Robbar

ভুলে যাওয়া অতল জীবন

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 29, 2026 6:04 pm
  • Updated:May 29, 2026 6:56 pm  

ছোটবেলায় কোনও এক মাস্টারমশাইয়ের মুখে শুনেছিলাম ‘আশ্রম’ শব্দটির নিহিতার্থ। যেখানে কেউ কাউকে শ্রম করতে নিষেধ করে না, সেই স্থানকেই নাকি ‘আশ্রম’ বলা হয়। এই আশ্রমেও আমাকে কেউ নিষেধ করেননি। আবার কিছু নির্দিষ্ট করেও বলেননি। নিজে থেকেই কিছু কিছু কাজ করতাম। কুঁয়ো থেকে জল তুলতাম। মন্দিরের সামনেটা ঝাঁট দিয়ে সাফ করতাম সকালবেলায়। কোনও কোনও দিন বিকেলে আরেকজন আশ্রমিকের সঙ্গে হাটে যেতাম।

সন্মাত্রানন্দ

৭.

কিন্তু আমি তাঁকে তাঁর পূর্বজীবনের কথা জিজ্ঞাসা করলাম, আর তিনিও সে-সব কথা আমাকে গড়গড় করে বলে গেলেন– ব্যাপারটা ঠিক এরকম নয়। নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে তাঁর ছিল ভীষণ অনীহা, কিছুটা বা সংকোচ। এবং সেই অপার রহস্যময়তা, যা তাঁর সহজ সরল মূর্তিটিকে ঘোমটার সোনালি পাড়ের মতো সতত ঘিরে রাখত। আমার অদম্য ঔৎসুক্যের উত্তরে সতী ভৈরবী শুধু বলেছিলেন সেদিন, “ওসব কথা পরে হবে। এখন কিছুদিন তুমি এখানে থাকো তো! তারপর কখনও সময়-সুযোগ হলে বলব ওসব। আগে তো দু’জনের আলাপ-পরিচয় হোক!”

কথাটা বলেই তিনি মধুর হেসেছিলেন, আজও মনে আছে বেশ।

অতএব, আমি এই আশ্রমে থাকতে আরম্ভ করলাম। এই জায়গাটা মুকুরটিলার চেয়েও অনেক বেশি সবুজ। খুব বিস্তৃত আশ্রম নয়। কিন্তু ছোট্ট জায়গাটি যেন সবুজ ঘাসের মখমলে মোড়া। ঘাসের মধ্য দিয়ে দেখা যায় নিম্নবর্তী মৃত্তিকার বুক রক্তিম নুড়ি, পাথরে আবরিত। বৃষ্টি হলে উঁচু জায়গা থেকে স্বচ্ছ জল নেমে এসে সেই তৃণগুল্ম, প্রস্তর, কঙ্করের ভিতর তিরতির করে বহে যায়। ঘাসজমির মাঝে মোরাম-ছড়ানো পথ, পথের দু’-পাশে হিজল, বকুল, ছাতিম, পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, মহানিম এবং আরও অন্যান্য নাম না-জানা গাছ উদাসী পথিকের মতো এখানে ওখানে স্থির দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওই সব গাছের তলায় তলায় কয়েকটি মাত্র মাটির ঘর, খড়ের চাল। আশ্রমে ঢোকার মুখে সংকীর্ণ খালের ওপর বাঁশের সাঁকো, যার কথা আমি আগেই বলেছি।

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

এখানে আপন মনে যথেচ্ছ ঘুরে বেড়াতাম। রাতে ঘুমতাম পূর্বকথিত সেই ঘরটিতে। আশ্রমে সতী-ভৈরবীকে নিয়ে সাকুল্যে ৮-১০ জন মাত্র লোক নানা বয়সের। সকলেই সতী-ভৈরবীর প্রতি সবিশেষ শ্রদ্ধাভক্তি সম্পন্ন।

কখনও আকাশ জুড়ে মেঘ ঘনিয়ে আসত বিকেলবেলায়, পেয়ারাপাতার আড়ালে জমে উঠত সান্দ্র অন্ধকার। আকাশ চিরে বিদ্যুতের চিকুর বারবার দেখা দিয়ে চকিতে নিভে যেতে থাকত, কানে তালা-ধরানো প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ত হঠাৎ। ধীরে ধীরে ঝুপ ঝুপ করে বৃষ্টি নামত সন্ধ্যায়। কেউ কোথাও নেই, আমি সেই নির্জন ঘরে একা বসে থাকতাম জানালার ধারে, তরল অন্ধকারে ডুবে যেত চারিদিক। কখনও ইচ্ছে হলে আসন থেকে উঠে হ্যারিকেন বাতিটা জ্বালতাম। কাজলকালো তমসায় আচ্ছন্ন সেই ঘরটাকে মৃদু আলোর স্পর্শে কেমন মায়াবী দেশের কোনও কালো ঘোমটায় ঢাকা কোমল মেয়ে বলে মনে হত আমার। হ্যারিকেনের চিমনি থেকে নিঃসৃত ঊর্ধ্বমুখ আলোর ময়ূখ ঘরের ভিতরের কঠিন আসবাবগুলোকে প্রণয়ভীত ব্রততীর মতো জড়িয়ে ধরে বিপরীতদিকের দেওয়ালে অনিয়ত ছায়া-সকলের জন্ম দিত মুহুর্মুহু। জানালাপথে ভেজা বাতাস চুপিপায়ে ঘরে ঢুকে হ্যারিকেনের উত্তল শিখার প্রান্ত-দু’টি যেন দু’হাতে ধরে দুই পাশে মৃদু মৃদু দোলাত; বিপ্রতীপে দেওয়ালের ছায়াগুলোও অবিরত আন্দোলিত হতে থাকত এপাশে-ওপাশে।

আরও রাত হলে বৃষ্টি থামত কখনও, কিছুক্ষণ পরে কোনও কোনও রাতে মেঘ সরে গিয়ে উজ্জ্বল চাঁদ লাফ দিয়ে বেরিয়ে আসত বৃষ্টিধোয়া আকাশের মাঠে, কালো বনের আড়ালে এতক্ষণ ধরে লুকিয়ে থাকা লাল চিতাবাঘের মতো। মধ্যনিশীথে খোলা জানালাটায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম, জলে ভেজা গাছপালা ঝোপঝাড়ের ভিতর সন্তর্পণে বনজ্যোৎস্না নেমে এসেছে, গুলঞ্চ গাছেদের আঁকাবাঁকা ডালগুলোর মধ্য দিয়ে উড়ে যাচ্ছে তরল আলোর ইতস্তত বিন্দু; সবুজ জোনাকির সেই জ্বলা-নেভা-ওঠা-পড়ার ছন্দ যেন কোন অসমাহিত রহস্যের সংকেতে আমাকে বুঝি বোঝাতে চাইত সতী ভৈরবীর জীবনের ভুলে যাওয়া অজানা যত কথা।

ছোটবেলায় কোনও এক মাস্টারমশাইয়ের মুখে শুনেছিলাম ‘আশ্রম’ শব্দটির নিহিতার্থ। যেখানে কেউ কাউকে শ্রম করতে নিষেধ করে না, সেই স্থানকেই নাকি ‘আশ্রম’ বলা হয়। এই আশ্রমেও আমাকে কেউ নিষেধ করেননি। আবার কিছু নির্দিষ্ট করেও বলেননি। নিজে থেকেই কিছু কিছু কাজ করতাম। কুঁয়ো থেকে জল তুলতাম। মন্দিরের সামনেটা ঝাঁট দিয়ে সাফ করতাম সকালবেলায়। কোনও কোনও দিন বিকেলে আরেকজন আশ্রমিকের সঙ্গে হাটে যেতাম। আশ্রমের রান্নাঘরের জন্য তরিতরকারি কিনে আনতাম আমরা হাট থেকে। রান্নার কাজে রাঁধুনিকে সাহায্য করতাম। সন্ধেবেলা মন্দিরে বসে ভাঙা বেসুরো গলায় ভজন গাইতাম।

এই সব কাজের ফাঁকে ফাঁকে কখনও কখনও সতী ভৈরবীর দেখা মিলত। দেখতাম, তিনি তাঁর মাটির কুটির থেকে বেরিয়ে কুর্চি ফুলের বড় গাছটার নীচ দিয়ে গোয়ালের দিকে যাচ্ছেন, সেখানে গোরুগুলোকে নিজে হাতে খাওয়াচ্ছেন। কখনও দেখতাম মন্দিরের পিছনে ফুলের বাগানে নিত্যপূজার ফুল তুলছেন, হাতে আধোফুলে ভরা সাজি। কুয়োটার থেকে ঘটিতে করে জল তুলে নিয়ে যাচ্ছেন মন্দিরের দিকে। একদিন দেখলাম, জনৈক প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে মাটির দাওয়ায় বসে হিসেবের খাতা দেখছেন। তাঁর চলাফেরা সবই সহজ। কোনও কাজের প্রতিই অবজ্ঞা নেই। অন্যত্র আমি দেখেছি, আমাদের দেশের কিছু কিছু ধর্মপ্রতিষ্ঠানে সাধু-সন্ন্যাসীদের মধ্যে এটা করব, ওটা করব না, এ-কাজটা ধর্মীয় কাজ, ও-কাজটা জাগতিক– এই ধরনের বিভেদবোধ কাজ করে। অর্থাৎ আধুনিক ভাষায়, সেকুলার আর সেকরেড– এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করার প্রবণতা বহু সাধু-সাধ্বী-মহাত্মার মধ্যেই দেখেছি। কিন্তু পাশাপাশি সতী ভৈরবীর মতো এমন অনেক উন্নত কোটির মানুষও আমি দেখেছি, যাঁরা এই সেকুলার আর সেকরেডের মধ্যে কোনও তফাত করেননি। তাঁদের চোখে সবটাই সেকরেড; সব কাজই পুজোর সমান। আন্তরিকতাই হল আসল কথা। সেই আন্তরিকতা থাকলে গবাদি পশুর সেবা করা, ঘর ঝাঁট দেওয়া, রান্না করা, জল তোলা, হিসেবের খাতা দেখা– সবটাই মন্দিরে বসে ভগবানের পূজা করারই শামিল হয়ে ওঠে।

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

কিন্তু এ রূপ বহিরঙ্গ, আরও এক অন্তরঙ্গ রূপ আছে, যা কখনও দিনানুদৈনিক জীবনযাপনের পাতার আড়াল থেকে নিহিত কোরকের মতো উঁকি দিত। সে-সব মুহূর্তে সেই সব অন্তরঙ্গ উন্মোচনের সাক্ষী থাকা খুবই সৌভাগ্যের ব্যাপার। এমনই এক দিন।

সেদিন আমি সকাল ১০টার সময় আশ্রম থেকে বেরিয়ে আশপাশে কোথায় যেন গিয়েছিলাম। ফিরলাম যখন, তখন দুপুর দেড়টা বাজে। দেরি হয়ে গিয়েছে বলে ভিতরে ভিতরে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিল। তাড়াতাড়ি হাত-মুখ ধুয়ে রান্নাঘরে গিয়ে হাজির হলাম। দেখলাম, আশ্রমের অন্য সকলেরই খাওয়া হয়ে গিয়েছে। রান্নাঘরের দাওয়ায় শুধু সতী-ভৈরবী খেতে বসেছেন। তিনি প্রতিদিনই সকলের খাওয়া হলে পরে নিজের হাতে সানকিতে খাবার বেড়ে নিয়ে খেতে বসতেন। আমি কাঁচুমাচু মুখে হাজির হয়েছি দেখে আমাকেও ইঙ্গিতে তাঁর মুখোমুখি আসন পেতে দাওয়ায় বসতে ইশারা করলেন। আমি তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম, একজনের জন্যে যথেষ্ট ভাত-তরকারিই আছে। সানকিতে ভাত-তরকারি বেড়ে নিয়ে বাইরে দাওয়ায় এসে তাঁর মুখোমুখি বসলাম। আচমন করে খেতে আরম্ভ করলাম। দু’জনেই চুপচাপ খাচ্ছি। কেউ কাছাকাছি নেই। রান্নাঘরের পিছনের বকুল গাছে বসে অদৃশ্য কোনও কোকিল ডাকছে মাঝে মাঝে। এছাড়া অন্য কোনও শব্দ নেই। ভরা দুপুর। চারিদিকে রোদ ঝাঁ-ঝাঁ করছে।

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

হঠাৎ দেখলাম, সতী-ভৈরবী কিছু খাচ্ছেন না। চুপ করে বসে আছেন ভাতের থালা সামনে নিয়ে। কী হল, বোঝার জন্যে তাঁর মুখের দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। আগেই লিখেছি, সতী-ভৈরবী ছিলেন মোটামুটি ফরসা, মুখমণ্ডল সবিশেষ গৌর। অথচ সেই মুহূর্তে তাঁর মুখখানা যেন গাঢ় মসীবর্ণ ধারণ করেছে। কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুরের চিহ্ন যেন আরও বেশি জ্বলজ্বল করছে। চোখে তো তাঁকে কাজল পরতে দেখিনি আগে, কিন্তু সেদিন দেখলাম, কাজল পরেছেন। চোখদুটোও আধবোজা। মুখে কেমন একটা লাজুক হাসি নিয়ে সামনে পিছনে মৃদু মৃদু দুলছেন যেন। এই সতী-ভৈরবীকে আমি এর আগে দেখিনি কখনও। কেমন যেন ভয়-ভয় করতে লাগল আমার। বুক দুরু দুরু করে উঠল। একবার ভাবলাম, অন্যদের ডাকব। তারপর চিন্তা করলাম, কাছাকাছি কেউ নেই যে, আমার ডাক শুনে কাছে আসবে। সেক্ষেত্রে আমাকেই এখান থেকে উঠে তাদের ডাকতে যেতে হবে। ইতিমধ্যে সতী-ভৈরবীর যদি কিছু হয়ে যায়, যদি অজ্ঞান হয়ে যান বা অসুস্থ হয়ে পড়েন ইত্যাকার বহুবিধ আশঙ্কা মনে কাজ করতে লাগল। এ-অবস্থাটা কীরকম, সতী-ভৈরবীর আসলেই কী হয়েছে, কী করা উচিত এমতাবস্থায়, তার কিছুই আমি জানি না। আমি সভয়ে ডাকতে লাগলাম, ‘সতী-মা, সতী-মা!’

এর আগে আমি তাঁকে কখনও ওই সম্বোধনে ডাকিনি। কোনও সম্বোধনেই ডাকতাম না তাঁকে। কিন্তু তখন এমন অবস্থা যে, সবাই আশ্রমে তাঁকে যে-নামে ডাকে, আমিও সেই নাম ধরেই ডাকছিলাম।

কিছুক্ষণ ডাকার পর তাঁর যেন কিছুটা হুঁশ ফিরল। সামান্য চোখ মেলে আমার দিকে অস্পষ্টভাবে চাইলেন। মুখে সেই অপ্রস্তুত হাসি। আমার মুখপানে চেয়ে স্খলিত অথচ বড় মধুর স্বরে বললেন, ‘খাইয়ে দে!’

অনুরূপ অবস্থায় সতী-ভৈরবীর জায়গায় অন্য কোনও মেয়েমানুষ হলে তাকে নিজে হাতে করে খাওয়াতে আমার অস্বস্তিই হত। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর প্রতি আমার মনে স্নেহ, প্রীতি, ভক্তি, ভালোবাসা ও ভয়ের এক বিচিত্র বিপরীতমুখী ভাবসকল উদিত হচ্ছিল। এমন বিরোধী ভাবসমূহের আলোড়নে চিত্ত অশান্ত হয়ে ওঠারই কথা, অথচ কী আশ্চর্য, সেই মুহূর্তে আমার মন যেন গভীর শান্তিতে ডুবে যাচ্ছিল। ছোট ছেলে বা মেয়েকে যেমন করে লোকে খাইয়ে দেয়, ঠিক সেভাবেই আমিও ডালভাত-তরকারি মাখা গরাস নিজের হাতে তুলে তাঁকে খাইয়ে দিতে লাগলাম। তিনিও ‘লোকখি’ মেয়েটির মতো নিশ্চিন্ত হয়ে আমার হাত থেকে খেতে লাগলেন। এভাবে আরও কিছুক্ষণ খাওয়ার পরে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে যেন ইঙ্গিতে আর খাওয়াতে নিষেধ করলেন। তারপর নিজে হাতে এক গ্রাস আরও মেখে খেলেন, আমার মুখেও এক গ্রাস সস্নেহে তুলে দিলেন। অতঃপর আমার আপত্তি সত্ত্বেও তাঁর ও আমার উচ্ছিষ্ট পাত্র তুলে নিয়ে কুয়োতলার দিকে বাসন ধুতে চলে গেলেন।

ব্যাপারখানা কী যে হল, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। সেদিন সারাটা দিন সারাটা রাত আমি ঘটনাটা নিয়ে ভাবতেই থাকলাম। যদিও কোনও উত্তরই পেলাম না। খেতে খেতে কী হয়েছিল সতী-ভৈরবীর? আমাকে অমন করে খাইয়ে দিতে বললেন কেন? আমারই বা ঠিক কী হয়েছিল তখন?

উত্তর পেলাম না কিছুই, তবু ওই ঘটনায় সতী-ভৈরবীর প্রতি এক সুগভীর আবেগ আমার অন্তরলোককে উন্মথিত করতে লাগল। আমি নিতান্তই হৃদয়হীন পাষণ্ড, জীবনে কখনও কাউকেই আমি ভালোবাসিনি। কারও প্রতি দুর্বলতাও অনুভব করিনি। একা একা বেঁচে থাকার আনন্দ ছাড়া আমার আর অন্য কোনও অবলম্বন নেই এ-পর্যন্ত। অথচ সতী-ভৈরবীর প্রতি এ আমার কী হল? মনে হল, আমি ছাড়া তাঁকে রক্ষা করার, আগলে রাখার কেউ নেই। এক গভীর স্নেহ-করুণার বোধ আমাকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম, আমি তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসছি। গভীর গভীর!

কিন্তু মনের এক অংশ প্রশ্ন তুলল, “একেই কি ‘ভালোবাসা’ বলে? একেই কি ‘প্রেম’ বলা যায়? কী নামে একে ডাকা উচিত?”

মনের অপরাংশ উত্তর দিল, ‘কোনও নামে ডাকাটাই কি প্রয়োজনীয়? তৃষ্ণার্ত মানুষ জল পান করলে তৃষা তৃপ্ত হয়। তখন কি তার জন্য এটা জানা জরুরি হয়ে ওঠে যে, জল কাকে বলে? তা মৌলিক, নাকি যৌগিক?’

মনের প্রথম অংশ অমনি বলে উঠল, “আরে থামো, থামো! প্রেমে অভিভূত হয়ে পড়েছ, তাই সব যুক্তিচর্চাকে নাকচ করে দিচ্ছ। ভালোভাবে মনে করে দেখো, এসব বিষয়ে কী বলা হয়েছে? যুক্তি বা আলোচনার শুরুতে কোনও বস্তুর সঠিক স্বরূপ ও লক্ষণ নির্ধারণ করাকেই সংজ্ঞা বলা হয়। এসব অত্যন্ত জরুরি। অভিধেয়ত্বং পদার্থ-সামান্য-লক্ষণম্‌। ‘তর্কদীপিকা’ মনে নেই?”

মনের অপরাংশ অমনি দু’হাতে কান চেপে ধরে বলে উঠল, ‘না, না, না। আমি এখন এসব শুনব না, শুনব না, শুনব না!’

……………. আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব …………….

১। ওধারে এক আগন্তুক

২। অন্ধকারে, মৃতদেহ কাঁধে 

৩। ধুলামলিন লাইব্রেরি

৪। সতীর সন্ধানে

৫। ডানায় মুক্তির গন্ধ

৬। স্বপ্ন কি সত্যি নয়?