Robbar

আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি…

Published by: Robbar Digital
  • Posted:May 28, 2026 5:37 pm
  • Updated:May 28, 2026 5:37 pm  

শিল্পসত্তা যুগে যুগেই শিল্পকে বেছে নেয় প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। নৃত্যশিল্পী সীমাও তার ব্যতিক্রম নন। একটা দীর্ঘসময়  নৃত্যের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে শান্তি আর সাম্যের বার্তা প্রচারের কাজে অতিবাহিত করার পর ২০০৫ সালে মনোনীত হয়েছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য। বিশ্বশান্তির এই মন্ত্র প্রচার-যজ্ঞে আপন জীবনে যদিও কোনওদিনই সেভাবে শান্তি পাননি তিনি। পাকিস্তানের অলিতেগলিতে নানা সময় তাঁর বিরুদ্ধে নানা দেশদ্রোহী ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে; পোশাক হিসেবে শাড়ি, আর প্রসাধন হিসেবে টিপকে বেছে নেওয়ার জন্য নানা মহল থেকে তাঁকে ‘হিন্দু’ এবং ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়া হয়েছে।

প্রহেলী ধর চৌধুরী

সীমা কিরমানি সূর্যের এক নাম।
সে নাম পাকিস্তানের বুকে,
ভারতনাট্যম নাচে;
পাকিস্তানের বুকের ভেতর
‘আউরত মার্চ’ হাঁটে।
আঠাশ বছর বয়সে সীমা নারীমঞ্চ বাঁধে,
যত ‘অইসলামিক’ কর্মের ভার তারই বুকে আর কাঁধে।
তাই পঁচাত্তরে এসে,
সীমা গনগনে রোদে হেসে,
প্রেস ক্লাব থেকে গ্রেফতার হয়
অজানা, অনামা কেসে।

এই ৫ মে, সীমা কিরমানি গ্রেফতার হলেন। এটা কোনও আশ্চর্যের ব্যাপার নয়। গত অর্ধ শতকেরও বেশি সময় ধরে, সেই সাতের দশক থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, পুলিশের গ্রেফতারি পরোয়ানা পকেটে পুরে পথ চলেন তিনি।

সীমা কিরমানি

বিগত অর্ধশতক এভাবেই চলেছেন। তাই আজ ৭৫-এ এসে রাষ্ট্রের সঙ্গে এই গ্রেফতারি নামক চোর-পুলিশ খেলা তাঁর পুরনো অভ্যাস। এসব তাঁকে বিচলিত করে না আর। তাঁর লক্ষ্য বৃহত্তর, তাঁর লক্ষ্য– কাজ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অসাম্যের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবিরাম লড়ে যাওয়ার কাজ। মনে পড়ে যায়, ১৯৬২ সালে প্রিটোরিয়ার ওল্ড সিনাগগ কোর্টের ‘ব্ল্যাক ম্যান ইন আ হোয়াইট কোর্ট’ নামে খ্যাত ট্রায়ালে নেলসন ম্যান্ডেলার সেই উক্তি– ‘সরকারের রক্তচক্ষু আমাদের ভয় পাওয়ায় না, ভাবায়ও না; কারণ আমাদের কিছু কাজ আছে, আর তা আমাদের করতেই হবে।’ মনে পড়ে যায় গান্ধীজির কথা– ‘কাজটা কতটা বড়, সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, কাজটা করে যাওয়া।’

নেলসন ম্যান্ডেলা

বিশ্বের সব প্রতিবাদী সুর এই একই টিউনে বাঁধা। সীমা কিরমানিরা সেজন্যই গোটা জীবন দিয়ে লড়ে যান। আস্ত এই পৃথিবীটা যখন ক্রমাগত নিজের ভাগের সুখটুকু বুঝে নেয় মাপে মাপে, ইচ্ছে মতো পাল্টে নেয় ন্যায়নীতির মাপকাঠি, বদলে দেয় ঠিক-ভুলের সংজ্ঞা, তখন কিরমানিদের স্বপ্নের এই লড়াইটুকু লড়ে যাওয়াই বড় কথা।

পেশায় নৃত্যশিল্পী– ভরতনাট্যম আর ওড়িশি নৃত্যে বিশ্বখ্যাত কিরমানির লড়াইয়ের মঞ্চ স্থাপিত হয় ১৯৭৯-এ। নাম, তেহরিক-ই-নিসওয়ান; নারী আন্দোলন। সামরিক শাসন আর ধর্মীয় রক্ষণশীলতার ঘেরাটোপে আবদ্ধ পকিস্তানের বুকে শিল্পের অধিকার আর লিঙ্গসাম্যের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয় এই প্রতিষ্ঠান। কারণ সেই সময়, অর্থাৎ, ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়া-উল-হক প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে পাকিস্তানে শরিয়া আইনের কঠোর প্রয়োগ শুরু হয়। নৃত্যশিল্পকে ‘হারাম’ এবং ‘অইসলামিক’ ঘোষণা করে ফতোয়া জারি হয়। ১৯৮০ সালে নৃত্যশিল্পকে সরকারিভাবে নিষিদ্ধও করা হয়। এরই প্রতিবাদে, শিল্পের স্বাধীনতা রক্ষার্থে কিরমানির তেহরিক-ই-নিসওয়ান মঞ্চ কাজ শুরু করে।

তেহরিক-ই-নিসওয়ানের হয়ে মঞ্চে পারফর্ম করছেন সীমা কিরমানি

১৯৮৪ সালে, এক বন্ধুর বাড়িতে ১০০ জন দর্শকের সামনে নৃত্য পরিবেশনা দিয়ে সীমা কিরমানির নারী আন্দোলন মঞ্চের পথ চলার শুরু। তখন প্রতিটি অনুষ্ঠান, প্রতিটি নৃত্য, প্রতিটি নাটক পরিবেশনার আগে সরকারের কাছ থেকে তাঁকে নো-অবজেকশন সার্টিফিকেট নিতে হত। এবং বলা বাহুল্য, কাজটা সহজ ছিল না। তবু এই কঠিন কাজটাই সীমা করে গিয়েছেন দিনের পর দিন; প্রতিটি প্রকাশ্য পরিবেশনার আগে ওই কাগজটুকু সংগ্রহ করাকে নিজের কাজের অঙ্গ ভেবে নিয়েছিলেন তিনি। বস্তুত, সমাজে ব্রাত্য হিসেবে দেগে যাওয়ার জন্য সেই সময় সীমা কিরমানির নৃত্যশিল্পী পরিচয়টুকুই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আগেই বলেছি, সীমা কিরমানি সূর্যের এক নাম। তাই নিষেধাজ্ঞার গণ্ডি আর প্রাণনাশের হুমকি পেরিয়ে সকল অন্ধকারের ওপর তাঁকে ছড়িয়ে পড়তেই হত। পড়লেনও। তেহরিক-ই-নিসওয়ানের মঞ্চ নিয়ে উপস্থিত হলেন পাকিস্তানের গ্রামে-গ্রামে, শহরে-শহরে। সেখানে নৃত্যানুষ্ঠান করতে গিয়ে, একদিকে যেমন স্থানীয় দর্শকদের সঙ্গে বাল্যবিবাহ, অনার কিলিং, ধর্ষণ, অনিরাপদ গর্ভপাতের মতো সামাজিক অভিসম্পাত নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন, অন্যদিকে, তেমনই ‘আন্তিগোনে’ থেকে লোরকার ‘হাউস অব বার্নার্ড আলবা’, কিংবা ভারতীয় নাট্যকার বিজয় তেণ্ডুলকরের নাটক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে লিঙ্গপ্রান্তিকতার ভয়াবহ অবস্থান চিত্রও তুলে ধরলেন।

মুক্তডানা: মধ্যমণি সীমা কিরমানি

আসলে শিল্পসত্তা যুগে যুগেই শিল্পকে বেছে নেয় প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে। নৃত্যশিল্পী সীমাও তার ব্যতিক্রম নন। একটা দীর্ঘসময়  নৃত্যের মাধ্যমে গোটা বিশ্বে শান্তি আর সাম্যের বার্তা প্রচারের কাজে অতিবাহিত করার পর ২০০৫ সালে মনোনীত হয়েছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য। বিশ্বশান্তির এই মন্ত্র প্রচার-যজ্ঞে আপন জীবনে যদিও কোনও দিনই সেভাবে শান্তি পাননি তিনি। পাকিস্তানের অলিতেগলিতে নানা সময় তাঁর বিরুদ্ধে নানা দেশদ্রোহী ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে; পোশাক হিসেবে শাড়ি, আর প্রসাধন হিসেবে টিপকে বেছে নেওয়ার জন্য নানা মহল থেকে তাঁকে ‘হিন্দু’ এবং ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে নির্মিত এই মিথ্যা প্রচার সহজও ছিল। কারণ, একদিকে যেমন পাকিস্তানে বসবাসকারী সংখ্যালঘু হিন্দুদের হয়ে তার আগে দীর্ঘদিন তিনি কাজ করেছেন, অন্যদিকে তেমনই তাঁর বাবা-মা-এর পূর্বজরা যথাক্রমে ভারতবর্ষের লখনউ এবং হায়দরাবাদের বাসিন্দা ছিলেন। বস্তুত, ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ওপর সীমার আগ্রহ তৈরিই হয় ছোটবেলায় স্কুলের ছুটিতে হায়দরাবাদে দিদার বাড়িতে ঘুরতে এসে।

যদিও শিল্প আর সত্যকে কোনও দিন দেশ আর ধর্মের গণ্ডিতে বাঁধতে চাননি তিনি। একদিকে যেমন ভারতনাট্যম বা ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে জীবনভর তার চর্চা করেছেন, অন্যদিকে পাকিস্তানকেই সারা জীবন নিজের দেশ বলে সম্মান করেছেন। তাঁর অগ্রজ বা অনুজ শিল্পীরা যখন মুক্ত শিল্পচর্চার লক্ষ্যে দেশান্তরি হচ্ছেন একে একে, তখন জোয়ারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে সীমা রয়ে গিয়েছেন পাকিস্তানে। বলেছেন, ‘এটাই আমার দেশ, আমার ঐতিহ্য, আমার সংস্কৃতি।’

যে-শিল্পী শিল্পের স্বার্থে দেশের মাটি ছাড়ে না, আর্মি ব্রিগেডিয়ারের মেয়ে হয়েও দেশদ্রোহী তকমা পায়; সে বিপ্লবী না-হয়ে যায় না। সে রাষ্ট্রের রক্তচক্ষু অবজ্ঞা করে রাষ্ট্রের জন্য প্রাণপাত করে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতে গ্রেফতার হবে– এটাই তার নিয়তি। যেমনটা হল ৫ মে।

গ্রেফতারের পর সীমা কিরমানি

পাকিস্তানে আসন্ন ‘অউরত মার্চ’-এর জন্য ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’-এর আবেদন করার আগে, সেই সংক্রান্ত একটি প্রেস কনফারেন্সে যোগ দিতে করাচি প্রেস ক্লাবে যান সীমা কিরমানি। প্রেস ক্লাবে ঢোকার মুখেই হিজাবে মুখ ঢাকা মহিলা পুলিশবাহিনী তাঁকে গ্রেফতার করে। যদিও ভিডিও-র দর্শকমাত্রেই জানেন যে, সেদিনের ওই হিজাব পরিহিতা মহিলা পুলিশরা ছিলেন দাবাখেলার বোরের মতো আজ্ঞাবহর ভূমিকায়; নেহাত মহিলা প্রতিবাদীকে মহিলা পুলিশ ছাড়া গ্রেফতার করা যাবে না, তাই। এই গ্রেফতারির মূল কান্ডারি ছিলেন ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট নাসির আফ্রিদি, যিনি সীমাকে গ্রেফতার করলেও স্পষ্টভাবে গ্রেফতারির কারণ দর্শাতে পারেননি, অ্যারেস্ট ওয়ারেন্টও দেখাতে পারেননি।

অতঃপর, এই বলপূর্বক গ্রেফতারির প্রতিবাদ পাকিস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে গোটা এশীয় মহাদেশে ছড়িয়ে পড়লে এবং বিষয়টি নিয়ে তীব্র চর্চা, ধিক্কার ও সমালোচনা শুরু হলে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী নড়ে বসে। শেষমেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জিয়াউল হাসানের তত্ত্বাবধানে সীমা কিরমানি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের শুধু মুক্তিই দেওয়া হয় না, গ্রেফতারকারী ডেপুটি সুপারিন্টেন্ডেন্ট নাসির আফ্রিদিকে কর্মক্ষেত্র থেকে সাসপেন্ডও করা হয়।

 

তাই সীমা কিরমানির মুক্তি শেষ পর্যন্ত কেবল একজন প্রতিবাদী শিল্পীর মুক্তি নয়; এটি রাষ্ট্রযন্ত্র বনাম গণপ্রতিবাদের যুদ্ধে গণতন্ত্রের জয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের অনাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা গণআন্দোলন ঠিক এভাবেই নিমেষে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পরাভূত করতে পারে। নেলসন ম্যান্ডেলা থেকে মহাত্মা গান্ধী, সেই অবিরাম লড়াইয়ের কথাই বলে গিয়েছেন। সীমা কিরমানিরা তাঁদের যোগ্য উত্তরাধিকারী।

আর আমরা? বাকিরা? অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের খানিকটা দায় মানুষ হিসেবে আমাদেরও কি থেকে যায় না?

………………………

রোববার.ইন-এ পড়ুন প্রহেলী ধর চৌধুরী-র অন্যান্য লেখা

………………………