


কাগজপত্র নিয়ে বিনোদবিহারী যখন নতুন ছবির পরিকল্পনা করছেন, তখন নন্দলাল তাঁর সামনে এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমার সেই লম্বা ছবিটা কোথায় গেল?’ বিনোদ তখন বোর্ডের নিচ থেকে সসম্ভ্রমে ছবির টুকরোগুলো বের করে টেবিলের ওপরে রাখলেন। বিস্মিত নন্দলাল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন—‘ছবি কাটলে কেন?’
৯.
সেই যে প্রিয়তম শিষ্য নন্দলালকে কোল থেকে ছিনিয়ে আনলেন রবীন্দ্রনাথ, তার বেদনা অবনের মনের মধ্যে জেগে রইল দীর্ঘকাল। পাকাপাকিভাবে নন্দলাল কলাভবনে যোগ দেওয়ার কিছুদিন পরে অবনীন্দ্রনাথ দেখতে এলেন তাঁর ‘রবিকা’র বিশ্বভারতী। বিশেষ করে তাঁর আকর্ষণ কলাভবনকে ঘিরে– যেখানে রয়েছেন তাঁর প্রধান শিষ্যেরা। রয়েছেন নন্দলাল, অসিতকুমার আর সুরেন কর। অবনের শান্তিনিকেতনে আসার খবরে রবিকাকা অসম্ভব উৎসাহী। রবীন্দ্রনাথের কলাভবন যেন পরিদর্শক অবনের সামনে একপ্রকার পরীক্ষা দেওয়ার সামিল। শিল্পকলার ব্যাপারে অবনের মতামত ‘রবিকা’র কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আশ্রমে তখন সাজো সাজো রব। অবশেষে ১৯২৩ সালে জানুয়ারি মাসের শেষদিকে শান্তিনিকেতনে এলেন অবনীন্দ্রনাথ। এ তো কেবল আসা নয়, এ হচ্ছে আবির্ভাব! অবনের আগমন উপলক্ষে আম্রকুঞ্জের বেদী ও তার সামনের প্রাঙ্গণ আলপনা দিয়ে সাজানো হল। সংস্কৃত মন্ত্রপাঠ ও গানের পরে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে মালাচন্দনে ভূষিত করলেন। আচার্যের ভাষণে রবীন্দ্রনাথ জানালেন কেন তিনি বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করেছেন। শোনালেন, ছোটবেলা থেকে তিনি কীভাবে পণ্ডিতদের হাত এড়িয়ে বাণীর নিকুঞ্জে এসে মালাকরের জায়গা নিয়েছেন– তার গল্প। সেই সঙ্গে অবনের কাছে অনুরোধ জানিয়ে রাখলেন, তাঁর অবর্তমানে অবনীন্দ্রনাথ যেন বিশ্বভারতীর আচার্যের আসন গ্রহণ করেন। রবিকাকার আদেশ অবনত মস্তকে স্বীকার করলেন অবনীন্দ্রনাথ। বললেন, তাঁর সেই প্রথম শান্তিনিকেতনে আসার কথা। বললেন, সেদিন এখানে পেট ভরানোর খাদ্য পেয়েছিলেন, আর আজ পেলেন মন ভরানোর অন্ন।

আরও বললেন, বিগত ৪০ বছর ধরে তিনি শিল্পের সাধনা করে চলেছেন। তাঁর অধিকাংশ সময়ই কেটেছে শিক্ষকতার কাজে। এবারে আগামী পাঁচ বছর সেই শিক্ষকের ভূমিকা থেকে অবসর নিয়ে পুনরায় তিনি শিল্পলক্ষ্মীর সাধনায় নিমগ্ন হতে চান। হঠাৎ কেন এমন কথা বললেন অবনীন্দ্রনাথ? তাঁর মনের কন্দরে কি কোনও অভিমান লুকিয়ে ছিল? কীসের সেই অভিমান? তবে শিল্পের সমকালীন অবস্থা তাঁকে সন্তুষ্ট করতে পারছিল না? এমতাবস্থায় অবনীন্দ্রনাথ আগামী পাঁচ বছর চিত্রপ্রদর্শনী বন্ধ করে দিতে বললেন। আরও কঠিন স্বরে তাঁর প্রিয় শিষ্যদের কাছে গুরুদক্ষিণা চাইলেন তিনি। গুরুদক্ষিণা হিসেবে নন্দলাল, অসিত হালদার এবং সুরেন্দ্রনাথ করের কাছে দাবি করলেন ‘কুটীরশিল্পের জাগরণ’ ঘটানোর। সেই সঙ্গে বললেন– ‘আমাদের দেশের শিশুরা ছোটবেলায় এমন কোনও খেলনা পায় না, যার সাহায্যে তাদের শিশুচিত্ত অনায়াসে কল্পরাজ্যে বিচরণ করতে পারে। এই সমস্ত শিশুর হাতে সুন্দর সুন্দর খেলনা দিতে পারলে তবেই তাঁদের গুরুদক্ষিণা দেওয়া সার্থক হবে’। তাঁর মতে, শিশুকাল থেকেই নানারকম খেলনার সাহায্যে তাদের মনে শিল্পের অনুরাগ জাগিয়ে তুলতে হয়। ছোটবেলার সেই শিল্প-অনুভূতির মধ্যে দিয়ে সম্পূর্ণতা পায় পরিণত বয়সের শিল্পসাধনা।

পাশাপাশি কলাভবনের শিক্ষকদের প্রতি কয়েকটি সাবধানবাণী শুনিয়ে রাখলেন অবনীন্দ্রনাথ। বললেন, প্রত্যেক শিল্পী যেন ছবিতে নিজের আদর্শকে স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারে। ছাত্রেরা যেন তাদের অধ্যাপকদের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভর না করে– সেদিকটাও খেয়াল রাখা উচিত। স্পষ্ট ভাষায় জানালেন– ‘অন্যের আদর্শে ছবি আঁকতে গেলে প্রথমত, কিছুতেই তারা সে আদর্শকে সম্পূর্ণতা দিতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, তাদের নিজেদের যে বৈশিষ্ট্য ছিল তাও তারা হারিয়ে ফেলবে’। রীতিমতো জোরালো কণ্ঠে ঘোষণা করলেন– ‘প্রত্যেক শিল্পীই তার আর্টে এমন একটি জিনিস প্রকাশ করুক, যা কেবল তারই জিনিস, অন্যের কাছ থেকে ধার করা নয়’। আমাদের জানতে ইচ্ছে করে, শিল্পাচার্যের এই কঠিন নির্দেশে শিষ্যদের মনে কী প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছিল? বিশেষ করে নন্দলাল কী ভাবছিলেন? অবনীন্দ্রনাথের ভাষণ নন্দলালের মনকে যে তীব্রভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, সেকথা আমরা সহজেই অনুমান করে নিতে পারি। পরবর্তী পর্বে কলাভবনের ক্লাসে তিনি ছাত্রদের আরও স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ছাত্ররাও শিক্ষকদের উপরে সম্পূর্ণ নির্ভর না-করে নিজের মতো করে এগিয়ে চলতে সচেষ্ট হয়েছেন। এখানে একটা গল্প শোনা যেতে পারে। একটি ছাত্রের গল্প। সে ছাত্র আর কেউ নন, স্বয়ং বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। এ ঘটনা বিনোদবিহারীই জানিয়েছেন। তবে বিনোদের স্মৃতির টুকরোর দিকে তাকালে মনে হয়, গুরু নন্দলালের প্রতি তাঁর একরাশ অভিমান জমা হয়ে ছিল।

বিনোদ লিখেছেন– ‘নন্দলাল আমাকে মাদুর, ডেস্ক, জলের পাত্র ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করেননি, কিন্তু আশেপাশের সবাইকে তিনি দেখাতেন, কেবল আমি ছাড়া। দিন যায়, ছবি আঁকি, স্কেচ করি, বন্ধুদের দেখাই। আর্টস্কুলে পড়া অর্ধেন্দুপ্রসাদ ও হীরাচাঁদ দুগার বলেন, “বিনোদ, তোমার কোনও ভাবনা নেই ভাই, আমরা তোমার ছবি স্টিপলিং দিয়ে ফিনিশ করে দেব”। বন্ধুদের তুলনায় আনপড়, কাজেই যেমন ইচ্ছা আমি কাজ করি’। এই ঘটনায় আমাদের মনে হয়, শুধু ছবি আঁকা নয়, শারীরিকভাবে দুর্বল ও ক্ষীণদৃষ্টি বিনোদবিহারীর অন্তরের শক্তিতে উসকে দেওয়ার জন্যই হয়তো নন্দলাল এমনটা করতেন! সচেতনভাবেই দূর থেকে তাঁর কাজের দিকে লক্ষ রাখতেন, সহজে এগিয়ে আসতেন না। জীবনের সব কাজেই বিনোদবিহারী গভীরভাবে প্রত্যয়ী হয়ে উঠুক– এমনটা বুঝি চাইছিলেন নন্দলাল। যাই হোক, একদিন দুপুরবেলা নানান ছবি দেখতে দেখতে প্রখ্যাত জাপানি শিল্পী সেরায়ু-র আঁকা একটা স্ক্রোল বিনোদকে বিশেষ আকৃষ্ট করে। সেই ভালো-লাগা থেকে তিনি জাপানি স্ক্রোলের ধরনে একটি ছবি আঁকলেন। ছবির সাইজ এক বিঘত চওড়া আর চার-পাঁচ বিঘত লম্বা। ছবির বিষয় যেন শান্তিনিকেতনের শালবীথি। শালগাছের সারি সারি গুঁড়ি দেখা যাচ্ছে, আর সেই গুঁড়ি বেয়ে একদল কাঠবিড়ালি উঠছে, নামছে আর মাটিতে দৌড়চ্ছে।

বিনোদবিহারীর ছবি যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন ক্লাসের বন্ধুরা এসে বললে, ছবির কম্পোজিশনে না কি খুব বড় একটা ভুল হয়েছে। বললে, সেই লম্বাটে ছবি কেটে তিনটে টুকরো করলে তবে তা ঠিকঠাক হয়। এই বলে বিনোদের অনুমতিক্রমে তারা নিজেরাই ছবি কেটে টুকরো করে দিলে। বিনোদেরও মনে হল ছবিটা এতক্ষণে বেশ ভালো লাগছে। পরদিন আবার কাগজপত্র নিয়ে বিনোদবিহারী যখন নতুন ছবির পরিকল্পনা করছেন, তখন নন্দলাল তাঁর সামনে এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলেন ‘তোমার সেই লম্বা ছবিটা কোথায় গেল?’ বিনোদ তখন বোর্ডের নিচ থেকে সসম্ভ্রমে ছবির টুকরোগুলো বের করে টেবিলের ওপরে রাখলেন। বিস্মিত নন্দলাল তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন– ‘ছবি কাটলে কেন?’ বিনোদের উত্তর ‘কম্পোজিশন ভুল হয়েছে’। এবারে কঠিন স্বরে নন্দলালের প্রশ্ন– ‘কে বললে তোমার কম্পোজিশন ভুল হয়েছে?’ স্মৃতিকথায় বিনোদ জানিয়েছেন– ‘কণ্ঠস্বর কঠিন। আসল কথা আমায় খুলে বলতে হল। ছবির টুকরোগুলো তুলে নিয়ে (নন্দলাল) আমার পরামর্শদাতাদের অন্য ঘরে নিয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে তিনি ফিরে এসে তিনটুকরো ছবি আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এরপর থেকে ছবি আমাকে দেখাবে, অন্যের পরামর্শে চলবে না”। পরে জানলাম ছবি যে কম্পোজিশনে ভুল হয়নি, সে কথাই তিনি সতীর্থদের ভাল করে বুঝিয়েছেন’। অর্থাৎ অবনীন্দ্রনাথ যে শিল্পীর স্বাধীনতার দিকে নজর দিতে বলেছিলেন– বিনোদবিহারীর এই শালগাছের সারির ছবি তার অন্যতম উদাহরণ। শিক্ষকের পরামর্শ ছাড়া সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে বিনোদ সেই ছবিটি এঁকেছিলেন। ঘটনাটির মধ্যে দিয়ে শিক্ষক নন্দলালের আরেকটা চেহারাও ফুটে ওঠে। বিনোদের সামনে ক্লাসের অন্য ছাত্রদের বকুনি দিয়ে নন্দলাল তাদের বিব্রত বা অসম্মানের হাত থেকেও মুক্তি দিয়েছেন। এটাও শিক্ষণীয় বইকি।

এখন প্রশ্ন হল, অবনীন্দ্রনাথের সেই গুরুদক্ষিণা অনুসারে নন্দলাল কি কলাভবনের পাঠক্রমে নতুন কিছু সংযোজন করেছিলেন? শিল্পাচার্য তাঁর শিষ্যদের কাছে কুটিরশিল্প জাগরণের যে কথা বলেছেন, সে প্রসঙ্গে জানাই, তার কিছুকাল আগেই নন্দলাল ছাত্রীরূপে পেয়েছিলেন সুকুমারী দেবীকে– যাঁর হাত ধরে কলাভবনে কারুশিল্পের সূচনা হয়েছে। কালীমোহন ঘোষের পরিবার সূত্রে সুকুমারী দেবী শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন হেমলতা দেবীর সহযোগী হিসেবে। বাংলার আলপনা ও সূচিশিল্পে তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। সে-কথা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের কানে পৌঁছে যায়। গল্পটা এইরকম। দীনেন্দ্রনাথের জন্যে একটি শালের ওপরে সূচিশিল্পের অপূর্ব কাজ করেছিলেন সুকুমারী, তা রবীন্দ্রনাথের নজরে পড়লে তিনি নন্দলালকে নির্দেশ দেন কলাভবনে কারুশিল্পের শিক্ষিকা হিসেবে সুকুমারীকে যুক্ত করে নিতে। সেই বিচারে সুকুমারী দেবীই কলাভবনের প্রথম মহিলা শিক্ষিকা। কলাভবনে আলপনা ও সেলাই শেখানোর পাশাপাশি সুকুমারী অবশ্য নন্দলালের কাছে সাগ্রহে ছবি আঁকার পাঠও নিয়েছেন। অর্থাৎ একইসঙ্গে সুকুমারী দেবী কলাভবনের শিক্ষিকা এবং ছাত্রী। এইভাবেই সে যুগের কলাভবনে ফাইন আর্টের পাশাপাশি ক্রাফটও সমান ভাবে পা ফেলেছে।
……………………………………………………………………………………
পড়ুন গল্পকলা কলামের অন্যান্য পর্ব
……………………………………………………………………………………
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved