


‘পত্রপাঠ প্রকাশনা’ তাদের ‘মিনি বুকস’ সিরিজে প্রকাশ করেছে কুইন্টাস তুলিয়াস সিসেরো-র লেখা ফলিত রাজনীতির হ্যান্ডবুক– ‘ভোটে জেতার উপায়’! যা আদতে ছিল তাঁর অগ্রজ এবং ‘কনসাল’ পদপ্রার্থী মার্কাস তুলিয়াস সিসেরোকে লেখা একটি চিঠি। প্রাচীন পত্রটির অনুবাদ করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। সে-লেখার সাঁকো বেয়ে পাঠক অনায়াসে পৌঁছে যাবেন খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪ অব্দের এক গুমোট গরমের দিনে।
কার্তিক ফুলুরিওয়ালা শেষমেশ ভোটে জিতে গেল! এলাকার জাঁদরেল ধনী যদু ভটচাজ্কে এক্কেরে গো-হারা হারিয়ে জঙ্গিপুর মিউনিসিপ্যালিটির কমিশনার হল কে? না, কার্তিক সাহা!
প্রাক্-স্বাধীনতা যুগে এহেন ঘটনায় রীতিমতো তেতে উঠেছিল আঞ্চলিক রাজনৈতিক আবহাওয়া! হেরো দলের লিডার মহা চটিতং, ‘এমন বিপর্যয় হল কী করে?’ নিচুস্বরে সমবেত উত্তর– ‘আজ্ঞে, ওদের ভোটের প্রচার এমন অভিনব! তাই তো আমাদের এমন শিঙে-ফোঁকা হাল!’
কথাটা মিথ্যে নয়! ‘ভোট দিয়ে যা, আয় ভোটার আয়/ মাছ কুটলে মুড়ো দিব, গাই বিয়োলে দুধ দিব…’– দাদাঠাকুর শরৎচন্দ্র পণ্ডিতের লেখা এই গান গেয়ে, জঙ্গিপুরের পথে পথে ঘুরে, কার্তিকের জন্য জনমত জড়ো করেছিলেন নলিনীকান্ত সরকার। আজকের দিনের পলিটিকাল ক্যাম্পেনে এ-জাতীয় ‘ভোটের গান’ জলভাত ব্যাপার– সে ‘মাছচোর’-ই হোক বা ‘ও লাভলি!’ কিন্তু এইটিই কি তবে প্রথম ভোট-স্ট্র্যাটেজি? উঁহু, সেই ইতিহাস আরও পুরনো।
কত বছর আগে? ১০০? ২০০? যখন ঠাহর হয় এ-ট্র্যাডিশনের বয়স ২,০০০ বছর, তখন তালু খানিক শুকিয়ে যায় বইকি! শুধু তাই নয়, আধুনিক ভোট রাজনীতির প্রাচীন ব্যাকরণ কেতাবি ঢঙে লেখাও হয়েছিল ওই সময়েই! আর এমনই যোগাযোগ, এ-বছর মে মাসে– বঙ্গদেশে যখন ভোটের বাদ্যি চড়াম চড়াম বাজছে, দুই সহস্রাব্দ আগের সেই ‘ভোট-কেতাব’ হঠাৎই কি না বাংলা তর্জমায় হাজির! উৎসাহের পারদ কি আর পাঠকের বশে থাকে?
‘পত্রপাঠ প্রকাশনা’ তাদের ‘মিনি বুকস’ সিরিজে প্রকাশ করেছে কুইন্টাস তুলিয়াস সিসেরো-র লেখা ফলিত রাজনীতির হ্যান্ডবুক– ‘ভোটে জেতার উপায়’! যা আদতে ছিল তাঁর অগ্রজ এবং ‘কনসাল’ পদপ্রার্থী মার্কাস তুলিয়াস সিসেরোকে লেখা একটি চিঠি। প্রাচীন পত্রটির অনুবাদ করেছেন অনির্বাণ ভট্টাচার্য। সে-লেখার সাঁকো বেয়ে পাঠক অনায়াসে পৌঁছে যাবেন খ্রিষ্টপূর্ব ৬৪ অব্দের এক গুমোট গরমের দিনে। রোমের সর্বোচ্চ ‘কনসাল’ পদে মনোনীত হওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন ৪২ বছর বয়সি মার্কাস তুলিয়াস সিসেরো। তিনি ‘নভুস হোমো’ বা বহিরাগত সম্প্রদায়ের লোক। অভিজাত তকমা গায়ে নেই তাঁর। রোমের দক্ষিণে আরপেনিয়াম শহরে এক বিত্তবান ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম। তিনি আর তাঁর ভাই কুইন্টাস দু’জনেই পড়াশুনোয় তুখোড়। সেকালের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীগুণী এমনকী গ্রিসের দার্শনিকদের কাছেও পড়েছেন দু’ভাই!

মার্কাস ছিলেন চমৎকার বক্তা। অল্পবয়সে সামরিক বাহিনীতেও কাজ করেছেন। ভবিষ্যতের কিংবদন্তি ‘পম্পে দ্য গ্রেট’-এর বাবার অধীনেই ছিলেন তিনি। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই রোমান আদালতে খুনের মামলায় অভিযুক্ত এক প্রভাবশালী ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস করে আনেন মার্কাস। এরপর একাধিক মামলায় জয়ী হওয়ায় সম্ভ্রান্ত রোমান সমাজে দ্রুত নাম ছড়িয়ে পড়ে তাঁর। ক্রমে ‘কোয়েস্টর’ এবং ‘প্রেটর’ পদে উন্নীত হন নিজ দক্ষতায়। সেখান থেকেই একদিন ‘কনসাল’ হয়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছনোর স্বপ্নে বিভোর মার্কাস। নির্বাচিত দু’জন কনসালের হাতে প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ সামরিক ও অসামরিক ক্ষমতা তখন থাকত। একটাই চিন্তা মার্কাসের মনে, গত ৩০ বছরে কোনও সাধারণ ঘরের ছেলে কখনও ‘কনসাল’ হননি!

বহু বছর আগে রসস্রষ্টা হিমানীশ গোস্বামী একটি দুর্দান্ত কার্টুন এঁকেছিলেন। একটি লোক ঝুড়ি ভর্তি কুড়ুল নিয়ে পথে বসে বিক্রি করছে হেঁকে হেঁকে, ‘সস্তায় নিয়ে যান বাবু, নিজের পায়ে মারবেন।’ ঝুড়ির গায়ে লেখা ‘গণতন্ত্র’। খ্রিস্টপূর্ব রোমের ভোটযুদ্ধে মার্কাস ছাড়া বাকি প্রার্থীতালিকা দেখে কুড়ুলের কথাই সর্বাগ্রে মনে পড়ার কথা। মার্কাসের প্রতিদ্বন্দ্বী দু’জন– আন্তোনিওস এবং ক্যাটালাইন। বংশমর্যাদায় কুলীন হলেও দুই মক্কেলেরই সমাজে বিশেষ সুনাম ছিল না। বাজারে আন্তোনিওসের প্রচুর ধারদেনা এবং ততদিনে সে সেনেট থেকেও বহিষ্কৃত।

ক্যাটালাইন তো আরও এককাঠি সরেস! একাধিক খুনের মামলা তার নামে ঝুলছে। মার্কাসের ভাবমূর্তি এঁদের চেয়ে শতগুণ পরিষ্কার, কিন্তু কে না জানে– রাজনীতিতে শুধু ‘মেধা’ অচল। কৌশল, বংশগৌরব এবং জনসমর্থন না-পেলে বজ্র-আঁটুনি ফসকা গেরো হতে কতক্ষণ! ঠিক এমন একটা পরিস্থিতিতে, ছোটভাই কুইন্টাস তাঁর বড়দার উদ্দেশ্যে একটা ‘চিঠি’ লিখলেন। নামে চিঠি হলেও আদতে তা ‘ভোকাল-টনিক’সম ফলিত রাজনীতির ‘মন্ত্রগুপ্তি’। ২,০০০ বছর পেরিয়েও যা আজও ভীষণরকম প্রাসঙ্গিক।

নির্দেশিকার মূল নাম (ল্যাটিন) ছিল ‘কোম্মেতারিওলুম পেতিতিওনিস্’। কংগ্রেসি অতুল্য ঘোষ যেমন ছিলেন কিং-মেকার, সেই একই গুণের পূর্বসূরি কুইন্টাস তুলিয়াস সিসেরো! নেপথ্যে থেকে প্রার্থীদের নির্বাচন জিতিয়ে আনার মন্ত্রগুপ্তিতে দিতেন অহরহ শান! দাদাকে তিনি যা লিখে পাঠিয়েছিলেন, তার থেকে কয়েকটি উদাহরণ দিলেই বিষয়টা বোঝা যাবে–
১. সবার আগে পরিবার ও বন্ধুদের সমর্থন পাওয়া জরুরি।
২. বিশ্বস্ত ও দক্ষ কর্মী বাহিনী বেছে নেওয়া দরকার।
৩. ঋণীদের থেকে পুরনো উপকারের প্রতিদান নেওয়া প্রয়োজন।
৪. সবাইকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া। ( ‘না’ বলার চেয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে রাখতে না-পারা অনেক ভালো।)
৫. বাক্পটু হওয়া প্রয়োজন।
৬. শহর ছেড়ে না-যাওয়াই দস্তুর।
৭. প্রতিপক্ষের খুঁত ভোটারদের সামনে বড় করে তুলে ধরা জরুরি।
৮. ভোটারদের মনে নতুন আশা জাগানোই আশু কর্তব্য।
আর… নাহ্, থাক! স্পয়লার দেওয়া ঠিক নয়। সুধী পাঠক নিজে পড়বেন, বিস্মিত হবেন।

এ-বইয়ের আসল মজা– এর অকপট অনায়াস ভঙ্গি। পড়তে পড়তে মনে হবে, ২,০০০ বছরের দূরত্ব নিমেষে ভ্যানিশ, এ যেন কোনও আধুনিক নির্বাচনী কৌশলবিদের গোপন নোটবইয়ের নিবিড় পাঠ! সিসেরো শেষমেশ জিতেছিলেন কি না বা কুইন্টাসের পরামর্শ কতদূর কাজে এসেছিল, সে-সব উত্তর খোঁজার দায়িত্ব পাঠকের!
এ-কেতাবের সবই ভালো। মলাট দৃষ্টিনন্দন। অনির্বাণ ভট্টাচার্যের অনুবাদও স্বাদু, তরতরে। একটানা এ মলাট থেকে ও মলাট পড়ে ফেলা যায় অনায়াসে। উচ্চারণভেদে সৃষ্ট দু’-একটি শব্দের লিখিত রূপ ছাড়া মুদ্রণপ্রমাদ প্রায় নেই। তবে নানা বাক্যে ‘সঙ্গে’-র পরিবর্তে ‘সাথে’-র ব্যবহার খানিক চোখে লাগে। ছোট্ট বইটির শেষের শব্দকোষ অংশটিও মুগ্ধ করার মতো! চমক লাগায় পুস্তানিও। নানা সময়ে বাংলার রাজনৈতিক দেওয়াল লিখনের দুর্দান্ত এক কোলাজ রয়েছে দু’পাতা জুড়ে!
অন্যদিকে, বইয়ের সুদৃশ্য বুকমার্কে কাট-আউট হয়ে হাজির স্বয়ং কুইন্টাস তুলিয়াস সিসেরো! হাতে আবার তাঁর নিজেরই বইয়ের বঙ্গানুবাদ! এত ধরনের আইডিয়া ছোট্ট পরিসরে সাজানোর জন্য প্রকাশকের সত্যিই ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে পুস্তানি পেরলেই এমন সুবিন্যস্ত বইয়ের অভ্যন্তর আগাগোড়া ছবিহীন। এইটিই যা দুঃখের। দু’-একটি রোমান মোটিফ বা তৎকালীন আবহের ছবি থাকলে যাত্রাটা হয়তো আরও নান্দনিক হয়ে উঠত।

কোনও নীতিশাস্ত্র নয়, কোনও আদর্শবাদী ঘোষণা নয়। যুগকাল পেরিয়ে এ-বইয়ের একটিই পরিচয়– নির্বাচনী রাজনীতির এ এক নির্মোহ ব্যবহারিক পাঠ! আদ্যিকালের রোমান প্রজাতন্ত্রের অলিগলি যে কখন এসে মিশে যায় আজকের গণতন্ত্রের করিডোরে, তা ধরার বিশেষ উপায়ই নেই। অবিশ্যি দোষ বাঙালি পাঠকেরই! কোথাও ‘পরিবর্তন’ দেখলেই তার নেপথ্যের ‘অনুপ্রেরণা’ খুঁজতে গিয়ে আমাদের মন নিসপিস করে। কারণ, আমরা ইতিমধ্যেই নেটফ্লিক্সে ‘দ্য গ্রেট হ্যাক’ দেখে ফেলেছি। ‘ভাবা প্র্যাকটিস করা’-ও যে এক দুরূহ ব্যাপার, সেও আমাদের আর অজানা নেই। তবুও, হ্যাঁ, এতকিছুর পরও– তবুও মুগ্ধ করে এই বই! রাজনীতি বদলেছে, ভোটবাক্স বদলেছে, প্রচারমাধ্যমে এসেছে বিরাট বদল, কিন্তু ভোট জেতার কৌশল? আশ্চর্য! খুব বেশি বদলায়নি।
শেষের পুস্তানির রং-বেরং আবারও যেন মনে উসকে দেয় বই-শুরুতে পাওয়া প্লেটোর অমোঘ উক্তি: ‘রাজনীতিতে অংশ না নেওয়ার অন্যতম শাস্তি হল, আপনার চেয়ে অযোগ্য কেউ আপনার ওপর শাসন করবে।’… অলমিতি বিস্তারেণ।
ভোটে জেতার উপায়
অনুবাদ: অনির্বাণ ভট্টাচার্য
পত্রপাঠ
৯৯ টাকা
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved