু পেশাদার ও অপেশাদার নাট্যদল নাটক মঞ্চস্থ করেছে। একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা দলিত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের কথা বলি, তখন ‘অভাগীর স্বর্গ’-এর মতো আখ্যানগুলো দলিত সাহিত্যের এক জ্বলন্ত ম্যানিফেস্টো হিসেবে কাজ করে। শরৎচন্দ্র দেখিয়েছিলেন, ধর্ম ও জাতপাত কীভাবে শোষণের হাতিয়ার হয়, যা আজও সমান সত্যি।
১৯১৪ সালে প্রকাশিত ‘বিরাজ বৌ’ উপন্যাসের নাট্যরূপ নিয়েও বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য রয়েছে। অনেকের ধারণা, শরৎচন্দ্র নিজেই এর পূর্ণাঙ্গ নাট্যরূপ দিয়েছিলেন, কারণ মুদ্রিত পুস্তকে কেবল তাঁরই নাম ছিল। কিন্তু ঐতিহাসিক তথ্য অন্য কথা বলে। ‘বিরাজ বৌ’ উপন্যাসের প্রথম নাট্যরূপ দিয়েছিলেন উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীতে শিশিরকুমার ভাদুড়ী তাঁর ‘নাট্যমন্দির’-এ অভিনয়ের জন্য এই নাটকটিকে নিজের মতো করে ঢেলে সাজান ও পুনর্লিখন করেন, যদিও মুদ্রিত পুস্তকে তাঁর নাম ছিল না। বর্তমানে পেশাদার ও অপেশাদার রঙ্গমঞ্চে ‘বিরাজ বৌ’ নাটকের যে পাঠটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ও অভিনীত হয়, তা প্রস্তুত করেছিলেন কানাই বসু। শরৎচন্দ্রের ‘বিপ্রদাস’ উপন্যাসের নাট্যরূপ ১৯৩৫ সালে এবং পরবর্তীকালে ১৯৪১-’৪২ সালে শিশিরকুমার ভাদুড়ীর নিজস্ব প্রেক্ষাগৃহ ‘শ্রীরঙ্গম’-এ (পরবর্তীতে যা বিশ্বরূপা থিয়েটার নামে পরিচিত হয়) বিপুল সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হয়। বিপ্রদাস চরিত্রটি এক আদর্শনিষ্ঠ, রক্ষণশীল অথচ দয়ালু জমিদারের প্রতীক। তার মূল্যবোধের সঙ্গে আধুনিক চটুল সমাজের সংঘাত নাটকে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে। শিশিরকুমার ভাদুড়ী যখন নামভূমিকায় অভিনয় করতেন, তখন তাঁর বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্বের কারণে চরিত্রটি এক অসামান্য উচ্চতায় পৌঁছে যেত।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক উপন্যাস ‘পথের দাবী’ (১৯২৬)। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব এবং সব্যসাচী মল্লিকের মতো এক অসামান্য বিপ্লবীর কর্মকাণ্ড নিয়ে রচিত এই উপন্যাসটি ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রাজদ্রোহের অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। উপন্যাসটি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও, বাংলার মানুষের মনে এর প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। প্রখ্যাত নাট্যকার শচীন সেনগুপ্ত এই উপন্যাসের এক অত্যন্ত বলিষ্ঠ নাট্যরূপ প্রদান করেন। ১৯৩৯ সালের ১৩ মে ‘নাট্যনিকেতন’ রঙ্গমঞ্চে এই নাটকটি প্রথম অভিনীত হয়।
শরৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’ উপন্যাস বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে পরিগণিত। মহিম, সুরেশ এবং অচলা– এই তিন চরিত্রের ত্রিকোণ প্রেম, আদর্শের সংঘাত এবং সামাজিক টানাপোড়েন এই আখ্যানের মূল ভিত্তি। শিশিরকুমার ভাদুড়ীর বিশেষ অনুরোধে শরৎচন্দ্র স্বয়ং ‘অচলা’ নাম দিয়ে এই উপন্যাসের নাট্যরূপ দেওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ায় দু’ অঙ্কের বেশি এই কাজ এগয়নি। পরবর্তীকালে শিশিরকুমার ভাদুড়ী নাট্যকার যতীন্দ্রনাথ রায়কে দিয়ে এই নাটকের অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করান এবং তা মঞ্চস্থ করেন। তবে ঐতিহাসিক ও সমালোচকদের মতে, এই প্রযোজনাটি ততটা মঞ্চসফল হয়নি। স্বয়ং শিশিরকুমার ভাদুড়ীও এই নাট্যরূপ নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। অবিনাশচন্দ্র ঘোষালের সঙ্গে এক কথোপকথনে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে, এই নাট্যরূপের মধ্য দিয়ে শরৎচন্দ্রের ‘অচলা’ চরিত্রের মূল সুর বা নির্যাসটি ক্ষুণ্ণ হয়েছে। উপন্যাসে অচলার যে সূক্ষ্ম মানসিক দ্বন্দ্ব ও দোদুল্যমানতা ছিল, তা মঞ্চের স্থূল সংলাপে যথাযথভাবে পরিস্ফুট করা সম্ভব হয়নি, যা সাহিত্য থেকে নাটকে রূপান্তরের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

শিশিরকুমার ভাদুড়ীর থিয়েটার-প্রীতির কোনও সীমা ছিল না। তিনি চাইতেন শরৎচন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আখ্যান মঞ্চে উঠে আসুক। তাঁরই বিশেষ অনুরোধে শরৎচন্দ্র ‘নববিধান’ এবং ‘বামুনের মেয়ে’ উপন্যাসের নাট্যরূপ দেওয়ার কাজে হাত দিয়েছিলেন। ‘বামুনের মেয়ে’ উপন্যাসে বাংলার পল্লিসমাজের কৌলীন্য প্রথা ও ধর্মান্ধতার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। অন্যদিকে ‘নববিধান’ ছিল নারী-পুরুষের সম্পর্কের এক অন্যরকম আখ্যান। কিন্তু শারীরিক অসুস্থতা এবং সময়ের অভাবের কারণে শরৎচন্দ্র দু’-এক দৃশ্য লেখার পর আর এগতে পারেননি। এই খসড়াগুলো অসম্পূর্ণই থেকে যায়।
বিশ শতকের প্রথমার্ধে বাংলা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের বিবর্তন এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যের মেলবন্ধন কেবল একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ ছিল না, ছিল বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক অবশ্যম্ভাবী ঐতিহাসিক পরিণতি। গিরিশচন্দ্র ঘোষের পৌরাণিক ও ভক্তিগীতিমূলক নাটকের যুগ পার হয়ে বাংলা থিয়েটার যখন সমাজ ও জীবনের বাস্তব দর্পণে নিজেকে খুঁজতে চাইছে, তখন শরৎচন্দ্রের গল্প ও উপন্যাসগুলোই হয়ে উঠেছিল সেই উত্তরণের প্রধান হাতিয়ার। যোগেশচন্দ্র চৌধুরী, শচীন সেনগুপ্ত, শিবরাম চক্রবর্তী, যতীন্দ্রনাথ রায় এবং স্বয়ং শরৎচন্দ্রের নাট্যরূপগুলো বাংলা থিয়েটারকে সাবালকত্ব প্রদান করেছিল।
আর এই সমগ্র প্রক্রিয়ার নেপথ্যে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিলেন নাট্যাচার্য শিশিরকুমার ভাদুড়ী। তাঁর নির্দেশনায়, অভিনয়ে এবং প্রযোজনায় শরৎচন্দ্রের চরিত্রগুলো কেবল বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে মঞ্চে দাঁড়ায়নি, তারা বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তত্ত্ব, পাপবোধ, সামাজিক সংস্কার এবং নারীস্বাধীনতার মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ‘ষোড়শী’র আত্মত্যাগ, ‘রমা’র ট্র্যাজেডি, ‘বিজয়া’র সংঘাত, ‘বিরাজ বৌ’-এর আত্মসম্মানবোধ কিংবা ‘অচলা’র অন্তর্দ্বন্দ্ব– এই সবকিছুই প্রমাণ করে যে, শরৎচন্দ্র কেবল একজন ‘অপরাজেয় কথাশিল্পী’ই ছিলেন না, তাঁর সৃষ্টির অভ্যন্তরে লুকিয়ে ছিল এক প্রবল নাট্যগুণ (Dramatic Element), যা যুগ যুগ ধরে বাংলা রঙ্গমঞ্চকে সমৃদ্ধ করে এসেছে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved