


আবুল বাশারের ওই গল্পের প্রথম বাক্যটি পড়েই আমার মনে আসে স্টেশনে দেখা ওই বাইরের দিক থেকে বিকট লোকটিকে। সে বলছিল, ‘সইঝ্য করতে পারে না, আমারে সইঝ্য করতে পারে না।’ দোকানি বলে উঠেছিল, ‘কে? উত্তর এল, ‘আমার বউ।’ ‘কেন?’ ‘নরহিংসা, বুঝস না, নরহিংসাহ!’ এইরকম চেহারার কোনও লোককে আমি রঙ্গমঞ্চে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।
প্রচ্ছদ: দীপঙ্কর ভৌমিক
৪.
একটি লোক। বিকট, বীভৎস একটা মাথা। শরীরের তুলনায় বড়। একে দেখেছি আমার ২৪-২৮ বছর বয়সের মধ্যে। রানাঘাট স্টেশনে গভীর রাতে চা খেতে আসত। রাত একটা-দেড়টা নাগাদ আমিও যেতাম স্টেশনে। তখন আর কোনও ট্রেন যাবে বা আসবে না। তার গায়ে কখনও থাকত স্যান্ডো গেঞ্জি। কখনও খালি গা। একটা খাকি হাফপ্যান্ট, ঢলঢল করছে হাঁটুর কাছে। বুকটা পাটাতনের মতো। একে দেখার দু’-তিন বছর পরে, ১৯৮৪ সালে, ‘এক্ষণ’ পত্রিকায় আবুল বাশারের একটি গল্প বেরিয়েছিল। নাম: সিমার। গল্পের প্রথম বাক্য: ‘খোসবাসের বুকে একটিও লোম নাই।’ হাসান হোসেনকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল? কথিত রয়েছে, তাদের একজনকে উল্টো করে ঝুলিয়ে পিঠে প্রবল চাপড় মেরে মেরে হত্যা করা হয়। যে-হত্যা করেছিল, তার নাম সিমার। তারপর থেকে এই ধরনের নিষ্ঠুর ঘাতকশ্রেণির লোককে বলা হত ‘সিমার’।

আমার যখন রানাঘাট স্টেশনে ওই লোকটিকে দেখি, দেখি, তার ওই পাটাতনের মতো বুকে ‘একটিও লোম নেই’। জানেন, আমি যখন কোনও গদ্য পড়ি, তার প্রথম বাক্য আমাকে আকর্ষণ করে নিয়ে যায় পরের বাক্যের দিকে। এভাবে প্যারাগ্রাফ। প্যারাগ্রাফের পর প্যারাগ্রাফ। শেষে অধ্যায়। অধ্যায়ের পর অধ্যায় যোগ করে পুরো গল্প বা উপন্যাস।
আবুল বাশারের ওই গল্পের প্রথম বাক্যটি পড়েই আমার মনে আসে স্টেশনে দেখা ওই বাইরের দিক থেকে বিকট লোকটিকে। সে বলছিল, ‘সইঝ্য করতে পারে না, আমারে সইঝ্য করতে পারে না।’ দোকানি বলে উঠেছিল, ‘কে? উত্তর এল, ‘আমার বউ।’ ‘কেন?’ ‘নরহিংসা, বুঝস না, নরহিংসাহ!’ এইরকম চেহারার কোনও লোককে আমি রঙ্গমঞ্চে দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। কিন্তু ওই যে, সেদিনের আড্ডায় আমার একটি কথায় আপনি বলে উঠলেন না গ্লোব থিয়েটারে বসে, আপনার দেখা নাটকের সংলাপ… পৃথিবীটাই একটা রঙ্গমঞ্চ…
হ্যাঁ, জয়দা, ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’-এ…
হ্যাঁ। তেমনই সেদিন রঙ্গমঞ্চ হয়ে গিয়েছিল রানাঘাট স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম। প্রধান চরিত্র ওই লোকটি। কথা বলছিল চা-দোকানির সঙ্গে। চা পুরো শেষ করল না। রেললাইনের ওপরে গেলাসটা আছড়ে ফেলল। ঝন ঝন শব্দে ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
‘তুই এটা ভাঙলি? এর দাম কে দেবে?’
‘দাম কে দেবে আমি জানিনে কো।’
চোখ দুটো ভাঁটার মতো জ্বলছে। হিসহিসে গলায় সে আবার বলল, ‘নরহিংসা! নরহিংসাহ…!’
এই জায়গাটা কিন্তু আমার কাছে নাটকের মতো অথবা নাটকের চেয়ে বেশি একটা ধাক্কা দেওয়ার জায়গা…
আমার মনে পড়ে, তখন আমার মা মারা গিয়েছে। আমি সারাদিনে ছ’টা সিগারেট খেতাম। একটা সিগারেটের দাম ১৬ পয়সা। আমার কাছে তখন পয়সা কোথায়! পাড়ার দোকান থেকে ছ’টা সিগারেট এনেছিলাম, ধারে। রাত সাড়ে দশটা। বাইরে বারান্দায় বসে একটা সিগারেট ধরিয়েছি। বারান্দার নিচে ঝোপঝাড়। ভাই ঢুকেছে। আমি ভাইকে বললাম, ‘দোকানে একটা টাকা দিয়ে দিস ভাই।’ ভাই বলল, ‘সারাদিনে বাজার ঘুরে একটা টাকা রোজগার করে আনতে পারবি? এক টাকা ধার রেখে এলি বাজারে?’ বলে, চলে গেল। ভাবছি, ‘বাজার’ কথাটা দু’বার বলল। তখনও জানি না, কয়েক বছরের মধ্যেই আমার কবিতা নিয়ে লেখার বাজারে ঢুকে পড়ব।
আমি বসে আছি। একা। নিশ্চুপ। হাতে সিগারেটটা চুপচাপ জ্বলছে। টান দিতে পারছি না আর। ফেলে দিলাম। নিচে। ঝোপঝাড়ে, জ্বলছে। প্যাকেটে তখনও পাঁচটা সিগারেট। স্পর্শ করিনি আর।

তারপর থেকে আজ পর্যন্ত এত বছর সিগারেট ছুঁইনি।
(চুপ করে থাকি দু’জনে। আমি আর জয়দা। তারপর জয়দা বলতে থাকেন…)
‘সিরাজৌদোল্লা’ নাটকের অভিনয় দেখতে গিয়েছি। রানাঘাটে। যে-নাটক রেকর্ডে পাওয়া যায়, সেটা নয়। সিরাজকে নিয়ে অনেক রকম যাত্রা ও থিয়েটার হয়েছিল। এটা তারই মধ্যে একটি।
সিরাজকে হত্যা করার দৃশ্য। মহম্মদী বেগ, যাঁকে বালক অবস্থায় তাঁর বাবার সঙ্গে আলীবর্দী খাঁ আশ্রয় দিয়েছিলেন এই প্রাসাদে।
আজ সিরাজের কাছে এসেছে, সিরাজকে হত্যা করতে।
সিরাজ তাঁকে বলছেন, ‘তুমি এসেছ?’
‘হ্যাঁ, জাঁহাপনা। আমার ওপরেই এই কাজের ভার পড়েছে। আপনার অনুমতি ছাড়া আমি তো এ-কাজ করতে পারি না।…’
শান্তভাবে সিরাজ বলছেন, ‘বেশ, আমি বুক পেতে দিচ্ছি। তুমি তোমার কাজ করো।’
মহম্মদী বেগের চরিত্রে, চেহারায়, আচমকা একটা পরিবর্তন ঘটে। সে ছুরিটা বের করল। তার চোখগুলি ভাঁটার মতো হয়ে যায়। সে একবার মারল। সিরাজ ছিটকে পড়েছেন। তারপর আরেকবার মারল। পিঠে মারল। তারপর রক্তমাখা ছুরিটা মুছতে মুছতে মঞ্চ থেকে বের হয়ে যাওয়ার আগে মাথাটা ঘুরিয়ে একবার তাকাল দর্শকের দিকে। রানাঘাট স্টেশনের রাত্রের ওই বিকটমাথা লোকটার চোখ যেন তার চোখে। এই নাটকে মহম্মদী বেগের ওই একবারই প্রবেশ আর প্রস্থান।
আমি পরবর্তী সময়ে দেখেছি, আমার জীবনে কেউ প্রবেশ করছেন। তখন তারা অত্যন্ত নম্র। যেন দুয়ারে অনুমতি চেয়ে আসছেন। কিছুদিন পরে, ওই মহম্মদী বেগের মতো, ছুরি মারছেন আমায়। সেই ছুরি মারার জন্য তাঁরা এক মুহূর্ত অপেক্ষা করছেন না! আমায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে চলে যাচ্ছেন।
‘এমনিতে বেশ দিব্যি ভালো,
সৌজন্যেও কমতি নেই
তেমন তেমন সময় এলেই
দাঁতনখ সব বেরিয়ে আসে…’
শঙ্খ ঘোষ। ‘ধুম লেগেছে হৃদকমলে’ বইয়ের। মনে পড়ে?
জয়দা, আমার ‘চার অধ্যায়’ মনে আসছে। ‘বহুরূপী’র শ্রুতি অভিনয় শুনেছি। ‘সন্দেহজীবী’ শব্দটির উচ্চারণ মনে পড়ছে। জয়দা, অতীন্দ্র যখন এলাকে খুন করে, কেমন ছিল মঞ্চের ছবি?
প্রায় অন্ধকার হয়ে আসে। ‘এই চুম্বন অফুরান হোক’– এইরকম একটা সংলাপ ছিল না? আমার ব্রাউনিং মনে আসে শৈবাল। ‘পরফাইরিয়াস লাভার’ কবিতা। মনে পড়ে সমরেশ বসুর ‘বিবর’। নীতাকে কীভাবে খুন করা হল। তখন আমি ‘চার অধ্যায়’ দেখার আগেই বিবর পড়েছিলাম। তখন বিবর-বিতর্ক তুঙ্গে। ফলে আমাকে একাধিকবার পড়তে হয়েছিল। বহুরূপী-র ‘চার অধ্যায়’ নাটকে ওই দৃশ্যে মঞ্চে ধীরে ধীরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। অন্ধকারে গুলির শব্দ শোনা যায়…

আর ‘রক্তকরবী’? রাজা যখন নন্দিনীকে বলে কিশোরকে সে হত্যা করেছে? রঞ্জনের দেহ কি দেখা যায় মঞ্চে? আপনি তো ‘বহুরূপী’র ‘রক্তকরবী’-র অভিনয় তিনবার দেখেছেন? কেমন ছিল সেই দৃশ্য…
একটি শায়িত দেহ ও তার মাথার আভাস দেখতে পাই। অনেক পরে, দেবতোষ ঘোষ আমায় বলেছিলেন, ওখানে কুমার রায় শুয়ে থাকতেন। একটু আগেই মঞ্চে কুমার রায় এসেছেন গোঁসাইয়ের রূপসজ্জা নিয়ে। এখানে তাঁর গোঁসাইয়ের রূপসজ্জাকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলতে হয়েছে।
আর জয়দা, তৃপ্তি মিত্র বলতেন, রাজা! ও জাগে না কেন!
কী আকুল সেই স্বর!
(‘রঞ্জন বেঁচে উঠবে, সে কখনও মরতে পারে না…’)
শৈবাল, আপনি রাজনৈতিক হিংস্রতা বিষয়ক নাটকের কথা বললেন। ‘বহুরূপী’-র ‘রক্তকরবী’ বা ‘চার অধ্যায়’ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। আমি এমন একটা অভিনয়ের কথা বলব, যেটি নিয়ে আলোচনা হয়নি তেমন। আমার মনে পড়ছে, ইউরিপিডিসের ‘ট্রোজান উওম্যান’ নাটকের কথা। এককালে ‘থিয়েট্রন’ নাট্যগোষ্ঠীর সলিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশনায় এটি মঞ্চস্থ হয়। ঠিক তার আগের বছর আমেরিকায় টুইন-টাওয়ার ভেঙে পড়ে। প্রায় ৪২ হাজার মানুষ মারা যান। আমি তখন আইওয়ায়। টিভি-তে দেখা যাচ্ছে পরপর দুটো টাওয়ার যখন ভেঙে পড়ছে, তখন তার বিরাট আওয়াজ আর চারপাশ থেকে পালিয়ে যাওয়া লোকজনের চিৎকার। আর ধোঁয়া। তার পরের বছর মার্চ মাসে গুজরাতে বিপুল হিংসার ঘটনা ঘটে। নির্বিচারে ধর্ষণ হয়। ধ্বংস হয় দেবালয়, ট্রয়ে যেমন হয়েছিল। সলিল বন্দ্যোপাধ্যায় ‘ট্রোজান উওম্যান’ নাটকে নিয়ে আসেন নরহিংসার ছবি।

মেয়েরা আছড়ে পড়ছে মঞ্চের পাটাতনে। ধর্ষিতা মেয়েরা। নেপথ্যে একটা প্রবল শব্দ শোনা যায়। যেন কোনও বিরাটকার স্থাপত্য ভেঙে পড়ার শব্দ। দর্শক আঁতকে ওঠেন সেই শব্দে। এই নাটকের বেশি অভিনয় হয়নি। আলোচনাও হয়নি তেমন। ইউরিপিডিস (৪৮৪-৪০৬ খ্রীস্টপূর্ব) সেই কবে লিখেছিলেন এই নাটক! তার কত শতাব্দী পরে, ৯/১১ আর গুজরাত হিংসা। ২০০১ ও ২০০২। আজও এই নাটকটির সত্য দাউদাউ করে জ্বলছে।
…জয়ের সঙ্গে একক অন্যান্য পর্ব…
প্রথম পর্ব: সদ্যবৈধব্য চিনতে আমার কখনও ভুল হয়নি
দ্বিতীয় পর্ব: জটলার মাঝে করতালি
তৃতীয় পর্ব: কোথায় এমন ধূম্র পাহাড়?
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved