


পরিবেশ রক্ষা, বায়ুদূষণ কমানো এবং জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস– এই লক্ষ্যগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও সত্য, একটি যুগের শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ এবং অভ্যাস ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। কয়েক দশক পরে হয়তো পেট্রোল ইঞ্জিনের গর্জন, কিক মেরে বাইক স্টার্ট করার ঝাঁকুনি কিংবা গ্যারাজে দাঁড়িয়ে ইঞ্জিনের শব্দ শুনে ত্রুটি ধরার দক্ষতা শুধু স্মৃতিচারণের বিষয় হয়ে থাকবে। তখন নতুন প্রজন্মের কাছে নীরবতাই হবে স্বাভাবিক, আর শব্দই হবে নস্টালজিয়া।
চারিদিক নির্জন। দূরদূরান্ত পর্যন্ত মিশমিশে অন্ধকার। চাঁদের আলো সিগারেটের মতো জ্বলে আছে আকাশে। রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে কালো দু’ চাকার শব্দযান। আকার এবং আয়তনে বেশ দীর্ঘ। কালো ট্যাঙ্কের উপরে সোনালি রঙে লেখা কোম্পানির নাম, রয়্যাল এনফিল্ড। শব্দযানের চালক অপেক্ষা করছে দু’ জোড়া হেলমেট নিয়ে। প্রেমিকা নিঃশব্দে পাঁচিল টপকে এলেই পগারপার। প্রেমিকা এল ভীষণ নির্জনতা নিয়ে। প্রেমিক ইঞ্জিনের সুইচ অন করল। সুচারু আলোয় ভেসে গেল সমুদ্দুর। তারপর পায়ে কিক মেরে ডান হাতে অ্যাক্সিলেটর চাপতেই নির্জনতার ক্যানভাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ইঞ্জিনের ভটভট আওয়াজে ডোপামিন নিঃসরণ হল। কেঁপে উঠল বুকের প্রকোষ্ঠ। প্রেমিকা জাপটে ধরল প্রেমিককে। তারপর সেই বাঙালির প্রিয় দৃশ্য। সেই আমাদের এভারগ্রিন উত্তম-সুচিত্রা। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তাহলে কেমন হত তুমি বলো তো…।’ এই দৃশ্যের জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। আবহমান কাল ধরে চলে আসছে। প্রেমের চিরসাথী মোটর-সাইকেল। সেই মোটর-সাইকেলের একটা শব্দ আছে, পেট্রোলের গন্ধ আছে, কিক বা সেল্ফ স্টার্ট দিলে একটা ঝাঁকুনি আছে। এইগুলো তো সাধারণ জীবনে মেঠো রোদের মতো। সিনেমা থেকে সাহিত্য, সিরিয়াল থেকে বাস্তবের জীবনে দু’ চাকার যান তো অবাধ স্বাধীনতা। এইবার সেই স্বাধীনতা হরণে মাঠে এসেছে নতুন ইভি নীতি। দিল্লি সরকার তাদের নতুন ইলেকট্রিক যানবাহন নীতি অনুযায়ী ২০২৮ সালের ১ এপ্রিল থেকে রাজধানীতে নতুন পেট্রোলচালিত মোটরসাইকেল ও স্কুটারের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থাৎ ওই তারিখের পর দিল্লিতে নতুন করে কোনও পেট্রোল-চালিত দু’ চাকার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন করা যাবে না। কেবল বৈদ্যুতিক দু’ চাকার যানই নতুন রেজিস্ট্রেশনের অনুমতি পাবে। তবে ইতিমধ্যে যাঁদের পেট্রোল বাইক রয়েছে, তাঁরা আগের মতোই ব্যবহার করতে পারবেন, তাদের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য নয়। সরকারের যুক্তি, দিল্লির মোট যানবাহনের বড় অংশই দু’ চাকার এবং বায়ুদূষণ কমাতে এই খাতে দ্রুত বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। সেই লক্ষ্যেই একদিকে যেমন নতুন পেট্রোল-বাইকের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করা হচ্ছে, অন্যদিকে ইলেকট্রিক বাইক কেনার ক্ষেত্রে ভর্তুকি ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধারও প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

উনিশ শতকের শেষভাগেই বৈদ্যুতিক দু’ চাকার যান তৈরির চেষ্টা শুরু হয়েছিল। ১৮৯৫ সালে মার্কিন উদ্ভাবক ওগডেন বোল্টন জুনিয়র একটি ব্যাটারিচালিত দু’ চাকার যানের পেটেন্ট পান, যা ইতিহাসে ইলেকট্রিক মোটর-চালিত বাইকের প্রথম স্বীকৃত নকশাগুলির অন্যতম। এরপর ১৮৯৭ সালে আরও উন্নত নকশা আসে এবং ১৯১৯ সালে ব্রিটেনে প্রথম বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেলের প্রোটোটাইপ তৈরি হয়। তবু প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, দুর্বল ব্যাটারি, কম রেঞ্জ এবং সস্তা পেট্রোলের কারণে এই প্রযুক্তি দীর্ঘদিন মূল ধারায় আসতে পারেনি। একবিংশ শতাব্দীতে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উন্নতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্ব জুড়ে উদ্বেগ বাড়ার পরই ইলেকট্রিক বাইক নতুন করে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। অর্থাৎ, ইলেকট্রিক বাইক আসলে ভবিষ্যতের কোনও নতুন আবিষ্কার নয়, এটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরনো এক ধারণা, যা প্রযুক্তির পরিপক্বতার অপেক্ষায় ছিল। ভারতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ইতিহাস শুরু হয় নয়ের দশকে। ১৯৯৪ সালে বেঙ্গালুরুর উদ্যোক্তা চেতন মাইনি প্রতিষ্ঠা করেন Reva Electric Car Company। দীর্ঘ গবেষণার পর ২০০১ সালে বাজারে আসে ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক বৈদ্যুতিক গাড়ি REVA, যা পরবর্তীকালে বিদেশেও G-Wiz নামে জনপ্রিয় হয়। তবে দু’ চাকার ক্ষেত্রে বড় পদক্ষেপ আসে ২০০৬ সালে, যখন গুজরাতের ‘YoBykes’ সাধারণ মানুষের জন্য বৈদ্যুতিক স্কুটার বাজারে আনে। এরপর ধীরে ধীরে Hero Electric, Ampere, Okinawa-র মতো সংস্থাগুলি বাজারে প্রবেশ করলেও দুর্বল ব্যাটারি, কম গতি, সীমিত রেঞ্জ এবং পর্যাপ্ত চার্জিং পরিকাঠামোর অভাবে ইলেকট্রিক দু’ চাকার যান দীর্ঘদিন মূল ধারায় জায়গা করে নিতে পারেনি। পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০১৫ সালের পর, যখন কেন্দ্রীয় সরকার বৈদ্যুতিক যানবাহনকে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করে এবং পরে ‘FAME’ (Faster Adoption and Manufacturing of Electric Vehicles) প্রকল্পের মাধ্যমে ভর্তুকি ও পরিকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়। ২০১৯ সালে Revolt RV400-এর মতো আধুনিক বৈদ্যুতিক মোটর-সাইকেল বাজারে আসে এবং ২০২০-এর দশকে Ola Electric, Ather Energy, TVS, Bajaj-এর মতো বড় সংস্থার হাত ধরে ইভি আর পরীক্ষামূলক প্রযুক্তি নয়, ভারতের পরিবহন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে। গত এক দশকে ভারতে ইলেকট্রিক ও পেট্রোল-চালিত দু’ চাকার গাড়ির প্রতিযোগিতা প্রযুক্তিগত উন্নতির চেয়ে অনেক বেশি সরকারি নীতির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা এবং আমদানি করা অপরিশোধিত তেলের ওপর দেশের নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য সামনে রেখে কেন্দ্র সরকার একের পর এক নীতি, ভর্তুকি এবং উৎপাদন-প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ফলে ইলেকট্রিক বাইক আর কেবল একটি বিকল্প প্রযুক্তি হিসেবে নয়, বরং ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন রাজ্যও নিজেদের মতো করে ইভি নীতি গ্রহণ করছে। সেই ধারাবাহিকতায় দিল্লি ২০২৮ সাল থেকে নতুন পেট্রোল-চালিত দু’ চাকার গাড়ির রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, ভবিষ্যতের নগর পরিবহনকে তারা বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির ওপর দাঁড় করাতে চায়। অর্থাৎ, এতদিন পর্যন্ত পেট্রোল ও ইলেকট্রিক বাইকের মধ্যে প্রতিযোগিতা ছিল বাজারে ক্রেতা কোনটি কিনবেন, সেটাই ছিল মূল প্রশ্ন। কিন্তু এখন সেই প্রতিযোগিতার নিয়ম বদলাচ্ছে। নীতি-নির্ধারকেরা নিজেরাই ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ ঠিক করতে শুরু করেছেন। ফলে ভারতের মোটর-সাইকেলের ইতিহাসে এই প্রথম প্রযুক্তির স্বাভাবিক বিবর্তনের পাশাপাশি রাষ্ট্রের নীতিও বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করছে। প্রশ্ন হল, এই পরিবর্তন কি কেবল পরিবেশ রক্ষার জন্য, না কি এর মাধ্যমে ভারত তার জ্বালানি-নির্ভর অর্থনীতি, শিল্পনীতি এবং নাগরিক জীবনের একটি সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে?

ইতিহাস শুধু স্থাপত্য, পোশাক বা প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি হয় না; ইতিহাসের একটি শব্দও থাকে। ঘোড়ার খুরের টকটক শব্দ, স্টিম ইঞ্জিনের হুইসেল, ট্রামের ঘণ্টা, টাইপরাইটারের খটাখট কিংবা পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি রয়্যাল এনফিল্ডের ভারী গর্জন, প্রতিটি যুগ তার নিজস্ব শব্দে নিজেকে চিনিয়েছে। শব্দ কেবল কানে পৌঁছয় না, স্মৃতিতেও জমা থাকে। আগামী দিনে যদি শহরের রাস্তায় অধিকাংশ বাইকই নীরব বৈদ্যুতিক মোটরে চলে, তবে আমরা শুধু একটি ইঞ্জিন নয়, একটি যুগের শব্দভাণ্ডারও হারাব। ভবিষ্যতের শিশু হয়তো জানবেই না, দূর থেকে ভেসে আসা একটি মোটরসাইকেলের আওয়াজ শুনে বাড়ির মানুষ কীভাবে বুঝে যেত ‘বাবা ফিরছেন’। কোনও সরকার আইন করে দূষণ কমাতে পারে, প্রযুক্তির পরিবর্তন ঘটাতে পারে, কিন্তু একটি সমাজের স্মৃতি ও আবেগও কি সেই আইনের অভিঘাত থেকে মুক্ত থাকে? ভারতীয় সিনেমা, সাহিত্য এবং মধ্যবিত্তের জীবনে মোটর-সাইকেল কখনও শুধু একটি যানবাহন ছিল না। প্রথম চাকরির বেতন, প্রথম প্রেম, প্রথম দীর্ঘ সফর, বন্ধুত্ব, স্বাধীনতার অনুভূতি সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটি পেট্রোল ইঞ্জিনের শব্দ, কিক মেরে বাইক স্টার্ট করার অভ্যাস, রাস্তার ধুলো আর বাতাস। নতুন প্রজন্ম অবশ্যই নিজেদের নতুন স্মৃতি তৈরি করবে, কিন্তু পুরনো স্মৃতির ভাষা ধীরে ধীরে ইতিহাসে পরিণত হবে। তাই প্রশ্নটা ইলেকট্রিক বনাম পেট্রোলের নয়, প্রশ্নটা হল, উন্নয়নের পথে হাঁটতে গিয়ে একটি সমাজ তার সাংস্কৃতিক স্মৃতির কতটা অংশ হারাতে প্রস্তুত? ইলেকট্রিক বাইক যত বাড়বে, ততই কমে যাবে কার্বুরেটর মেরামত, কিক স্টার্ট, ক্লাচ টিউনিং, সাইলেন্সার ওয়েল্ডিং কিংবা ইঞ্জিন ওভারহলের মতো দক্ষতার প্রয়োজন। বহু ছোট গ্যারাজ, অসংখ্য স্থানীয় মেকানিক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তৈরি হওয়া হাতে-কলমে শেখা যান্ত্রিক জ্ঞান নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে। অবশ্যই নতুন ধরনের কাজও তৈরি হবে। ব্যাটারি, সফটওয়্যার ও ইলেকট্রনিক্স-ভিত্তিক পরিষেবা বাড়বে। কিন্তু এই রূপান্তরের মাঝখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি শুধু একটি ইঞ্জিন বদলাচ্ছি? না কি এক ধরনের কারিগরি সংস্কৃতি, ভাষা এবং জীবনযাপনকেও বিদায় জানাচ্ছি?

দিল্লির সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে ভারতের পরিবহন নীতিতে এক যুগান্তকারী মোড়। কিন্তু একটি নীতি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই পরিবর্তনের জন্য দেশ কতটা প্রস্তুত? বৈদ্যুতিক গাড়ির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শুধু গাড়ি বিক্রির ওপর নয়, তার চারপাশে গড়ে ওঠা সম্পূর্ণ একটি পরিকাঠামোর ওপর। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ২৭,৭৩৭টি পাবলিক ইভি চার্জিং স্টেশন স্থাপন করা হলেও, তার মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র ২২,৭৫৩টি। সংখ্যাটি শুনতে বড় মনে হলেও, দেশের মোট বৈদ্যুতিক যানবাহনের তুলনায় তা এখনও অপ্রতুল। বর্তমানে ভারতে একটি পাবলিক চার্জিং স্টেশনের ওপর নির্ভর করছে গড়ে প্রায় ২৩৫টি ইভি, যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে অনেক উন্নত দেশে এই অনুপাত অনেক কম। অর্থাৎ, ইভি বিক্রি দ্রুত বাড়লেও চার্জিং পরিকাঠামো সেই গতিতে এগতে পারেনি। এর সঙ্গে জুড়েছে নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বের প্রশ্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ব্যাটারিতে আগুন লাগার কিছু ঘটনা ইভির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছিল। যদিও বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কারণ ছিল নিম্নমানের ব্যাটারি, ত্রুটিপূর্ণ ব্যাটারি ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, অননুমোদিত চার্জার বা ভুল চার্জিং পদ্ধতি। মানসম্মত প্রযুক্তি ব্যবহারে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কিন্তু ভারতের মতো দেশে, যেখানে অসংগঠিত সার্ভিসিং ও সস্তা যন্ত্রাংশের বাজার এখনও বড়, সেখানে নিরাপত্তার প্রশ্নকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। একইসঙ্গে ব্যবহৃত লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার, বিরল খনিজের জোগান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস এবং গ্রামাঞ্চলে চার্জিং সুবিধার মতো বিষয়গুলিও ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। ফলে প্রশ্নটা কেবল এই নয় যে, ২০২৮ সালের পর দিল্লিতে নতুন পেট্রোল বাইকের রেজিস্ট্রেশন বন্ধ হবে কি না? আরও বড় প্রশ্ন হল, ভারত কি এমন একটি অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে জাতীয় সড়ক পর্যন্ত একজন ইভি চালক নিশ্চিন্তে যাত্রা করতে পারবেন? প্রযুক্তির ইতিহাস বলছে, কোনও নতুন ব্যবস্থা তখনই সফল হয়, যখন তার পরিকাঠামো মানুষের আস্থার সমান গতিতে এগয়। নইলে নীতি ভবিষ্যতের দরজা খুলে দিলেও, বাস্তবতা সেই দরজার সামনে দীর্ঘ অপেক্ষার সারি তৈরি করে। সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি উন্নয়নেরই একটি অদৃশ্য মূল্য থাকে। নতুন প্রযুক্তি শুধু পুরোনো যন্ত্রকে সরিয়ে দেয় না, মানুষের অভ্যাস, ভাষা, স্মৃতি এবং অনুভূতিরও পুনর্লিখন করে। বিদ্যুৎ এসে কুপির আলোকে জাদুঘরে পাঠিয়েছে, মোবাইল ফোন হাতে আসতেই চিঠির জন্য অপেক্ষা করার দিন শেষ হয়েছে, ডিজিটাল ক্যামেরা ফিল্ম-রোলকে ইতিহাসে পরিণত করেছে। তবু মানুষ এই পরিবর্তনকে মেনে নিয়েছে, কারণ প্রতিটি ক্ষতির বিনিময়ে আরও বড় কোনও প্রাপ্তি এসেছে। ইলেকট্রিক বাইকের ক্ষেত্রেও হয়তো আমরা ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। পরিবেশ রক্ষা, বায়ুদূষণ কমানো এবং জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস– এই লক্ষ্যগুলির গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও সত্য, একটি যুগের শব্দ, গন্ধ, স্পর্শ এবং অভ্যাস ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছে। কয়েক দশক পরে হয়তো পেট্রোল ইঞ্জিনের গর্জন, কিক মেরে বাইক স্টার্ট করার ঝাঁকুনি কিংবা গ্যারাজে দাঁড়িয়ে ইঞ্জিনের শব্দ শুনে ত্রুটি ধরার দক্ষতা শুধু স্মৃতিচারণের বিষয় হয়ে থাকবে। তখন নতুন প্রজন্মের কাছে নীরবতাই হবে স্বাভাবিক, আর শব্দই হবে নস্টালজিয়া। হয়তো এটাই ইতিহাসের নিয়ম– প্রতিটি নতুন যুগ নিজের প্রযুক্তি নিয়ে আসে, আবার নীরবে বিদায় জানায় আগের যুগের জীবনযাপনকেও। উন্নয়নের প্রকৃত মূল্য তাই শুধু টাকায় বা প্রযুক্তিতে মাপা যায় না; তার একটি অংশ জমা থাকে মানুষের স্মৃতিতে, সংস্কৃতিতে এবং সেইসব ছোট ছোট অভ্যাসে, যেগুলি হারিয়ে যাওয়ার পরই আমরা বুঝতে পারি, সেগুলোও আমাদের সভ্যতারই অংশ ছিল।

সম্ভবত ইলেকট্রিক গাড়িই ভবিষ্যৎ। হয়তো কয়েক দশক পর পেট্রোল-চালিত মোটর-সাইকেলকে মানুষ ঠিক সেইভাবেই দেখবে, যেভাবে আজ স্টিম ইঞ্জিন বা গ্রামোফোনকে দেখে– একটি সুন্দর ইতিহাস হিসেবে। প্রযুক্তির এই পরিবর্তনকে থামানো যাবে না, থামানো উচিতও নয়। কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি অগ্রগতি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, উন্নয়ন কখনও বিনা মূল্যে আসে না। প্রতিটি নতুন যুগ কিছু নতুন সম্ভাবনা উপহার দেয়, আবার নিঃশব্দে কেড়ে নেয় কিছু শব্দ, কিছু গন্ধ, কিছু স্পর্শ, কিছু অভ্যাস। হয়তো একদিন ইঞ্জিনের গর্জন থেমে যাবে, কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে তার প্রতিধ্বনি অনেকদিন বেঁচে থাকবে। কারণ সভ্যতা শুধু সামনে এগয় না, সে তার পিছনে ফেলে আসা শব্দগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে হাঁটে।
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved