
রবীন্দ্রনাথ বিয়ের পদ্য না-লিখলেও অনেক বিয়েতে তিনি আশীর্বাণী লিখে দিতেন। লীলাদেবী, দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রের কন্যা ইন্দিরা, লালগোলার রাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ, কুচবিহারের রাজকন্যা ইলাদেবী, এমনকী কবি অমিয় চক্রবর্তীর বিয়েতেও তিনি সানন্দে আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন। তবে প্রথম শ্রেণির বিয়ের পদ্যকার ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। অনেকেই তা জানে না।
২১.
হিন্দুদের আনুষ্ঠানিক বিয়ে শুধু দেখার নয়, পর্যবেক্ষণের বিষয়। গাঁ-গঞ্জের বনেদি বাড়ি হলে তো কথাই নেই। বিচিত্র লোকাচার লোক-অনুষ্ঠানে পূর্ণ। এক একটা জনজাতি, এক এক রকমের বিয়ে। মিল থাকলেও অমিল কম নেই। বিয়ে দশবিধ সংস্কারের মধ্যে শেষ বা চরম সংস্কার। সুতরাং পুরুষদের তুলনায় মেয়েদেরর তরফে আবার বিবাহ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।
বিবাহের মাধ্যমে কন্যার কুলচ্যুতি ঘটে। পিতৃকুলের গোত্র পরিত্যাগ করে স্বামীকুলের গোত্র ও পদবি গ্রহণ করেন কন্যা। সুতরাং বিবাহ মানেই হিন্দু নারীর কাছে চরম সন্ধিক্ষণ। সেই কারণে বিবাহে নানা ধরনের শাস্ত্রীয় ও মেয়েলি আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হয়।
আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বিয়েতে থাকে তিনটি আকর্ষণীয় পর্ব– লোকখেলা, গান আর পদ্য মানে ছড়া। লোকখেলা যেমন আট-হাঁড়ি ঢাকা, কড়িখেলা, পাশাখেলা, ভাঁড়-কুলো খেলা, সুতোখেলা, মোনামুনি ভাসানো, আংটি খেলা ইত্যাদি।

বিয়ের বাসরে গানবাজনা-সহ জলসহার গান, ঢেঁকি মোঙলানোর গান আজও শোনা যায়। ঢেঁকিমঙ্গলা বিবাহের গুরুত্বপূর্ণ স্ত্রী আচার। পূর্বে গায়ে হলুদের দিন সধবা মেয়েরা পাত্রী-সহ এক কুমারী মেয়েকে নিয়ে যান ঢেঁকিশালে। কুলোয় ধান সিঁদুর ইত্যাদি সজ্জিত থাকে। একজন ঢেঁকিতে পার দেন। পরে সেই ঢেঁকি-ছাঁটা চাল দিয়ে পিঠা বানান। ঢেঁকিমঙ্গলা শুধু হিন্দুদের নেই, মুসলমান বিয়েতেও কেতুগ্রাম অঞ্চলে দেখেছি। মুসলমান পরিবারে ঢেঁকিমঙ্গলা থেকে শুরু হত মহিলামহলে বিয়ের গীত।
ঢেঁকিমঙ্গলা দেবদেবীর বিয়েরও এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। ধর্মরাজের স্নানযাত্রাকে বলে ‘মুক্তিস্নান’। এদিন ‘মুক্তি’ নামক ধানের দেবীর সঙ্গে ধর্মরাজের বিয়ে হয়। ঢেঁকিমঙ্গলার পূর্ণ বিবরণ আছে ময়ূরভট্টের শূন্যপুরাণে। বিবাহের দিন সকালে একটি অনুষ্ঠান হয়। এর নাম ‘একুটি’। সম্ভবত ‘আখেটিক’ শব্দ থেকে আগত। ‘আখেটিক’ শব্দটির অর্থ শিকারযাত্রা। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কালকেতু উপাখ্যানের নাম ‘আখেটিক’ খণ্ড। বিবাহের সঙ্গে শিকারযাত্রার কোনও স্মৃতি কি মিশে আছে? না কি আদিম কোনও যাদুবিশ্বাস?
‘একুটি’-তে ব্যাধ ও নিষাদ জাতির বিবাহের ছাপ আছে কি না তা বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারেন। কঞ্চি দ্বারা একটি অস্থায়ী বর্গাকার আচ্ছাদনের নাম আগড়। ‘অর্গল’ শব্দ থেকে ‘আগড়’ শব্দটি এসেছে। লাগে ৫টি পান, সুপারি, কড়ি, হলুদ– চার কোণে চারটি ও মাঝে একটি– এভাবে থাকে। নাপিত-বধূরা মিলে অনুষ্ঠানটিকে পরিচালনা করেন। ৯খি বা ৭খি সুতো ধরে ভাবী বর বা বধূকে নানা মুদ্রায় ডিঙিয়ে আগড়ে প্রবেশ প্রস্থান করিয়ে, অবশেষে সেই হলুদ-ছোপানো যাদু সুতো পরিয়ে দেওয়া হয় বর বা কনেকে।
একসময় বিয়ে মানেই শুধু সংগীতময় নয়, ছিল কাব্যময়। ছাদনাতলার ছড়া, নেমন্তন্ন করার ছড়ার চিঠি আর সেইসঙ্গে নাপিতের কণ্ঠে ছড়া এবং বিয়ের আসরে বর্ণাঢ্য পদ্যপাঠ। যার অনেকাংশ বর্তমানে লুপ্ত বা লুপ্তপ্রায় হয়ে গেছে।

বাংলার মায়েদের এক স্বভাবগত সৃষ্টি হল ছড়া। ছেলে-ভোলানোর ছড়া থেকে ঘুমপাড়ানির গান, প্রবাদ প্রবচনে সর্বত্রই মুখে মুখে ছড়া সৃষ্টি করেন গ্রাম্যবধূরা। বাংলার কবিয়ালদের পরিচিতি ছড়াদার হিসাবে। তাঁরা নিজেরাই আসরে বলেন–
মায়া মমতায় গড়া
বাংলা মায়ের ছড়া।
সুতরাং বিয়েতেও যে নানা ধরনের ছড়া থাকবে তাতে আর বিস্ময়ের কী আছে! আগে পাড়াগাঁয়ে পানসুপারি দিয়ে নেমন্তন্ন করার চল ছিল। বন্ধুবান্ধবদের নিমন্ত্রণ করার সময় বাজার থেকে কয়েকটা কার্ড নিয়ে এসে হাতে লেখা হত, লালকালিতে রঙবাহারি ছড়ায় । যেমন
বন্ধু তোমায় জানাই খবর
হয়তো তুমি হাসবে।
৮ ফাগুন আমার বিয়ে
নিশ্চয় তুমি আসবে।।
বিয়ের দিন ছাদনাতলায় খুব সুন্দর করে আলপনা দেওয়া হত। বড় করে দু’টি উড়ন্ত প্রজাপতি আঁকা হত। চারপাশে থাকত লতাপাতার অলংকরণ। বর-কনের বসার পিঁড়িদু’টিও অলঙ্কৃত হত সুচিত্রিত আলপনায়। বর্গাকার ছাদনাতলায় লেখা হত শ্রীশ্রীপ্রজাপতয়ে নমঃ। তারপরই লেখা থাকত দুই পঙ্ক্তির মনোগ্রাহী ছড়া, ঠাকুমার বয়ানে লেখা–
প্রজাপতি উড়ে গিয়ে/ পড়ে গেল ফাঁদে।
অমুক রানির পা-দু’খানি/ তমুক ভাইয়ের কাঁধে।।
কন্যা সম্প্রদানের বা মধুপর্ক দানের পর নাপিত ছড়া কাটে। একে সাধারণত গৌরবচন বলে। অনেক সময় আবার বিবাহের শুভদৃষ্টি বা মালাবদলের সময় এই ছড়া বলে থাকেন–
শুনুন শুনুন মহাশয় করি নিবেদন।
রামসীতার বিবাহকথা করুন গো শ্রবণ।।
যথাধ্বনি উলুধ্বনি করুন সকলে।
হর গৌরীর মিলন হল শুভকালে।।

বিয়ের পদ্য বর ও কনে দুই পক্ষেই ছাপাত। বরের বন্ধুরা আবার আলাদা করে বিয়ের পদ্য পাঠ করে বিলি করত বিবাহসভায়। পদ্য পাঠের সাধারণ নিয়ম ছিল– কনেকে সিঁদুর দান করার পরে অথবা বাসরঘরে যাওয়ার পূর্বে নাপিত ঘোষণা করতেন বিয়ের পদ্য পড়ার পালা। ‘কে পড়বেন পড়ুন গো–’
বর বা কনেপক্ষের পারিবারিক পদ্যপাঠ করার পর ছেলের বন্ধুদের একজন পদ্য পড়তেন। পদ্য শুনে উপস্থিত ব্যক্তিরা হাততালি দিয়ে অভিনন্দন জানাত। তবে মেয়েবন্ধুদের কবিতা ছাপানো বা পাঠের ব্যবস্থা দেখা যেত না।
বিয়ের পদ্য সাধারণত তিন ধরনের হত– ছড়াকারে লেখা, গদ্যে লেখা আর গদ্য-পদ্য মিশিয়ে লেখা। পারিবারিক পদ্যগুলি ছিল ক্ষুদ্র পুস্তিকা স্বরূপ। বাবা-মা, কাকা-কাকিমা, দাদা-বৌদি, দাদু-ঠাকুমা, ভাইপো-ভাইঝি কিংবা ভাগ্না-ভাগ্নির বয়ানে পদ্য লেখা হত।
এই ধরনের পদ্যগুলিতে আশীর্বাণী, মৃত নিকট আত্মীয়কে স্মরণ করে শোকোচ্ছ্বাস ইত্যাদির পাশাপাশি ছোটদের বয়ানে পদ্যর শিরোনাম থাকত– ‘দিদির বিয়েতে একটু চাটনি’, ‘মামার বিয়েতে ধামাকা’ ইত্যাদি নামে। যেমন–
তেল হলুদের বন্যায় মুড়কি মুড়ি ভেসে
বোঁদে ব্যাটা ভিজে মরে পড়ে চিনির রসে।।
পদ্যর শেষে থাকত– ‘ইতি তোমার ভাইবোনেরা’, ‘মা-বাবা’ ইত্যাদি শব্দমালা।

পদ্য শুরু হত ‘শ্রীশ্রীপ্রজাপতয়ে নমঃ’ বাক্য দিয়ে। দু’দিকে দুটো প্রজাপতির ছবি। তারও উপরে ছাপা হত মালা হাতে দু’টি বিদ্যাধর-বিদ্যাধরী। উড়ন্ত বিদ্যাধর-বিদ্যাধরীকে পাবেন প্রস্তর ভাস্কর্যে। এরা গন্ধর্ব, পুরুষ ও মহিলা। প্রসঙ্গত, গান্ধর্ব বিবাহ– হিন্দুদের আট প্রকার বিয়ের অন্যতম।
কাগজ হালকা লাল, সবুজ বা হলুদ রঙের। পদ্যপাঠের পর উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকদের বিলি করা হত। নয়ের দশকের শুরুতে গ্রামবাংলা থেকে বিয়ের পদ্যপাঠ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। গবেষক-লেখক যতীন্দ্রমোহন গুপ্ত এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ১৩০৪ বঙ্গাব্দে কলকাতায় রাজা সুবোধ মল্লিকের বিয়ের সময় প্রথম পদ্য ছাপানো হয়েছিল।
কারও কারও মতে রাজা প্রফুল্লনাথ ঠাকুরের বিবাহ উপলক্ষে তদীয় পিতামহ কালীকৃষ্ণ ঠাকুর তাঁর মৃত পুত্র শরদিন্দুনাথকে স্মরণ করে এক শোকবিলাপ মুদ্রিত ও পঠিত হয়েছিল। যাইহোক বিয়ের পদ্য বিশ শতকের প্রথম দিকে যে ব্যাপক মাত্রায় শুরু হয়েছিল, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
অধিকাংশ প্রেসে রকমারি বিয়ের পদ্যের নমুনা আগে থেকেই সংগৃহীত থাকত। যাঁরা পদ্য ছাপাতে যেতেন তারা পছন্দ করার পর বরকনের নাম, বিয়ের তারিখ, বিবাহবাসর এবং কারা লিখছেন তাদের নামগুলি লিখে নিতেন। অনেকেই আবার কবিযশোপ্রার্থী, কবিয়াল কিংবা প্রতিষ্ঠিত কবিদের কাছে লিখিয়ে নিয়ে আসতেন বিয়ের পদ্যগুলি।

রবীন্দ্রনাথ বিয়ের পদ্য না-লিখলেও অনেক বিয়েতে তিনি আশীর্বাণী লিখে দিতেন। লীলাদেবী, দ্বিজেন্দ্রনাথ মৈত্রের কন্যা ইন্দিরা, লালগোলার রাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ, কুচবিহারের রাজকন্যা ইলাদেবী, এমনকী কবি অমিয় চক্রবর্তীর বিয়েতেও তিনি সানন্দে আশীর্বাণী লিখে দিয়েছিলেন।
তবে প্রথম শ্রেণির বিয়ের পদ্যকার ছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। অনেকেই তা জানে না। কাটোয়ার ডাকসাইটে ডেপুটি ছিলেন কবি তারকচন্দ্র রায়। তারকবাবুর শালার বিয়েতে পদ্য লিখে দিয়েছিলেন কবি কুমুদরঞ্জন মল্লিক। হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের সংগৃহীত সেই পদ্যটি লেখা হয়েছিল ১৩২২ সালের ১৮ই মাঘ। পদ্যটি লেখা হয়েছিল তারকবাবুর নাতির নামে–
আজকে তোমার বইবে তুফান বুকে
মুখেতে আর বলবো আমি কত
দুই জনেতে থাক পরম সুখে
একটি বোঁটায় দু’টি ফুলের মতো।।

বিয়ের পদ্য দেবদেবীর বিয়েতেও লেখা হয় এবং পাঠ করা হয়। বর্ধমানের সগড়াই গ্রামে ধর্মরাজ ও মনসাদেবীর বিয়ে উপলক্ষে পদ্যপাঠের রীতি আছে।
যুগে যুগে এইভাবে কাটে কতকাল।
সগড়াইবাসীর কিবা সুখের কপাল।।
প্রতি বর্ষে ধর্ম বিয়ে মনসা মিলন।
দেখিতেছে গ্রামবাসী যাবজ্জীবন।।
………………..পড়ুন ঠাকুরদার ঝুলির অন্যান্য পর্ব………………..
পর্ব ২০: মাদারি কা খেল
পর্ব ১৯: কোনও পসরাই অবিক্রিত পড়ে থাকে না বৈরাগ্যতলার ভাঙামেলায়
পর্ব ১৮: সুর নয়, আদিতে সুরার সঙ্গেই অধিক যোগাযোগ ছিল সরস্বতীর
পর্ব ১৭: পৌষপার্বণের সঙ্গে মিশে গেছে টুসু, সোদরব্রত কিংবা কুড়মালি আইখানযাত্রা
পর্ব ১৬: বাংলার মনসা ও চণ্ডীপুজোর ধারা এসে জগৎগৌরীতে মিলেছে
পর্ব ১৫: রাঢ়ের কবিগানের পালায় হিঁদু হলেন চাঁদ মুহম্মদ, কাশীনাথ মুসলিম
পর্ব ১৪: খেজুর গাছে হাঁড়ি বাঁধো মন
পর্ব ১৩: বৈদিক যুগের ‘স্থালী’-ই আজকের প্লেট, ‘উখ্য’-ই ফ্রাইং প্যান
পর্ব ১২: লোকখেলার মধ্যে মিশে রয়েছে হাজার বছরের ফেলে আসা জীবনের স্মৃতি
পর্ব ১১: অঘ্রানের নবান্ন মূলত নববর্ষেরই উৎসব ছিল
পর্ব ১০: বারবণিতাদের আরাধনার মধ্যে দিয়েই শুরু হয়েছিল কাটোয়ার কার্তিক লড়াই
পর্ব ৯: শিশুঘাতক থেকে কেন শিশুরক্ষক দেবতা হয়ে উঠলেন কার্তিক?
পর্ব ৮: তেনাদের পুজো, তেনাদের মেলা-মোচ্ছব
পর্ব ৭: প্রেত মানেই ভূত বা অতীত, কিন্তু সকল প্রেতই ভূত নয়!
পর্ব ৬: কেবল কালী নন, লৌকিক লক্ষ্মী ঠাকরুনও দাঁড়ান স্বামী নারায়ণের বুকে পা রেখেই
পর্ব ৫: মহিষাসুরমর্দিনী নন, কৃষিপ্রধান বাংলায় আদিপূজিতা ছিলেন শস্যদেবী নবপত্রিকা
পর্ব ৪: পুকুরের দেবতা পুকুরের ভূত
পর্ব ৩: পুকুরের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে লোককথা আর লোকবিশ্বাস
পর্ব ২: পৌরাণিক হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে দেবতা অথবা মানুষের বন্ধু হিসেবেই স্থান পেয়েছে কুকুর
পর্ব ১: সেকালের ডাকাতির গপ্প
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved