overflow in brahmaputra river due to human activities | Robbar
Robbar
  • ২০ ভাদ্র ১৪৩৩
  • সোমবার
  • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জীবন নদীর কূলে কূলে

ব্রহ্মপুত্র, যাকে ওখানকার লোকেরা মহাবাহুও বলেন, সে নদীর কূলে প্রবলভাবে মাটি ভেঙে ধ্বসে যাচ্ছিল। কাছেই অনেকটা জায়গা জুড়ে ONGC-র তেল নিষ্কাশনের কুয়ো। স্থানীয় মানুষদের মত ছিল– এই বিশাল ও ভাঙনপ্রবণ নদীর তীরে অনেক জায়গা জুড়ে গর্ত খোঁড়া, পাম্প বসানো, ভারী গাড়ি ও যন্ত্রপাতি আনা-নেওয়ার কারণেই বালি-মাটি ধ্বসে যাওয়া এতখানি বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে চলছে এই ভাঙন। জনবিক্ষোভে কয়েকবার বন্ধ রাখতে হয়েছে তেল নিষ্কাশনের কাজ।

প্রচ্ছদের ছবি: শান্তনু দে

শেষ আপডেট: জুলাই ৬, ২০২৬, ১৩:০৫   
Facebook WhatsApp Messenger

১৫.

এই গুমোট গরমে দূর জায়গার এক তরুণ গৃহিণীর কথা মনে পড়ল।

গুয়াহাটি থেকে বাসে এক রাত্রির থেকেও একটু বেশি পথ রহমোরিয়া। ব্রহ্মপুত্র, যাকে ওখানকার লোকেরা মহাবাহুও বলেন, সে নদীর কূলে প্রবলভাবে মাটি ভেঙে ধ্বসে যাচ্ছিল। কাছেই অনেকটা জায়গা জুড়ে ONGC-র তেল নিষ্কাশনের কুয়ো। স্থানীয় মানুষদের মত ছিল– এই বিশাল ও ভাঙনপ্রবণ নদীর তীরে অনেক জায়গা জুড়ে গর্ত খোঁড়া, পাম্প বসানো, ভারী গাড়ি ও যন্ত্রপাতি আনা-নেওয়ার কারণেই বালি-মাটি ধ্বসে যাওয়া এতখানি বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে চলছে এই ভাঙন। জনবিক্ষোভে কয়েকবার বন্ধ রাখতে হয়েছে তেল নিষ্কাশনের কাজ। ONGC-র সৌজন্যে ভাঙন বন্ধ করতে জলের মধ্যে স্টিলের রড দিয়ে তৈরি পিরামিডের মতো দেখতে কতগুলো কাঠামো নামানো আছে, তারা না কি তীরের মাটি ধরে রাখবে, স্রোতে মাটি ভেসে যাবে না। বাসিন্দারা তখনকার মতো মেনে নিয়েছেন, কিন্তু সেকথা ব্রহ্মপুত্র মেনেছে কি না জানা যায়নি। ফলে শরতকালে আবার ভাঙন বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। সেই সূত্রে ওঁদের আমন্ত্রণে আমার যাওয়া, অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য। ফারাক্কা-সহ অন্যান্য কিছু জায়গার ভাঙনের চেহারা দেখে এসেছি, রহমোরিয়ার ভাঙনকে কি ব্যাখ্যা করতে পারব সেই অভিজ্ঞতায়? রহমোরিয়া যাবার বছরখানেক আগে আমি দেখেছিলাম– নদীর বেশ কিছুটা নিচে বগীবিলের অসামান্য জলাভূমি। বর্ষায় উপছে ওঠা ব্রহ্মপুত্রের বিশাল জল দু’ পাশের অপেক্ষাকৃত নিচু জমিতে জমে থাকে। সেই অসামান্য সুন্দর বিস্তৃত জলার নামই বগীবিল। ঘাসগুল্মের মধ্যে অগণন পাখির বাসা সেখানে। কয়েক বছর আগে সেই বগীবিলের উপরে তৈরি হওয়া পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্রহ্মপুত্র সেতু আপার অসমকে যুক্ত করেছে গুয়াহাটির সাথে। সেই সেতুকে স্থাপন করার জন্য ফ্লাডপ্লেনের দুইপাশে দেওয়া হয়েছে কংক্রিটের বিশাল দেওয়াল। দু’ পাশ থেকে অসমের বিপুল বর্ষার জল গড়িয়ে নদীতে আসা বন্ধ, আর একইসঙ্গে বন্ধ হয়েছে স্ফীত নদীর জল উপচে ওঠার জায়গা। নদীর বুকে জমা সেই অতিরিক্ত জল সাবলীলভাবে নেমে আসতে না পেরে পিছনদিকে ধাক্কা দিচ্ছে। উজানে সেই বাঁকের মুখেই রহমোরিয়া। পাঠকের মনে সন্দেহ হতে পারে যে, এই অবসরে এই লেখক আবার নিজের সেই পুরনো গানটাই গাইতে বসেছে– নদী বন্যা ভাঙন সম্বন্ধিত। কথাটা যে পুরো অসাড়, তাও নয়। কিন্তু এই প্রস্তাবনাটা আসলে সেদিন দিনের শেষে যে অপূর্ব প্রাপ্তি ঘটেছিল– তার প্রেক্ষাপট।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

ভাঙনকে এঁরা বলেন বান-খহনিয়া। রহমোরিয়াতে সেই বান-খহনিয়ার চেহারা এখন সত্যিই উদ্বিগ্ন হবার মতো। সকাল ১১টায় ভাদ্রের গুমোট রোদ্দুরে কয়েকশত মানুষ বসে আছেন নদীপাড়ের অদূরে, স্কুলবাড়ির মাঠে। ১০০ বছরের চেয়ে পুরনো ছড়ানো স্কুলবাড়ি। ইংরিজি ‘E’ অক্ষরের মতো। সারি সারি ক্লাসরুম, সামনে বারান্দা। চারিদিক ঘিরে বিরাট মাঠ। যাঁরা ওই মাঠে বসে আছেন, তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু জন এই স্কুলের পুরনো ছাত্র, আবার অনেকে এতদূর থেকে এসেছেন যে তাঁদের রওনা হতে হয়েছে ভোর পাঁচটায়। সভায় এটা স্পষ্ট ছিল যে, অনেক দূর পর্যন্ত নদী-তীরবর্তী মানুষেরা বিপন্ন বোধ করছেন। স্কুলের সামনে ৭০০ বছরের প্রাচীন রাস্তা। একসময়ে এটি এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যপথ ছিল। তার ওপারে বেশ খানিকটা গিয়ে নদী। তার পাড়ে ছিল সারি সারি গুদামঘর, যেখানে জিনিসপত্র এনে জমা করা হত বড় বড় নৌকায় তুলে দেবার জন্য। কিছুই তার অবশিষ্ট নেই। মাত্র ৫০ বছরের মধ্যে ব্রহ্মপুত্র সেই বাণিজ্যকেন্দ্র, পথ সমস্ত গ্রাস করেছে। রাস্তাটির অর্ধেক ইতিমধ্যেই নদীগর্ভে। এপারের অল্প কিছুটা তীরের জমি পার হয়েই যে স্কুল, তা যেন মাঠের মধ্যে পা ছড়িয়ে বসে থাকা এক অসহায় মা, সন্তানদের সংসারের ধ্বংস নিশ্চিত জেনেও যাঁর রক্ষা করার বা পালিয়ে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। সেই উদ্বেগের অসহায়তা থেকেই এই মানুষেরা জানতে চাইছিলেন পরিত্রাণের পথ। আমার মতো সামান্য একজনের কাছে তাঁরা কোনও আশার কথা শুনতে চাইছিলেন, যা আমি তাঁদের বলতে পারিনি। আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম ফারাক্কার ভাঙনের এক আরও ভয়াল রূপ, কেননা এই নদীটির নাম ব্রহ্মপুত্র। বয়ে যাবার ধারা রুদ্ধ হলে তার বালিপ্রধান মাটির ভাঙন আরও ভয়ংকর হবে। আমার যতটুকু কথা বলবার ছিল, তা বলবার পর সকলে মিলে বলছিলেন ওঁদের সাধারণ জীবনযাত্রা তছনছ হয়ে যাবার গভীর আশঙ্কার কথা। শুনছিলাম এই দূর অঞ্চলেও নানা অসুবিধা ও সমস্যার মধ্যেই কীভাবে গড়ে উঠেছে নিজেদের অভ্যস্ত জীবন। কীভাবে সেই জীবনযাত্রাতে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছেন এখানকার মানুষরা।

এই বিখ্যাত স্কুলের যে ছাত্ররা পৃথিবীর নানা প্রান্তে আছেন, তাদের অনেকেই টাকা পাঠিয়েছেন এই গ্রস্ত স্কুলবাড়ি থেকে সরে শহরের মাঝামাঝি কোনও অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জায়গায় যেন নতুন স্কুলবাড়ি তৈরির ব্যবস্থা হয়। আজকের এই জমায়েতের আহ্বায়কদের মধ্যে ছিলেন স্কুলের বর্তমান হেডমাস্টার মশাই। তিনি এই স্কুলেরই প্রাক্তন ছাত্র। সভাশেষের মুখে তিনি বলছিলেন তিনি আর নতুন স্কুলবাড়িতে যাওয়ার কথা ভাবেন না, এই বাড়িটিতেই বালকবয়সে এসেছিলেন, আর দু’ বছর পর রিটায়ার করবেন।

সমস্ত আয়োজন যাঁদের উদ্যোগে সংগঠিত হয়েছে– তাঁদের মধ্যে রঞ্জন গগৈ নামে যুবককে দেখলাম সবচেয়ে বেশি ছুটোছুটি করতে। শুনলাম ইনি চা-বাগান শ্রমিক ইউনিয়নের অন্যতম নেতা। নিজে ও ওঁর স্ত্রী দুজনেই চা-শ্রমিক। সকলের সঙ্গে কথা বলছেন। প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন। আমার আসবার ব্যবস্থাও মূলত ইনিই দেখাশোনা করেছিলেন। লাহোয়াল কলেজের অধ্যক্ষ, যিনি আমাকে গুয়াহাটি থেকে নিয়ে আসেন, তিনি রঞ্জনের কথাই বলেছিলেন। বেলা অনেকখানির চেয়েও বেশি হয়েছে। দুপুরে সকলে মিলে ব্রহ্মপুত্রের সুস্বাদু মাছ দিয়ে ভাত খাওয়ার পর, দূর থেকে যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরা বাস ধরতে রওনা হলেন। অসমের বিখ্যাত গুমোট গরমে আমারও ক্লান্তি সত্যিই অগাধ হয়ে উঠছিল। খুব ভারি মন নিয়ে একসময় রঞ্জনের সঙ্গে রওনা হলাম। আজ ওঁর বাড়িতে থাকব। কাল কথা বলব আরও কিছু মানুষের সঙ্গে। তারপর ফেরা। কোনও সমাধানের কথা শোনানো গেল না, বলতে হল কেবল এই দেশের অন্য অন্য জায়গাতেও নদী লঙ্ঘনের ঘটনার কথা।

সদ্যসন্ধ্যার অন্ধকারে চা-বাগানকেও মনে হচ্ছিল জঙ্গল। বেশ গরম। রঞ্জনের বাড়িতে এসে নামলাম। অসমের নিজস্ব ধরনের বাড়ি। ইকড়ার মাটি-লেপা বেড়ার দেওয়াল, ঘরে সিমেন্টের মেঝে। উঠোন-রান্নাঘরের মেঝে মাটির। রঞ্জনের স্ত্রী বিনতা তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে হাত ধরে নিয়ে গেল ঘরের ভেতরে, যেখানে তার শ্বশুর-শাশুড়ি রয়েছেন। গৃহস্থ সংসারের প্রথামতো গামোছা, গুয়া দিয়ে বরণ করে নিলেন মা। তারপর আমরা গিয়ে বসলাম রান্নাঘরে। বড়, ছড়ানো রান্নাঘর। বিনতার করে দেওয়া চা গলা দিয়ে নামতে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। কাঁচাকাঠের লম্বা টেবিলে রেখে ছুরি দিয়ে দ্রুত হাতে তরকারি কেটে দিতে দিতে অনর্গল নিজেদের আন্দোলনের কথা, চা-বাগানের অবস্থা, বান খহনিয়ার কথা বলছিলেন রঞ্জন। একসময় বিনতা ধমক দিল তাকে– এইবার তুমি থামো। দেখছ না বাইদেউ ক্লান্ত হয়ে গেছে। আগে স্নান করে আসতে দাও।

zoom
শিল্পী: শান্তনু দে

শুনে মেয়েটিকে অন্তর্যামী বলে বলে স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। উঠোনের এক প্রান্তে স্নানঘর। সেখানে বিদ্যুৎ নেই। কাচ লাগানো আলো দিয়ে বিনতা চলে গেল। প্রায় আমার বুকসমান উঁচু দু’খানা কাঠের ব্যারেল ভর্তি জল আর তার মধ্যে কী যেন ভাসছে। জিগেস করতে বিনতা জানাল, ওগুলো লেবুর টুকরো। স্নান করার জন্য। প্রায় হাতের মুঠোর মতো মাপের আট-দশটা খণ্ড ভাসছে জলে। তাই দিয়ে ঘষে ঘষে স্নান করে সারাদিনের সব ক্লান্তি এমন নিঃশেষে মুছে গেল, যেন ক্লান্তি বলে কিছু ছিলই না। এসে বসার পর বিনতার একটু কুণ্ঠিত জিজ্ঞাসা– বাইদেউ, আমরা এইখানে জলে লেবু ফেলেই স্নান করি। আপনার কি সাবান লাগত?

নতুন গমের দানার মতো উজ্জ্বল মসৃণ ওর ত্বক। বলি– নিচে আমরা লেবুর গন্ধ মেশানো সাবান কিনে আনি ৩০ টাকা দিয়ে, টাটকা লেবু দিয়ে গা-ঘষে স্নান করার কথা কেউ ভাবতেও পারে না।

পরদিন সকালে দেখেছিলাম ওদের উঠোনে একতলা ঢালু চালের মাথা ছাড়ানো টসটসে গন্ধলেবুর গাছ। ফলের ভারে তার প্রতিটি ডাল মাটির দিকে নেমে এসেছে। বিনতা দেখায়– আশপাশে ওর জা, প্রতিবেশী সবারই উঠোনে ওরকমই গন্ধলেবুর সমারোহ। হাসিমুখে বলে, যতদিন লেবু পাওয়া যায়, আমরা কেউ আর দোকান থেকে সাবান কিনি না। সেই সকালে ওই একদিন দেখা বিনতা আমাকে গৃহস্থের সমৃদ্ধি কথাটার মানে বুঝিয়েছিল। আজও সংসারে আশ্বাস বললে সেই ছবিটি মনে আসে।

___ পড়ুন ধুলোমাটির মুখ কলামের অন্যান্য পর্ব ___

১৪. এ শহরের একজন আশ্চর্য গাইড

১৩. তুলি-কলমের বহুমুখিতা

১২. শিকড়ের খোঁজে ফেরা

১১. ইনি আমার মাসি, আর আমি এনার দিদি!

১০. অন্য এক ঘরের সন্ধানে

৯. সেই কবে একটা যুদ্ধ হয়েছিল

৮. যুদ্ধের যে গল্পে বীরত্ব নেই, মনখারাপ আছে

৭. কালী তো রোজকার, সরস্বতী তো মোটে একদিনের গেস্ট!

৬. রূপসাধকের প্রাণের ভিতর সুরের ঝরনাধারা

৫. ছুরিকাঁচির ভয়ের চেয়ে বন্দি থাকার ভয় বেশি

৪. ভালোবাসার সাহসের ভাষা জানলে দোভাষীর আর দরকার নেই

৩. যিনি লাইব্রেরিতে ঢুকতে দেন, বই নিতে দেন– তিনি সর্বশক্তিমান

২. পথের কুকুর, আকাশের কাক-চিল, মাটির পিঁপড়েরও অন্নের ভাবনা গৃহস্থের

১. বেনারসে স্কুলে পড়ার সময় বহেনজির তকলি কাটার ক্লাসে বন্ধুদের ভাগেরও সুতো কেটে দিতাম

Brahmaputra manmade flood Natural Disasters ONGC River river gate Sangbad Pratidin Sangbad Pratidin Robbar

Share this article on