Robbar

ইনি আমার মাসি, আর আমি এনার দিদি!

Published by: Robbar Digital
  • Posted:April 18, 2026 2:28 pm
  • Updated:April 18, 2026 2:28 pm  

শেষ হল বছর। যা কিছু পেয়েছি, যাহা কিছু গেল চুকে, ধুলো ওড়ানো চৈত্র বাতাসে তারা উড়ে যায় শুকনো ফুলের মতো। ব্যথার মতো। তার অঞ্জলি তুলে নিই নতুন বছরের শুভকামনার নামে– এই সহজ নির্ভার বেঁচে থাকার দিকে ফিরে আসুক পৃথিবী। যারা রক্তচক্ষু দিয়ে এই বিশ্বকে দেখতে পায় কেবল লোভের উপনিবেশ বলে, তাদের চোখ রোগমুক্ত হোক। সব্বে সন্তু নিরাময়া।

প্রচ্ছদ: শান্তনু দে

জয়া মিত্র

১১.

রাসবিহারী এভিনিউয়ে মুক্তমঞ্চের পাশেই ইনস্টিট্যুট অব ইংলিশের তিনতলা বাড়ি।

হাওড়া স্টেশন থেকে সটান এসে ঢুকে পড়লে এককাপ চাও খাওয়া যেত না সোমবার। দ্বিতীয় পিরিয়ডে নেমেছি সেই চায়ের তেষ্টায়। নিচের গাড়িবারান্দায় দেওয়াল ঘেঁষে গীতাদের একটা ছোট্ট চায়ের দোকান ছিল। ছোট ছোট তিন ভাইবোন মিলে চালাত। ওদের এই দোকান নিয়ে কল্লোলের (দাশগুপ্ত) একটা চমৎকার গান আছে ‘গীতাদের চায়ের দোকান’ বলে। দেওয়াল ঘেঁষে একটা টেবিল আর সামনে ফুটপাথে গোটা দুই-তিন যেমন-তেমন বেঞ্চি। বসে চায়ের গেলাসটা হাতে নিয়েছি, হঠাৎ কোথা থেকে উদয় হল ছোট্ট এক মেয়ে। পায়ে চটি, সুন্দর ফ্রক। মাথায় উমরোঝুমরো চুল। এসে আমার পাশে বসেই প্রশ্ন, ঈষৎ ধমকের সুরে,

–এখানে রাস্তায় বসে আছ কেন?
–চা খাচ্ছি যে!
–এইখানে রাস্তার চা খাচ্ছ কেন?
–আমি এইখানে পড়ি যে। চোখ তুলে বাড়িটা দেখা হল।
–এইখানে? পড়ো না পড়াও?
–পড়ি
–এত বড় মেয়ে, পড়ো!

অন্য বেঞ্চিটাতে এসে বসেছেন আমারই এক সহপাঠী। আলাপ হয় নি তখনও। শুধোলেন,

–এ আপনার চেনা? আমি কিছু বলবার আগেই ঝটিতি উত্তর,
–হ্যাঁ। এ আমার মাসি হয় আমি এর দিদি হই।

শিল্পী: শান্তনু দে

চা ফুরিয়েছিল। ক্লাস শুরু হবে। পরের দিনও একই আবির্ভাব।

ওই গাড়িঘোড়া বহুল রাস্তা দিয়ে যেভাবে ছুট্টে হঠাৎ দেখা দেয়, তাতে শঙ্কিত না হয়ে পারি না। সে এসব কথায় কোনও পাত্তাই দিল না।

–আমি তো সবসময়েই আসি। এই তো সামনেই আমাদের বাড়ি।
–কে আছেন বাড়িতে? মা কই?
–মা ত সকালে ইস্কুলে চলে যায়। তখন তো আমি ঘুমোই।
–এখন কে আছেন?
–বাবা। বাবা ঘুমোচ্ছে।
–এখনও? চমকাই। বেলা দশটা চল্লিশ।
–বাবা তো খবরের কাগজে কাজ করে। রাত বারোটা-তেরোটার সময় বাড়ি আসে।
–দুপুরবেলা উঠবে। বিকেলে আবার অফিস। তখন আবার মা এসে পড়বে।
–তুমি ইশকুলে যাও না?
–এখন আমাদের ছুটি। বড়দের পরীক্ষা।

এটা চলে মোটামুটি রোজই। গীতারাও মুখ চেনে তার। হাসে। সেই ছুটন্ত খুকির দেখি প্রবল সামাজিক অভিজ্ঞতা।

–তোমার বাড়িতে কে আছে?
–একটা কাকু আর একটা ভাই।
–আমার কাকু, না তোমার কাকু?
–তোমারই।
–ও। আর ভাইটা তোমার ছেলে? ও চা খায়?
–না।
–চা দেবে না। কোনওদিন দেবে না, বুঝলে? দুধ খাওয়াবে, দুধ। ঠেসে ঠেসে দুধ দেবে। চা খেতে নেই। কোনওদিন চা চাইলে ঠাস ঠাস করে মারবে। বুঝলে?

বুঝলাম বইকি। একটু মায়াও হল, উপস্থিত এবং অনুপস্থিত– দু’ পক্ষেরই ওপরে। ব্যস্ততার তাড়ায় কত কী যে পড়ে যায় আশপাশে, আর কোথায় সেসব জমা হয়, জানতে কি পারি সবসময়ে? 

কয়েকদিন পরই তাকে আর দেখি না। যেমন আচমকা দেখা দিয়েছিল, তেমনই অকস্মাৎই অনুপস্থিতি। কে জানে, হয়তো স্কুল খুলে গেছে। ছুটির দিন শনি-রবি আমিও তো আসি না এই চত্বরে। নামটাও জেনে নেওয়া হয়নি।

প্রায় ২৫ বছর হয়ে গেল।

হয়তো সে নিজেও এখন কোনও সংসারের গৃহিণী। সেও কি স্কুলে যায় সকালবেলায়? এখন কি আর তার মনে আছে কয়েকদিনের সেই মাসিকে যার সে দিদি হয়?

শেষ হল বছর। যা কিছু পেয়েছি, যাহা কিছু গেল চুকে, ধুলো ওড়ানো চৈত্র বাতাসে তারা উড়ে যায় শুকনো ফুলের মতো। ব্যথার মতো। তার অঞ্জলি তুলে নিই নতুন বছরের শুভকামনার নামে– এই সহজ নির্ভার বেঁচে থাকার দিকে ফিরে আসুক পৃথিবী। যারা রক্তচক্ষু দিয়ে এই বিশ্বকে দেখতে পায় কেবল লোভের উপনিবেশ বলে, তাদের চোখ রোগমুক্ত হোক। সব্বে সন্তু নিরাময়া।

___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___

১০. অন্য এক ঘরের সন্ধানে

৯. সেই কবে একটা যুদ্ধ হয়েছিল

৮. যুদ্ধের যে গল্পে বীরত্ব নেই, মনখারাপ আছে

৭. কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!

৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা

৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি

৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই

৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান

২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের

১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম