Robbar

অন্য এক ঘরের সন্ধানে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:March 30, 2026 1:43 pm
  • Updated:March 30, 2026 1:43 pm  

নদীর ধ্যান করতাম। রোদের আলোতে পুঁথি পড়তাম, রাত্রের অন্ধকারে গুহায় বসে সেগুলো আবার মনে করতাম। আমার চারিপাশে ভগবানের যত রূপ, তার মানে বুঝবার চেষ্টা করতাম, যেমনটা তিন বছর আগে শুনেছিলাম। কখনও নিচ থেকে কোনও ভগত এসে ভগবানের সব সেবককে ভাণ্ডারা দিত– কম্বল, চিঁড়ে। কখনও কিছু বইকিতাব। তাঁকে মাঝে মাঝে দেখতে পেতাম, ওপারে দূরে কোনও গাছের নিচে। কখনও গঙ্গামাইয়ার কিনারে উঁচু পাথরে বসে। সারাদিন ধ্যান করছেন।

প্রচ্ছদ: শান্তনু দে

জয়া মিত্র

১০.

গঙ্গোত্রীতে তখনও গঙ্গা ছিল। নির্জনতাও। 

গঙ্গার সোনালি গেরুয়া ধারায় এসে পড়ছে কেদারগঙ্গার হালকা সবুজ ধারা। ঠিক সেই সঙ্গমস্থলের ওপরে একটা বড় আর একটা ছোট ঘরের একখানা ডেরা। সামনে পেছনে খানিক ছাড়া জায়গা আর চারিপাশে ফাঁকা। ঠান্ডার কথা বলাবাহুল্য। সূর্যাস্তের পর কেউ আর বাইরে থাকতে পারে না। বাটির মতো নিচু জায়গাটির চারপাশে ঘিরে ঘিরে আছে ভাগিরথী এক দুই, সুদর্শন– আরও সব চূড়া। তাদের গায়ে গাছ কম। নানারঙের পাথরে কী প্রকাণ্ড সব ছবি আঁকা। কেবল আমি আবিষ্কার করব বলে রঙের ছাপ সেজে বসে আছে। নিচে দেখতে না পাওয়া দুই ধারার কলোচ্ছ্বল কথা বলাবলি। সকাল দশটা-এগারোটায় ঘরের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট কাঠের টেবিল আর চেয়ার টেনে বাইরে এনে লেখার ভান করে কাগজ মেলে রেখে এই আয়োজন দেখছি, একটু দূর দিয়ে এক সন্ন্যাসিনী মূর্তি পেরিয়ে গেলেন। একবার তাকিয়ে দেখলেনও। দৃষ্টিতে প্রসন্ন কৌতূহলের ছাপ। আমিও হাসলাম। একটু পরে ফিরে যাবার সময় দেখি টেবিলের কাছে এসে দাঁড়ালেন। দু’ দিন আগেই হৃষীকেশে গঙ্গার পাশে প্রায় ২০ ফুট লম্বা এক সিমেন্টের বেঞ্চিতে গিয়ে বসতেই অন্য প্রান্ত থেকে দুই গেরুয়াবসন সন্ন্যাসীকে উঠে যেতে দেখে খুব খারাপ লেগেছিল। এতো দূর থেকেও নারী কিংবা গৃহীর সঙ্গে একাসনে বসায় যদি অশুদ্ধ হন, তাহলে এই এক বসুন্ধরায় বাস করবেন কী করে! এ কেমন বৈরাগ্য– যার এত অশুদ্ধ হবার ভয়! এই প্রসন্ন মুখখানা যেন সেই ক্ষোভ ধুয়ে দিল। কোথা থেকে এসেছি, ক’দিন থাকব-র উত্তর দিয়ে জানতে চাইলাম তিনি এখানে আছেন কতদিন।

পরের দু’-তিনদিনও ওই একই সময়ে একইভাবে বসে থাকতাম। সিঁড়ি ভেঙে গঙ্গা মন্দিরের আরতি দেখা ছাড়া চারপাশের এই বিপুল স্তব্ধতা ভাঙে কেবল কয়েকটি গগনবিহারী পাখির তীক্ষ্ণ ডাক আর দুই জলের নিরন্তর ঝর্ঝরে। সঙ্গের জনটির বয়েস ১০। সে ঘুরে বেড়ায় আশপাশে ইচ্ছেমতো। কখনও বা দু’জনেই। কাছাকাছি সময়ে রোজই সেই গেরুয়াবসনাকে দেখি পেছনদিকের কোথা থেকে এসে গঙ্গার দিকে চলে যেতে। কিছুক্ষণ পরে ফিরেও যান আবার, ওই একই পথে। দুটো-একটা কথার পরিচয় আরেকটু এগিয়ে আমার লেখার টেবিলের পাশে আরেকটা কাঠের চেয়ারে এসে বসতেন। গল্প বলতেন গঙ্গার। কতদিন ধরে আছেন এখানে, কেমন করে এলেন– একা এই বিরলে একটি মেয়ে হিসাবে, প্রায় ৫০ বছর ধরে কেমন করে কাটান দিন, এইসব প্রশ্নও করেছিলাম ভয়ে ভয়ে। পাছে কোনও অনধিকার জায়গায় পা দিয়ে ফেলি আর গম্ভীর হয়ে যান মানুষটি। একদিন ডাকলেন নিজের গুহায় যাবার জন্য…

–যাওগি? 

শিল্পী: শান্তনু দে

গেলাম। বেশি দূরে নয়, কিছুটা উঁচুতে গুহাটি। গুহার ভেতরেই কোনও ধনী ভক্ত ওঁর গুরুর মূর্তি বানিয়ে দিয়েছেন শ্বেতপাথর দিয়ে। এবড়োখেবড়ো দেওয়ালে সাঁটা আছে কোনও শিশুর দিয়ে যাওয়া মার্কিন থানের থেকে খুলে নেওয়া সোনালি রাংতার গণেশ। কয়েকটা রঙিন পাথর। কোনওটাই ওঁর নিজের সংগ্রহ নয়। আমার মনে হল, কোনওটারই বিশেষ করে কোনও আদর-অনাদর নেই ওঁর কাছে।

–যে যা দিয়ে যায়, রেখে দিই। ভালোবাসার জিনিস।

মেঝেতে মোটা করে কম্বল পাতা। এই কম্বলও কারও দানের। বসলাম সেখানে।

–কেমন করে তুমি এলে এখানে? পৌঁছলে কেমন করে?

জানি না কেন, সেই প্রাচীন হয়ে আসা সন্ন্যাসিনী নিজের কথা বলেছিলেন অনেক দূরদেশের এই অপরিচিত যাত্রীর কাছে। তাঁর কথাতেই বলি। হিন্দিতে বলছিলেন।

–‘যেখানে আমার বাড়ি ছিল, সেই শহরে খুব বড় কলেজ উদ্‌ঘাটন করতে একজন সন্ন্যাসী এলেন। হিমালয় থেকে। শুনলাম গঙ্গাকিনারে তপস্যা করেন। যেন আগুনের মতো চেহারা। আর কী তাঁর বাণী! আমার মনের মধ্যে যেন প্রদীপ জ্বলে উঠল। মনে হল, এখনই চলে যাব এঁর সাথে। শিষ্যা হয়ে থাকব এঁর। জানব সেইসব আশ্চর্য কথা, যা উনি বলছিলেন। কিন্তু কাউকে কিছু বললাম না। তখন আমার বয়েস ১৭। নিজের মনকে তো বুঝতে হবে। আমি কি ওঁকে দেখে ভুলেছি? এই টান কি আমার অন্য কোনও আকাঙ্ক্ষা? একবছর মন লাগিয়ে পড়াশুনা করে গেলাম। কলেজের পড়া, যেসব কথা আমার মনে আলো জ্বেলেছিল, সেই পড়া। এমন নয় যে আমি কখনও শাস্ত্রের কথা শুনিনি। আমাদের বাড়িতে শাস্ত্র পড়া হত। একজন গুরুজি আসতেন ‘সাল মে একবার’। ভজন গান শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু এ যেন অন্যরকম ভাবে সবকিছুকে দেখা। সেই একবছর আমি নিজেকে অনেক পরীক্ষা করলাম। বুঝলাম। ‘এক সাল বাদ’ মাকে বাবাকে বললাম আমার সংকল্পের কথা– আমি সন্ন্যাস নিতে চাই। তাঁরা সব বোঝালেন যা কিছু মা-বাবারা বোঝান। কিন্তু আমি বাড়ি ছাড়লাম। সেখান থেকে হৃষীকেশ রুদ্রপ্রয়াগ হয়ে হেঁটে হেঁটে এখানে আসতে দুই বছর লেগেছিল। তবু একধ্যানে চলেছি। থেমেছি। আবার চলেছি। একদিন পৌঁছলাম। চারিদিকে ফাঁকা জায়গার মধ্যে দেখতে পেলাম আমার গুরুকে। পরদিন ভোরে গঙ্গাজিতে ডুব দিয়ে গিয়ে তাঁকে প্রণাম করলাম। বললাম কোথা থেকে এসেছি। বললাম তাঁর শিষ্যা হতে চাই আমি। তাড়িয়ে দিলেন। একেবারে কুত্তা খেদানোর মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন। এটা আমি ভাবিনি। অনেক কিছু ভয় ছিল। যদি খুঁজে না পাই, যদি রেগে যান আমার অযোগ্যতায়, যদি… আরও অনেক কিছু ভয়। কিন্তু এরকমভাবে তাড়িয়ে দেবেন, কিছু শুনবেনই না– এই কথা ভাবিনি। সেদিন পয়লা মনে হয়েছিল ওই গঙ্গাজিতে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে মরে যাই। এ কেমন গুরু যিনি শিষ্যের আগ্রহ বোঝেন না। কতদূর থেকে কত বাধা পার হয়ে এসেছি, শিখতে চাই বলেই তো– কিছুই ভাবলেন না? তবু মরলাম না। চলে গেলাম। গুরু ততক্ষণে নিজে উঠে চলে গিয়েছেন। দূরে একটা গুহা খুঁজে নিলাম। রয়ে গেলাম সেখানে। মেনে নিলাম এটাই আমার গুরুর শিক্ষা।

–কতদিন থাকলেন?

–তিন সাল।

–তিন সাল! কী করতেন সারাদিন?

–নদীর ধ্যান করতাম। রোদের আলোতে পুঁথি পড়তাম, রাত্রের অন্ধকারে গুহায় বসে সেগুলো আবার মনে করতাম। আমার চারিপাশে ভগবানের যত রূপ, তার মানে বুঝবার চেষ্টা করতাম, যেমনটা তিনবছর আগে শুনেছিলাম। কখনও নিচ থেকে কোনও ভগত এসে ভগবানের সব সেবককে ভাণ্ডারা দিত– কম্বল, চিঁড়ে। কখনও কিছু বইকিতাব। তাঁকে মাঝে মাঝে দেখতে পেতাম, ওপারে দূরে কোনও গাছের নিচে। কখনও গঙ্গামাইয়ার কিনারে উঁচু পাথরে বসে। সারাদিন ধ্যান করছেন।
তিন বছর পরে একবার শীতের আগে এক ভগত গরম চাদর নিয়ে এল। আমার গুহা একটু ওপরে, আড়ালে। তাকে আশীর্বাদ করলাম সে বলল, মহারাজজি তাকে এই দিকে দেখিয়ে দিয়েছেন। বলেছেন, ওইখানে এক মুরতি আছেন, তাকেও দিয়ে যেও। কী বলব, সেদিন আমার মনে যে কীরকম হয়েছিল। তিনি আমাকে ভুলে যাননি, এই লোকটিকে বলেছেন আমার শীতের চাদরের কথা। কয়েকদিন পর সটান তাঁর কাছে গেলাম। প্রণাম করে বললাম, যদি আমাকে শিষ্যা বলে মেনে না নেন, আমি আজকে গঙ্গায় ঝাঁপ দেব। সেই পাপ আপনাকে লাগবে।
তারপর থেকে আছি। এখানেই আছি। শুনলাম, তাঁর গুরুর শরীর গিয়েছে প্রায় ২০ বছর আগে। আমি তাঁকে দেখছিলাম। কঠিন ঠান্ডায় শুধু কপাল থেকে চিবুক আর হাতের পাতা দুটো ছাড়া সবই আলখাল্লার মতো পোশাকে ঢাকা। ফোলা ফোলা দুই হাতের চামড়ার নিচে শিরাগুলো দেখা যাচ্ছে, তার ওপরে যেন জল জমে আছে এরকম স্বচ্ছ মতো। স্পষ্টতই হার্টের সমস্যা। কথা বলতে একটু একটু হাঁপান।

–একাই থাকো এখানে? শীতে যখন সবাই নেমে যায়? 

–এখন আর থাকতে দেন না অন্যরা। উত্তরকাশীতে নেমে যাই। কিন্তু উত্তরকাশীও খুব ভিড় হয়ে যায়। থাকতে ইচ্ছা হয় না। এখানেই ভালো লাগে। যাবার সময় তো হচ্ছে, অন্য কোথাও গিয়েই বা কী হবে।

আবার দেখা হয়েছে দুই-একবার। কোনও ধর্ম বা দর্শনের আলোচনা করেননি, গল্প বলেছেন কেবল। গঙ্গাকে নিয়ে নানান কথা নানা কাহিনি। 

ফিরে এলাম তারপর। কাউকে বলাও হয়নি তাঁর কথা। 

কেবল কয়েক বছর পর হিমালয়ের সন্তান শ্রী উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের একটি পুরনো বইয়ে হঠাৎ চোখে পড়েছিল তাঁর ছবি। নামও ছিল। নিচে লেখা ছিল ইনি ভারতের অন্যতম শাস্ত্রজ্ঞ দার্শনিক সাধিকা।