Remembering Anik Dutta: obituary by Sandip Ray | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সত্যজিতের অন্ধভক্ত বললেও কম বলা হয়

‘অপরাজিত’-এ চরিত্রগুলোর নাম অপরিবর্তিত রাখতে চেয়েছিল অনীক। আমি ওকে বলেছিলাম, অনেকেই তো জীবিত রয়েছেন, অনেকের ছেলেমেয়ে, পরিবার-পরিজন রয়েছেন, ফলে এখানে একটা ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ থেকেই যায়। ওর হয়তো সেটা মানতে একটু কষ্টই হয়েছিল। কিন্তু সিনেমাটা রিলিজ হওয়ার পরে ও আমাকে ফোন করে, তখন বলেছিল, ‘বাবুদা, ভাগ্যিস আপনার পরামর্শটা তখন শুনেছিলাম! নয়তো অনেক সমস্যায় পড়তে হত।’

প্রচ্ছদের আলোকচিত্র: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: মে ২৮, ২০২৬, ১৩:৪২   
Facebook WhatsApp Messenger

অনীকের গোড়ার দিকে বিজ্ঞাপনগুলো দেখার সুযোগ হয়েছিল। ওর অ্যাড-ফিল্মগুলো আমার বেজায় ভালো লাগত। ওর সঙ্গে আলাপ যদিও অনেক আগে থেকেই, অন্তরঙ্গতা বাড়ে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ দেখার পর। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এ ও মাত করে দিয়েছিল সবাইকে! তারপরে তো বেশ কিছু ছবি পরপর অনীক করে। যখন ও সিদ্ধান্ত নিল ‘অপরাজিত’ করবে, তখন ও আমার কাছে এসেছিল। সেইসময় ওর সঙ্গে বিস্তারিত কথা হয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, অনীক সিনেমার বাইরেও যোগাযোগটা রাখত। ‘অপরাজিত’ করার সময় ও খুব ডিটেইলসে আলোচনা করেছিল যে, কীভাবে সিনেমাটা করা যায়, বিশেষত ক্রাফটের নানা খুঁটিনাটি নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। আমি এককথায় ওকে সম্মতি দিয়েছিলাম। কারণ, আমি জানতাম, বাবার ক্ষেত্রে অনীক অন্ধর চেয়েও বেশি ভক্ত। আমার বিশ্বাস ছিল, ও সিনেমাটা করলে সেটা খুবই সম্মানজনক ভাবে করবে। ও ভীষণ ভাবে চেয়েছিল, ‘অপরাজিত’-এ চরিত্রগুলোর নাম যাতে অপরিবর্তিত রাখা যায়। আমার মনে একটাই সংশয় ছিল। সেটা ওকে বলেও ছিলাম যে, অনেকেই তো জীবিত রয়েছেন, অনেকের ছেলেমেয়ে, পরিবার-পরিজন রয়েছেন, ফলে এখানে একটা ‘রিস্ক ফ্যাক্টর’ থেকেই যায়। ওর হয়তো সেটা মানতে একটু কষ্টই হয়েছিল। আমি সেটা বুঝতেও পেরেছিলাম। কিন্তু সিনেমাটা রিলিজ হওয়ার পরে ও আমাকে ফোন করে, তখন বলেছিল, ‘বাবুদা, ভাগ্যিস আপনার পরামর্শটা তখন শুনেছিলাম! নয়তো অনেক সমস্যায় পড়তে হত।’

zoom
‘অপরাজিত’ চিত্রনাট্য প্রকাশের দিন বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে

শুধু ‘অপরাজিত’ নয়, ওর সঙ্গে তারপরেও যোগাযোগ তো ছিলই। তাছাড়া বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা-সাক্ষাৎ হত। নানা কথায় বুঝতে পারতাম, ওর শরীরটাও ভালো যাচ্ছিল না! শ্বাসকষ্টজনিত একটা সমস্যা তো ওর ছিলই। সে কারণে নানা চিকিৎসাও চলছিল ওর। কিন্তু তাই বলে এমন হুট করে চলে যাবে, তাও এভাবে, সেটা কল্পনাও করিনি! ফলে এমন একটা মর্মান্তিক খবর, এটা এতই আকস্মিক আমার কাছে, বলে বোঝাতে পারব না। দিনকয়েক আগেও আমার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল অনীকের। আমার কাছে আসবে, দেখা করবে, এমনটাই বলেছিল। কী কথা, ফোনে কি বলা যায়? জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, ‘না, না। সামনাসামনি গিয়ে কথা বলব।’ দুর্ভাগ্য, সেই বসাটাও হল না, কী কথা যে ওর বলার ছিল, সেটাও আর জানার কোনও উপায় রইল না।

zoom
অনীক দত্ত, জিতু কামাল ও সন্দীপ রায়

পরিচালক-সত্তার বাইরে ওর একটা স্পষ্টবাদী ভাবমূর্তি ছিল, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। সিনেমার ক্ষেত্রে ও ভীষণ ভীষণ সিরিয়াস একজন পরিচালক ছিল। এবং একইসঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত। সেই হিউমার এবং রসবোধে ও দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল বরাবর। পাশাপাশি এন্টারটেনিং। সব ছবির মধ্যে ‘অপরাজিত’ একেবারেই অন্য ঘরানার। অন্যান্য ছবির ক্ষেত্রেও সেই মেজাজ বজায় ছিল পুরোমাত্রায়। লেখালেখির হাতও ছিল চমৎকার। আরেকটা সংযোগের কথাও বলতেই হয়, আমরা দু’জনেই একই স্কুল, পাঠভবনের ছাত্র। সবদিক থেকেই একজন ‘গিফ্টেড’ ক্রিয়েটিভ শিল্পীকে আমরা হারালাম।

zoom
সত্যজিৎ রায়ের স্টাডিতে সন্দীপ রায় ও অনীক দত্ত

‘অপরাজিত’ ছবির চিত্রনাট্য বই হয়ে বেরনোর সময় আমাদের বিশপ লেফ্রয় রোডের বাড়িতে অনীক ওর টিম এবং জিতু কামালকে নিয়ে হইহই করে কতক্ষণ কাটিয়ে গেল। মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা! ক্যালকাটা ক্লাবে ‘মিউজিক অফ সত্যজিৎ রায়’ অনুষ্ঠানে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। সেখানে ও কিছুক্ষণ ছিল। কিন্তু পরে অসুস্থতার জন্য ও চলে যেতে বাধ্য হয়। তখনই বুঝেছিলাম, ওর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। এই শারীরিক কারণে একটা ডিপ্রেশনের মধ্যে দিয়ে ও যাচ্ছিল। সেটার পরিণতি যে এতটা করুণ হবে, ভাবিনি। অথচ ওর সঙ্গে শেষ যেবার কথা হল, সেবার কিন্তু ওকে বেশ পজিটিভ লাগছিল। ওর সঙ্গে অনেক স্মৃতি। নানা কথা, আড্ডা। এমন আচমকা ওর চলে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছি না। মানসিকভাবে এমন খবরের জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।

zoom
রায়বাড়িতে সই-শিকারীদের আবদার মেটাচ্ছেন হাসিমুখে

‘অপরাজিত’-র সময়ও নিয়মিত কথা হয়েছে ওর সঙ্গে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল ‘অপরাজিত’-তে আবির (চট্টোপাধ্যায়)-কে কাস্ট করা হবে, পরে সেই চরিত্র জিতু কামাল করে। লুক টেস্টের সময় অনীক নিয়মিত ছবি আমাকে পাঠাত। মেকআপ নিয়ে নানা খুঁটিনাটি, ও সবসময় আমাকে জানাত। ফিজিক্যালি হয়তো আসতে পারত না, কিন্তু ফোনে নিয়মিত যোগাযোগ করে যেত। কাকে কাস্ট করছে, কেন করছে– নানা ব্যাপারে ও জিজ্ঞেস করত। আমি নিজের মতামতও জানাতাম। অনীক নেই, এমন হৃদয়বিদারক খবরটা পাওয়ার পর থেকেই তাই মনটাকে গুছিয়ে নিতে পারছি না কিছুতেই।

Accident Anik dutta aparajito Bengali Death Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar Satyajit Ray

Share this article on