obituary of rahul arunoday banerjee। Robbar
Robbar
  • ৮ ভাদ্র ১৪৩৩
  • বুধবার
  • ২৬ আগস্ট ২০২৬

অস্তরাগের অরুণোদয়

ইস্টবেঙ্গল জিতলে তোমার মতো সুখী কে, রাহুলদা! হারলে তোমার মতো অসুখী হতে দেখেছি, এমন মানুষ‌ও হাতেগোনা। মাঠের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে তুমি। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়ে ফোনে রাতদিন তর্কযুদ্ধ চলছে তোমার-আমার। ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে বহুবার ফোন করেছি, হাসিমুখে কথা বলেছ। রাগ করোনি। কথার মারপ্যাঁচে নাস্তানাবুদ করেছ, ‘দেখ নেব পরেরবার’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছ। সেই ঝগড়ায় আন্তরিকতা ছিল। ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল। সেই হৃদ্যতার এমন করুণ পরিসমাপ্তি কেন হল, বলতে পারো!

Published by: Robbar Digital

Posted:April 1, 2026 8:04 pm | Updated:April 1, 2026 8:37 pm  
Facebook WhatsApp Messenger

সময় কখনও-সখন‌ও আমাদের এমন দৃশ্যের সম্মুখীন করে, যখন মনে হয় এর চেয়ে অসময় বুঝি আর নেই। মনখারাপের বিকেলগুলোয় এই কথাগুলো আজকাল মনে হয় পরমাত্মীয়ের মতো বিশ্বাসযোগ্য। সেই শূন্যতায় ভরা জীবনে হারিয়ে ফেলা তোমার মুখ ক্রমাগত ধ্রুবপদের মতো ভেসে উঠতে দেখি রাহুলদা।

আসলে এমন সহজ কথার জীবন পাঁচালিতে জটিল গোলকধাঁধায় রেখে তুমি ‘কাট’ বলবে, ঘুণাক্ষরেও যে টের পাইনি! তোমার এমন নিষ্ক্রমণ আমাদের কেবল শোকে পাথর করেনি, সেই স্তব্ধতার চাদর সরিয়ে বিহ্বল-দশা কাটিয়ে উঠতে পারিনি এখন‌ও। একটুও না।

অরুণোদয়ের আলোমাখা পৃথিবীতে এমন অস্তরাগের বিষাদ-বিকেল কি আমাদের খুব পাওনা ছিল?

অরিঞ্জয়! পরিচিত, অপরিচিত বৃত্তে যে-কতিপয় এই নামে এখনও আমায় ডাকে, তুমি তাদের অন্যতম ছিলে। এই ডাকে আন্তরিকতা ছিল। স্নেহ ছিল। বন্ধুত্ব ছিল। আপন করে নেওয়ার সহজতা ছিল। ক’জনই বা পারে দূরের বৃত্তের কাউকে এভাবে আত্মীয় করে নিতে! কে-ই বা পারে রাখতে অনুজপ্রতিমের কাঁধে এভাবে আস্থার হাত! তুমি পারতে। সেই আগলে রাখার পৃথিবীতে আমাদের মতো কাঁচা-মনের এক অরুণোদয় ছিল।

সংকোচহীন মানসিকতায় দরাজ হতে তোমার মতো আর কাউকেই দেখিনি। শেখ হাসিনার এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ প্রকাশের পর তুমি সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলে, ‘এই একটা ছেলে, যাকে নিয়ে আমার গর্বের কোন‌ও শেষ নেই’।

zoom
রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়

এমন সহজ কথা! নির্ভার, আন্তরিক অথচ গভীর। এমন করে উত্তরপ্রজন্মকে আপন করে নেওয়া হয়তো তোমার পক্ষেই সম্ভব ছিল রাহুলদা। অগ্রজের বিশ্বে তুমি আশ্চর্য ব্যতিক্রম। তোমার ঋজু ব্যক্তিত্বের মতোই।

ব্যতিক্রমী বলেই ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী হয়েও তোমার সঙ্গে আড্ডার আয়ু ফুরয়নি। গল্পে, ঠাট্ট-ইয়ার্কিতে ভাটার টান টের পাইনি কখনও। তুমি জনপ্রিয় অভিনেতা, অনবদ্য লেখক। তবে সেসব কিছু ছাপিয়ে তুমি অসাধারণ মানুষ। সেই মানবিক বোধে তুমি অপরকে আপন করার জাদুমন্ত্র জানতে, আমরা চুম্বকের মতো সেই অনতিক্রম্য মায়াটান অনুভব করতে পারতাম। অথচ মৃত্যু আজ সেই আলাপচারিতায় যতিচিহ্ন টেনে দিয়েছে। বিছিয়ে দিয়েছে সেই নিঃসীম নীরবতা, যাকে অতিক্রম করে তোমার স্মিত হাসি, ভরসাবাণীর কাছে পৌঁছতে আমরা অপারগ।

জীবনের এই চড়াই-উতরাই অচেনা নয়। তবে আকস্মিকতা বিহ্বল করে। ‘মরণ রে, তুহু মম শ্যাম সমান’-এর দার্শনিকতা খর্ব হয়ে যায় আচমকা স্বজনহারানোর যন্ত্রণায়। রাহুলদা, তোমাকে হারিয়ে সেই শূন্যতা অনুভব করছি। নিয়ত এক অভাববোধ ক্রমশ ডালপালা মেলছে, যাকে অতিক্রম করার সাধ্য আমাদের নেই।

অভিনয়ের তুলনায় তোমার লেখক-সত্তার কাছে আমার ব্যক্তিগত অবাধ ও অবাক যাতায়াত। তোমার লেখনীগুণ প্রাণিত করেছে বারবার, শুধু তাই নয়, ভরসা জুগিয়েছে ভাবনার সূত্র অনুসন্ধানে। তোমার বক্তব্যের প্রাঞ্জলতায়, বাধ্য কলমের সারস্বত সাধনা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। যত পড়েছি তোমার লেখা, যত জেনেছি তোমায়, তত‌ই শ্রদ্ধায় নতজানু হয়েছে হৃদয়। পাণ্ডিত্য, মেধা, রুচিবোধ এবং মধ্যবিত্তের সরলতার এমন সূত্রধর মেলে না। আফসোস আর চিরকালের হাহাকার– আমরা সেই মনের-মানুষকে ধরে রাখতে পারলাম না!

রাহুলদা, তোমার কথা ভাবতে বসে কেন জানি না, শেন ওয়ার্নের কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে, দিয়েগো মারাদোনার কথা। তুমিই লিখেছিলে, ‘তিনি শেন ওয়ার্ন, যদি সময়মতো জন্মাতেন, সূর্যকে ঘুরিয়ে দিতে পারতেন। তিনি মরে গিয়ে নিজেকে কী করেছেন জানি না, আই লস্ট অ্যা ফ্রেন্ড অ্যান্ড অ্যা লেজেন্ড। যে ঈশ্বর ছিল না, মানুষ ছিল।’ আমরা আজ সেই সমবোধের মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছি। রাহুলদা, তুমি ঈশ্বর ছিলে না, মানুষ ছিলে, বন্ধু ছিলে। সেই অগ্রজ বন্ধুকে বড্ড মিস করছি।

সহজ। অনাড়ম্বর। অনাবিল। এই অনুভব তোমার সাহচর্যে জীবন্ত হয়েছে। তোমার ‘সহজ কথা’ এই নির্ভার জীবনবোধকে বহন করেছে আজীবন। অর্ধশিক্ষা, অশিক্ষা, ধর্মান্ধতার যুগে বড্ড প্রাসঙ্গিক ছিল তোমার ‘সহজ কথা’। তোমার পডকাস্টে বহুবার আমন্ত্রণ জানিয়েছ। যাইনি। নিজের অকিঞ্চিৎ বোধে এড়িয়ে গিয়েছি সেই আবদার। আসলে ক্যামেরার পিছনে খোলামনে তোমাকে পাওয়ার অভাব হয়নি। অভাব হয়নি নিজের ভাবনা আদান-প্রদানে। আদ্যন্ত বামপন্থী তুমি। অথচ মত ও পথের জটিল আবর্তে নিজেকে অবরুদ্ধ না করে উন্মুক্ত করেছ। তোমার কথায় ধরা দিয়েছে মধ্যবিত্তের সুখ-দুঃখ, বেঁচে থাকার আস্বাদ। কলোনির কলতান প্রাণ পেয়েছে তোমার ভাষ্যে। জোনাকির আলো জ্বেলে স্নিগ্ধতা বিছিয়েছ আমাদের মতো পাঠকের মনে।

ইস্টবেঙ্গল জিতলে তোমার মতো সুখী কে, রাহুলদা! হারলে তোমার মতো অসুখী হতে দেখেছি, এমন মানুষ‌ও হাতেগোনা। মাঠের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে তুমি। মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নিয়ে ফোনে রাতদিন তর্কযুদ্ধ চলছে তোমার-আমার। ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে বহুবার ফোন করেছি, হাসিমুখে কথা বলেছ। রাগ করোনি। কথার মারপ্যাঁচে নাস্তানাবুদ করেছ, ‘দেখ নেব পরেরবার’-এর প্রতিশ্রুতি দিয়েছ। সেই ঝগড়ায় আন্তরিকতা ছিল। ভ্রাতৃত্ববোধ ছিল। সেই হৃদ্যতার এমন করুণ পরিসমাপ্তি কেন হল, বলতে পারো!

আর কয়েকমাস পরেই বিশ্বকাপ। তোমার প্রিয় আর্জেন্টিনা আবার বিশ্বজয়ের লক্ষ্যে মাঠে নামবে। মাঠে নামবে তোমার প্রিয় লিও মেসি। গতবার বিশ্বকাপ জয়ের পর বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতেছিলে। এবার! মেসিদের ঘিরে স্বপ্নঘোর রাতে তোমার টেক্সটগুলোর অভাব অনুভব করব প্রতি মুহূর্তে। তবু নিজেকে অবোধ আশ্বাসে বোঝাতে পারব না, ‘অন্ত নিয়ে এতটা ভেবো না/ মৃত্যুপথে যেতে দাও মানুষের মতো মর্যাদায়’। আসলে কোন‌ও কোন‌ও বিয়োগব্যথা অনুভবের অতীত। সংবেদনশীল মন সেই মৃত্যুচেতনাকে অতিক্রম করতে পারে না একজীবনে। যত‌ই তা জীবনের অনিবার্য, শান্ত ও দার্শনিক পরিণতি হোক, আক্ষেপের দিগন্তে তাই তোমাকে নিয়ে ‘সহজ কথা’ ফুরবে না, রাহুলদা।

জানি, কিছু মানুষ বাঁচতে আসে, বেঁচে থাকতে নয়। তুমি তাদের‌ই দলে। ভিড়ের মাঝে অপূর্ব একা হয়েও যাপনের নিজস্বতায়, জ্ঞানের গভীরতায়, ভাবনার মাপকাঠিতে তুমি অনন্য, অমায়িক অথচ সংযত। মনে আছে, রোববার ডিজিটালের দ্বিতীয় বছর পূর্তিতে বিমান বসুর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলে। ফোনে তোমার সঙ্গে তা নিয়ে আলোচনায় বুঝেছিলাম, ভিতরে ভিতরে কতটা উত্তেজিত, কতটা আবেগ বাসা বেঁধে আছে তোমার মনে। প্রবীণ কমরেডকে কী প্রশ্ন করা হবে, তা নিয়ে দীর্ঘসময় আলোচনা করেছি আমরা দু’জনেই। তোমার আকস্মিক চলে যাওয়া সেই স্মৃতিকে হঠাৎ জাগিয়ে তুলেছে। মৃত্যু বোধহয় এমন‌ই। জীবনকে নিঃশেষ করে নিষ্কম্প স্মৃতিকে এভাবেই জাগ্রত করে দিয়ে যায়। সেই দহন-তাপে মন পুড়ে যায়, অসহায় হয়ে।

তোমাকে নিয়ে লিখতে বসে কথা ফুরবে না। কিন্তু তবু হাতের অবাধ্য কলমকে থামাতে হয়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও। তোমার সঙ্গে আমার শেষ-স্মৃতি এ-লেখায় সমাপ্তিচিহ্ন হোক তবে।

রাজ্যজুড়ে এখন ভোটের আবহ। এস‌আইআর-সহ নানা কাণ্ডকারখানায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ তোমাকে কষ্ট দিয়েছে। সেই উদ্বেগ তোমার সঙ্গে ফোনে আড্ডায় টের পেয়েছি। শেষ শুটিংয়ে যাওয়ার আগে কথা দিয়েছিলে, নির্বাচনে ভোটপর্ব নিয়ে ‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ লিখবে। বলেছিলে, সোমবার লেখা পাঠাবে।

সেই লেখা আর আসেনি।

জানি, আর আসবে না।

তবু অপেক্ষা। রাহুলদা, তোমার জন্য।

………… পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য পর্ব …………

পর্ব ৩৪: গম্ভীর যে পৃথিবীকে জয় করলেন গৌতম

পর্ব ৩৩: জাস্টিস ডিলেইড, জাস্টিস ডিনাইড

পর্ব ৩২: অমরত্বের দাবি রাখে যে শেষ তারা

পর্ব ৩১: বিরোধিতার সহজপাঠ

পর্ব ৩০: পুরনো-নতুনের কথোপকথন

পর্ব ২৯: পয়সা দিলে ‘ঈশ্বর’ও বিক্রি আছে

পর্ব ২৮: ব্রিগেডে গরিব মার খেলে কলকাতার এখনও শ্বাসকষ্ট হয়

পর্ব ২৭: রিলের পুজোয় রিয়েল পুজোর গন্ধ নেই!

পর্ব ২৬: আমার মূর্তির অনতিদূরে যদি রমার একটা মূর্তি করা যায়

পর্ব ২৫: তাহলে কি রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলাদেশি’ ভাষায় ‘সোনার বাংলা’, আর বাংলায় ‘জনগণমন’ লিখেছিলেন?

পর্ব ২৪: বর্ষাকাল মানেই বাঙালির কনফিউশনের বন্যা!

পর্ব ২৩: ও ক্যাপ্টেন! মাই ক্যাপ্টেন!

পর্ব ২২: শচীন-বিরাটরা আসেন-যান, ভারত থেকে যায়

পর্ব ২১: কিং কোহলি দেখালেন, ধৈর্যের ফল বিরাট হয়

পর্ব ২০: মনকে শক্ত করো টেস্ট, রাজা আর ফিরবেন না

পর্ব ১৯: মুকুল কিংবা ফিলিস্তিনি বালক, খুঁজে চলেছে যে যার ঘর

পর্ব ১৮: ধোনিবাদ: ধাঁধার চেয়েও জটিল তুমি…

পর্ব ১৭: সাদা সাদা কালা কালা

পর্ব ১৬: গতবারের বিক্রি প্রতিবারই ছাপিয়ে যায় বইমেলা, কারণ দামবৃদ্ধি না পাঠকবৃদ্ধি?

পর্ব ১৫: সেন ‘মায়েস্ত্রো’কে ভুলে বাঙালি দেখিয়েছে, সে আজও আত্মবিস্মৃত

পর্ব ১৪: শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসই বাঙালির প্রকৃত সান্তা

পর্ব ১৩: প্রবাসে, দোতলা বাসে, কলকাতা ফিরে আসে

পর্ব ১২: না-দেখা সেই একটি শিশিরবিন্দু

পর্ব ১১: ঘোর শত্রুর বিদায়বেলায় এভাবে বলতে আছে রজার ফেডেরার?

পর্ব ১০: অভিধানের যে শব্দটা সবচেয়ে বেশি মনুষ্যরূপ ধারণ করেছে

পর্ব ৯: জোট-অঙ্কে ভোট-রঙ্গ

পর্ব ৮: দক্ষিণ বিসর্জন জানে, উত্তর জানে বিসর্জন শেষের আগমনী

পর্ব ৭: পুজো এলেই ‘সর্বজনীন’ নতুবা নিঃসঙ্গ?

পর্ব ৬: এক্সক্লুসিভের খোয়াব, এক্সক্লুসিভের রোয়াব

পর্ব ৫: শাসন-সোহাগের দ্বন্দ্বসমাস

পর্ব ৪: পাঁকাল সাধনায় নাকাল

পর্ব ৩: দেখা ও না-দেখার সিদ্ধান্ত

পর্ব ২: মহাবিশ্বে যে টোকে না, সে বোধহয় টেকেও না

পর্ব ১: অফিসে দৈবের বশে প্রেমতারা যদি খসে

Accident Death Memory Rahul Arunoday Banerjee Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on