Robbar

শিল্পশিক্ষার আতিশয্যহীন ক্লাসরুম

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 3, 2026 5:02 pm
  • Updated:June 3, 2026 5:02 pm  

নন্দলাল জানিয়েছেন– ‘এখানে (কলাভবনে) কাজ করতে আসার সময় অবনীবাবু পরামর্শ দিয়েছিলেন, বলেছিলেন– “দেখো আমড়া গাছকে আম গাছ করার চেষ্টা কখনো কোরো না”। তিনি আরও বলেছিলেন, “মনে রেখো, নুড়িতে জল দিলে যেমন গাছ হয় না, তেমনি যাদের মনের মধ্যে শিল্প নেই তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে শিল্পী করা যায় না। শিক্ষকের কাজ– মালীর কাজ। কিছুই সে সৃষ্টি করে না, বীজ পেলে, চারা পেলে সে যত্ন বারিয়ে তোলে, বাঁচিয়ে রাখে”।…’

সুশোভন অধিকারী

৬. 

কেমন ছিল কলাভবনের শুরুর দিনগুলো? কী রকম তার ক্লাসরুম, কেমনই বা কাজের জায়গা? বিশ্বভারতীর প্রধান সমস্যা তার আর্থিক অপ্রতুলতা, এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিল্পনিকেতন চালাচ্ছিলেন কীভাবে? এদিকটা একবার দেখে নেওয়া যাক। সে যুগের কলাভবনে ছবি আঁকবার উপযুক্ত উপকরণ বা আসবাবের আতিশয্য যে ছিল না– তা বলাই বাহুল্য। তবু জানতে ইচ্ছে করে কেমন ছিল তখনকার ক্লাসরুমের চেহারা?

দ্বারিক গৃহ, যেখানে উপরে কলাভবন আর নিচে সঙ্গীতভবন

স্পষ্ট তথ্য না পেলেও প্রথম যুগের ছাত্র বিনোদবিহারীর কথায় তার খানিকটা আভাস মেলে। বিনোদবিহারী বলেছেন– ‘যে সংকীর্ণ গৃহে কলাভবনের কাজ শুরু হয়েছিল সেখানে উপকরণের আতিশয্য ছিল না। বিচিত্রা কালে সংগৃহীত লোকশিল্পের কিছু নিদর্শন, অল্পসংখ্যক বই, জাপানি চিত্রের কলো-টাইপ প্রিন্ট– মোটামুটি এই ছিল কলাভবনের সংগ্রহালয়। সেই সঙ্গে দেয়ালে টাঙানো ছিল লেডি হেরিংহামের অনুকৃত অজন্তার কয়েকখানি ছবি।’ ব্যস, এই হল শুরুর কলাভবনের অন্দরমহল। হয়তো কলাভবনের ঘরকে এভাবে সাজিয়ে তুলেছিলেন অসিত হালদার, গবর্নরের আগমন উপলক্ষে। সেকালের শান্তিনিকেতনে ক্লাসের এই সহজ অনাড়ম্বর অন্দরসজ্জা আশ্রমজীবনের সঙ্গে বেশ মানানসই। যা মার্কা দেওয়া আর্ট কলেজের মতো নয়, একেবারে সাদাসাপ্টা। ব্যবস্থাপনাও খানিক আলাদা। ক্লাসে শিক্ষক ও ছাত্রদের আসন ছিল স্থির। এমনটা বিনোদবিহারীই জানিয়েছেন। বলেছেন– ‘অসিতকুমার ও তাঁর শিষ্যবর্গ একই জায়গায় বসে কাজ করতেন। উপরতলায় কলাভবন, নীচের তলায় সংগীতভবন।’ আমাদের মনে পড়তে পারে, তরুণ বয়সে লেখা রবীন্দ্রনাথের সেই কাব্যগ্রন্থ ‘ছবি ও গান’-এর কথা। সেই গ্রন্থনাম যেন এতদিনে তাঁর আশ্রমে মূর্ত হয়ে উঠল। বিনোদ লিখেছেন– ‘ছবি, গান, আলাপ-আলোচনা, অসিতকুমারের স্বতঃস্ফূর্ত রহস্যপূর্ণ উক্তি, অপর দিকে মাঠে মাঠে স্কেচ খাতা হাতে যথেচ্ছ ভ্রমণ– এই ছিল কলাভবনের পরিবেশ।’ সহজেই অনুমেয়, শান্তিনিকেতনের উদার প্রকৃতির কোলে কলাভবনের ছাত্রদের ছিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো অনায়াস বিচরণ। কিন্তু ছাত্রদের শিল্পচর্চা কীভাবে এগিয়েছে? কলাভবনে শিল্প-অভ্যাসের কোনও নির্দিষ্ট কাঠামো তথা সিলেবাস তৈরি হয়েছিল কি?

নন্দলাল বসু

প্রথমদিকে কলাভবনের দায়িত্ব অসিতকুমারের কাঁধে থাকলেও, নন্দলাল সপ্তাহে একবার শান্তিনিকেতনে আসতেন। সেই যে ‘রবিকা’র বজ্রকঠিন চিঠি পৌঁছেছিল অবনের কাছে– তারপর আর শিল্পাচার্য তাঁর প্রিয়তম শিষ্যটিকে নিজের কোলের কাছে বেঁধে রাখেননি। ১৯২০ সালের মার্চে নন্দলাল পাকাপাকিভাবে শান্তিনিকেতনে ফিরে এসেছেন। নন্দলাল আগে যখন সপ্তাহে একবার কলাভবনে আসতেন, ছাত্রেরা তখন সারা সপ্তাহের কাজ নিয়ে উপস্থিত হতেন তাঁর কাছে। সেইসব ছবির ঠিকভুলের বিচার হত নন্দলালের দরবারে। অর্থাৎ ছবির ব্যাকরণের দিকটা দেখতেন তিনিই। এই প্রসঙ্গে বিনোদবিহারী জানিয়েছেন– ‘সারা সপ্তাহের কাজ ছাত্রেরা তাঁর কাছে উপস্থিত করতেন। ছবির বাঁধন, ড্রইং ও বর্ণের ক্ষেত্রে কালো-সাদার পরিবেশ সৃষ্টি এইগুলি সম্বন্ধে নন্দলাল নির্দেশ দিতেন’। অর্থাৎ ছবির ভাষায় যাকে বলে তার কম্পোজিশন, রেখার ব্যবহার আর রঙের বিন্যাস ও ছবির সামগ্রিক আকারগত সামঞ্জস্যের পাঠ দিতেন নন্দলাল। বলাবাহুল্য, এটি চিত্রনির্মাণের মূল পাঠ, ছবি তৈরির গোড়ার কথা। বিনোদ এমনও বলেছেন, নন্দলাল সবসময়ে অসিতকে বলতেন– ‘সংশোধনের কারণগুলি ছাত্রদের বুঝিয়ে দিতে’। এছাড়া নন্দলাল সর্বদা প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ তথা ‘নেচার স্টাডি’ করার সময় ছাত্রদের সচেতন থাকতে বলতেন। বিনোদবিহারীর মতে, ‘নন্দলালের এই উপদেশ অনুযায়ী স্কেচ খাতা হাতে বাইরে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস ছাত্রদের মধ্যে প্রথম থেকেই দেখা যায়।’ এ তো গেল নন্দলালের শিক্ষা। কলাভবনের আরেক শিক্ষক অসিতকুমারের ক্লাস কেমন ছিল? সেকথাও জানাতে ভোলেননি বিনোদবিহারী। লিখেছেন– ‘অসিতকুমার স্টুডিয়োর কাজ পরিচালনা করতেন। অবনীন্দ্র-পদ্ধতির “ওয়াশ” অসিতকুমারের মধ্যস্থতায়ই ছাত্রেরা পেয়েছিলেন।’ এখানে বলে রাখা দরকার, অবনীন্দ্রনাথের চিত্রপদ্ধতি অর্থাৎ ওয়াশ টেকনিকই ছিল অসিতের কাছে চিত্রের চূড়ান্ত শিল্প-আঙ্গিক। আরেকটা ব্যাপার, যেহেতু বিশ্বভারতী তথা উত্তর বিভাগের অধ্যক্ষ ছিলেন বিধুশেখর শাস্ত্রী। তাই কলাভবনের প্রথম দিকে পরিচালনা-সংক্রান্ত কাজে অসিতকুমারকে দায়িত্ব নিতে হয়নি। অবনীন্দ্রনাথের ভাবধারায় স্নাত অসিতের চিত্রশিক্ষার উপরে নির্ভর করে প্রথম পর্বের কলাভবন রিপোর্ট-এ বিধুশেখর লিখেছিলেন– ‘কলাভবনে কল্পনা ও চিত্রবিদ্যা’ শেখানো হয়ে থাকে। ক্রমে নন্দলালের পাকাপাকি যোগদানের পর অসিতকুমারের শিল্প-আদর্শ হুবহু অনুসরণ করা হয়নি, যদিও মূল ভাবনা ছিল অপরিবর্তিত। অন্যদিকে কলাভবনের আরেকজন শিক্ষক সুরেন্দ্রনাথ কর– তিনি কী শেখাতেন? বিনোদ বলেছেন– ‘সুরেন্দ্রনাথ ব্রহ্মচর্যাশ্রমের ছাত্রদের শিক্ষা ও পূর্ত বিভাগের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন এবং প্রয়োজনমত কলাভবনের ছাত্রদের উপদেশ দিতেন।’ তাহলে দেখা যাচ্ছে, কলাভবনের শুরুর দিনগুলি এমন করেই এগিয়েছে। একেবারে প্রথম যুগের অপর এক ছাত্র ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মাও প্রায় সে কথাই জানিয়েছেন। বলেছেন– ‘গোড়ার দিকে কলাভবনের শিক্ষাপ্রণালীতে বাঁধা-ধরা নিয়ম-কানুন বিশেষ ছিল না। ডিপ্লোমা ডিগ্রি দেওয়ার কোনো প্রশ্ন ছিল না। কত বছরের কোর্স বা শিক্ষাবর্ষ তখনও নির্ধারিত হয়নি। তবে শিক্ষাপ্রদানের মধ্যে যে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা শিল্পীগুরুরা প্রদর্শন করেছিলেন তার জন্য ছাত্রেরা খুবই উৎসাহিত ও আনন্দিত ছিল। কারণ তারা জানতো তাদের শিক্ষা ঠিক পথেই চলেছে।’ ধীরেন্দ্রকৃষ্ণের কাছে এ-ও জানতে পারি, নন্দলাল শান্তিনিকেতনে এলে তিনি সপরিবারে গুরুপল্লীর পূর্বপ্রান্তে দোতলা একটি মাটির ঘরে বাস করতেন। শোনা যায়, কলকাতার শিকড় ছিঁড়ে শান্তিনিকেতনে চলে আসার আগে নন্দলাল তাঁর স্ত্রী সুধীরা দেবীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘কোথায় থাকতে চাও, প্রাসাদে না খড়ের চালায়?’ উত্তরে সুধীরা তখন জানিয়েছেন, ‘কুটীরই ভালো’। এমনই ছিল আচার্য নন্দলালের স্ত্রীর যথার্থ উত্তর। 

দ্বারিক-এর সামনে কলাভবনের ছাত্রেরা, বারান্দায় দাঁড়িয়ে নন্দলাল বসু

তারপর ১৯২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠা হলে স্পষ্ট হয়ে উঠল শিক্ষাক্রমের সামগ্রিক রূপরেখা। এখানে মনে রাখা দরকার, রবীন্দ্রনাথ যখন বিশ্বভারতীকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছেন– সেই মুহূর্তে শুরু হয়েছে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা। ফলে দেশ জুড়ে আন্দোলনের সমর্থনে বহু ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষক সরকারি স্কুল-কলেজ ছেড়ে বিশ্বভারতীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী তখন তাঁদের কাছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের এক অন্যতম প্রেরণাস্থল। ১৯২১ সালে কলাভবনে যাঁরা যোগ দিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন অন্নদা মজুমদার, অর্ধেন্দুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, বীরভদ্র রাও চিত্রা, মণীন্দ্রভূষণ গুপ্ত, বিনায়ক মাসোজী, সুকুমারী দেবী, রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সত্যেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুকুমার দেউস্কর, হরিপদ রায়, পি হরিহরণ, হীরাচাঁদ দুগার প্রমুখ ছাত্রছাত্রী। স্মরণীয়, সেই সঙ্গে আছেন ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মা বা বিনোদবিহারীর মতো ছাত্র। এই ছাত্রতালিকার দিকে একঝলক তাকালেই বোঝা যায়, পরে এঁরা প্রায় প্রত্যেকেই শিল্পের ইতিহাসে স্বতন্ত্র জায়গা অধিকার করেছেন। আগেই বলেছি, নন্দলাল এসে পাকাপাকি যোগ দিলেও কলাভবনের ক্লাসে পাঠক্রমের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। তার অন্যতম কারণ, নন্দলাল এবং অসিতকুমার উভয়েই অবনীন্দ্রনাথের কাছ থেকে শিল্পের পাঠ নিয়েছিলেন। 

নন্দলাল ও অসিত কুমার হালদার, অজন্তা পর্ব

কলাভবনে আসবার আগে গুরু অবনীন্দ্রনাথ শিষ্য নন্দলালকে যে নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেকথা এখানে একবার স্মরণ করে নেওয়া যেতে পারে। নন্দলাল জানিয়েছেন– ‘এখানে (কলাভবনে) কাজ করতে আসার সময় অবনীবাবু পরামর্শ দিয়েছিলেন, বলেছিলেন– “দেখো আমড়া গাছকে আম গাছ করার চেষ্টা কখনো কোরো না”। তিনি আরও বলেছিলেন, “মনে রেখো, নুড়িতে জল দিলে যেমন গাছ হয় না, তেমনি যাদের মনের মধ্যে শিল্প নেই তাদের শিখিয়ে পড়িয়ে শিল্পী করা যায় না। শিক্ষকের কাজ– মালীর কাজ। কিছুই সে সৃষ্টি করে না, বীজ পেলে, চারা পেলে সে যত্ন বারিয়ে তোলে, বাঁচিয়ে রাখে”।…’ অর্থাৎ গুরু অবনীন্দ্রনাথের মতে কোনও ছাত্র যখন আর্টস্কুলে আসে, তখন তার ভিতরে যদি অনুভূতিময় শিল্পীমন থাকে, শিক্ষকের কাজ সেই শিল্পীসত্তাকে আরও সতেজ করে তোলা। অবন ঠাকুরের মতে, যাদের তা নেই তাদের পিছনে শক্তি ব্যয় করা অর্থহীন। এ থেকে পরিষ্কার, গুরু অবনীন্দ্রনাথ ছিলেন রীতিমতো কড়া ধাতের শিক্ষক। দক্ষিণের বারান্দায় তিনি গুরুকূলের আদলে তাঁর শিল্পের আসর পরিচালনা করতেন। উল্টোদিকে, শিক্ষক হিসেবে নন্দলাল তেমন কড়া ধাতের নন, শিল্পচর্চাকে তিনি গুরুর মতো কঠিন নিগরে বাঁধতে চাননি। আবার এও ঠিক, জোড়াসাঁকোর দক্ষিণের বারান্দার মতো শিল্পআখড়া কলাভবন নয়। পরিবর্তে নন্দলাল ছিলেন এক শিল্প প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। সর্বোপরি যার মাথার ওপরে আছেন আচার্য রবীন্দ্রনাথ। যদিও নন্দলালের শিল্পশিক্ষার দিকে তাকালে দেখি, অবনীন্দ্রনাথের সেই নির্দেশের পাশাপাশি তিনি সচেতনভাবে গুরুর বাণীকে আরও প্রসারিত করেছিলেন। ছাত্রের অন্তরে সুপ্ত শিল্পীসত্তাকে জাগিয়ে তাদের আরও উদ্বোধিত করতে চেয়েছিলেন নন্দলাল। তাঁর মতো ছাত্রদরদী শিক্ষক আজ আর পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ!