Robbar

আধুনিক ভাস্কর্যের লীলাভূমি

Published by: Robbar Digital
  • Posted:July 28, 2026 9:25 pm
  • Updated:July 28, 2026 9:27 pm  

তাঁর নিজের জগতে তিনি একা। চলমান জীবন দৃশ্যের একক রূপকার। অশান্ত, অনন্ত সৃজনবেদনায় কাতর। আর সেই সৃজনবিশ্বের কেন্দ্রে তার ভাব-ভাবনা নিয়ে আলো ধরেন শিল্পী বিনোদবিহারী। আলো ধরে সযত্নে লালন করা এক টুকরো শান্তিনিকেতন। লীলা শান্তিনিকেতন ছেড়ে এসেছিলেন, কিন্তু সারাজীবন মনের মধ্যে সোনার ফ্রেমে যেন বাঁধিয়ে রেখেছিলেন তাঁর ভালোবাসার শান্তিনিকেতনের ছবি।

স্বাতী ভট্টাচার্য

৭.

“Normality is a paved road: It’s comfortable to walk, but no flowers grow on it.” 

–Van Gogh

সাল ১৯৪২, শান্তিনিকেতন। বোম্বে থেকে পড়তে এল একটি অবাঙালি মেয়ে। লীলা। জন্ম ১৯১৬, সিন্ধু প্রদেশের হায়দ্রাবাদে। বাবা বস্ত্র-ব্যবসায়ী। ধনী পরিবার। অ্যানি বেসান্তের ভক্ত বাবা। মেয়ের পড়াশুনোর ব্যবস্থা করলেন বেনারস থিওজফিকাল গার্লস স্কুলে। আঁকতে ভালোবাসে মেয়েটি। বেনারসের ইশকুলে আঁকার দিদিমণির প্রিয় ছাত্রী। কিন্তু স্কুল শেষ করে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা, বি.এড-ও করলেন। তারপর শান্তিনিকেতন, কলাভবন। নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেজ, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। অপার মুগ্ধতা বিনোদবিহারীর কাজের প্রতি, ক্রমশ তা-ই পরিণত হল অনুরাগে, অবশেষে বিয়ে। লীলা মনসুখানি হলেন লীলা মুখোপাধ্যায়। মনে পড়ে যায় বিনোদবিহারীর অনবদ্য অভিব্যক্তি, ‘কলা ভবনের এই রক্ষণশীল আবহাওয়ার মধ্যে আমি কলাভবনের এক ছাত্রীকে বিবাহ করি। বিবাহের সময় আমার বয়স ৪০-এর কাছাকাছি।’ বোঝাই যায়, সে যুগের শান্তিনিকেতনে সবাই খুব ভালো চোখে দেখলেন না এই পরিণয়। যদিও বিনোদবিহারীর মতে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ‘বিশ্বভারতী জুড়ে এক রকমের রক্ষণশীলতা’ দেখা দিয়েছিল তবুও গম্ভীর আত্মমগ্ন, ধীমান বিনোদবিহারী সঙ্গে সিগারেট খাওয়া, উচ্ছল মেয়েটিকে বেমানান মনে হয়েছিল অনেকেরই। লীলার স্মৃতিচারণায় জানা যায়, বিয়ের খবর শুনে রামকিঙ্কর তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন– ‘এটা কি হল?’ যেন তিনি ভেবেছিলেন, তাঁকেই বিয়ে করবেন লীলা। পরিণত বয়সে স্মৃতির পাতা উল্টে এই কথা মনে করে ভারী মজা পেতেন তিনি। যাই হোক, বিয়ে হল আর প্রীতিভোজ হবে না– তাও কি হয়! বিনোদবিহারীর চিনে বন্ধু অধ্যাপক উ আর তাঁর গবেষক স্ত্রী নবদম্পতির সৌজন্যে ‘চীনা পদ্ধতিতে প্রীতিভোজের আয়োজন করেছিলেন।’ উচ্ছল, বিদেশি পোশাকআশাক পরা ধনীর দুলালী এই অবাঙালি মেয়েটি হয়তো সে যুগের শান্তিনিকেতনে ছিলেন খানিক দলছুট। মাস্টারমশাই নন্দলালকে ভয় পেতেন। সে-যুগের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন সেকথা। কিন্তু সহজ স্বচ্ছন্দ সম্পর্ক ছিল রামকিঙ্করের সঙ্গে। আর আজীবন অদ্ভুত শ্রদ্ধা-মেশানো ভালোবাসা ছিল শান্ত গম্ভীর বিনোদবিহারীর সঙ্গে। তাঁদের এই বিপরীত ব্যক্তিত্বের চলন যেন দৃঢ় করে তুলেছিল তাদের সম্পর্কের ভিত।

লীলা মুখোপাধ্যায় ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়

লীলা ছিলেন অত্যন্ত প্রাণচঞ্চল, জীবনরসে টইটুম্বুর অথচ প্রচারবিমুখ এক শিল্পী। প্রায় ৫০ বছরের শিল্পী-জীবন, আটটি একক প্রদর্শনী সত্ত্বেও শিল্পী হিসেবে খুব ঘনিষ্ঠ কিছু বন্ধুবান্ধব, শিল্পমহল পাদপ্রদীপের আলোয় পাওয়া যায়নি তাঁকে। অথচ তিনি ছিলেন আধুনিক ভারতীয় ভাস্করদের অন্যতম। পিলু পুচকানওয়ালা ও মীরা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁকে প্রথম আধুনিক ভারতীয় মহিলা ভাস্করের শিরোপা দেওয়া যায় অনায়াসেই।

১৯৪৬-এ কলাভবন ছাড়লেন সেখানকার শিক্ষাক্রম অসমাপ্ত রেখেই। চলে গেলেন বোম্বে। সেখানে বছরখানেক থেকে ১৯৫০-এ গেলেন কাঠমান্ডু। বিনোদবিহারী তখন নেপাল মিউজিয়ামের কিউরেটর। নেপালের ঐতিহ্যময় কাঠের ভাস্কর্য ও কাঠ খোদাইয়ের ঐশ্বর্যে বিনোদবিহারী মুগ্ধ। নেপালে যখন তিনি কাজ পান, লীলা তখন মীরাটে ছিলেন– নিজের কর্মস্থলে। পুজোর সময় বিনোদবিহারী নেপালের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন আর ‘শীতের মুখোমুখি’ লীলা সেখানে পৌঁছন।

শিল্পী-দম্পতি

ইতোমধ্যে নেপালের সেসময়ের সেরা কারিগর কুলাসুন্দর শিলাকর্মীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে বিনোদবিহারীর। নাম শুনেই বোঝা যায় কুলাসুন্দার ঐতিহ্যবাহী ভাস্করদের একজন ছিলেন। বিনোদবিহারীর অনুরোধে রীতিমতো পাঁজিপুথি দেখে লীলা ও লীলার সঙ্গে আসা বিশ্বভারতীর আর এক ছাত্র ঋতেন মজুমদারকে ছাত্রছাত্রী হিসেবে ‘গ্রহণ করলেন’ তিনি। সেই শিক্ষার বিবরণ লেখা আছে ‘চিত্রকর’-এর পাতায়! ‘গদা হাতে ভীমসেনের মূর্তি দিয়ে কাজ শুরু হলো। ভীমসেন হলেন নেপালের বণিক সম্প্রদায়ের সর্বপ্রধান দেবতা।’ নতুন ছাত্রী প্রথম মূর্তি গড়তে গিয়ে খানিক বিপাকে পড়ল, ভীমসেনের খোলা চোখ নতুন ছাত্রছাত্রীদের হাতে পড়ে হয়ে গেল অর্ধনীমিলিত। অন্য ঐতিহ্যশালী কারিগররা সেটিকে ‘অশুভ মূর্তি’ বলে বাতিল করতে চাইলে কুলসুন্দর বললেন, ‘দুটো চোখ সমান হলেই বিশ্বকর্মা খুশি হবে।’ 

ভীমসেন, শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

আর এভাবেই পরম্পরার হাত ধরে শিল্পীর স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে গেল লীলার কাছে। ক্রমশ কাঠখোদাইয়ে পারঙ্গম হয়ে উঠলেন তিনি। তাঁর ভাস্কর্যের সিংহভাগই কাঠের কাজ, কিন্তু ঐতিহ্য ও বর্তমানের সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুললেন একান্ত নিজস্ব এক শৈলী।

শান্তিনিকেতনে যা শিখেছিলেন তিনি, বিনোদবিহারীর ভাবনা ও সাহচর্যে সেটির মূল আরও গভীরে প্রবেশ করে। শিল্প-পরম্পরার প্রতি শ্রদ্ধা দিয়ে যে শিক্ষার শুরু, পরবর্তীতে তার সঙ্গে মিলে যায় তাঁর জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসা। মানুষ দেখতে ভালোবাসতেন তিনি। আজীবন খাতা নিয়ে ছুটে গিয়েছেন পথচলা সাধারণ মানুষের নানা অভিব্যক্তি, নানা আবেগের নির্যাসটুকু রেখার বাঁধনে ধরে রাখতে। তাই তাঁর ভাস্কর্যের বহিঃরেখা স্পষ্ট, কিন্তু নমনীয়। কাঠের চরিত্র বুঝে যেন তার অন্তর্নিহিত গভীর সম্ভাবনার কথা মনে রেখে সেগুলিকে বদলে দিয়েছেন ভাস্কর্যে। তাঁর ফিগারেটিভ ভাস্কর্যের মধ্যে ধরা দেয় মানুষকে, জীবনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা। দেহের ভঙ্গিগুলিতে নমনীয়তার কোনও অভাব নেই যদিও তাদের উপস্থাপন অনেকসময় খানিকটা কৌণিক কিউবিস্ট ভঙ্গিতে। অনেকটা যেন যক্ষী ভাস্কর্যের আদলে গড়া চওড়া হাত পা। এই ভাস্কর্যটিতে যেমন দেখা যায় একটি মেয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে আনমনা হয়ে হারিয়ে গিয়েছে নিজস্ব কোনও ভাবনার জগতে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

দেহের প্রতিটি খাঁজে যে সরলীকরণ– তা আমাদের মনে করায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের পুতুলের কথা; অথবা নেপালের মন্দিরগাত্রে যে কাঠের মূর্তিগুলি অলংকরণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে– তাদের সঙ্গেও এর মিল পাওয়া যায়। আবার রামকিঙ্করের ভাস্কর্য শৈলীর কথাও মনে পড়ে যায়। কিন্তু মেয়েটির চোখের অভিব্যক্তি সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল; যেন এক অনন্য প্রতীক্ষার আবেশ সেখানে। এরই পরিপূরক একটি ভাস্কর্য আবার অন্য এক প্রতীক্ষার গল্প বলে, যেন সারাদিন মাঠের কাজ করে পরিশ্রান্ত রমণী নদীর ধারে হাতে মাথা রেখে আধশোয়া; হারিয়ে গিয়েছে কোনও সুখস্বপ্নে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

মানুষ দেখতে দেখতে মনে মনে তাদের গল্পগুলো সাজাতেন লীলা, আর তাই তাঁর অধিকাংশ কাজেই মিশে থাকে গল্পের আভাস। ছোট প্রাণ ছোট ব্যথার এইসব গল্পগুলি অনায়াসে জায়গা করে নেয় তার কাজে। কারণ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের সঙ্গে যেন তিনি চাইতেন এক সংযোগ খুঁজে পেতে। তাঁর উচ্চবিত্ত পরিবারের শিক্ষা, তাঁর পাশ্চাত্য যাপন-কাঠামোতে তৈরি জীবনবোধ তাঁকে সাধারণ মানুষের থেকে একটু দূরেই রেখেছিল সারাজীবন। জীবনের শেষ পর্যায়ে বাড়ির উল্টোদিকের পার্কে বিভিন্ন বাড়ির কর্মসহায়িকারা জমায়েত হত কাজের আগে নিছক আড্ডা দেওয়ার জন্য। লীলাও যেতেন সেখানে, দূর থেকে স্কেচ করতেন তাদের। এই যে দূর থেকে দেখা, প্রায় যেন এক পর্যটকের কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে দেখা– মাটির সঙ্গে, প্রাত্যহিকতার মধ্যে থেকে তুলে আনা জীবনের সঙ্গে এই দূরবর্তী সংযোগ তাঁর কাজের মধ্যে এক অভিনবত্বের সঞ্চার করে। তাই তাঁর কাঠের ভাস্কর্যে অনেক সময়েই এসে পড়ে মুখোশের আদল, এক ধরনের পরম্পরার ছোঁয়া।

শিল্পী নীলিমা শেখ যেমন তাঁর কাজের আলোচনা প্রসঙ্গে লেখেন–

‘They validate the position that inventiveness can well be rooted within a gharana. Idioms deemed stereotypical can be energized by an input of conviction.’

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

তাঁর শৈলীতে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের শিল্পশৈলীর ছাপ স্পষ্ট। কিন্তু উপস্থাপন-ভঙ্গির মধ্যে রয়েছে তাঁর নিজস্বতা। যে কাহিনি খোদাই হয় তাঁর মূর্তিতে তার আভাস লুকিয়ে থাকে নানা অদ্ভূত শরীরী বিভঙ্গে। কখনও ফিগারগুলির নিচের দিকটায় সামান্য খোদাই করে পায়ের বা পায়ের পাতার আদল, অথবা শাড়ির আভাস এনেছেন; অথচ কাজটির ভরকেন্দ্র কিন্তু ওপরের অংশটুকু। সেখানে হয়তো ধরা দেয় মা ও শিশুর একটি অন্তরঙ্গ মুহূর্ত।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

এই কাজটিতে স্পেস ও ভলিউমের ব্যবহার যেন খানিকটা হেনরি ম্যুরের কাছাকাছি। আবার তাঁর কিছু কিছু কাজ মনে করায় এক্সপ্রেশনিস্টদের বিন্যাস বয়ান, কখনও বা সেগুলি একান্তই একরৈখিক দেহের গড়ন ভেঙেচুরে এক গাঠনিক বিমূর্ততার সৃষ্টি হয় সেখানে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

কখনও আবার ভলিউমের ওপর জোর দিয়ে সামান্য রিলিফের সাহায্যে ফুটিয়ে তোলেন চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। রেখে দেন ছেনি-বাটালির দাগ কখনও মুখের অভিব্যক্তি সৃষ্টিতে, কখনও বা শরীরের ভাঁজ বোঝাতে, কখনও বা পোশাকের আভাস আনতে। এই কাজটিতেও স্পেস ও ভলিউমের মেলবন্ধন অনবদ্য। ভারতীয় শিল্পশাস্ত্রে বলা হয়, ভাবপ্রকাশের যথার্থ বাহন হল ব্যঞ্জনা বা সাজেশন। এই কাজটির মধ্যে দেখি ব্যঞ্জনার স্বতঃপ্রকাশ, শৈলী এবং বিষয় বিন্যাসে। এই যে নারী, যে আপন ভাবনজগতে মগ্ন, অত্যন্ত সংযত খোদাইয়ে সেটি স্পষ্ট করে তুলেছেন শিল্পী। এই অন্তর সংহতি বিশেষ করে প্রকাশ পায় তাঁর কাঠের কাজগুলোতে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

প্রিয় বিষয় ছিল মা ও শিশু। অনেকগুলি কাজ করেছেন তিনি এই ভাবনায়। তবে খুব অদ্ভুতভাবে বাবা ও শিশু-বিষয়ক কিছু কাজও তিনি করেছেন। অদ্ভুত– কারণ তুলনায় এই সম্পর্কটি শিল্পজগতে খানিক অবহেলিত। আর আছে তাঁর পশুপাখিবিষয়ক কাজগুলি– একঠেঙে মোরগ বা ষাঁড়। এখানে অবশ্য ভলিউমের ওপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এগুলি তাঁর প্রিয় বিষয়। যখন যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, এইগুলি ফিরে ফিরে আসে নানা বিচিত্র রূপে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়
শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

লক্ষ্য করার বিষয় যে, তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণের ফলে নিজের নিজের মতো করে দু’টি কাজই অতীব জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তবে তাঁর ভাস্কর্যের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাঁর যুগল ভাস্কর্যগুলো। সাধারণভাবে এগুলিতে একটি নারী ও পুরুষ দেখা যায়। যদিও দু’টি মেয়ে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরেছে– এমন একটি ভাস্কর্যও আছে। তবে নারী-পুরুষের যৌথ জীবনের পথ চলার নানা দৃশ্যায়ন পাওয়া যায় তাঁর দশটি ফিগারেটিভ কাজে। কখনও তারা আগুপিছু হেঁটে চলেছে, কখনও উন্মত্ত আবেগের তাড়নায় তারা নিবিড় আশ্লেষে পরস্পর সংলগ্ন। এই ভাস্কর্যগুলোয় কিন্তু লীলা ফিগারগুলির শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি ধরেছেন যথেষ্ট অনুপুঙ্খভাবে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

কিন্তু বিচিত্র গড়ন তার intertwined ভাস্কর্যগুলোর। এগুলি দেখে মনে পড়ে যায় আদিবাসী ভাস্কর্যের কথা। মনে হয় যক্ষযক্ষী বা নাগ দেবতাদের কথা। এদের প্রতিটি বিভঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আদিম শৈলী। পিতৃপুরুষের স্মৃতিতে নির্মিত ছোট ছোট আদিম ভাস্কর্যের সঙ্গে জেনবেদের গভীর সংযোগ। কখন যেন তা ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে ছুঁয়ে যায় মেক্সিকো, নাইজেরিয়া, মিশর অথবা মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন ভাস্কর্যশৈলীকে। এই যে সম্পৃক্ত ভাস্কর্য– তাদের মুখগুলির অভিব্যক্তি মুখোশের মতো– এ এক অদ্ভুত ভারসাম্যের খেলা, শারীরিক এবং মানসিক, যা দর্শককে ভাবায়, শিল্পীর মনোজগতে দৃষ্টিপাত করতে উৎসাহী করে। অথচ তাঁর সৃষ্ট এই মূর্তিগুলি তাদের সংহত উপস্থাপনায় সমকালীন ভারতীয় ভাস্কর্যে আধুনিকতার এক নতুন বয়ান সৃষ্টি করে; যার উৎসে হয়তো মিশে আছে নানা স্মৃতি, তবুও এগুলিকে urban folk ভাস্কর্যের অভিধা দেওয়া বোধহয় ভুল হবে না। তাঁর কাজে ধরা দেয় এক সাহসী অথচ অনায়াস ব্যতিক্রম।

পরিবার, মানুষের বিচ্ছিন্নতা ও নির্ভরশীলতা তাঁর কাজের কেন্দ্রীয় ভাবনা। তারই ভিন্নমাত্রিক শৈল্পিক অভিব্যক্তি এই ভাস্কর্যগুলি। এই আবেগের পরিশীলনই কাঠের মূর্তিগুলোকে দিয়েছে এক মানবিক আবেগের উত্তাপ।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

ফিরে আসি নেপাল পরবর্তী অধ্যায়ে। ১৯৪৯-এ মৃণালিনীর জন্মের সময় লীলার মা তাঁকে বোম্বেতে নিয়ে যান। বিনোদবিহারী নেপাল থেকে ফেরা পর্যন্ত বোম্বেতেই ছিলেন লীলা। মেয়ে মৃণালিনীর জন্মের পর তিনি একটি মন্তেশ্বরী কোর্সও করেন। ১৯৫০-এ পাটনায় হিন্দু সাহিত্য সম্মেলন ভবনে বিনোদবিহারী, লীলা মুখার্জি ও ঋতেন মজুমদারের কাজের একটি যৌথ প্রদর্শনী হয়। মজার কথা এই যে, এই প্রদর্শনীতে বিনোদবিহারীর শতাধিক, ঋতেন মজুমদারের ৬৮টি কাজ প্রদর্শিত হলেও, লীলার কাজ ছিল মাত্র পাঁচটি। একটি জলরঙের কাজ, একটি কাঠখোদাই– ছাপার ছবি, একটি ব্যানার, একটি কাপড়ের নকশা ও পাথরের একটি গণপতি মূর্তি। ওই ক’টি কাজের মধ্যে দিয়েই তিনি বুঝিয়ে দিলেন তাঁর শিক্ষা ও শিল্প-প্রতিভার ব্যপ্তি। প্রথম দু’টি কাজ তাঁর শান্তিনিকেতনে শিক্ষার ফসল। পরের দু’টি অবশ্যই নেপালে শিল্পশিক্ষার পরিণত প্রকাশ; এবং কাপড়ের নকশা তাঁর নবতম আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এটি তাঁর প্রথম স্বীকৃত প্রদর্শনী বলে মনে করা হয়, জানাচ্ছেন শিবকুমার। এরপর রাজস্থানের বনস্থলী বিদ্যাপীঠে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন বিনোদবিহারী এবং তারপরে মুসৌরীতে প্রতিষ্ঠা হল তাদের নিজেদের শিল্পশিক্ষা নিকেতন। আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও সেই শিল্প শিক্ষালয় কিন্তু বেশিদিন চালানো গেল না।

আর্থিক অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে লীলা চাকরি নিয়ে চলে গেলেন দেরাদুন, ওয়েলাম গার্লস স্কুলে। বয়েজ স্কুলের শিল্পশিক্ষা বিভাগেরও দায়িত্ব সামলাতেন তিনি। বিনোদবিহারী আরও কিছুদিন চেষ্টা করলেন মুসৌরীতে তাঁদের স্কুলটিকে বাঁচিয়ে রাখার। পারলেন না, চলে গেলেন পাটনায়।

১৯৬০ সালে ওয়েলাম স্কুলে একটি ভিত্তিচিত্র বানানোর অনুরোধ আসে লীলার কাছে। প্রথমে ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে কাজটি করবেন ভেবেছিলেন তিনি। কারণ শান্তিনিকেতনে থাকাকালীন বিনোদবিহারীর সুবিখ্যাত হিন্দি ভবনের ম্যুরালটিতে তাঁরও অবদান ছিল; এবং তা যে নিতান্ত নগণ্য নয়– তার প্রমাণ পাই বিনোদবিহারীর লেখায়। তিনি লিখছেন, হিন্দি ভবনের পুবদিকের দেওয়ালে কৃপাল সিং-এর যে কাজটি ছিল– তার ধারে ধারে কিছু রিলিফ দিয়ে অলংকরণের কথা ভাবেন তিনি। সেই রিলিফের কাজগুলি করছিলেন লীলা ও জিতেন্দ্রকুমার। পরবর্তী পর্যায়ে অবশ্য লীলা ছিলেন মায়ের কাছে, করাচিতে। জীবনে অনেকটা সময়ই তাঁরা পরস্পরের থেকে আলাদা থেকেছেন, কিন্তু চিঠিপত্রে যোগাযোগ থাকত সারাক্ষণ। সে চিঠিগুলিতে ধরা পড়ে দুই শিল্পীর কথোপকথন– করাচি থেকে মীরাট, মীরাট থেকে নেপাল, মুসৌরি থেকে, পাটনা থেকে দিল্লি– কাজের গল্প, পরামর্শ, পরিকল্পনা, উপদেশের বিনিময় চলতেই থাকে।

স্কুলে পড়িয়েছিলেন তিনি দু’ দশকেরও বেশি সময় ধরে। এই সময়ে দু’টি ভিত্তিচিত্র আঁকেন। ১৯৬০-এ তাঁকে একটি ভিত্তিচিত্র দিয়ে শিল্পবিভাগটি অলংকৃত করতে অনুরোধ করা হয়। এর আগে কখনও একা সম্পূর্ণ দেওয়ালচিত্র পরিকল্পনা বা সম্পন্ন করার অভিজ্ঞতা হয়তো ছিল না লীলার। কিন্তু উৎসাহ দেবার জন্য, আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্যে অবশ্যই তাঁর পাশে ছিলেন বিনোদবিহারী। যদিও আক্ষরিক অর্থে নয়, কারণ তিনি তখন পাটনায়। প্রথমে ভেবেছিলেন ফ্রেস্কো পদ্ধতিতে কাজটি করবেন। তখন চিঠিতে সেই পদ্ধতি প্রয়োগের অনুপুঙ্খ বিবরণ পাঠান বিনোদবিহারী। পড়ে লীলা মত বদলান, ঠিক করলেন এগ টেম্পেরায় আঁকবেন ভিত্তিচিত্র। তখনও বিনোদবিহারী চিঠিতে রং তৈরি থেকে, রঙের ঘনত্ব কত হবে, কীভাবে তা লাগাতে হবে– এ বিষয়ে লিখলেন এক দীর্ঘ চিঠি। তার থেকে কয়েকটা লাইন তুলে দিলে বোঝা যায় স্বামী নয়, প্রিয় সঙ্গী নয়, আজকের দিনে ‘মেন্টর’ বলতে যা বোঝায়– লীলার জীবনে বিনোদবিহারীর ভূমিকা ছিল তেমনই।

এরপরেই শুরু হল কাজ। ভাবনা কিন্তু একান্তই নিজস্ব। প্রথম ম্যুরালটি আটের দশকে মুছে ফেলা হয়। সেটির বিষয়ে আলোচনার জন্য এখন ক’টি ফটোগ্রাফই সম্বল। ১৯৬০-এ করা এই দেওয়ালচিত্রটি ছিল সেকালের শিল্পবিভাগের বাড়ি উডসিটের দেওয়ালে। এগ টেম্পেরায় এই ভিত্তিচিত্রখানি করার জন্য কীভাবে জমি প্রস্তুত করতে হবে, কীভাবে রঙের উজ্জ্বলতা আনতে হবে– এসবই ছিল বিনোদবিহারীর একাধিক চিঠিতে। ২০ ফুট বাই ৮ ফুট এই ম্যুরালটি সম্বন্ধে তার ছাত্র জগজিৎ জানাচ্ছেন– 

It was a big rural Bengal landscape with a pond and fishing nets, elephants, palm trees and women in white sarees … the mural was painted in maroon, green and white.

এই ম্যুরালটির কম্পোজিশন ও স্থানবিভাজন বিনোদবিহারীকে মনে করিয়ে দেয় তার বনস্থলী বিদ্যাপীঠে করা ভিত্তিচিত্রটির কথা। বিনোদবিহারী স্বয়ং অবশ্য পাটনা থেকে লেখা একটি চিঠিতে লিখছেন, লীলার ফিগারগুলির ডৌল অনেক ভারী ও ভরাট বলে সেগুলি দেওয়ালের ওপর বেশি স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। ১৯৬৮-তে লীলা আরেকটি ভিত্তিচিত্রের কাজে হাত দেন। এটি ওই স্কুলের বাইরের দেওয়ালে করা কাজ। এবার ছাত্ররাও হাত লাগায়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, এটি সেরামিক টাইলস আর নানা ফেলাছড়া জিনিস দিয়ে তৈরি। ভারতে তখনও সেরামিক টাইলসে করা ম্যুরালের চল হয়নি তেমন। ছয়ের দশকের গোড়ার দিকে সতীশ গুজরাল, হুসেন, কে জি সুব্রহ্মণ্যম, অমল ঘোষ সবেমাত্র এই ধরনের কাজ বা ব্রিকোলাজ করতে শুরু করেছিলেন। লীলা তাই এক্ষেত্রে আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন পাঁচজনের মধ্যে পঞ্চম। ম্যুরালটি ছ’টি ভাগে বিভক্ত এবং এটির শৈলী, বিশেষ করে ফিগারগুলি মনে করায় বীরভূমের সাঁওতাল গ্রামের দেওয়ালে আঁকা ছবির কথা। তবে এটির কেন্দ্রে রয়েছে একটি পেখম-মেলা ময়ূর, পাশে দু’টি গাছ। ময়ূরটার ভঙ্গি এবং গড়ন মনে করায় নেপালি কাঠখোদাইয়ে করা ময়ূরের কথা।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়
নেপালি কাঠখোদাইয়ের ময়ূর

ডানদিকের দেওয়ালে রয়েছে স্কুলের পতাকা নিয়ে এগিয়ে চলা একটি ছেলে। তার পেছনে নৃত্যরত দু’টি ফিগার এবং তাঁদের পেছনে বাদ্যযন্ত্র হাতে আরও তিনটি ফিগার। তার মধ্যে দু’জন বাঁশি-বাজিয়ে। তলার বর্ডারে হাঁসের সারি, কিন্তু প্রত্যেকটির ভঙ্গি ভিন্ন। তাঁর উপস্থাপনা প্রাণবন্ত, অনায়াস এবং স্বচ্ছন্দ। এটি স্কুলের স্টেজের পেছনে এবং পাশের দেওয়ালে করা। একটি গাছে দেখা যাচ্ছে চড়ে বসেছে এক বালক। গাছের পাতা ও ফুলগুলির নকশা করা হয়েছে বেতের বোনা চাটাইয়ের ধরনের, বুননের ভাষায় যাকে বলে ‘বাস্কেট উইভ’। 

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

এছাড়াও রয়েছে একটি হাতির ছবি। তার পিঠেও বসে রয়েছে একটি বালক। এক কথায় বলতে গেলে এই ভিত্তিচিত্রের মধ্যে দিয়ে তিনি ধরতে চেয়েছেন শৈশব-কৈশোরের চঞ্চল উদ্ভাস। ভাস্কর্যের কৌণিক জ্যামিতিক আকার ধরা দেয় এখানেও।

কত মাধ্যমে যে কাজ করেছেন তিনি– এ যেন কাজের আনন্দে কাজ, এক চলমান জীবনগাথা। বিনোদবিহারী সেই কবে পাঁচের দশকের গোড়ায় তাঁকে লিখেছিলেন, এক চিঠিতে– তাঁকে তাঁর নিজের উপযুক্ত মাধ্যম খুঁজে নিতে হবে। সেই খোঁজ তিনি চালিয়েছেন আজীবন। তবে যে মাধ্যমেই কাজ করুন না কেন, গড়ে তুলেছেন তাঁর নিজস্ব শৈলী, ভঙ্গি। একসময়, সম্ভবত ছয়ের দশকে, ধাতব পাত ভাঁজ করে করলেন কিছু ছোট ছোট কাজ। বেশিরভাগই বিভিন্ন জন্তু ও পাখি। কিন্তু তার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে সেগুলি যেন জ্যান্ত হয়ে ওঠে। এগুলি যেন খেলাচ্ছলে করা। বোধহয় স্কুলের নতুন জীবনের বাঁধাধরা গতের মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার ফাঁকফোকরে খানিক হালকা হাওয়ার দোলা দিয়ে মনকে সতেজ রাখার চেষ্টা। এগুলি সম্ভবত কোথাও প্রদর্শিত হয়নি।

১৯৭৩-এ লীলা তখন দেরাদুনে, বিনোদবিহারী শান্তিনিকেতনে পাট উঠিয়ে পৌঁছলেন সেখানে। বিনোদবিহারী তখন আর চোখে দেখেন না। ১৯৭৬-এ চাকরি ছাড়লেন লীলা। পাকাপাকিভাবে এলেন দিল্লিতে, মেয়ের কাছাকাছি, একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে। শুরু করলেন ললিত কলা অ্যাকাডেমির স্টুডিওতে এচিং-এর কাজ। বাড়িতে চলছে জলরঙের কাজ। এতদিনের স্কুল-শিক্ষিকার জীবন থেকে মুক্তি পেতে লীলার জীবনে তখন সৃষ্টিসুখের মাতন। যদিও স্কুলে পড়ানোর সময় নিজের কাজ দিনেকের জন্যও বন্ধ করেননি তিনি। ১৯৫৭-’৫৮-র পর ’৭০-এও হয়েছে তাঁর প্রদর্শনী। বিনোদবিহারী চলে গেলেন ১৯৮০-তে। শেষ হল পারস্পরিক শ্রদ্ধা-ভালোবাসা দিয়ে মোড়া এক সম্পর্কের কাহিনি। পরের বছরদুয়েক লীলা মেতে রইলেন ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য নিয়ে। তাঁর কাঠের কাজের তুলনায় এগুলো আকারে ছোট। বেশিরভাগই ফুটখানেক বা ফুট দেড়েক। কিন্তু প্রত্যেকটিই অত্যন্ত গতিশীল। এগুলির গড়ন রৈখিক এবং বেশিরভাগই কোনও নাটকীয় মুহূর্তের। এইসব ভাস্কর্যের মধ্যেই অবশ্য দেখা যায় নর্তকীদের, যাদের স্কেচ করতেন তিনি।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

আছেন সংগীত শিল্পীরা, আবার সাধারণ গায়কেরা– গান যাঁদের জীবনধারণের অবলম্বন। আছেন যোদ্ধারা– হাতে খোলা তলোয়ার। আর অবশ্যই আছে বেশ কয়েকটি মা ও শিশু বা পিতা ও শিশুর মূর্তি। তার পূর্ববতী কাজগুলির মতো, এখানেও মিথুন-মূর্তির দেখা মেলে। কাজটির পরিচিতি ‘একস্ট্যাসি’ নামে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

সেই খণ্ড-মুহূর্তের ভাবাবেশ এক নাটকীয় মূর্ছনায় ধরা পড়ে এই কাজটিতে। আঙ্গিকের এই স্বকীয়তা, ভাষার বৈশিষ্ট্যে যে আদিম অনুষঙ্গ– তা তাঁর শিল্পভাষা-সম্বন্ধীয় জ্ঞানের দ্যোতক। তাঁর কাছে মানুষের সম্পর্ক ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। মা-শিশু হোক বা নরনারীর যৌথ মূর্তি হোক– সেখানে গভীর আবেগের প্রকাশ ঘটেছে। যেন এক পূর্ণ সমর্পণ।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

আবেগের এই গভীরতা শুধুমাত্র দৈহিক বিভঙ্গের মধ্যে দিয়ে ফুটিয়ে তোলাই তাঁর কাজের বৈশিষ্ট্য। এই ফিগারগুলির মুখের ভঙ্গিতে কোনও আবেগের অভিব্যক্তি নেই, আবার হাত-পায়ের গঠনও আলাদা করে দেখানো হয়নি সবসময়। এ যেন এক আবেগদীর্ণ মুহূর্তের ছবি আর সেই মুহূর্তের নাটকীয় ব্যঞ্জনা প্রকাশ করার জন্য প্রয়োজনীয় শরীরী ভাষারই ব্যবহার করেছেন তিনি। এই ভাস্কর্যগুলোর মধ্যে এক ধরনের স্পর্শময়তা অনুভব করা যায়। যেমনটি না কি বিনোদবিহারীর আবক্ষ মূর্তিতে। চোখে কালো চশমা, মাথাটি সামান্য হেলিয়ে রেখেছেন, একপাশে হাতে ধরা লাঠির মাথাটি। চোখ ঢাকা, অথচ শিল্পীর আবেগে সারা শরীর ব্যঞ্জনাময়। তবে এই পর্যায়েও তিনি বেশিদিন কাজ করেননি।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

একা থাকেন। বাড়ির একটা অংশে ভাড়া থাকে তরুণ শিল্পী রণবীর কালেকা। আর আছে ওমাবতী, তাঁর গৃহসহায়িকা। সারাদিন কী করেন লীলা? কখনও বাসে কখনও আবার লোকাল ট্রেনে চেপে ঘুরে বেড়ান সারাদিন। কামরার লোকজনদের স্কেচ করে চলেন অবিরত। স্কেচ করার অভ্যাস তাঁর শান্তিনিকেতনে থাকার সময় থেকেই। তাঁকে কখনও দেখা যেত ত্রিবেণী কলাসঙ্গমের সিঁড়িতে বসে মণিপুরী নৃত্যশিল্পীদের রিহার্সাল দেখছেন আর অবিরাম স্কেচ করে চলেছেন। দূরদর্শনের পর্দায় মহাভারত চলছে। তাঁর হাত কিন্তু থেমে নেই, স্কেচ করে চলেছেন। মানুষের অনুভূতির শারীরিক বিভঙ্গ তাঁকে চিরকাল আকর্ষণ করেছে, আর তাকেই ধরে রেখেছেন তিনি, দ্রুত হাতে করা চলমান রেখায়।

১৯৮২ থেকে বছর পাঁচেক তিনি ছাপাই ছবি নিয়ে মেতেছিলেন। ললিতকলার স্টুডিও-তে নিয়মিত গিয়ে এচিং ও লিথোগ্রাফ পদ্ধতিতে প্রায় ৫০টি কাজ করেন তিনি। যদিও এচিংয়ের সংখ্যাই বেশি। সেখানেও দেখা মেলে পাখিদের। আর আছে কিছু বিমূর্ত আকারমাত্রিক ছবি। আছে একটি আত্মপ্রতিকৃতিও। কোথাও বা রেখাগুলি পরস্পর সম্পৃক্ত আবার ভাঙাচোরা, কোথাও একাকী মানুষের ছবি, কোথাও বা দু’টি ফিগার, কোথাও শুধু জটিল রেখার সমাবেশ। যেন শিল্পী তাঁর শৈলী বা বিষয় নিয়ে খানিক দ্বিধাগ্রস্ত। কোথাও উজ্জ্বল রঙের ব্যবহার। এগুলি যেন উঠে আসে গভীর স্মৃতি, কল্পনা এবং অভিজ্ঞতার এক জটিল আত্মঅন্বেষণে।

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

শেষের দিকে অর্থাৎ নয়ের দশক জুড়ে শুধুই জলরং আর ক্রেয়নে করা ছবির এক রূপময় রঙিন জগত। এখানে শিশুরা আছে, আছে নাচিয়েদের ছন্দোবদ্ধ ছবি, ছোট শিশু ও তার চারপাশের দেখা জগতের ছবি। জীবনের রসে টইটুম্বুর যাপনচিত্র এগুলি। হলুদ সবুজ, নীল মেরুনের হালকা রেখা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এক আশ্চর্য জগতের ছবি। এইসব ছবির মধ্যেও উঠে আসে রাঢ় বাংলার প্রকৃতি, কখনও বা নেপালের জনজীবন। এই ছবিগুলির রেখার বিন্যাস, কম্পোজিশন আবার আমাদের বিনোদবিহারীর ছবিকে মনে করায়। বিশেষত সেই ছবিগুলি, যা তিনি আলোহীন অন্তরের স্মৃতিময়তা থেকে স্পর্শ করে করে আঁকতেন। তবু লীলার ছবির মধ্যে যে আকার, ভঙ্গি বা উদ্দীপনা অর্থাৎ তাদের অন্তরের কাঠামো– তা কিন্তু একান্তই তাঁর দেখা, ভালো লাগা চলমান, ঘটমান জীবনের সঞ্চয়। ছাতা মাথায় মেয়েদের এই ছবিটি যেমন হালকা রঙের কালির রেখায় ফুটিয়ে তোলা মুখের ভঙ্গিতে, চোখের চাউনিতে বদলে দেয় খুব চেনা এক দৃশ্যকে। 

শিল্পী: লীলা মুখোপাধ্যায়

বিনোদবিহারীর কাজের প্রতি, ভাবনার প্রতি, জ্ঞানের প্রতি তাঁর যে গভীর আবেগ ও শ্রদ্ধা– তা-ই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে আজীবন। তাঁর মৃত্যুর পরেও যেন তিনি আরও বেশি করে আত্তীকরণ করলেন এই মানুষটির বোধ ও চর্যাকে। ততদিনে মনজিৎ বাওয়া, মদনগোপাল, কেলকা ও আরও কিছু তরুণ শিল্পীর নিয়মিত আড্ডা বসে তাঁর বাড়িতে। সাংস্কৃতিক বিশ্ব-সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনা, সুফি গানের আসরের মধ্যে দিয়ে মেলবন্ধন চলে নতুন-পুরাতনের। ৫০ বছর একাদিক্রমে কাজ করেও তাই প্রতিটি কাজে ধরা দেয় এক অদ্ভুত সজীবতার স্পন্দন; যে সজীবতা সিঞ্চিত হয় তাঁর নিজের যাপন থেকে, অনুভব থেকে; যা হাসপাতালের শয্যায়, অসুস্থ শরীরেও তাঁকে প্রেরণা দেয় জীবনকে নতুন করে দেখতে। হাতে তুলে নেন কালি কলম ক্রেয়ন, এঁকে চলেন আঁকাবাঁকা রেখায়।

তাঁর নিজের জগতে তিনি একা। চলমান জীবন দৃশ্যের একক রূপকার। অশান্ত, অনন্ত সৃজনবেদনায় কাতর। আর সেই সৃজনবিশ্বের কেন্দ্রে তার ভাব-ভাবনা নিয়ে আলো ধরেন শিল্পী বিনোদবিহারী। আলো ধরে সযত্নে লালন করা এক টুকরো শান্তিনিকেতন। লীলা শান্তিনিকেতন ছেড়ে এসেছিলেন, কিন্তু সারাজীবন মনের মধ্যে সোনার ফ্রেমে যেন বাঁধিয়ে রেখেছিলেন তাঁর ভালোবাসার শান্তিনিকেতনের ছবি। দু’চোখ মেলে জীবনকে দেখেছেন। তাই তাঁর ছবিতে এত রং, তাঁর কাজে এত প্রানোন্মাদনা। লীলার কাজগুলি সন-তারিখ অনুযায়ী আলোচনা করা মুশকিল, কেননা সেভাবে কোথাও উল্লেখ নেই সময়কালের। তাঁর ভাবনার উত্তরণ ঘটেছে, শৈলীর গাম্ভীর্য বেড়েছে, কিন্তু তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহারের উৎসাহে ভাঁটা পড়েনি। এ যেন এক বহমান সময়ের দলিল, যেখানে বিভিন্ন মাধ্যমে, বিচিত্র ভঙ্গিতে, বিশিষ্ট হয়ে ওঠে তার মা ও শিশুরা। মানুষ কথা বলে মানুষের কানে, পশুপাখি গাছপালা নিজের নিজের বিশিষ্টতা নিয়ে সঙ্গী হয়ে ওঠে তাঁর সৃজনবিশ্বের। আর এভাবেই সৃষ্টি হয় আধুনিক ভারতীয় ভাস্কর্যের এক নতুন অধ্যায়– যেখানে সহজ সরল ভাবনা ও মানবিক গহীন আবেগের প্রতিচ্ছবি। 

১৯৮৯-এ দিল্লিতে তাঁর একক প্রদর্শনীর শিরোনাম ছিল ‘মেমোরি, মাইম অ্যান্ড ফ্যান্টাসি’। চেনা রাস্তা থেকে সরে ফুল-ফোটানো এই ব্যতিক্রমী শিল্পীর জীবনের, কাজের নির্যাস ধরে রাখে এই তিনটি শব্দবন্ধ– তাঁর স্মৃতি সত্তা আর ভাবনার বিস্তারের দ্যোতনায়।

তথ্যঋণ:
১. চিত্রকর, বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়
২. Leela Mukherjee A G Modernist, R Shivakumar, Tulika Books
৩. Contemporary Art in India, Prananath Mago

চিত্রঋণ: Leela Mukherjee A G Modernist, R Shivakumar, Tulika Books, মৃণালিনী মুখার্জি ফাউন্ডেশন

…………… পড়ুন চিত্রার্পিত কলামের অন্যান্য পর্ব ……………

পর্ব ৬ : প্রথম বাঙালি মহিলা ইলাস্ট্রেটর

পর্ব ৫ : গোপেশের খল ক্লাউনেরা

পর্ব ৪ : নন্দলালের ছাত্রী থেকে সশস্ত্র বিপ্লবী

পর্ব ৩ : অরুন্ধতীর ছবি: আলো ক্রমে আসিতেছে

পর্ব ২ : আমিনা করের ছবি যেন জীবনানন্দের কবিতা

পর্ব ১ : মনের মানুষের সন্ধানেই রানী চন্দের শিল্পনীড় রচনা