Robbar

যে দিন ভেসে গেছে

Published by: Robbar Digital
  • Posted:June 12, 2026 7:54 pm
  • Updated:June 12, 2026 8:27 pm  

এই তো তুমি আমাকে দেখছ, এখন যেমন হয়েছি। বুঝতে পারো নিশ্চয়ই, যখন প্রথম যৌবন এসেছিল, হবে তখন আমার ১৫-১৬ বছর বয়স, শরীরটা খুব সুন্দর হয়ে উঠেছিল হঠাৎ। পাঁক-দঁক থেকে প্রকৃতিদেবী কুমুদ ফুল ফোটায়, আমি তখন কর্দমাবিল পুষ্করিণীর প্রথম কুমুদিনী। আর এই সুন্দর হয়ে উঠেই মনে হয়েছিল আমার, কী যেন একটা ভয়ানক অপরাধ করে ফেলেছি!

সন্মাত্রানন্দ

৯.

জন্মেছিলাম বাগদির ঘরে। বাগদি, মুচি, ডোম, হাঁড়ি প্রভৃতি– এরা সব হিন্দু সমাজের ‘ছাঁচতলা’ হিসেবে পরিগণিত। রক্ষণশীল হিন্দুদের একটা বড় অংশ– অন্যান্য ধর্মের মানুষকে যতটা পর ভাবে– তার থেকে  অনেক বেশি পর বলে ভাবে, অনেক বেশি ঘৃণা করে হিন্দু সম্প্রদায়েরই অন্তর্গত এই নীচু জাতের মানুষদের। এটাই হিন্দুদের ভিতর থেকে দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ। এদিকে আবার কাঠ কাটা, জল বওয়া, চাষবাস করা, ঘরের কাজ সারা… যাবতীয় শারীরিক পরিশ্রমের কাজগুলোতে এই ছোট জাতের লোকদের না-হলে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের চলে না। ভাত খেতে হাতের আঙুল লাগে, মাটির ওপর দিয়ে চলে ফিরে বেড়াতে হলে পায়ের পাতার দরকার, এখন খাওয়ার সময় যদি আমি আমার আঙুলগুলোকে ঘেন্না করি, চলার সময় যদি পায়ের ওপর ঘেন্না হয়, তাহলে ধীরে ধীরে নিজের সমস্ত জীবনটার ওপরেই ঘেন্না ধরে যায়। হিন্দুদের ঠিক তাই হয়েছে। এটা  ঠিক যে, এই সব ভেদাভেদ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ কমে আসছে, তবে হাজার হাজার বচ্ছরের ঘৃণার পাহাড় কি আর ১০-২০ বা ৩০ বছরের চেষ্টায় কমে? এই ঘৃণার স্তূপ ধ্বংস করতে হলে চাই আধ্যাত্মিক উপলব্ধির দুরন্ত আগুন। এক ঢিপি ছেঁড়া ন্যাকড়ার যম শুধু একটি আপাত-নিরীহ দেশলাই কাঠি। শুধু চ্যাঁচামেচি, দাঙ্গা-হাঙ্গামা করে আর নিজেদের মহিমা ঘোষণা করে সেই উপলব্ধি আসে না। চ্যাঁচামেচিতে শক্তি ক্ষয় হয়, মন বহির্মুখী হয়, নিজের মহিমা ঘোষণা করে অহংকার বৃদ্ধি পায়, কোনও উপলব্ধি অর্জনই সম্ভব হয় না। উপলব্ধির জন্য শান্ত হতে হয়, স্থির হতে হয়।

দ্যাখো, কী বলতে বসে কী বলতে লেগেছি!… জন্মেছিলাম বাগদির ঘরে। ছোটবেলাতেই মা-বাপ মরে গেল। আমতলিতে আমার মামাঘর; সেখানেই মামাদের আশ্রয়ে মানুষ হয়েছিলাম। খুব আদরে নয়, মা-বাপ মরা মেয়ের ওপর গরিব ঘরে অনাদর উপেক্ষাই জোটে। আমারও তাই-ই হয়েছিল। তোমাকে তো আগেই বলেছি, মুকুরটিলায় পাতা কুড়তে যেতাম, উনুনের জ্বালানি জোটানোর জন্য। এছাড়াও অত ছোট বয়স থেকেই মামাদের রান্না করতাম, ঘর ঝাঁট দিতাম, বাসন মাজতাম, গরুগুলোকে খাওয়াতাম নাওয়াতাম, অনেক দূরের কুয়ো থেকে জল তুলে আনতাম। এককথায় ঘর-গেরস্থালির সমস্ত কাজই করতাম। কাজে ফাঁকি দিয়ে খেলতে গেলে মামা-মামি মুখ করত, চড়চাপড়ও কম খাইনি। প্রাইমারি ইশকুলে ক্লাস ফোর অবধি পড়ার পরে মামারা ইশকুল ছাড়িয়ে দিল, বলল, ওর আর অত লেখাপড়া করে কী হবে? তা যাই হোক, গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ছোটকালটা আনন্দেই কেটে গিয়েছিল। কিন্তু বিপদ হল, যখন যৌবন এল।

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

এই তো তুমি আমাকে দেখছ, এখন যেমন হয়েছি। বুঝতে পারো নিশ্চয়ই, যখন প্রথম যৌবন এসেছিল, হবে তখন আমার ১৫-১৬ বছর বয়স, শরীরটা খুব সুন্দর হয়ে উঠেছিল হঠাৎ। পাঁক-দঁক থেকে প্রকৃতিদেবী কুমুদ ফুল ফোটায়, আমি তখন কর্দমাবিল পুষ্করিণীর প্রথম কুমুদিনী। আর এই সুন্দর হয়ে উঠেই মনে হয়েছিল আমার, কী যেন একটা ভয়ানক অপরাধ করে ফেলেছি!

আমার প্রতি সেই গাঁয়ের পুরুষ লোকেদের দৃষ্টি পালটে যেতে লাগল। কেমন অচেনা হয়ে গেল সবাই। আগে ছেলেমেয়ে সবার সঙ্গেই খেলতাম, মিশতাম। এখন মেয়েদের সঙ্গেই মেশা ছাড়া আমার অন্য উপায় রইল না। মেয়েরাও নিজেদের মধ্যে কানাকানি করত আমাকে নিয়ে। আমি নাকি অনেককে মজাব! আমার কথা নাকি সবাই বলাবলি করে। জোয়ান-বুড়ো সব রকমের চোখেই সেই এক চোরা আগুন। কোনও আত্মীয়তা, স্নেহ-মায়ার সম্পর্ক কিছুই কিছু নয়। পুরুষের চোখে তীব্র লালসার দৃষ্টির ব্যতিক্রম খুব বেশি যে দেখেছি, তা নয়।

ভিড় বাসে চেপে কোথাও যাওয়া, মেলার বা বাজারের ভিড় ঠেলে হাঁটা… সমস্তই বিপজ্জনক হয়ে উঠল আমার জন্য। উত্যক্ত করার সুযোগ পেলে ছাড়ত না কেউই। কোথাও বেড়াতে গেলে গায়ে পড়ে আলাপ করা দেখতে দেখতে বিরক্তি ধরে গেল। রাগও হত, কিন্তু কিছুই করতে পারতাম না। আমাদের ওদিকের গাঁয়ে ঝুমুরের আসর বসত। কখনও বাউল-বাউলানিরাও আসত। যাত্রাও দেখেছি অনেক রাত জেগে। কিন্তু এখন এসব আসরে আমাকে খুব সাবধানে থাকতে হত। যে একা, সে বোকা। তাছাড়া মেয়েদের মাথার পিছনে আরও দুটো চোখ আছে, জানো তো? অশুচি লালসার্ত দৃষ্টি খোলা কাঁধে, পিঠে বা আর কোথাও এসে পড়লেও আমরা ঠিকই টের পেয়ে যাই। ওই বয়সে আমার কেন জানি মনে হত, আড়াল থেকে কারা আমাকে দেখে চলেছে অবিরত, চোখ দিয়ে অবিরত আমাকে শুষে চলেছে। আমার সেই মনে হওয়াটা যে নিতান্ত মনের ভুল নয়, অগুনতিবার তার প্রমাণ পেয়েছি।

ও গাঁয়ে সত্যিকার মানুষ ছিলেন একজনই; নারায়ণকাকু। নারায়ণ চক্রবর্তী বা নারায়ণ কবিরাজ, তুমি যাঁর কাছে আমার কথা প্রথম শুনেছ। চারিপাশের ব্যাপার-স্যাপার দেখে উনি আমার জন্য ভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। পাড়াগাঁয়ে প্রসূতি মায়েরা অনেকেই এখনও হাসপাতালে ভর্তি হয় না, আর ওই গাঁয়ে একটা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও নেই কাছেপিঠে। নারায়ণকাকু চাইলেন, আমি ধাত্রীবিদ্যা শিখি। ভাগীরথী বলে একজন বয়স্ক মহিলা ছিলেন গাঁয়ে, তিনিই আমতলি, কুলতলি এবং আশেপাশের গাঁগুলোতে ধাই-মার কাজ করতেন। নারায়ণকাকু সেই ভাগীরথীকে বললেন, আমাকে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যেতে, আমাকে সব কাজ শেখাতে। আমিও তাঁর সঙ্গে যেতে লাগলাম। এতে আমার মামাদের বিশেষ আপত্তি ছিল না, যেহেতু এ-কাজে ভালোই আয় হত। কিছুদিনের মধ্যেই আমি ধাত্রীবিদ্যা অনেকটাই শিখে গেলাম।

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

মনে পড়ে, ভাগীরথী-পিসি বলে দিয়েছেন, ভোররাতে আমাদের বেরিয়ে পড়তে হবে ভিনগাঁয়ে। তার জন্য একখানা কাপড় কেচে সন্ধ্যায় উঠানের তারে মেলে দিয়েছি, রাতের বাতাসে শুকিয়ে যাবে কাপড়টা, খুব জ্যোৎস্না উঠেছে সে-রাতে, জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বাড়িয়ে মাঝে মাঝে দেখছি কেমন সেই কাপড়টা ধবল জ্যোৎস্নার ভিতরে দুধের সরের মতো শুকিয়ে আসছে…

কিন্তু সেই ধাইয়ের কাজ করতে গিয়েই পরগাঁয়ে হল আরেক বিপদ। তখন আমি একা একা ধাত্রীর কাজ করতে শিখে গিয়েছি। এখানেও একাই গিয়েছিলাম। এমনটা নয় যে, বাচ্চা হওয়ার সময়টুকুতেই ধাই-মা প্রসূতির কাছে থাকে। অনেক সময় শিশুজন্মের কয়েকদিন আগে থাকতেই প্রসূতির কাছাকাছি থাকতে হয়, কখন ব্যথা ওঠে, আগে থেকে বলা যায় না। কখনও বা তাদের বাড়িতেই থাকতে হত একটা-দুটো দিন। সেবা-শুশ্রূষাও করতে হত। এখানেও তেমনই হয়েছিল। বউটা একটু বেশি বয়সের ভরা পোয়াতি, তার স্বামীর বয়স হবে তা বছর চল্লিশেক। লোকটাকে দেখে প্রথমে আমি তেমন কিছু বুঝতে পারিনি।

একদিন দুপুরবেলা কাঠের উনুনে দুধ জ্বাল দিচ্ছি, হঠাৎ মনে হল, পিছনে যেন কে! ঘুরে দেখি, সেই লোকটা। রান্নাঘরে কী না কি কী চাইতে এসেছে বলল। সে কখন আমার একেবারে পিছনে চলে এসেছে, হাতখানেক মাত্র ব্যবধান, কিছু বোঝার আগেই আমাকে পিছন থেকে দু’-হাতে জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছে যেন… বোঝামাত্রই চিল-চিৎকার দিয়ে আমি সেই ঘর থেকে কোনওমতে ছুটে বেরিয়ে এলাম। হাঁপাতে লাগলাম। বুঝতে পারছিলাম, কী হতে যাচ্ছিল। নিজের পোড়া রূপের উপর ধিক্কার দিচ্ছিলাম মনে মনে। আর মনে হচ্ছিল, আমাকে সবাই এত সস্তা ভাবে কেন?

সে-বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে সেই গ্রামের শিবমন্দিরের সামনের আটচালায় পড়ে পড়ে কাঁদছিলাম সেদিন। কাউকে বলতে পারছি না, কী হয়েছে। একে তো অন্য গ্রাম, তার ওপর ওকথা বললে লোকে আমাকেই দুর্নাম দেবে। অনেক ভেবেচিন্তে স্থির করলাম, মেয়েটার তো কোনও দোষ নেই। তার এই ভরা বিপদের দিনে আমি এ-গ্রাম ছেড়ে এখনই চলে গেলে, মেয়েটির প্রতি ভয়ানক অপরাধ করা হবে। তখন সেই আটচালাতেই তে-রাত্তির পড়ে থেকে, বাচ্চা হওয়ার সময়টাতে ওদের বাড়ি গিয়ে কোনওমতে সেই মেয়েটির প্রসব করিয়ে আমতলি ফিরে এসে বাঁচলাম।

এই সব তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাকে ভিতরে ভিতরে দুর্বল করছিল। ভাবতাম, কোনওমতে যদি এই গাঁ-গঞ্জ ছেড়ে শহরে কোনও কাজ নিয়ে চলে যেতে পারি।

আমাদের গাঁয়ে জ্যৈষ্ঠমাসে বড় করে কালীপূজা হত। ভাবছ, জ্যৈষ্ঠমাসে কীসের কালীপূজা? ফলহারিণী কালীপূজা গো, ফলহারিণী কালীপূজা! ওই সময়ে আমাদের গাঁয়ে মেলা হত। একদিন দু’-দিন নয়। সাত-সাতদিন ধরে মেলা! বাইরে থেকে কত দোকানদানি আসত। মিষ্টির দোকান, মাদুরের দোকান, জামাকাপড়ের দোকান, রান্নার বাসন-কোসনের দোকান… আরও কত কী! মেলা বসত ইশকুলের মাঠে। ধাইয়ের কাজ করে মামা-মামির শ্যেনদৃষ্টি থেকে আড়াল করে ক’-টা টাকা মাত্র জমাতে পেরেছিলাম। সাধ হল, মেলায় একটা সুন্দর কাপড় কিনব। পুরনো কাপড়গুলোর রং জ্বলে গিয়েছে।

তো সেই মেলায় বসেছে এক কাপড়ের দোকান। নামটা এখনও মনে আছে। আদি অমৃত বস্ত্রালয়। দোকানের অন্যান্য কর্মচারীদের মধ্যে একজন লোক, সে-ই দোকানের মালিক, পরে তার নাম জেনেছিলাম, লোকটার নাম অমৃত তরফদার, তার নামেই দোকানের নাম। যাই হোক, দোকানে ঢুকে এ শাড়ি, ও শাড়ি দেখছি, মেয়েরা যেমনটা করে আর কি! তা সেই অমৃত বলে লোকটা, বয়স হবে ২৭-২৮, আমাকে শাড়ি দেখাচ্ছিল। কথায় কথায় হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি ধাইয়ের কাজ করো?’

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি জানলেন ক্যামোন করে?’

সে বলল, ‘আমি জানি। আমি তো এ গাঁয়ে প্রতি বছরই আসি। তা গত পাঁচ বচ্ছর হল এই মেলায় দোকান দিচ্ছি। তোমাকে আমি এর আগেও দেখেছি।’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। ওর মধ্যেই একটা কমলা-হলুদ রঙের শাড়ি বেছে নিয়ে তাড়াতাড়ি বেঁধে দিতে বললাম। শাড়ির প্যাকেটটা আমার হাতে দিয়ে সেই অমৃত নামে লোকটা বলে কি না, আমার কাছ থেকে সে টাকা রাখবে না।

আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘তা কেন? আমি এমনি এমনি মাগনা কাপড় কিনব না। টাকা নিন। কাপড় দিন। ব্যস!’

সে আমাকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করতে লাগল। আমি এই গাঁয়েরই মেয়ে, শুনেছে সে, আমি নাকি খুব ভালো মেয়ে। খুব পরিশ্রম করি। আরও কত কী হ্যানাত্যানা!

আমি তার কথায় কিছুতেই ভিজছি না দেখে, শেষে অনেকটা ছাড় দিয়ে কাপড়টা বেচল। আমি চলে এলাম পায়ে পায়ে। বুকটা ঢিপ-ঢিপ করছিল। কী জানি, আবার কোন বিপদ হয়!

শিল্পী: স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

পূজার পরের কয়েক রাত ধরে গ্রামে যাত্রা হয়। এক রাত্রে যাত্রা দেখতে গেছি সঙ্গীসাথীদের নিয়ে। মাঝরাতে অনেকক্ষণ বাজনার জগঝম্প শুনতে শুনতে চোখ ভারী হয়ে আসছিল। সঙ্গীদের বললাম, ‘তোরা বোস, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।’

যাত্রার ঘেরাটোপের বাইরে পানের দোকান একটা। ভাবলাম, মশলা দেওয়া মিঠে পান খাব। তাতে যদি ঘুম কমে। দোকানের কাছাকাছি এসেছি, হঠাৎ দেখি সেই কাপড়ের দোকানি অমৃত! লোকটাকে হঠাৎ দেখে ভিতরে ভিতরে চমকে গেলাম আমি।

দেখলাম, সে ছোট কাঁচের গেলাসে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। আমাকে দেখতে পেয়ে হাসল। আমি সামান্য হেসে দোকান থেকে পান কিনে মুখে দিলাম। চলে আসছিলাম সেখান থেকে।

অমৃত জিজ্ঞেস করল, ‘যাত্রা দেখতে চলে এলে যে বড়? মামা-মামি বকবে না?’

আমি বললাম, ‘তারাও এসেছে। বসেছে ওই ধারে।’

সে আরও এটা সেটা কীসব বলছিল। তারপর কথায় কথায় বলল, ‘তুমি কাজ শিখেছ কার কাছে?’

–‘ভাগীরথী পিসি। সে-ই আগে এসব গাঁয়েঘরে ওসব কাজ করত। এখন বুড়ো হয়েছে। আর পারে না।’

–‘তা এই গণ্ডগ্রামে পড়ে থাকবে তুমি আর কদ্দিন?’ হঠাৎ জিজ্ঞেস করল অমৃত।

আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম ওর দিকে। কী বলতে চায় ও?

অমৃত বলল, ‘তুমি হয়তো জানো না, এ গাঁয়ে আমার বোন স্বপ্নার বিয়ে হয়েছে। এখানে এলে আমি ওদের বাড়িতেই থাকি। আসলে আমার বাড়ি গৌহাটিতে। সেখানেই আমার বড় দোকান। গৌহাটি খুব বড় শহর, জানো?’

আমি সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘জানি।’

সে বলল, ‘গৌহাটিতে নার্সিং শেখানোর ইশকুল আছে। আমার সঙ্গে তাদের কমিটির হোমরাচোমড়া লোকেদের ভালো পরিচয় আছে। তুমি যদি চাও, তোমাকে নার্সিং ইশকুলে ভর্তি করিয়ে দিতে পারি। হোস্টেলও আছে তাদের। তুমি সেখানেই থেকে নার্সিং শিখতে পারো!’

আমি কথাটা নিয়ে ভাবছিলাম। একবার মনে হচ্ছে, লোকটা ভালো। ভালো উদ্দেশ্য নিয়েই কথাগুলো বলছে। সত্যিই তো! কতদিন আর এই গ্রামে এই বিষাক্ত পরিবেশে পড়ে থাকব। এখানে আমার কোনও ভবিষ্যতই নেই।

আবার মনে হচ্ছে, কে জানে, লোকটার কোনও বদ মতলব নেই তো?

–‘কী ভাবছ?’

–‘আমি আপনাকে দুয়েক দিন পরে বলছি।’

‘আচ্ছা, বোলো। ভেবে বোলো। শোনো। তোমার মামা-মামিকে রাজি করানোর দায়িত্ব আমার,’ তারপরেই কী যেন ভেবে আমার চোখের দিকে চেয়ে বলল অমৃত, ‘সতী! আমাকে তুমি একটু হলেও বিশ্বাস করতে পারো। আমি খারাপ লোক নই গো!’

পরের দিনই নারায়ণকাকুকে নার্সিং-এর কথাটা বললাম। অমৃতের প্রসঙ্গটুকু বাদ দিয়ে।

তিনি হেসে বললেন, ‘নার্সিং? সে-কথা কি আর আমি তোর জন্য ভাবিনি রে, বেটি? কিন্তু কী করব বল, তুই যে পড়েছিস মাত্তর ক্লাস ফোর অবধি। তোর মামারা তোকে আর পড়ালই না। নার্সিং ইশকুলে ভর্তি হতে হলে অন্তত বারো ক্লাস অবধি পড়তেই হয়।’

কথাটা শুনে বড্ড দমে গেলাম।

……………. আয়নার ওধারে-র অন্যান্য পর্ব …………….

১। ওধারে এক আগন্তুক

২। অন্ধকারে, মৃতদেহ কাঁধে 

৩। ধুলামলিন লাইব্রেরি

৪। সতীর সন্ধানে

৫। ডানায় মুক্তির গন্ধ

৬। স্বপ্ন কি সত্যি নয়?

৭। হাসে অন্তর্যামী

৮। হাসে অন্তর্যামী