প্রফুল্লদা, প্রফুল্ল রায় তখন ‘যুগান্তর’-এ কাজ করেন। সেবার তাঁদের পত্রিকা গোষ্ঠীর পুজোসংখ্যার জন্য প্রফুল্লদা বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কাছে একটি উপন্যাস চেয়েছিলেন। যথাসময়ে উপন্যাসটি দপ্তরে এসে পৌঁছলে প্রফুল্লদা খাম না খুলেই লেখাটি প্রেসে পাঠিয়ে দেন কম্পোজ করার জন্য। তিনি ভেবেছিলেন, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রিত উপন্যাস তো আর না-ছাপার কোনও প্রশ্নই নেই। টুকটাক কিছু ভুলভ্রান্তি থাকলে প্রুফেই সেটা সংশোধন করে নেওয়া যাবে। কিন্তু দুয়েকদিন পরে তাঁদের প্রেস-ইন-চার্জ এসে প্রফুল্লদাকে না কি জিগ্যেস করেন– এটা কেমন পাণ্ডুলিপি পাঠানো হয়েছে। প্রফুল্লদা তখনও বিষয়টার ধরতাই না পেয়ে সরল বিশ্বাসে বলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস পাঠিয়েছেন, তা নিয়ে আবার সমস্যার কী থাকতে পারে ! তখন প্রেসের সেই ভদ্রলোক না কি পাণ্ডুলিপি দেখিয়ে বলেন, তিনি এমন বিচিত্র পাণ্ডুলিপি জীবনে দেখেননি !
২৮.
পুরনো চিঠির ফাইল খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ হাতে উঠে এল ১৯৭০ সালের জুন মাসের ১৪ তারিখে সুদূর দ্বারভাঙা থেকে লেখা বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের একখানা চিঠি। আগেও বলেছি, প্রকাশনায় পুরোদস্তুর নেমে পড়ার সময় থেকেই আমার মাথায় একটাই ভাবনা ছিল– যতদূর সম্ভব চেষ্টা চালিয়ে যাব, যাতে নামকরা লেখকদের ভালো কিছু বইও প্রকাশ করতে পারি। বইপাড়ায় তখনকার নামী লেখকদের মাঝে-মাঝেই দেখতাম। তাঁরা নানা প্রয়োজনে নিজেদের প্রকাশকের দপ্তরে আসতেন। তেমনই একদিন শচীনবাবুর (শচীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়) দপ্তরে দেখেছিলাম বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়কে। সেদিন নিশ্চয়ই প্রকাশ ভবনে গিয়েছিলাম দে বুক স্টোরের জন্য কোনও বই কিনতে। প্রকাশ ভবনের কাউন্টারের ওপারে শচীনবাবুর টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারে তিনি বসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে তখন কথা বলার কোনও প্রশ্নই ছিল না। কিন্তু প্রকাশনায় আসার পর কোনওভাবে তাঁর ঠিকানা জোগাড় করে আমি একটি বই প্রকাশ করতে চেয়ে তাঁকে চিঠি লিখেছিলাম। আমার প্রথম চিঠির জবাবেই বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় লেখেন–
‘মহাশয়,
আপনার ৮.৬ তারিখের চিঠি পেয়েছি। উত্তরে জানাই, আমার হাতে উপন্যাস বা গল্প কিছুই উপস্থিত নেই। এবং আমার বর্তমান প্রকাশকদের বাহিরে কোন বই দেওয়ার সম্ভাবনাও নেই। আশা করি তজ্জন্য ক্ষুণ্ণ হবেন না। আপনাদের প্রস্তাবের জন্য ধন্যবাদ জানাই।
নমস্কারান্তে
আপনাদের
শ্রীবিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়’
বই দিতে পারবেন না– একেবারে সরাসরি একথা বললেও আমার বিশ্বাস ছিল দে’জ পাবলিশিং যদি ভালো বই করে পাঠকের মনে জায়গা করে নিতে পারে তাহলে বিভূতিবাবুর মতো সাহিত্যিকের লেখা একদিন নিশ্চয়ই আমরা ছাপতে পারব। তাই শুরুতেই বই না পেলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগটা ছিলই।
বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় বিহারের দ্বারভাঙায় বড় হয়েছিলেন, সেখানকার স্কুলের পড়া শেষ করে কলকাতার রিপন কলেজ হয়ে পাটনা বি এন কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট হন। বাংলা সাহিত্যের দুই বিভূতিভূষণেরই জন্ম ১৮৯৪ সালে, একমাসের তফাতে। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় সারাজীবনে নানারকম কাজ করেছেন– কখনও শিক্ষকতা, কখনও ইন্ডিয়ান মিশন পত্রিকার কার্যাধ্যক্ষের কাজ, আবার কখনও দ্বারভাঙা প্রেসের সুপারিটেন্ডেন্টের কাজ। তাঁর সাহিত্যজগতে আসাটা কিন্তু রীতিমতো সাড়া জাগিয়ে। বিভূতিবাবু তাঁর অনবদ্য আত্মজীবনী ‘জীবন-তীর্থ’-র পাতায় লিখেছেন, মজফ্ফরপুরের স্কুলে পড়ানোর সময়ের কথা, যখন ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় তাঁর ‘রাণুর প্রথম ভাগ’ গল্পটি প্রকাশিত হয়। ‘প্রবাসী’র গল্প প্রতিযোগিতায় তিনি দ্বিতীয় পুরস্কার পান–
‘আজকালকার হিসাবে– যখন মৌলিক রচনার জন্য অনেক বড় বড় পুরস্কার রয়েছে– ব্যাপারটা কিছুই নয়। তখন কিন্তু এইচ. বোসের কুন্তলীন পুরস্কারের পর একমাত্র “প্রবাসীর” কর্তৃপক্ষরাই মাঝে মাঝে ছোটগল্পের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করতেন। আগে বলেছি, আমার সাহিত্যের জন্মই তাই থেকে। পরেও বার দুই পেয়েছি। মূল্যটা কমই থাকত, তবে, তখন টাকার মূল্য ছিল, সংখ্যার অল্পতাটুকু সেদিক দিয়ে পূরণ হ’য়ে যেত।…’
সে বার ‘প্রবাসী’ পত্রিকা ঘোষণা করে যে, এক বছরে যতগুলি গল্প পত্রিকায় প্রকাশিত হবে তার মধ্যে সেরা দু’টিকে পুরস্কার দেওয়া হবে। প্রথম পুরস্কার ছিল ২০০ টাকা আর দ্বিতীয় পুরস্কার ১৫০ টাকা। সেরা গল্প বাছাইয়ের পদ্ধতিটিও ছিল সেকালের তুলনায় বেশ অভিনব। ‘প্রবাসী’ পত্রিকার পাঠকরা একটা ক’রে ভোট দিয়ে তাঁদের অভিমত জানান এবং পাঠকের ভোটেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শর্ত ছিল কোনও লেখকের একাধিক লেখাও বিবেচনায় আসতে পারে। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের লেখা দু’টি গল্প সেবার বিবেচনায় ছিল। ‘জীবন-তীর্থ’-এ তিনি লিখছেন–
‘সে সময় বেশ সাড়া প’ড়ে গিয়েছিল। আমি দু’টো গল্প দিই, “গজভুক্ত” এবং “রাণুর প্রথম ভাগ”; দ্বারভাঙ্গায় থাকতে আমার সাত-আট বছরের ভাইঝিকে বিদ্যাসাগর মশাইয়ের “বর্ণপরিচয় প্রথমভাগ” পড়াতে যে নাকালটা হ’তে হয়েছিল, তাই নিয়ে। সেদিন ছিল নাকাল, বিরক্তি, তার সঙ্গে চড়-চাপড়টাও। তারপর স’রে এসে বিরহবিচ্ছেদের বেদনা-অনুতাপের সূতিকাগারে জন্ম নিল গল্পটি।
প্রথম পুরস্কার পান রাজশেখর বসু (পরশুরাম) তাঁর একসঙ্গে প্রকাশিত দু’টি ছোট ছোট গল্পের জন্য।’
বিভূতিবাবুর আত্মজীবনীর শুরুটাও সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে অদ্বিতীয় যেখানে উনি লিখছেন–
‘আমি যেদিন জন্মাই সেদিন আমাদের পরিবারে খুব বড় একটি দুর্ঘটনা ঘটে; সেটি আর কিছু নয়, আমার জন্মগ্রহণই। নিতান্ত দৈবানুগ্রহে পরিবারের কেউ বিপদটা সদ্য সদ্য উপলব্ধি করতে পারেন নি। যথারীতি শাঁখ বেজেছিল, যদিও নিজের শঙ্খনিনাদের দিকে মন থাকায় আমার কানে যায়নি। রীতিমতো ষেটেরা, আটকৌড়ে, ষষ্ঠী-সুবচনী পূজা প্রভৃতি জাতকর্ম সম্পন্ন হয়ে পুত্রসন্তান লাভের আনন্দের মধ্য দিয়ে প্রায় মাসখানেক কেটে যায়। তারপর মোটামুটি একটা বৎসরও বলা যেতে পারে, যেমন শুনেছি পরিবারের মধ্যে আমার বাল্য-জীবন আলোচনার প্রসঙ্গে। তারপর থেকেই বৎসর পূর্বের শুভঘটনাটি যথার্থই শুভ ছিল কিনা সে বিষয়ে সকলে সন্দিহান হতে আরম্ভ করেন।’
খুব বেশি মানুষ নিজেকে নিয়ে এমন চমৎকার নিস্পৃহ মন্তব্য করতে পারেন না। বিভূতিবাবুর মধ্যে কোনও ভাণ ছিল না।
আমি যখন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি ততদিনে তিনি লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাহিত্যিক। তাঁর ছোটোগল্পের সঙ্গে-সঙ্গে ‘নীলাঙ্গুরীয়’, ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’ (৩ খণ্ডে), ‘নয়ান বৌ’, ‘কাঞ্চনমূল্য’ প্রভৃতি বই বাংলার পাঠকের কাছে বিপুল সমাদর পেয়েছে। ‘নীলাঙ্গুরীয়’ সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল বেঙ্গল পাবলিশার্স থেকে। পরে বইটি শচীনবাবুর প্রকাশ ভবন থেকেই প্রকাশিত হত। ‘নীলাঙ্গুরীয়’ যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গল্পের দৌলতে পাঠক তাঁর স্মিত হিউমারের পরিচয় পেয়ে গেছেন। তাই তাঁর রচনাকে কৌতুক রসের বলার একটা প্রবণতা ছিল। সেজন্যই ‘নীলাঙ্গুরীয়’র প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় তিনি লেখেন–
‘ ‘নীলাঙ্গুরীয়’ বইখানির একটু ইতিহাস আছে। শ্রাবণ, ১৩৪৬-এর ‘শনিবারের চিঠি’তে ‘কশ্চিৎ প্রৌঢ়’ ‘ভালবাসা’ শীর্ষক একটি রচনা প্রকাশিত করেন। লেখক তাহাতে ভালবাসার নানা বৈচিত্র্য সম্বন্ধে আলোচনা করিয়া শেষে তাঁহার পাঠকের নিজের নিজের অভিমত জানাইবার জন্য আহ্বান করেন।
সকলেই স্বীকার করিবেন যে, মানুষের এই মনোবৃত্তিটি উপরে উপরে মোটামুটি সরল এবং নিরীহ মনে হইলেও আসলে অত্যন্ত জটিল। ‘কশ্চিৎ প্রৌঢ়ে’র আহ্বানে আমি ‘ভালবাসা’ নামক একখানি গল্প ‘শনিবারের চিঠি’তে প্রকাশিত করি; যাহা পরে ‘বসন্ত’ নামক গল্প সংগ্রহে বাহির হইয়াছে। তাহাতে দেখিয়াছি ভালবাসার সঙ্গে মার খাওয়াইবার ইচ্ছা থাকাও বিচিত্র নয়।
বৃত্তিটির জটিলতার আরও একটা দিক দেখাইবার ইচ্ছা থাকায় এই বইখানির অবতারণা।…’
‘নীলাঙ্গুরীয়’ আদৌ কৌতুকময় লেখা নয়। বরং বিষয়ের গভীরে গিয়ে লেখা একটি অসাধারণ উপন্যাস। এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, ভূমিকায় যে ‘কশ্চিৎ প্রৌঢ়’ নামক লেখকের উল্লেখ করেছেন সেই লেখক আর কেউ না, তিনি নিজেই। ‘কশ্চিৎ প্রৌঢ়’ তাঁর একটি ছদ্মনাম।
বিভূতিবাবুর প্রথমে আমাদের বই দিতে অস্বীকার করলেও সাত-আট বছর পরে আমাদের কাজের ধরন দেখে তিনি আমাকে বই দিতে রাজি হন। ১৯৭৭/৭৮ সাল নাগাদ তাঁর চিঠিতে মনে হচ্ছিল আমরা, পুনর্মুদ্রণ হলেও, হয়তো তাঁর বই পাব।
১৯৮০ সালের ৭ ডিসেম্বর একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন–
‘…আপনাদের রেকর্ড থাকতে পারে আমার বই “স্বর্গাদপি গরীয়সী” নিয়ে গত ২৫. ৯. ৭৮ তারিখ আপনার সঙ্গে পত্রাচার হয়। আপনারা বিশেষ আগ্রহ দেখান। বইটি তিন খণ্ডে। দ্বিতীয় খণ্ডটি বাজারে পাওয়া যায় না। আরও কয়েকটা কারণে পত্রাচার সেসময়ের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। আমি বইটির একটা ভালো সংস্করণ একত্রেই বেড় [য.] করতে চাই। দ্বিতীয় খণ্ডেরও ব্যাবস্থা [য.] করতে পারব। এ অবস্থায় আপনারা বইটি নিতে পারবেন কিনা জানালে আমি অগ্রসর হতে পারব।…’
চিঠির নীচে কাঁপা-কাঁপা হাতের লেখায় লিখে দিয়েছিলেন– ‘আমি অসুস্থ, তাই অন্য হাতে লেখালাম’। এর উত্তরে ওই মাসেরই ২৪ তারিখে আমি উত্তরে লিখেছিলাম–
‘…৭ ডিসেম্বর লেখা আপনার চিঠি পেয়েছি।
‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’ বইটির তিনটি খণ্ড একত্রে করবার জন্য আপনার চিঠি আমার উৎসাহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি একত্রে বইটির পুনঃপ্রকাশ করতে আগ্রহী। এই সঙ্গে ‘গণ্শা’ সংক্রান্ত বইও প্রকাশ করতে আগ্রহী। ছাপার কাজ দ্রুত শেষ করবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করব। বইয়ের কপি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসে দেব। লোডশেডিং-এ কাজ কিছুটা বিলম্ব হলেও যত তাড়াতাড়ি ছাপার কাজ শেষ করা যায়, তার চেষ্টা করব। আপনার পক্ষ থেকে সম্মতি পেলেই কাজে অগ্রসর হব। এ-ব্যাপারে আমার কী করণীয়, আপনি জানালে আমি সেইমতো কাজ করব।…’
‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’র তিনটি খণ্ডের প্রকাশক ছিল মিত্র ও ঘোষ। তাদের অনুমতি না পাওয়ায় লেখক চাইলেও এই বইটি আমরা পুনর্মুদ্রণ করতে পারিনি। পরে মিত্র ও ঘোষ থেকেই বইটির অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয়। আর আটের দশকের শুরুতে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গে লোডশেডিং-এর কারণে আমাদের জনজীবন প্রায় বিপর্যস্ত হতে বসেছিল। দিনের অনেকটা সময় কারেন্ট না থাকার জন্য ছাপাখানার কাজকর্ম বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হত।
তবে এর পরের বছরের ডিসেম্বরে আমরা তাঁর দু’টি বই একই সঙ্গে প্রকাশ করি। তার মধ্যে একটি পুনর্মুদ্রণ, অন্যটি একেবারে আনকোরা নতুন বই। পুনর্মুদ্রিত বইটি হল তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’। এই বইটিও ছিল বেঙ্গল পাবলিশার্সের। তখন বেঙ্গল থেকে শ্রেষ্ঠ গল্পের সিরিজ খুবই জনপ্রিয় ছিল। এই বইগুলি সম্পাদনা করতেন বঙ্গবাসী কলেজের প্রখ্যাত অধ্যাপক, ত্রৈমাসিক ‘কবি ও কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘কবিমানসী’-খ্যাত জগদীশ ভট্টাচার্য। প্রতিটি বইতে জগদীশবাবুর একটি করে সুলিখিত ভূমিকা থাকত। আমরা এই বইটি ছাপার সময় জগদীশবাবুর অনুমতিক্রমে তাঁর ভূমিকা সহ ‘বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প’ প্রকাশ করি। ‘রাণুর প্রথম ভাগ’ থেকে শুরু করে বিভূতিবাবুর বিখ্যাত ১৬টি গল্পের এই সংকলন আজও পাঠকের কাছে জনপ্রিয় একটি বই।
তাঁর নতুন বইটি ছিল ‘একটি যুগের জন্মকথা’ নামে উপন্যাস। এই বইয়ের প্রসঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রে দেখছি ১৯৮১ থেকেই তিনি আমাকে আর ‘আপনি’ না লিখে ‘তুমি’ লিখছেন। ১৪ অগাস্ট ১৯৮১-র চিঠিতে লিখেছেন–
‘তোমার চিঠি পেয়েই (৩.৮) আমি গত শনিবার (৮.৮) যে চিঠি দিয়েছি এবং পরের সোমবার (১০ই) রেজেষ্টারি A.D যোগে যে “একটি যুগের জন্মকথা”র পাণ্ডুলিপি পাঠিয়েছি, নিশ্চয় এতদিনে তা পেয়ে গেছ। শারদীয় কোন পত্রিকায় আগে প্রকাশ করায় আমার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল, খানিকটা প্রচার হয়ে যাবার। অনেকের ধারণা এই রকম। তোমার চিঠি থেকে মনে হয় তুমি এরকম ধারণা পোষণ কর না। সুতরাং ও বিষয়ে আর কোনো প্রশ্ন থাকে না।
বইটা সম্বন্ধে আমার এখন একটা কথাই বলার আছে। এটা আমার অন্যান্য বই থেকে সম্পূর্ণ অন্য ধরনের, বর্তমান সমাজের একটা Burning question নিয়ে। আমার ইচ্ছা, তুমি যখন একটা কাগজে বিজ্ঞাপিত করবে তখন “সাহিত্য ও সমাজচেতনা” সম্বন্ধে বেশ অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে এর মূল কথাটা– আমার যা বক্তব্য সেটা স্পষ্ট করেই বিজ্ঞাপিত কোর [য.]। যদি বিলম্ব থাকে তো আমায় খসড়াটা দেখিয়ে নিতে পার।…
আমি এই সঙ্গে “একটি যুগের জন্মকথা”র ভূমিকাটাও পাঠালাম। এইভাবেই ছেপো।…’
‘একটি যুগের জন্মকথা’র ভূমিকা এবং উৎসর্গের পাতায় লেখকের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লেখা ছিল। উৎসর্গের পাতায় তিনি লিখেছিলেন– ‘অতীত, বর্তমান ও ভাবী– কোন কালই/ সম্পূর্ণ গ্রহণীয় নয়, তেমনই আবার,/ সম্পূর্ণ বর্জনীয়ও নয়/ যাঁরা এই ত্রি-কালের মধ্যে সামঞ্জস্য ঘটিয়ে/ নবাগতকে স্বাগত/ করে নিতে পারবেন,/ বইখানি তাঁদের উৎসর্গ করলাম।’ এখন মনে পড়ছে চিঠিতে তিনি পুরো নাম সই করলেও বইয়ের ভূমিকা বা উৎসর্গে নামের অদ্যক্ষর– ব. ভ. ম. লিখতেন। গৌতম রায়ের প্রচ্ছদে ‘একটি যুগের জন্মকথা’ ছেপেছিলাম হরি ঘোষ স্ট্রিটে কাননশ্রী পয়ড়্যা-র অভিনব মুদ্রণ প্রেস থেকে।
এই দু’টি বই প্রকাশিত হওয়ার পর বিভূতিবাবুর বইয়ের জনপ্রিয়তার নিরিখে বিক্রি কমই হচ্ছিল। আমি অবশ্য বিষয়টা নিয়ে তেমন চিন্তিত ছিলাম না, কেননা আমার চিরকালই বিশ্বাস বইয়ের বিক্রি দু’-রকমের হয়। কোনও বই প্রকাশের সঙ্গে-সঙ্গে মারকাটারি বিক্রি শুরু হয়, আবার কোনো বই থাকে যেগুলো ধীরে-ধীরে বিক্রি হয় কিন্তু তাদের একটা লম্বা দৌড় থাকে। বহুদিন পরেও সেসব বই কিছু-কিছু করে বিক্রি হয়ে চলে। বিভূতিবাবুর বই সেরকমই ধীর কিন্তু অনেকদিন ধরে বিক্রি হবে বলেই আমার অনুমান ছিল এবং সেধারণা যে ভুল ছিল না, তা আজও অনুভব করি। তবে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে একটু হতাশই হয়েছিলেন। ১৪ মে ১৯৮৫ সালে একটি চিঠিতে আমাকে লিখেছিলেন–
‘…তোমার কাছে আমার একটি পুরণো ও একটি নূতন বই আছে– “শ্রেষ্ঠ গল্প”
ও “একটি যুগের জন্মকথা”। পুরণোটা পুরণই [য.] কিন্তু নূতনটার Sale অ্যারও নৈরাশ্যজনক। ব্যবসায়ী হিসেবে যেমন স্বাভাবিকভাবে তোমার কাছে, তেমনই লেখক হিসাবে আমার কাছেও। একটি আধুনিকতম সামাজিক সমস্যা নিয়ে, অনেকটা আধুনিক ধাঁচায় লেখা বইটা (অর্থাৎ যা বিষয়বস্তুর প্রয়োজনে এসে পড়েছে)– অথচ পাঠকমণ্ডলীর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারল না। তোমায় একবার একটু হিন্ট দিয়েছিলাম।…’
আসলে, এই সময় তাঁর তৃতীয় বইয়ের কাজ শুরু হওয়ার কথা চলছিল। অন্য কিছু বই নিয়ে ব্যস্ততার কারণে সেই কাজ কিঞ্চিৎ ঢিমে তালে এগোচ্ছিল বলেই হয়তো তিনি খানিক অভিমানী হয়ে পড়েছিলেন। ভাবছিলেন বইয়ের তেমন চাহিদা না বুঝে আমি তাঁর নতুন বইয়ের কাজ পিছিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু বাস্তবে তেমন ঘটেনি। সেসময় দে’জ পাবলিশিং-এর প্রকাশিতব্য বইয়ের চাপেই খানিকটা দেরি হয়েছিল। আমি তাঁকে সেকথা জানাতে তিনি বিষয়টা অনুধাবন করতে পারেন এবং তাঁর পরের বই ‘সেই তীর্থে বরদ বঙ্গে’র প্রেস কপির কাজ শুরু করেন। ১৮ জুলাই ১৯৮৫ তারিখে লেখা চিঠিতে তিনি জানালেন–
‘পূর্বেই তোমায় লিখি, ভালো লিপিকারের অভাবে আমার পাণ্ডুলিপিটা কিছুটা অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়ায় আমি সেটি কলকাতায় আমার বন্ধুস্থানীয় ব্যক্তির কাছে পাঠাই। কিছু দূর অগ্রসর হওয়ার পর হঠাৎ চাকরি নিয়ে সংকট অবস্থায় পড়ে যাওয়ায় তিনি ওটি আমায় ফেরৎ দিয়েছেন। গতকাল পেয়েই তোমায় এ চিঠি দিচ্ছি। তাঁকে দিল্লি যেতে হচ্ছে। আমার পাণ্ডুলিপি যে একেবারে অচল এমন নয়। তবে Press সম্বন্ধে আমার কোন স্পষ্ট আইডিয়া নেই। সেইজন্য তোমায় জিজ্ঞেস করি, এমন কোন লোক– তোমাদের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট– দিন তিনেকের জন্যে পাঠিয়ে দিতে পার, যিনি এ-বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং সাহিত্য সম্বন্ধে জ্ঞান আছে। আমার বক্তব্য তিনি আমার সঙ্গে একবার পড়ে– এই পাণ্ডুলিপিই Press এর উপযোগী মনে হলে নিয়ে যাবেন। অন্যথা যা পরামর্শ দেন সেই মতো করা হবে।
বলা বাহুল্য, আমি তাঁর উভয়দিকের রাহাখরচ বহন করব। থাকবেন, অবশ্য আমার এখানেই।
আমার চেষ্টা ছিল ৴পূজার আগে বইটা বের হয়ে যাক। আমার বন্ধুর চাকরি বিভ্রাটে একটা set-back হয়ে গেল বোধ হয়।
তবে, আমার অনুমান, তিনি এই কপিটির অনুসরণেরই অভিমত দেবেন।
তুমি এই চিঠিটার উত্তর একটু তাড়াতাড়ি দিও। যদি কাউকে পাঠাতে পার তো একটা চিঠি তাকে দিয়েই পাঠিয়ে দিও। উত্তরের অপেক্ষা করবার দরকার নেই।…’
এই চিঠিটা পড়তে-পড়তে মনে পড়ে গেল প্রফুল্লদার (প্রফুল্ল রায়) মুখে শোনা একটা ঘটনার কথা। প্রফুল্লদা তখন ‘যুগান্তর’-এ কাজ করেন। সেবার তাঁদের পত্রিকা গোষ্ঠীর পুজোসংখ্যার জন্য প্রফুল্লদা বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কাছে একটি উপন্যাস চেয়েছিলেন। যথাসময়ে উপন্যাসটি দপ্তরে এসে পৌঁছলে প্রফুল্লদা খাম না খুলেই লেখাটি প্রেসে পাঠিয়ে দেন কম্পোজ করার জন্য। তিনি ভেবেছিলেন, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের আমন্ত্রিত উপন্যাস তো আর না-ছাপার কোনও প্রশ্নই নেই। টুকটাক কিছু ভুলভ্রান্তি থাকলে প্রুফেই সেটা সংশোধন করে নেওয়া যাবে। কিন্তু দুয়েকদিন পরে তাঁদের প্রেস-ইন-চার্জ এসে প্রফুল্লদাকে না কি জিগ্যেস করেন– এটা কেমন পাণ্ডুলিপি পাঠানো হয়েছে। প্রফুল্লদা তখনও বিষয়টার ধরতাই না পেয়ে সরল বিশ্বাসে বলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস পাঠিয়েছেন, তা নিয়ে আবার সমস্যার কী থাকতে পারে ! তখন প্রেসের সেই ভদ্রলোক না কি পাণ্ডুলিপি দেখিয়ে বলেন, তিনি এমন বিচিত্র পাণ্ডুলিপি জীবনে দেখেননি ! একটা বাক্যও পড়া যাচ্ছে না। তাঁর না কি মনে হচ্ছিল একটা পিঁপড়েকে কালিতে চুবিয়ে সাদা পাতায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রফুল্লদা তখন পাণ্ডুলিপি দেখে হতবাক। সত্যিই কিছু পড়া যাচ্ছে না। আমার ধারণা বেশি বয়সে শারীরিক অসুস্থতার কারণে বিভূতিবাবুর হাতের লেখা দুষ্পাঠ্য হয়ে উঠেছিল। যাইহোক, সেবার প্রফুল্লদা তাঁর অনুজ লেখক শচীন দাশকে দ্বারভাঙা পাঠিয়ে গোটা উপন্যাসের নতুন প্রেস-কপি বানিয়ে নিয়ে আসেন। লেখাটি পত্রিকায় যথা সময়ে প্রকাশিতও হয়। অকাল প্রয়াত কথাসাহিত্যিক শচীন দাশ সে-যাত্রায় প্রফুল্লদাকে উদ্ধার করেছিলেন। শচীনদাও পরবর্তীকালে মান্য লেখকের স্বীকৃতি পেয়েছেন। দে’জ থেকে প্রকাশিত তাঁর ‘উদ্বাস্তু নগরীর চাঁদ’ আমার নিজের খুবই প্রিয় লেখা।
আমার মনে হয়, প্রফুল্লদার ব্যবস্থাপনায় সেবার এভাবে পাণ্ডুলিপি তৈরির অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি আমাকে চিঠিতে লিখেছিলেন কাউকে পাঠিয়ে প্রেস-কপি করিয়ে আনার জন্য। তাঁর হাতের লেখা পড়তে আমারও অসুবিধে হত খুব। কিন্তু এ-ক্ষেত্রে আমার সহায় হয়েছিলেন বিভূতিবাবুরই নাতনি শর্মিলা। শর্মিলা তখন কলেজের ছাত্রী। তাঁর সাহায্যেই বিভূতিভূষণ প্রেস-কপি তৈরি করেন। ‘সেই তীর্থে বরদ বঙ্গে’ বইটি ১৯৮৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়। গৌতম রায়ের প্রচ্ছদে বইটি ছেপেছিলাম অরিজিৎ কুমারের টেক্নোপ্রিণ্ট থেকে। উপন্যাসের ভূমিকায় লেখক উপন্যাসটির মূলকথাটি ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন– ‘নানা উত্থান-পতন, ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে সব দেশ-উপদেশের মতোই, বাংলারও এক শাশ্বত রূপ আছে। তার জিনিয়াস অর্থাৎ সহজাত চিন্তাধারা, সেই-ধারা-সম্মত ঐতিহ্য, তার নদী-মাতৃক শান্ত নৈসর্গিক পরিবেশ– সব মিলিয়ে যে-রূপটি ফুটে উঠেছে তাকে এক তীর্থ-রূপ বলে তার কবি অভিনন্দিত করেছেন। আমার মনে হল এই-রূপটিকে পূর্ণমহিমায় তুলে ধরতে হলে তার শৌর্য-বীর্য-মনীষার সবচেয়ে যা বিস্ময়কর স্ফুরণ সম্প্রতিকালে দেখা গেছে তার কথাটা একটু স্পষ্ট ও বিস্তারিত করে দিতে হয়। বাংলার ‘অগ্নিযুগ’– সাহিত্যে বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ থেকে নিয়ে, সাধনায় উনিশশত-বিয়াল্লিশের ‘কুইট ইন্ডিয়া’, বা ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন পর্যন্ত। এই কাহিনি এর সবটুকু নিয়ে নয়। শতাব্দীর তৃতীয় দশকের কিছুটা নিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই এসে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বিক্ষোভটা এতই গভীর, বিরাট এবং বিস্তৃত যে তার একটুখানি ধরে দিতে গিয়ে সেইটুকুই যেন প্রাধান্য লাভ করেছে মনে হতে পারে।’ ‘সেই তীর্থে বরদ বঙ্গে’ নামটি তিনি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘আমরা’ কবিতা থেকে পেয়েছিলেন, তাই উৎসর্গের পাতায় লিখেছিলেন– ‘মুক্তবেণীর গঙ্গা যেথায় মুক্তি বিতরে রঙ্গে/ আমরা বাঙালী বাস করি সেই তীর্থে বরদ বঙ্গে’।
সেই বয়সেও কিন্তু বিভূতিবাবু প্রায় নবীন লেখকের মতোই– নিজের নতুন লেখা পাঠকের কেমন লাগছে, তা জানতে উৎকণ্ঠিত থাকতেন। আমি দেখছি নতুন বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরের বছরের গোড়ায়, ১৯৮৭ সালের ৩১ জানুয়ারি পোস্টকার্ডে লেখা ছোট্ট চিঠিতে জানতে চেয়েছেন– ‘দুটো মেলা তো শেষ হোল [য.], বইগুলোর– বিশেষ করে “সেই তীর্থে…” উপন্যাসটি সম্বন্ধে বলবার মতো কিছু থাকলে জানিও।…’ এখানে দুটো মেলা বলতে তিনি নিশ্চয়ই কলকাতা বইমেলা আর ১৯৮০ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উদ্যোগে শুরু হওয়া পশ্চিমবঙ্গ গ্রন্থমেলার কথা বলতে চেয়েছেন।
‘সেই তীর্থে বরদ বঙ্গে’ পর আমি চাইছিলাম তাঁর লেখা কিশোর-রচনার একটি সংকলন করতে। সেকথা শুনে তিনি নিজেও খুবই উৎসাহিত হয়ে পড়েছিলেন। পর-পর চিঠি লিখছিলেন আমাকে এই সংকলনের পরিকল্পনা নিয়ে। ১৯৮৭ সালের ৩০ জুলাই তাঁর প্রয়াণের আড়াই মাস আগে একটি চিঠিতে তিনি জানিয়েছিলেন– ‘…কিশোরদের বইগুলোতে কি হাত দিয়েছ ?… আমি অর্ডার (ক্রমপর্যায়)ও লিখে দিয়েছি– কৈলাসের পাটরানী, দুষ্টু-লক্ষ্মীদের গল্প, হেসে যাও। বা যেমন ভালো বোঝ। তবে কৈলাসটা ১ম থাকবে।…’ কিন্তু বইটি তাঁর জীবদ্দশায় আমরা প্রকাশ করতে পারিনি। অনেকটাই পরে, ১৯৯৯ সালের বইমেলার সময় সেটি প্রকাশিত হয়– ‘কিশোর রচনাসম্ভার’ নাম দিয়ে। বইটি সম্পাদনা করেন শোভন বসু। শোভনদা আনন্দ পাবলিশার্সে কপি এডিটিং-প্রুফ রিডিংয়ের কাজ করতেন। আমাকে অনেক ভালো বই তৈরি করতে সাহায্য করেছেন তিনি। সরাসরি সম্পাদক হিসেবে নাম না দিলেও দে’জের বেশ কিছু বইতে তাঁর পাকা হাতে সম্পাদনার ছাপ আছে। বিভূতিবাবুর ‘কিশোর রচনাসম্ভার’ও তেমনই একটা বই। সংকলনটিতে লেখক প্রথম বই হিসেবে ‘কৈলাসের পাটরানী’ রাখতে চেয়ে চিঠি লিখে গেলেও, প্রকাশের কালানুক্রম মেনে শোভনদা ওই বইটিকে প্রথমে রাখেননি। প্রথমে এসেছে তাঁর খুবই বিখ্যাত কিশোর রচনা ‘পোনুর চিঠি’। এছাড়া, বিভূতিবাবুর বলে যাওয়া বাকি বইগুলির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু অগ্রন্থিত রচনাও। বইয়ের শেষে শোভনদা অত্যন্ত যত্ন নিয়ে একটি ‘গ্রন্থ-পরিচয়’ও তৈরি করে দিয়েছেন।
বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের চিঠিগুলো পড়তে-পড়তে হঠাৎ মনে হল– দে’জ পাবলিশিং থেকে আমি বহু লেখকের অসংখ্য বই প্রকাশ করেছি, কিন্তু বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় হলেন সেই প্রবীণতম লেখক যাঁর নতুন লেখাও আমি বই করেছি। চিঠিপত্রে, এমনকী, কখনও কলকাতায় এলে সামনে বসেও নতুন বইয়ের পরিকল্পনা করেছি।
তাঁর আত্মজীবনীর একেবারে শেষের দিকে তিনি লিখেছেন– ‘আমাদের জাতকর্মের একটা বিধান অনুযায়ী জন্মের ষষ্ঠ দিনে প্রসূতির কক্ষদ্বারে কালি-ভরা দোয়াত আর একটা কলম রেখে দিতে হয়। বিধাতাপুরুষ নাকি মায়ের ঘুমন্ত অবস্থায় চুপিসারে এসে জাতকের ললাটে জীবনের আদ্যন্ত সবকিছু লিখে দিয়ে যান। আমার বেলাও রাখা হয়েছিল। লিখেও গেলেন; কিন্তু অতি-বৃদ্ধ, হাত কেঁপে তার ওপর কি ক’রে একটা টানা আঁচড় প’ড়ে গিয়ে থাকবে, বেশ একটু ওলট পালট হ’য়ে গেল’– আমার মনে হয়, জীবন সম্পর্কে এই প্রসন্ন দৃষ্টির জন্যই তিনি লেখক হিসেবে বাঙালি পাঠকের মনে চিরকালীন জায়গা করে নিয়েছেন।
লিখন শ্রীকুমার চট্টোপাধ্যায়
……………………ইতি কলেজ স্ট্রিট-এর অন্যান্য পর্ব…………………
পর্ব ২৭। নিজস্ব ঈশ্বরভাবনা থাকলেও শঙ্কু মহারাজের লেখার মূল বিষয় ছিল মানুষের আলো-আঁধারি জীবন
পর্ব ২৬। বাংলাদেশে পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও একুশে বইমেলায় কখনও স্টল পাইনি
পর্ব ২৫। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মুহূর্তের রক্ত-ঘাম-হাসি-কান্নার এক জীবন্ত দলিলচিত্র ছেপেছিলাম
পর্ব ২৪। রাখাল ছেলে যেমন বাঁশি বাজায়, আমিও তেমন নিজের খুশিতে লিখি, বলেছিলেন যাযাবর
পর্ব ২৩। রয়্যালটি-মুক্ত বইয়ের ওপর প্রকাশকদের ঝোঁক চোখে পড়ছে বইমেলাতেও
পর্ব ২২: শেষমেশ রেগে গিয়ে আমাকে চিঠিই লিখে ফেলেছিলেন শঙ্খ ঘোষ!
পর্ব ২১: ৩০০০ কপি বিক্রির মতো জীবিত বা মৃত লেখক আর হয়তো নেই
পর্ব ২০: কম বয়সে আমাদের রোববারের আড্ডা ছিল ২৮ নম্বর প্রতাপাদিত্য রোড, আশুদার বাড়িতে
পর্ব ১৯: ‘লেখা বড় হচ্ছে’ অভিযোগ আসায় খুদে হাতের লেখায় পাণ্ডুলিপি দিতেন প্রবোধবন্ধু অধিকারী
পর্ব ১৮: দু’বছরের মধ্যে সংস্করণ না ফুরলে অন্য জায়গায় বই ছাপার চুক্তি ছিল শরদিন্দুর চিঠিতে
পর্ব ১৭: পূর্ণেন্দু পত্রীর বাদ পড়া প্রচ্ছদ ও দিনেশ দাসের কবিতার শ্রেষ্ঠ দিনগুলি
পর্ব ১৬: সব প্রকাশনার যাবতীয় বইয়ের হদিশ পাওয়া যেত ‘সম্মিলিত গ্রন্থপঞ্জী’তে
পর্ব ১৫: নিছকই একটা পত্রিকা নয়, ‘কলেজ স্ট্রীট’ আমাদের আবেগ
পর্ব ১৪: খুদে পাঠকদের জন্য মিনিবই তৈরির কথা প্রথম ভেবেছিলেন অভয়দা
পর্ব ১৩: কয়েকটি প্রেসের গল্প
পর্ব ১২: দীর্ঘায়ু বই ও আইয়ুব পরিবার
পর্ব ১১: প্রেমের নয়, অপ্রেমের গল্প সংকলনের সম্পাদনা করেছিলেন সুনীল জানা
পর্ব ১০: ছোট্ট অপুকে দেখেই রঙিন ছবিতে ভরা টানটান গল্পের বই করার ইচ্ছে জেগেছিল
পর্ব ৯: চানঘরে গান-এ সত্যজিৎ রায়ের চিঠি থাকায় ব্যাপারটা গড়িয়েছিল কোর্ট কেস পর্যন্ত
পর্ব ৮: প্রকাশক-লেখকের কেজো সম্পর্কে বুদ্ধদেব গুহর বিশ্বাস ছিল না
পর্ব ৭: পুজো সংখ্যায় না-বেরনো উপন্যাস বই আকারে সুপারহিট
পর্ব ৬: মানবদার বিপুল অনুবাদের কাজ দেখেই শিশির দাশ তাঁর নাম দিয়েছিলেন– ‘অনুবাদেন্দ্র’
পর্ব ৫: সাতবার প্রুফ দেখার পর বুদ্ধদেব বসু রাজি হয়েছিলেন বই ছাপানোয়!
পর্ব ৪: লেখকদের বেঁচে থাকার জন্য অনেক কিছুই লিখতে হয়, প্রফুল্ল রায়কে বলেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র
পর্ব ৩: পয়লা বৈশাখের খাতায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় মজাচ্ছলে লিখেছিলেন, ‘সুধাংশুরা রাজা হোক’
পর্ব ২: বাংলা মাসের সাত তারিখকে বলা হত ‘গ্রন্থতিথি’, বিজ্ঞাপনেও বিখ্যাত ছিল ‘৭-ই’
পর্ব ১: সত্তরের উথাল-পাথাল রাজনৈতিক আবহাওয়ায় আমি প্রকাশনার স্বপ্ন দেখছিলাম
১৯৭৬ সালে স্ট্রোক হওয়ার পর থেকে গাইতে পারতেন না আর। এহেন শিল্পী, যে এত সংগ্রাম করলেন দু’কলি গাইতেই, গান না থাকলে তার জীবনে কী থাকে? ১৯৭৭ সালে পাড়ি দিলেন না-ফেরার দেশে। অন্য বাহিরে। সে বাহিরের গায়ে কান পেতে দাঁড়ালে হয়তো আজও খামাজে ঠুমরি শোনা যাবে।