Robbar

দূরত্ব বাড়ে-কমে, যোগাযোগ নিভে যায়

Published by: Robbar Digital
  • Posted:August 14, 2026 5:00 pm
  • Updated:August 14, 2026 5:02 pm  

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা ভার্চুয়াল জগৎ কি পারে নাড়ির টানের বিকল্প হতে? বিশেষ করে যে নাড়ির যোগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক। কর্মব্যস্ত দুনিয়ায় বিদেশ-বিভুঁই অথবা প্রবাসে থাকা সন্তানদের জন্মদাতা-দাত্রীর সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভবপর হয় না। হয় না বলেই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম সেই দূরত্ব মুছিয়ে দেওয়ার অনুঘটক হয়। কিন্তু যেখানে যোগাযোগ নয়, প্রশ্ন মৃত্যুর মতো বিয়োগযন্ত্রণা, সেখানে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম কি শেষকৃত্যের মতো কর্তব্য পালনের যোগ্য মাধ্যম হতে পারে?

অরিঞ্জয় বোস

৩৬.

সম্পর্কের একক কী? দূরত্ব?

কত কাছে, কত দূরে– তাই দিয়ে তো আমাদের জগৎ-সংসারে নিত্যদিনের হিসাব। নতুবা জীবনের চলার পথে, আঁকে-বাঁকে, দূরত্ব কেন ফ্যাক্টর হবে! বড় প্রেম তো শুধু কাছে টানে না, দূরে‌ও ঠেলে। সেই দূরত্বে ব্যবধান যত‌ই যোজন-বিস্তৃত হোক, মানসিক টান ঠিক রয়ে যায়। তবে প্রেম বললে শুধু লায়লা-মজনু, হির-রাঞ্ঝনাকে সাক্ষীগোপাল করে বসলে ভুল হবে। সম্পর্ক তো মানুষ-প্রকৃতি, জীব-জড়, পোষ্য-পালক, শত্রু-মিত্রে‌ও হয়। বাবা-মা? অভিভাবকের সঙ্গে অপত্যের নিবিড়তায় কি থাকে না সম্পর্কের জোয়ার-ভাঁটা? মন সেখানে লাইটহাউস। হৃদয়ের চার-দেওয়ালের মধ্যে অনুভব নামের সাঁঝবাতি নিভলে সম্পর্কের শিকড়গুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।

বাবার সঙ্গে লিও মেসি

সদ্য পিতৃহারা হয়েছেন লিওনেল মেসি। খ্যাতি, বিত্ত, সাফল্যের শিখরে থাকতে থাকতে আচমকা হারিয়ে ফেলেছেন সেই মানুষটিকে, যিনি একদা হাতে হাত রেখে পথ দেখিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার। জীবনস্রোতে তাই জর্জে মেসির এই চিরবিদায় বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফুটবলারের পক্ষেও মেনে নেওয়া কঠিন। এই শূন্যতা অতলান্ত, বিচ্ছেদ-ব্যবধান অনাদি। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে সম্প্রতি সোশাল মিডিয়ায় নিজের শোকের কথা অনুরাগীদের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন এল‌এম-টেন। সেই শোকবার্তায় স্পষ্ট হয়েছে, মৃত্যু নামক অলঙ্ঘনীয় দূরত্বের সামনে মেসির প্রয়াত বাবাকে ঘিরে হাহাকার। যে বাবা ছিলেন তাঁর সন্তানের সুখদুঃখের সাথী, সাফল্য-ব্যর্থতার নীরব অথচ উজ্জ্বল সাক্ষী।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ জিততে পারেননি মেসি। মনপ্রাণ দিয়ে চেয়েছিলেন বিশ্বকাপ জিতে রোজারিও ফিরতে। অসুস্থ বাবাকে আর‌ও একটা বিশ্বকাপ উপহার দিতে। রোগে জীর্ণ জর্জে মেসির জন্য হয়তো সেটাই হত বিশল্যকরণী। তা হয়নি। ফাইনালে নিজের নিষ্প্রভতাকে কষ্ট হলেও মেনে নিয়েছেন মেসি। যেমন মেনে নিয়েছেন, বাবাকে আর কোন‌ওদিন কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণা। কোন‌ওদিন আর যে দেখা হবে না, গল্পের প্রহর ভরে উঠবে না ফুটবলের আলোচনায়, সেই আক্ষেপ।

বিচ্ছেদ নামক এই দূরত্বে মেসি কোথাও যেন সমীপবর্তী হয়ে ওঠেন আমাদের চিরপরিচিত এক তারকার।

ব্রিস্টলে সেঞ্চুরির পর সদ্যপ্রয়াত বাবাকে স্মরণ

ব্রিস্টলের সেই মেঘলা দিনে, সেঞ্চুরির পর আকাশপানে তাকিয়ে, প্রয়াত-পিতাকে খুঁজতে চেয়েছিলেন শচীন রমেশ তেণ্ডুলকর। ২২ গজের জয়-পরাজয়, কীর্তির পাহাড় টপকে অনেক বেশি মূর্ত হয়ে উঠেছিল এক পিতৃহারা সন্তানের যন্ত্রণা, মাথার ওপর ছাদ হারানো এক রক্তমাংসের চির ব্যাকুলতা।

তবে মৃত্যু অনেকসময় দূরত্বের ব্যবধান মুছিয়ে দেয়। হারিয়ে দেয় বৈরিতার পৃথিবীকে। সাফল্য-ব্যর্থতা, প্রাপ্তি-প্রতিহিংসার ইঁদুরদৌড়ে মৃত্যুর শীতলতা দাঁড়ি টানে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। দুঃসময়ে মেসিকে বার্তা পাঠিয়ে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগুনে জল ঢেলে দিয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো। বুঝিয়ে দিয়েছেন, কঠিন সময় মানুষ চেনায়। চেনায় তার অন্তরাত্মাকে। মাঠের দ্বৈরথ সেখানে গো-হারা হেরে গিয়েছে অন্তরের মহানুভবতার কাছে।

ইনস্টাগ্রামে মেসির পিতৃবিয়োগের শোকে সমব্যথী রোনাল্ডোর কমেন্ট

এসব চেনা, আবেগঘন দুনিয়ায় পাশে একটা বৈপরীত্যের পৃথিবীও আছে। সেই বিপরীতের দুনিয়া আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, মানবিকতা এ-বিশ্ব মাঝে কতটা বেমানান! দূরত্ব বাড়তে বাড়তে এমন সীমান্তে পৌঁছয় যেখানে ভেঙে পড়ে জনক-সন্তানের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। সম্প্রতি হরিয়ানার সোনিপতের একটি ঘটনা সেই রূঢ় বাস্তবতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। কাঠগড়ায় তুলে দিয়েছে পারিবারিক মূল্যবোধ, মানুষের সামাজিক দায়বদ্ধতাকে। কী ঘটেছিল সোনিপতে? সেখানকার এক বৃদ্ধাশ্রমে দেহ রেখেছেন এক বৃদ্ধ। সেই বৃদ্ধ-পিতার অন্ত্যেষ্টিতে আসার প্রয়োজন অনুভব করেননি মৃতের তিন কন্যাসন্তান। বরং ভিডিও কলে যোগ দিয়েই বাবার শেষকৃত্য সেরেছেন তাঁরা। ভিডিওটি ভাইরাল হ‌ওয়ার পর সমালোচনার মুখে পড়তে হয় মৃতের তিন সন্তানকেই।

উচিত-অনুচিতের প্রশ্নে সোশাল মিডিয়ায় বিচারসভা বসানো নতুন কিছু নয়। তার ভালোমন্দ– দু’দিক‌ই রয়েছে। কিন্তু তা ছাপিয়ে মাথাচাড়া দেয় মূল্যবোধ ও বিবেকের প্রশ্ন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা ভার্চুয়াল জগৎ কি পারে নাড়ির টানের বিকল্প হতে? বিশেষ করে যে নাড়ির যোগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক। কর্মব্যস্ত দুনিয়ায় বিদেশ-বিভুঁই অথবা প্রবাসে থাকা সন্তানদের জন্মদাতা-দাত্রীর সান্নিধ্য পাওয়া সম্ভবপর হয় না। হয় না বলেই ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম সেই দূরত্ব মুছিয়ে দেওয়ার অনুঘটক হয়। কিন্তু যেখানে যোগাযোগ নয়, প্রশ্ন মৃত্যুর মতো বিয়োগযন্ত্রণা, সেখানে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম কি শেষকৃত্যের মতো কর্তব্য পালনের যোগ্য মাধ্যম হতে পারে? বরং তা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ক্ষতকেই স্পষ্ট করে তোলে। প্রমাণ করে দেয়, ডিসটেন্স মেইনেন্টিং আসলে সেই অগস্ত্যযাত্রা, যা থেকে ফেরার উপায় নেই বর্তমান সমাজের। উল্টে ঘুণপোকার মতোই তা ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে আমাদের মূল্যবোধ, পারিবারিক শিক্ষার ভিত্তিস্তম্ভকে।

বাবার শেষকৃত্য ভিডিও কলে দেখছেন কন্যা

ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডে কিংবা ব‌ইয়ের পাতায় তাই যত‌ই লেখা থাক, দূরত্ব আসলে স্কেলার রাশি, যার মান আছে, নির্দিষ্ট দিক নেই। বাস্তব ছবিতে ধরা থাকবে অপরাপর সংজ্ঞা– দূরত্ব আসলে বুঝি, মানহীন, বেআব্রু। যার নির্দিষ্ট দিক আছে, অধঃপতনের অভিমুখে।

………………….

রোববার.ইন-এ পড়ুন ওপেন সিক্রেট-এর অন্যান্য লেখা

………………….