Robbar

কবির অসুখ অথবা মুখোশের জ্বর

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 1, 2026 6:03 pm
  • Updated:July 1, 2026 6:03 pm  

বিশ্ব চিকিৎসক দিবসে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই– গত দু’-তিন দশকে কবিদের শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য যথেষ্ট নিম্নগামী। আগের অনেক কবি ছিলেন শারীরিকভাবে অসুস্থ, কিন্তু মানসিক উদারতা তাঁদের ছিল। তাঁদের অনেকের বৈঠকখানায় যথেষ্ট সুপরামর্শ পাওয়া যেত। কিন্তু আজ প্রতি মুহূর্তে বাংলা কবিতার জগৎ বিশ্বাসঘাতকতায় পূর্ণ। তৈলমর্দনে কার আগে প্রাণ কে করিবে দান, তাই নিয়ে তারা তৎপর। মঞ্চে ওঠবার জন্য সরকারি কবির বারান্দায় সুপারিশের জন্য বসে থাকেন।

পঙ্কজ চক্রবর্তী

পরশুরামের ‘কচি সংসদ’ গল্পটির কথা নিশ্চয়ই আপনার মনে আছে? এই সমিতির সদস্যদের নাম পেলব রায়, শিহরণ সেন, বিগলিত ব্যানার্জি, অকিঞ্চিৎ কর, হুতাশ হালদার, দোদুল দে, লালিমা পাল (পুং)। এই নামগুলিকেই আজ থেকে ১০০ বছর আগে কবির উপমা হিসেবে ধরা যায়। পেলারাম কিংবা পেলব, দোদুল কিংবা লালিমা– নাম ছাড়িয়ে কবির ধর্ম হয়ে দেখা দিয়েছে। যদিও ভদ্রলোকি ভাষায় একে বলা যায় সংবেদনশীলতা। কিংবা অতি সংবেদনশীলতা। আসলে কবির ধর্ম কিংবা ধরন এমনই। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমে সিনেমা বা কথাসাহিত্যে কবিকে এমন সখীভাবাপন্ন করেই নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলা সাহিত্যে কবিজন্মের সঙ্গে রুগ্নতা সমার্থক হয়ে গিয়েছে অনেকদিন। যে কবি সে কুস্তিগীর– এমন ভাবনার অবকাশ নেই। বরং একজন কবি হবেন রুগ্‌ণ, আর্থিক দারিদ্রে কাতর, সংসারে খানিকটা সন্ন্যাসী, তীব্র বোহেমিয়ান, সামাজিকতায় উদাসীন– এমন ভাবমূর্তি দীর্ঘদিন ধরে রচিত হয়েছে। তার খুব যে বদল হয়েছে তা নয়। বাংলা সাহিত্যের অনেক কবি শারীরিক দিক থেকে ছিলেন অসুস্থ। আর্থিক দূরাবস্থা কিংবা স্বেচ্ছাচার সেই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। মধুসূদন দত্ত থেকে নজরুল কিংবা সুকান্ত ভট্টাচাৰ্য সকলেরই ভগ্ন স্বাস্থ্য কিংবা নানা রোগের কারণে অকালমৃত্যু হয়েছে। সুকান্তর মৃত্যু প্রমাণ করে দিল যক্ষ্মায় কবির মৃত্যু– ঘটনা হিসেবে অতি উপাদেয়। তাই উত্তমকুমারের একটি জনপ্রিয় সিনেমার কবি-বন্ধুটির নামও সুকান্ত। এবং সে-ও যক্ষ্মায় আক্রান্ত। অকালমৃত্যুর এই রোমান্টিক ধর্ম কিংবা বাণিজ্যের সুযোগ একজন পরিচালক সহজে ছাড়বেন কেন! যদি তুলনায় যাই, দেখব, কথাসাহিত্যিকরা অনেক বেশি সুস্থ, সাবলীল এবং সপাটে জীবন নামক ব্যাটটি চালিয়েছেন। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছেন। শরৎচন্দ্র কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শেষ জীবনের অসুস্থতা মাত্রাতিরিক্ত। মানিকের ক্ষেত্রে এই অসুখ স্নায়বিক বিপর্যয় এবং চিকিৎসার অভাবে শেষপর্যন্ত অকালমৃত্যু। তিরিশের কবিদের মধ্যে জীবনানন্দের বেশ অসুস্থতা ছিল। অন্তত জীবন এবং আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁকে খুব সুস্থ স্বাভাবিক জীবন দেয়নি। বরং উদভ্রান্ত হয়ে পথে পথে ঘুরেছেন তিনি। সেটুকু বাদ দিলে তিরিশের বাকি সকল কবি স্বাস্থ্য বিষয়ে বেশ যত্নবান। আভিজাত্য বা সাহেবি কেতায় রুগ্‌ণ কবি মনে হয়নি তাঁদের। হয়তো তাঁদের সামনে ছিল রবীন্দ্রনাথের উদাহরণ। এই একজন মানুষ একাধারে সুপুরুষ, স্বাস্থ্যবান, পরিশ্রমী এবং প্রাণবন্ত। একজন কবির মধ্যে উদ্যোগীর এমন সতেজ সবুজ ধর্ম বাংলা সাহিত্যে আর কখনও দেখা যায়নি। শেষ জীবনে রোগশয্যায় কিছুদিন থেকেছেন তিনি। কিন্তু তা বয়সোচিত এবং অস্বাভাবিক নয়। এখানে আরেকটি কথা উল্লেখ করতে চাই: কবির স্বাস্থ্যের সঙ্গে তাঁর কবিত্বের সম্পর্ক আছে– এমন মনে করতেন অনেকেই। আবু সয়ীদ আইয়ুব সূত্রে এখানে বোদলেয়র এবং রবীন্দ্রনাথের তুলনা করা যেতে পারে। বোদলেয়র তরুণ বয়স থেকে গ্লানিকর ও দূরারোগ্য রোগে ভুগতেন। সিফিলিস ছিল তাঁর। স্কুলজীবন ছিল দুঃসহ। প্রণয়ের জটিলতা শেষ পর্যন্ত তাঁকে বিকৃতস্বভাব অসামাজিকতা ও অকৃতজ্ঞতার ক্ষমতা দেয়। এলিয়ট তাকে ‘সিম্বল অফ মর্বিডিটি’ আখ্যা দিয়েছেন এবং তুলনা করেছেন পূর্ণ স্বাস্থ্যের প্রতীক গ্যেটের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথও পূর্ণ স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন। সেই স্বাস্থ্য বোদলেয়র যাকে বলেছেন ‘পোয়েটিক হেলথ’। আইয়ুব বলেছেন– ‘রবীন্দ্রনাথের বিশ্বপ্রেম যেমন ছিল তাঁর নিটোল মানসিক ও কাব্যিক স্বাস্থ্যের প্রকাশ বিশেষ, তেমনি বোদলেয়রের বিশ্ববিতৃষ্ণাকে তাঁর ব্যাধিগ্রস্ত মনের অভিব্যক্তি জ্ঞান করা যেতে পারে।’

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

চারের দশকে সুকান্তর অকালমৃত্যু এবং বলাবাহুল্য সুকান্ত যে আজও পাঠকের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন– তার প্রধান কারণ ভগ্নস্বাস্থ্য এবং অকালমৃত্যু। অসুস্থতার রোমান্টিকতা দিয়ে সুকান্তকে দীর্ঘদিন এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে, সিলেবাসে জীবন্ত থাকতে কিংবা রবীন্দ্র-নজরুল-সন্ধ্যার সঙ্গে সুকান্ত-সন্ধ্যা মিলিয়ে দিতে বাঙালি দু’বার ভাবেনি। যদিও সেই ডানাটি গত দুই দশকে খসে পড়েছে। পঞ্চাশের একজন উল্লেখযোগ্য কবি বিনয় মজুমদার ছিলেন অসুস্থ। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। অনায়াসে বিনয় ভালো চাকরি করতে পারতেন। কিন্তু বন্ধুরা মনে করলেন বিনয়ের জন্ম কবিতা লেখার জন্য। চাকরি করা তাঁর শোভা পায় না। ফলে বিনয় সারাজীবন কবিতায় মগ্ন রইলেন এবং অসুস্থতা তাঁর পিছু ছাড়ল না কোনওদিন। নয়ের দশক থেকে বিনয় মজুমদার যে মিথ হয়ে উঠলেন কিংবা তাঁর পাঠকরা যথেষ্ট মৌলবাদী– তার কারণ এই অসুস্থতার মিথ। অসুস্থতা আর কবিত্ব মিলে বিনয়ের যে উচ্চতা নির্মাণ করেছে সেখানে সামান্য বিপরীত কথা বলা আজ বেশ কঠিন। যে কারণে ঋত্বিক সম্পর্কে সামান্য সমালোচনাও সহ্য করতে পারেন না তাঁর অনুরাগীরা। ইদানীং বিস্মৃত একজন কবির কথা বলি। পঞ্চাশের সেই কবির নাম ইন্দ্রনীল চট্টোপাধ্যায়। ‘এবংপুরের টিকটিকি’ নামে অসামান্য একটি কিশোর উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি। চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। শিক্ষকতা করেছেন। বসন্ত কেবিনে নানা চিত্রশিল্পীদের সঙ্গে তিনি আড্ডা দিতেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘অদ্ভুত ধূলায়, ভুল ঘাসে’র প্রচ্ছদ করেছিলেন গণেশ পাইন। অনেকেই তাঁকে মাঝেমাঝে দেখেছেন বসন্ত কেবিন থেকে কফি হাউসের দিকে উদভ্রান্তের মতো হেঁটে যেতে। মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন তিনি। তাঁর মৃত্যুর দু’ দিন পর দরজা ভেঙে পচা-গলা দেহ উদ্ধার করা হয়।

ষাটের কবিতায় অসুস্থতার চেয়েও বেশি এল বিষণ্ণতা। একা ভাস্কর চক্রবর্তী এ ব্যাপারে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। তার ডায়েরি কিংবা কবিতায় ছত্রে ছত্রে বিষণ্ণতার সুর। তীব্র এক ডিপ্রেশনে সারাজীবন নিজেকে শেষ করে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি। ‘মুন্নার জ্বর। আমারও শরীর ভেঙে জ্বর আসছে।’, ‘লেখালেখি করে জীবনটা নষ্ট হলো।– লেখালেখি না করলে জীবনটা আরো নষ্ট হতো। ভয়াবহ দারিদ্র্য।’, ‘আমিই আমার বন্ধু আমি আমার শত্রু হয়ে কতো সাদা কাজ আমি করে গেছি, মরে যেতে চেয়েছি নীরবে’– এমন অজস্র কথাবার্তায় ছেয়ে আছে ভাস্করের ডায়েরি। স্কুলে যাচ্ছেন না। বারবার মেডিক্যাল নিচ্ছেন। আসছে সেসব প্রসঙ্গও।

ভাস্কর চক্রবর্তী

এখানে আবার কবির জীবন শেষপর্যন্ত এমনই বিষণ্ণ হবে– এই ভাবনাটি নিয়তি হয়ে ওঠে। অসুস্থতাই– মানসিক বা শারীরিক– কবিকে দিব্যদৃষ্টি দেয় এমন কুসংস্কার বহুদিন প্রচলিত ছিল। পরবর্তীতে অনেক তরুণ কবি এই বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং না-বলে উপায় নেই, সেই বিষণ্ণতা অনেক ক্ষেত্রে বানানো বিষণ্ণতা। আরোপিত বিষণ্ণতা। কবিত্বকে প্রাসঙ্গিক রাখার একটি প্রচার-কৌশল। এর পাশাপাশি আছে জীবন নিয়ে পাশাখেলা। অকালমৃত্যুর ঢেউ। সে লাইনে তুষার রায়, ফাল্গুনী রায়, শামসের আনোয়ার, নিশীথ ভড় থেকে প্রবীর দাশগুপ্ত– কম কিছু নেই। একজন কবি হবেন সামাজিক ব্যাপারে বিদ্রোহী, উদাসীন, ভবঘুরে এবং তীব্র বোহেমিয়ান। এই লক্ষণগুলি হয়ে উঠল ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার চরিত্র। সেইসব কথা সন্দীপন কিংবা সুনীলের উপন্যাসে চিত্রিত হয়ে আছে। আজ তা প্রায় মিথ। শক্তি-সুনীলের কবিতার অনেক পাঠক ছিলেন তাদের উন্মার্গগামী জীবনের অনুরাগী, কবিতার নয়। এই স্বেচ্ছাচার দিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন যে সাম্রাজ্য নির্মাণ করেছেন তাতে ধোঁয়া যতখানি, আগুন ততখানি নয়। এঁরা অনেকেই ছিলেন হিসেবী বোহেমিয়ান। প্রতিষ্ঠান সে খবর রাখত। এই বিদ্রোহ কিংবা বিপ্লব ছদ্মবেশে এক ধরনের আত্মপ্রতারণা। তাই সহজেই কৃত্তিবাসী কবিদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়া সহজ হয়েছিল। অনেককেই বলতে শুনেছি– পঞ্চাশে শক্তি নয়, একমাত্র দীপক মজুমদারই ছিলেন সত্যিকারের বোহেমিয়ান। আমাদের দুর্ভাগ্য তার হয়ে বলবার কেউ ছিল না। তার আগেই মিডিয়া নানা গুজব, মিথ নির্মাণ করে যথেষ্ট পয়সা লুটে নিয়েছে।

দীপক মজুমদার

নয়ের দশকে এসে দেখলাম কবি এবং রুগ্নতা, কবি এবং শারীরিক অসুস্থতা সমার্থক হয়ে উঠল। শুধু সমার্থক নয়, বরং তা বিজ্ঞাপনের উপযোগী। যথেষ্ট উঁচু দরে বিপণনযোগ্য। সত্তরের একজন কবি এই সময় সাম্রাজ্য শাসন করছেন। শহর থেকে মফস্‌সল সর্বত্রই তিনি। তাঁর জীবনের ছোট ছোট দুর্বলতা, অসুস্থতা, মাতৃহীন বিষণ্ণ দিন সাবলীল মায়াবী গদ্যে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠল বাংলা সাহিত্যে। আমরা বুঝলাম কবিকে সুস্থ হলে চলবে না। অসুস্থতাই মহাকবির সবচেয়ে বড় লক্ষণ। আর তাঁকেই অনুসরণ করে তরুণ কবিদের অনেকের মধ্যেই নানারকম অসুস্থতার বীজ দেখা দিল। এবং রাজবেশ হিসেবে গায়ে উঠে এল মলিন চাদর। সভা-সমিতি-মঞ্চে সর্বত্রই গায়ে চাদর, যাতে যথাযথ কবি মনে হয়। মঞ্চ থেকে খালাসিটোলা, কফি হাউস থেকে নন্দন চত্বর সর্বত্র তারা বিরাজমান। গায়ে ঝকঝকে শার্ট নেই, পায়ে ভদ্রস্থ জুতো নেই, চুলে চিরুনির ছোঁয়া নেই। প্রায় ভিখারি ও উঞ্ছবৃত্তিপ্রবণ এমন কিছু কবি দীর্ঘদিন বাংলা কবিতার সেবাদাস হয়ে রইলেন। এদের সকলেরই প্রার্থনা-সংগীত ‘এরে ভিখারি সাজায়ে কী রঙ্গ তুমি করিলে’। নব্বইয়ের একজন তরুণ কবির টিবি হয়। তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সেখানে সুনীল-সহ অনেকেই তাকে দেখতে এসেছিলেন। খবরের কাগজে তা ফলাও করে ছাপা হয়। এই খবরের কাগজের কাটিং বুকপকেটে রেখে দীর্ঘদিন এই তরুণ কবিকে অসুস্থতার ভাণে অনেক সুযোগ নিতে দেখেছি আমরা। এই আত্মপ্রতারণার ধরনটি অনেক কবির বরাদ্দ গেটপাস।

‘দেয়া নেয়া’ ছবির অসুস্থ কবি-বন্ধু

নতুন সহস্রাব্দে অনেকখানি বদল এল কবির জীবনে। নতুন যে কবিদের আমরা দেখলাম– তারা যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান, ঝকঝকে, স্মার্ট, রীতিমতো কর্পোরেট হাউসের চাকুরে। তাদের দেখে চিরাচরিত কবি মনে হয় না। তারা কেউ সম্পাদক, কেউ প্রচ্ছদশিল্পী, কেউ প্রকাশক কেউ অনলাইন পোর্টাল চালাচ্ছেন সব্যসাচীর মতো। চুল এলোমেলো নয়, জামা-প্যান্ট ভদ্রস্থ এবং সবচেয়ে বড় কথা অসুস্থতা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই। অনেকদিন পর একদল কবিকে আমরা পেলাম, যারা শারীরিকভাবে যথেষ্ট সুস্থ। অসুস্থতা তাদের উপজীবিকা নয়। বিশ্ব চিকিৎসক দিবসে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতে চাই– গত দু’-তিন দশকে কবিদের শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে, কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য যথেষ্ট নিম্নগামী। আগের অনেক কবি ছিলেন শারীরিকভাবে অসুস্থ, কিন্তু মানসিক উদারতা তাঁদের ছিল। তাঁদের অনেকের বৈঠকখানায় যথেষ্ট সুপরামর্শ পাওয়া যেত। কিন্তু আজ প্রতি মুহূর্তে বাংলা কবিতার জগৎ বিশ্বাসঘাতকতায় পূর্ণ। তৈলমর্দনে কার আগে প্রাণ কে করিবে দান, তাই নিয়ে তারা তৎপর। মঞ্চে ওঠবার জন্য সরকারি কবির বারান্দায় সুপারিশের জন্য বসে থাকেন। সরকারি উৎসবে কে কীভাবে অংশগ্রহণ করবেন তার ছক নির্মিত হয়। এমনকী কীভাবে বাংলা আকাদেমির পুরস্কারগুলি ভাগ-বাটোয়ারা করে নিতে হবে নিজের লোকেদের মধ্যে, তাই নিয়েও চলে গোপন শলা-পরামর্শ। দরজায় দরজায় ছোটাছুটি, সুযোগ বুঝে কানভাঙানি, অভিসন্ধিমূলক নানা প্রতারণা– সব কিছুতেই সিদ্ধহস্ত আজকের কবি। যথেষ্ট পড়াশোনা, কবিতা নিয়ে সচেতন চর্চা– এসব আজ বাতিল। শুধু দেখতে হবে কোন খুঁটিতে নৌকা বাঁধলে খুঁটিদেবতা প্রসন্ন হয়। মেধার বিনিময়ে নয়, কীভাবে ক্ষমতার বিনিময়ে পুরস্কার কিনতে হয়– তা তাঁরা জানেন। আজ অজস্র ক্ষমতা প্রদর্শনকারী কবি ও তার অনুচরের দল, উপদল, মেজ-কবি, বড়-কবি, সেজ-কবি, হাফ-কবি সকলে মিলে তৈরি করেছে এক জবরদস্ত সিন্ডিকেট। বাংলা কবিতায় চলছে সিন্ডিকেটের শাসন। এখানে সব আছে, শুধু কবিতা– তার দেখা নেই। আজ জীবন দিয়ে কবিরা বুঝেছেন সুচাকুরে হওয়া দরকার। ভদ্রস্থ রোজগার দরকার। উদাসীন থাকলে চলবে না, বরং ঝোপ বুঝে কোপ মারার দক্ষতা চাই। অর্থ দিয়ে কিনে নিতে হবে মঞ্চ সফলতা বা পুরস্কার। তাই তাকে আর্থিক দীনতার থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। একদিন অর্থের দারিদ্র দূর হয় কিন্তু কবিদের মনের দারিদ্র দূর হয় না। আজ এতদিন পর মনে হয়, কবিদের শারীরিক অসুস্থতা কমেছে, কিন্তু মানসিক অসুস্থতা বিপজ্জনক সেতুর উপর দাঁড়িয়ে আছে। স্বেচ্ছানির্মিত এই মনোরোগই এই মুহূর্তে কবির নিয়তি।

কবির অসুখ, জন কিটস, জোসেফ সেভার্ন

আজ বিশ্ব চিকিৎসক দিবস। শুধু একদিনের জন্য আমাদের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে হবে। কার স্বাস্থ্য? কবির স্বাস্থ্য। একজন কবি তাকে যথেষ্ট সুস্থ থাকতে হবে শরীরের দিক থেকে এবং মনের দিক থেকে। আমরা এ-ও জানি বিষণ্ণতা অনেক ভালো কবিতার জন্মদাতা। কিন্তু যে বিষণ্ণতা কবিতার আগে নজর টানে– তার কোনও উপশম নেই। আজ দিকে দিকে আত্মমুগ্ধ কবিদের দল। সকলেই নিজের গলায় নিজেই মালা পরে বসে আছে। মনে মনে নিজেকে ‘মহাকবি’ উপাধি দিতে তার দ্বিধা নেই। সকলেই রাশি রাশি কবিতা উৎপাদনকারী। প্রায় প্রত্যেকেরই একই বছরে চার-পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে। দ্বিধার আত্মমর্যাদা আজ আর অবশিষ্ট নেই। কবি এবং কবিতার জগতের গভীর গভীরতর অসুখ এখন। আত্মমুগ্ধ কবিকে রোধ করবে এমন সাধ্য কার! আজ কবি তীব্র এক মনোবিকারে আচ্ছন্ন, লোভী অথবা গুপ্তচর। আত্মপ্রতারণার সিঁড়ি দিয়ে পরিশ্রমহীন বিকল্প পথে তাঁরা উপরে উঠতে চাইছেন। বিশ্ব চিকিৎসক দিবসে তাই নিরুপায় বলতে হচ্ছে– এই অসুখের আজও কোনও চিকিৎসা নেই।