


‘শান্তিনিকেতনের শৈশবে’ কয়েক মাস তিনি নন্দলাল বসুর কাছে কলাভবনে ছবি আঁকার পাঠ নিয়েছিলেন। নন্দলাল বসু আগের মতোই প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের উপদেশ দিতেন। তাঁর প্রেরণায় আঁকা হল বেশ কিছু ছবি। জলরঙের ছবির সঙ্গে আরও নানা মাধ্যমে শিল্পসৃষ্টির শিক্ষা পেলেন। তখন কোনও বিভাগীয় বিভাজন না থাকায় সবাই ইচ্ছেমতো কাজ শিখতে পারত। এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় আন্দ্রে কর্পেলস-এর সঙ্গে। তাঁর কাছেই দেখেন তিনি অয়েল পেন্টিং ও উডকাট।
৮.
‘আমাদের বাল্যকালে ঝি-রাঁধুনি ছাড়া অন্য মেয়েদের রাস্তায় হাঁটতে দেখতাম না। আমাদের সমাজ পাড়া থেকে বেথুন কলেজ বেশি দূরে নয় অথচ ছুটির পর গাড়ি পাবার জন্য ঘণ্টা দুই স্কুলে বন্দী থাকতে হতো। আমরা একদিন ঠিক করলাম সবাই মিলে হেঁটে বাড়ি ফিরব। কলেজ থেকে হেঁটে বাড়ি ফেরার বিষয়ে আমরা পথপ্রদর্শক বলে দাবি করতেই পারি।’
–শান্তা দেবী
‘প্রবাসী’ সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বিদূষী কন্যা শান্তাদেবীর এই দাবি নিতান্তই অন্যায্য নয়, কিন্তু এটা সেই সময়ের কাহিনি যখন মেয়েদের পদে পদে বাধা, পাছে লোকে কিছু বলে! মেয়েরা তখনও ভীষণভাবে পর্দার ঘেরাটোপে বন্দি। কাজেই বেড়ি ভাঙার সূচনায় সহসা বড় রাস্তায় ‘দৃশ্যমান’ মেয়েদের প্রতি লোকজনের ‘উৎপাতে’, পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় তাদের বেশিদিন আনন্দ করার সুযোগ হয়নি। অতএব হাঁটার চাইতে দু’ঘণ্টা স্কুলে বন্দি হয়ে থাকাটাই উচিত মনে করলেন শান্তা ও তাঁর বান্ধবীরা। এ ঘটনা বিশ শতকের প্রথম দশকের প্রায় মাঝামাঝি।

কলকাতা থেকে দূরে, প্রবাসী এক পরিবারের দুই মেয়ে– সীতা ও শান্তা। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ এপ্রিল পরাধীন ভারতের রাজধানী কলকাতায় শান্তার জন্ম হয়েছিল। এদের আদি নিবাস ছিল বাঁকুড়ার পাঠকপাড়ায়। জীবনের প্রথম ১৫ বছর কেটেছিল এলাহাবাদে। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত আত্মনির্ভরশীল শান্তা, আলাদা ঘরে থাকতে ভালোবাসতেন, ভালোবাসতেন নিজের মতো চলতে। এলাহাবাদে প্রচণ্ড শীত, ঘুম পেলে কোট-বুট পরেই শুয়ে পড়তেন, নিজের আলাদা বিছানায়। অনেক পরে মা এসে জুতো খুলে নিতেন। ছোট্ট শান্তা তখন ঘুমের অতলে। বলছেন তিনি–
‘আমি ছিলাম স্বাধীন জেনানা। আমাকে কেউ খাইয়ে দিচ্ছে কি স্নান করাচ্ছে এসব মনেই নেই। নিজেই নিজের সব করতাম এবং বোধহয় এইজন্যেই আমি কারুর সঙ্গে শুতে ভালবাসতাম না।’
শান্তা ছিলেন বাড়ির বড় মেয়ে, ওপরে এক দাদা। তারপর জন্ম সীতার। সীতার পরে অবশ্য এক ভাই, জন্মাবার ক’দিন পরেই মারা গিয়েছিল। সীতা ফর্সা, গোলগাল, সুন্দরী। শান্তা অতটাও ফর্সা নন, নাকটাও একটু খাঁদা। কিন্তু সে ব্যাপারে তাঁর কোনও মাথাব্যথা ছিল না। ছোট থেকেই তাঁরা দুই বোন ছিলেন অভিন্নহৃদয়।
মা সারাদিনের ব্যস্ততার পর সময় পেলে গল্প শোনাতেন। রামানন্দবাবু তখন কায়স্থ কলেছের অধ্যাপক। ‘প্রবাসী’র প্রকাশনা সংগ্রহ ছাড়াও দেশবিদেশের বইয়ের সংগ্রহ তাঁর। সেখানে অবাধ গতায়াত দুই বোনের। এভাবেই রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের উদার প্রশ্রয়ে ছোট থেকে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে। ‘প্রবাসী’ ও ‘মর্ডান রিভিউ’ পত্রিকার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তৈরি করেছিল তার মনন।

মেয়েদের জন্যে এলাহাবাদে তখনও কোনও ভালো স্কুল ছিল না। পিতৃবন্ধু ইন্দুভূষণ রায় ও নেপালচন্দ্র রায় মেয়েদু’টির শিক্ষার ভার গ্রহণ করলেন। মাস্টারমশাই শোনাতেন বিদেশি লেখকদের গল্প। বছরে অন্তত একবার তাঁরা বাঁকুড়ায় পাঠকপাড়ার বাড়িতে আসতেন। সেখানে ছোট-ছোট মেয়েদের দেখতেন নানারকম ব্রত পালন করতে। এভাবেই প্রবাসে থাকলেও বঙ্গসংস্কৃতির সঙ্গে তাঁদের আলাপ হয়েছিল। মেসোমশাইয়ের কাছে শুনতেন রামায়ণ মহাভারতের পাঠ। শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল অনেকটাই। দাদাকে মা পড়াতেন, তাই শুনে শুনে পড়তে শিখেছিলেন প্রতিভাময়ী কন্যা।
১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে সপরিবারে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ফিরে এলেন কলকাতায়। দুই মেয়ে ভর্তি হলেন কলকাতার বেথুন স্কুলে। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়ে বিএ পাস করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পদ্মাবতী’ স্বর্ণপদক লাভ করলেন শান্তা। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও সংস্কৃত ভাষায় এবং অর্থনীতি ও গণিতে তাঁর পারদর্শিতা ছিল প্রশংসনীয়।
বাবার ইচ্ছেতে শান্তা ছবি আঁকা শেখা শুরু করলেন নন্দলাল বসুর কাছে। কিন্তু সেই শিক্ষা শেষ হওয়ার আগেই রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে শান্তিনিকেতনে চলে গেলেন নন্দলাল বসু। তখনকার মতো ছেদ পড়ল শিল্পশিক্ষায়। কিন্তু নন্দলাল বসুর চিত্রভাবনা তাঁর চোখ খুলে দিল। তিনি দেখতে শিখলেন আর সারাজীবন মনে রাখলেন চোখের দেখা কীভাবে চিত্রদর্শন হয়ে উঠতে পারে, তার গোড়ার কথাটি।
‘নন্দলালবাবু কতদিকে আমার দৃষ্টি খুলে দিয়েছিলেন যা আগে কখনও ভাবিনি। প্রকৃতির সমস্ত জিনিষই যে একটা ধরাবাঁধা নিয়মে চলে আগে তা ভাবতাম না। আমরা ভাবি গাছ এলোমেলো যেদিকে খুশি বাড়ে, কিন্তু তা নয়, তাদের কয়েকটা নির্দিষ্ট রূপ আছে, তারা তাই মেনে চলে– কোনটা গোলাকার, কোনটা ত্রিভুজাকৃতি, কোনটা সূচ্যগ্র, কোনটা মোটা মাথা এইরকম ।’

মাস্টারমশাইয়ের কাছেই জানলেন তিনি– কাঠ, পাথর, ধাতুর জিনিস সবের নিজস্ব একটা চরিত্র আছে, সেটা বুঝলে তবেই তাঁকে বদলে দেওয়া যায়। অনেকেরই ধারণা যে বেঙ্গল স্কুলের শিল্পীরা, কেবলমাত্র পুরনো ছবি নকল করে একই ধরনের শৈলীতে ছবি আঁকেন। শান্তা কিন্তু ওই অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের মতো ছবি আঁকার স্বাধীনতা পেয়েছিলেন। একথাও সত্যি যে অজন্তার ছবির কপি করতেও বলতেন নন্দলাল, কিন্তু সে মূলত অভ্যাসের জন্য, কারণ অজন্তার ছবিই তখন ছিল ভারতীয় শিল্পের আদর্শ।
শিল্পশিক্ষায় এই ছেদ অবশ্য ছিল সাময়িক। ছবি আঁকতেন তিনি, প্রদর্শনীও হয়েছে, ছবি ছাপা হয়েছে ‘প্রবাসী’ ছাড়াও নানা মাসিকপত্রের পাতায়। তবুও একথা তো অস্বীকার করা যাবে না যে, সীতার মতোই শান্তারও প্রথম ভালোবাসা ছিল সাহিত্য রচনা। ছোটবেলা অর্থাৎ এলাহাবাদের দিনগুলি তাঁরা ভরিয়ে রাখতেন কল্পনার নৌকোয় পাল তুলে গল্প বানিয়ে। সীতার গল্প শুনতেন শান্তা আর শান্তার গল্প শুনতেন সীতা, কখনও বা দু’জনে মিলে বানিয়ে ফেলতেন একটাই গল্প। আকাশে মেঘের খেলার মতোই রচনার পরই মুছে যেত সেসব কল্পগল্পরাশি। কত মানুষ যে আসতেন ওই বাড়িতে! কেউ থাকতেন অল্পদিন, কেউ বা বেশ কয়েকমাস। বিচিত্র তাদের স্বভাব, বিশিষ্ট তাদের ভাবনা। কাজেই গল্প-লিখিয়েদের চরিত্রের অভাব হত না। বড় হয়েও সেই অভ্যাস যায়নি তাঁদের। ১৯২২-এ দুই বোনের যৌথ প্রয়াসে বেরল হিন্দুস্থানী উপকথা, ‘ফোক টেইল্স অফ হিন্দুস্তান’ বইয়ের অনুবাদ। এত স্বচ্ছন্দ আর সহজগতি সে বইয়ের ভাষা যে মোটেই মনে হয় না সেটি অনুবাদ– তাও আবার দু’জনের করা! চমৎকার সেইসব উপকথার গল্পের সঙ্গে সুন্দর করে ছবি এঁকে দিয়েছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী।
ফিরে আসি আবার নতুন করে আঁকা শুরু করার কাহিনিতে। এবার কিন্তু তাঁর পথপ্রদর্শকের দায়িত্ব নিলেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। গগন ঠাকুরের নিজের ছবি ততদিনে নব্য ভারতীয় শৈলী ছেড়ে নতুন পথের দিশা খুঁজে নিয়েছে। রামানন্দবাবুকে তিনি পরামর্শ দিলেন কন্যাকে অবনীন্দ্রনাথের কাছে নিয়ে যেতে। একথা অনেকেই হয়তো জানেন যে, ‘প্রবাসী’তে যে সব ছবি ছাপা হত সেগুলি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অবনীন্দ্রনাথের এক প্রধান ভূমিকা ছিল। কাজেই ঘোড়ার গাড়ি চেপে সকন্যা রামানন্দ উপস্থিত হলেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির বিখ্যাত দক্ষিণের বারান্দায়। দক্ষিণের বারান্দার যে দৃশ্যটি নানা লোকের লেখা থেকে আমাদের মনে আঁকা হয়ে গিয়েছে, সেটি আরেকবার দেখে নেওয়া যাক শান্তা দেবীর চোখ দিয়ে।
‘জোড়াসাঁকোয় তাদের বড় ঘরের মেঝেতে তখন জাপানী মাদুরের গদি পাতা থাকত। দেয়ালে সবচেয়ে চোখে পড়ত তাঁর আঁকা “পদ্মপত্রে অশ্রবিন্দু” এবং তাঁর মাতৃদেবীর ছবিটি। মোগল আর্টের ছবিতে দেয়াল ভর্তি। দাক্ষিণাত্যের পিতলের বড় বড় প্রদীপাধার ঘরে ও বারান্দায় সাজানো, মাঝে মাঝে চীনা কি জাপানী টবে বামন মহীরুহ। তিনখানি চেয়ারে এইখানেই তিন ভাই বসতেন। গগনেন্দ্র তখন বেশীরভাগ কার্টুন আঁকতেন, অবনীন্দ্র জলরঙের ছবি। ছবি আঁকতে আঁকতে তিনি তাঁর সাদা পাঞ্জাবীতে তুলি মুছতেন। এইখানেই সব বাইরের লোকেরা তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে আসতেন। অনেক সময় ছবির থেকে চোখ না তুলেই তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন।… যখনই যেতাম দেখতাম তিনি ওই দক্ষিণের বারান্দায় ছবি আঁকছেন।’

রামানন্দবাবুর মেয়ে, সে তো নিজের লোক– ঘুরে ঘুরে ছবি দেখতেন শান্তা, নিজের মতো করে। অবনীন্দ্রনাথ তখন হিউয়েন সাং-এর ছবি আঁকছেন, সেই ছবিটি শেষ হলে শান্তাকে উপহার দিলেন। হাতে ধরে শেখাননি তিনি, সেভাবে, কিন্তু যেমন বলেছিলেন বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধবলীর ‘মত ও মন্ত্র’ প্রবন্ধে, তেমনভাবেই যেন ছবি আঁকার কিছু মন্ত্র শিখিয়ে দিলেন তিনি শান্তাকে। বুঝিয়ে দিলেন কেন সকলেই আর্টিস্ট নয়, কেউ কেউই শুধু আর্টিস্ট হতে পারে।
‘আর্টিস্ট আর সাধারণ মানুষে প্রভেদ এই যে আর্টিস্ট দেখে, সাধারণ মানুষ দেখে না।’
শান্তাকে একথা প্রায়ই বলতেন অবন ঠাকুর। তারপর আবার ব্যাখ্যা করে বলতেন–
‘আমরা যে আমাদের আত্মীয়-বন্ধুজনের মুখ মন থেকে আঁকতে পারি না, তার কারণ আমরা তেমন ভাল করে দেখি না। জিজ্ঞাসা করলে তার ভুরু চোখ নাক ঠোঁটের বর্ণনা সঠিক দিতে পারি না। আমরা বই পড়ি, কিন্তু অক্ষরগুলো! সমস্ত দেখি না, অর্ধেক আন্দাজে পড়ে যাই।’
শিল্প সৃষ্টির গোড়ার কথাই তো দেখা– চোখ দিয়ে দেখা নয় শুধু, মন দিয়ে দেখাও নয়, প্রাণ দিয়ে আত্মার মধ্যে অনুভব করে দেখা। এই দেখার করণ-কৌশল অচিরেই আয়ত্ত করলেন শান্তা। আঁকতে লাগলেন নানা ছবি। আর বাবার সঙ্গে মাঝেমাঝে ছবি দেখাতে যেতেন জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে। অবনীন্দ্রনাথ তাঁকে শেখাতেন ওয়াশ পেন্টিংয়ের করণ-কৌশল, কখনও বা চকিত রেখা টেনে দেখাতেন কীভাবে চুল আঁকতে হয় ভোঁতা তুলি দিয়ে। আর বিশদে গল্প করতেন– কীভাবে এই নব্য ভারতীয় শিল্পের সূচনা হয়েছিল তাঁদের হাতে; কীভাবে দেশি ধাঁচে শিল্পচর্চা করার জন্য তাঁরা বাড়ির মূল্যবান বিদেশি আসবাবপত্র সব বিক্রি করে দিয়ে নতুন করে দেশি ধরনের আসবাবপত্র তৈরি করেন। হাত চলে, সঙ্গে চলে কত কথা, ছাত্রদের অকারণ রং নষ্ট করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন আবার অবাক হয়ে লক্ষ করেন শান্তা– ভাঙা শ্বেতপাথরের থালায় কীরকমভাবে খোদাই করে ফুটিয়ে তোলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি। যেন উদাহরণ দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। তেমনভাবে দেখলে মনের থেকেই যে কোনও ব্যক্তির ছবি ফুটিয়ে তোলা যায়, বিশেষত সে যদি হয় তাঁর প্রিয় মানুষগুলোর একজন। কোনও এক সময় বলেন তাঁকে, কীভাবে শুধু স্মৃতির থেকে এঁকেছিলেন তিনি তাঁর মায়ের ছবিটি। এই ছবিটি ঘরে ঝোলানো অবস্থায় বহুবার দেখেছিলেন তরুণী শান্তা, এখন তাঁর অনুপ্রেরণাতে ইতিহাসও জানলেন। হয়তো এই ছবিটি দেখেই মা মনোরমা দেবীর স্কেচটি করেছিলেন শান্তা। নব্য ভারতীয় শিল্পশৈলীর অন্যতম প্রবক্তা ও ‘রূপম’ পত্রিকার সম্পাদক ও সি গাঙ্গুলির ভারি পছন্দ হয়েছিল ছবিটি, তিনি সেটি ‘রূপম’ পত্রিকায় ছাপেন।

অবনীন্দ্রনাথ তাঁকে বলেছিলেন, ‘কাগজ তুলি রংকে ভয় পেতে নেই। গেলই বা একটা ছবি নষ্ট হয়ে, যা চাও সাহস করে আঁকতে চেষ্টা কোরো।’ সারাজীবন এ কথাগুলি মনে রেখেছিল শান্তা। আর তাই পরবর্তীকালে স্মৃতিরোমন্থন করতে গিয়ে আক্ষেপ করে বলেছিলেন: ‘নিজের সময়ের অভাবেই সে চর্চাতে মরচে পড়ে গিয়েছে।’
স্মৃতির পাতায় সন-তারিখের হিসেব মেলানোর চেষ্টা বাদ দিয়ে ওঁর ছবি আঁকা শেখার গল্প শুনে নেওয়া যাক আর একটু। ১৯১৭ সাল। রামানন্দ তখন সপরিবারে শান্তিনিকেতনে, ছোটবেলায় এলাহাবাদে ‘মোগলাই পোশাকে’ দেখা রবীন্দ্রনাথ এখন দুই বোনেরই কাছের মানুষ। মাঝেমাঝে চলে আসতেন তাঁদের বাড়ি। আসতেন মীরা দেবী, প্রতিমা দেবীও।
‘সন্ধ্যায় আবার উপরের ছোট ছাদটিতে কবি ক্যাম্প চেয়ারে বিশ্রাম করতেন। তখন আমরা এবং আরও অনেকে সেখানে গিয়ে হাজির হতাম। কতরকমের গল্প আর আলোচনা যে হত তার ঠিক নেই। তাঁর মধ্যে থেকে থেকে শিশুরা এসে নানা আর্জি পেশ করে যেত। সে এক যুগ গিয়েছে যা কেউ আর কোনদিন ফিরে পাবে না। মনে পড়ে এই সময়ই রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইল না, রইল না”।’
সত্যিই তাদের জীবনে সে ছিল এক সোনার দিন, নন্দলালের কাছে আঁকা শেখা তো চলছেই, সঙ্গে আবার কবি স্বয়ং পড়াচ্ছেন শেলির কাব্য।
এই সময়ে অর্থাৎ ‘শান্তিনিকেতনের শৈশবে’ কয়েক মাস তিনি নন্দলাল বসুর কাছে কলাভবনে ছবি আঁকার পাঠ নিয়েছিলেন। নন্দলাল বসু আগের মতোই প্রকৃতি পর্যবেক্ষণের উপদেশ দিতেন। তাঁর প্রেরণায় আঁকা হল বেশ কিছু ছবি। জলরঙের ছবির সঙ্গে আরও নানা মাধ্যমে শিল্পসৃষ্টির শিক্ষা পেলেন। তখন কোনও বিভাগীয় বিভাজন না থাকায় সবাই ইচ্ছেমতো কাজ শিখতে পারত। এই সময়েই তাঁর পরিচয় হয় আন্দ্রে কর্পেলস-এর সঙ্গে। তাঁর কাছেই দেখেন তিনি অয়েল পেন্টিং ও উডকাট। কিন্তু মায়ের শারীরিক অবস্থার জন্য ফিরতে হয় কলকাতায়। সখ মিটিয়ে আঁকা। বিয়ের আগে, যে কোনও কারণেই হোক ছবি আঁকায় সহসা মেতে উঠেছিল তাঁর মন। সেসময় তিনি থাকতেন হোস্টেলের একটা ঘরে। তটিনী দাস, আশা অধিকারী এঁরা ছিলেন ওঁর সমসাময়িক। ছিলেন কিরণবালা সেন। মাঝেমাঝে তিনি আসতেন ছবি দেখাতে। সমসাময়িক কলাভবনের একটি সুন্দর ছবি ধরা দেয় তাঁর লেখনীতে।
‘ছেলেদের ক্লাসে দেখতাম রমেন্দ্রনাথ, প্রভাতমোহন, মণীন্দ্রভূষণ, ধীরেন্দ্র দেববর্মা, ভি. মাসোজি এবং আরও কয়েকজন। তখন ছেলেরা এবং মেয়েরা আলাদা শিখতেন, কারও সঙ্গে কারুর পরিচয় বিশেষ হত না। দুই-একজন আপনা থেকেই পরিচয় করে নিতেন মাঝে মাঝে।
তখন একটা কারখানা ঘর হয়েছিল প্রতিমা দেবীর বিশেষ আগ্রহে। সেখানে বই বাঁধানো, কাঠের পুতুল তৈয়ারী ও রং করা এবং নানারকম সেলাই প্রভৃতি হত। মাসিমা বলে পরিচিত একজন মহিলা আলপনা ও সেলাইয়ে পাকা ছিলেন। এর নাম সুকুমারী দেবী। কাঠের উপর সুন্দর রঙে গালার কাজ নন্দলালবাবুও করতেন, ছাত্ররা শিখে নিত। এই সময় থেকে ধীরে ধীরে ভারতীয় নক্সা ও সেলাইয়ের ফোড় দেশে আবার চলতে থাকে। আগে বাংলাদেশে অন্তত সবাই বিলাতী ধরনে ছুঁচের কাঁজ করত। কিছুদিন কাঠোয়ারী কাজের খুব চলন শান্তিনিকেতন ও কলকাতায় চলেছিল। কসিদার কাজ এবং কাশ্মীরী কাজও অনেকে তখন শিখত।’

এসময় তাঁর কয়েকটি ছবি বিক্রিও হয়েছিল আর প্রদর্শনীও হয়েছিল বেশ কয়েকটি। ততদিনে কিন্তু লেখালেখির জগতে তাদের দুই বোনের পরিচিতিও বেড়েছে। সংযুক্তা দেবী নামে ‘উদ্যানলতা’ উপন্যাস লিখেছেন যৌথভাবে। তবে সীতা দেবী লেখিকা হিসেবে ছিলেন বেশি সক্রিয়।
এ তো গেল সলতে পাকানোর গল্প। এবার ওঁর ছবির কথায় আসা যাক। নব্য ভারতীয় শৈলীর দুই পথিকৃতের কাছে আঁকা শেখায় তাঁর ছবিতে বেঙ্গল স্কুল ঘরানার সুস্পষ্ট ছাপ রয়েছে; কিন্তু ক্রমান্বয়ে ছবির চর্চা না করলেও ধীরে ধীরে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক নিজস্ব চিত্রবয়ান। তার অনুপুঙ্খ দর্শন ছবিকে প্রাণবন্ত করে তোলে। তার ছবির আর একটি দিক– অনায়াস, স্বাভাবিক ভঙ্গি। এই ভঙ্গির সহজ গতি ছন্দিত হয় তাঁর ছবির বিষয়বস্তুকে ঘিরে। অথচ সেগুলি খুবই পরিচিত দৃশ্য। হয়তো কেউ চলেছে হাটের পথে– তার চলার ছন্দটি ধরা রইল ছবির পাতায়; কেউ জলের ঢেউয়ের দোলায় ভাসিয়ে দিচ্ছে তার হাতের প্রদীপ সাজানো ডালা– সেই নিবেদনের মধুর ভঙ্গিটি ঢেউয়ের ছন্দে উঠল স্পন্দিত হয়ে। আবার ছোট শিশুটি বড় ফুলগাছের ছোট ডালটি ভেঙে ফুল সমেত পুঁতে দিচ্ছে তার বাগানে, হাতে ধরা লাল ফুল ফোটাবার স্বপ্নটি জেগে রইল ছবির গভীরে। তাঁর লেখা পড়লে বোঝা যায় খুঁটিনাটি জিনিসের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল অসীম। খুব ছোট ছোট অনুভূতির বদল, ছোট ঘটনাও তাঁর নজর এড়াত না। আর তাঁর ছবিতেও ধরা দেয় এমনই সব সাধারণ অথচ হৃদয়ছোঁয়া অনুভূতির চিত্রায়ন। যেমন আগেই উল্লেখ করা নিচের ছবিটিতে।

ছবিটি ছাপা হয়েছিল ‘প্রবাসী’তে, নাম ‘খুকির বাগান’। ছোট্ট মেয়েটি একমনে তার একফালি বাগানের পরিচর্যারত। ছোট ছোট গাছগুলোতে ফুলও ফুটেছে। বালিকাটির হাতে ভাঙা ডালে দু’টি ফুল ফুটে রয়েছে। একমনে সেটি দেখছে সে, যেন ভাবছে কবে তার ছোট্ট বাগান আলো করে অমন দু’টি ফুল ফুটবে। শিল্পীও পরম যত্নে এঁকেছেন বাগানখানি আর তার মালকিনকে। ছোট মেয়েটির ডান হাতে একগাছা চুড়ি, বাঁ হাতটি শাড়ির ভাঁজে ঢাকা পড়েছে, কিন্তু লক্ষণীয় তার নকশা করা পায়ের মলটি।

এই ছবিটি– নদীর জলে প্রদীপ ভাসানোর যে প্রথা আজও প্রচলিত আছে, তারই একটি দৃশ্যায়ন। এই ছবিটিতে রংয়ের ব্যবহারের মুনশিয়ানা লক্ষণীয়। বিশেষত নদীর ঢেউ এবং প্রদীপের আলোকরেখা বড় সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন তিনি। নৌকোর মধ্যে থেকে সামান্য ঝুঁকে প্রদীপ ভাসানোর মধ্যে বড় কোমল এক নিবেদনের ভাষ্য ফুটে উঠেছে। নৌকোটির দৃশ্যমান অংশটুকু ডিটেইলে আঁকা হলেও, এখানে সেটি প্রেক্ষাপটের কাজ করছে মাত্র।
এরকমই আরেকটি কোমল-মধুর ছবি ছোট শিশুর নৌকা ভাসানোর দৃশ্যটি।

জলের রঙের সঙ্গে একটুকরো পারের আভাস, রংয়ের সুচিন্তিত ব্যবহারে এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। লক্ষ করে দেখলে বোঝা যায়, তাঁর ড্রয়িং কিন্তু অনেক স্বাভাবিক। বেঙ্গল স্কুলের শিল্পীদের আদর্শায়িত গড়ন নয় তাঁর আঁকা চরিত্রগুলির। ছেলেটির পায়ে নজর এড়ানোর জন্যে বাঁধা কালো কারটি দেওয়ার ফলে ছবিটির মধ্যে এক স্থানিক বা কালিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ছেলেটির মনের উত্তেজনার প্রকাশ ঘটেছে তার দুই চোখে। হালকা রঙের ব্যবহারে সৃষ্ট নানা বর্ণচ্ছায়ে আঁকা ছবিটি যেন রবীন্দ্রনাথের একই নামের কবিতার চিত্ররূপ ।
‘আমার নৌকা ভাসাইয়া জলে
চেয়ে থাকি বসি তীরে।
ছোটো ছোটো ঢেউ ওঠে আর পড়ে,
রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে,
আকাশেতে পাখি চলে যায় ডাকি
বায়ু বহে ধীরে ধীরে।’

এই ছবিটির বিষয়টি লক্ষ করার। ছোট ছেলেমেয়েদু’টি মেলা দেখে ফিরে যাচ্ছে, বাড়ির দিকে। সম্ভবত গ্রামের কৃষিজীবী কোনও মুসলমান পরিবার। মেয়েটির পোশাক এবং শিশুটির মাথার ফেজ টুপি সেটিই ইঙ্গিত করে। এই ছোট-ছোট সূচকের মাধ্যমে তিনি ছবির মধ্যে গল্প বুনে দেন। দু’হাতে নিজের সওদা গুছিয়ে চলেছে মেয়েটি। মেলায় যাবে বলে চুলে ফুল গুঁজেছে, গলায় একটা বাহারে হার। অন্য শিশুটির পরনেও ভালো পোশাক। কিন্তু সবচেয়ে মজার যে, তাদের অভিভাবক পুরুষটির ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত হলেও পায়ে কিন্তু নাগরা। এদের প্রত্যেকের ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি ছবিটির মধ্যে তাদের চলার শান্ত মন্থর ছাঁদটিতে সজীবতার ছোঁয়া লাগিয়েছে।

শান্তা দেবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছবি এটি। প্রকৃতির রুদ্র রোষের সামনে মানুষের অসহায়তার এক করুণ সংবেদনশীল, বাস্তবানুগ দৃশ্যায়ন ঘটেছে ছবিটিতে। কুটিরের সামনের সমূলে উৎপাটিত গাছটি যেন মানুষের মতোই ভিটেটুকু আঁকড়ে ধরতে চাইছে তাঁর ডালপালা দিয়ে। শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরা মায়ের ভঙ্গিতে ধরা পড়ে উৎকণ্ঠা, অন্য নারীদের ভয়কাতর আলোচনা যেন শোনা যাবে কান পাতলেই। অসহায় একমাত্র পুরুষটি এদের দিকে পেছন ফিরে কি নিজের অক্ষমতা গোপন করছে, না কি সে তার দুশ্চিন্তা লুকিয়ে রাখতে চাইছে? এই ছবির রঙের ব্যবহার অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। সাদা এবং অকার ইয়েলোর প্রেক্ষিতে প্লাবনের রঙিন উচ্ছ্বাস এক অদ্ভুত বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। সাদা শাড়ি বৈধব্যের চিহ্ন, কিন্তু এক্ষেত্রে যেন তা ঘর ভরা এক শূন্যতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। চালের কাছাকাছি ভেজা কাকটিও তো একই বিপন্নতার শরিক। ভাঙা গাছ ও পুরুষটির ড্রয়িং নন্দলালকে মনে করায়। তবে নারী চরিত্রগুলিতে দৈহিক পেলবতা ও মানসিক শক্তি সঞ্চয়ের প্রয়াসের এক অপূর্ব দ্যোতনা প্রকাশ পায়।

অন্য ছবিগুলির তুলনায় এই ছবিটিতে শান্তা দেবী অনেক বেশি নব্য বঙ্গীয় শিল্পধারার অনুসারী। যদিও ছবির শিরোনাম জানাচ্ছে এটি অর্জুনের ছবি। তাঁর দেহভঙ্গির নমনীয়তা ওই বিশেষ ঘরানার কথা মনে করায়। গাছের ড্রয়িং পাহাড়ি অনুচিত্রের ধরনে। এটি সম্ভবত কিরাতের ছদ্মবেশে অর্জুনের ছবি। কারণ এখানে তাঁর যোদ্ধাসুলভ বেশবাস কিছুই নেই। বরং শিরোনাম না থাকলে অনায়াসেই তাঁকে কিরাত বলে মনে করা যেত। অবশ্য ধনুকের দৈর্ঘ্য, সেটিকে গাণ্ডীব বলে চিনিয়ে দেয়। এই ছবিতে রঙের বৈচিত্র তেমন না থাকলেও রঙের বৈপরীত্যের সাহায্যে এক সহজ-সরল ভাবের প্রকাশ ফোটানো হয়েছে। বিশেষত পীতবস্ত্রের সঙ্গে ধূসর মালকোচার ব্যবহার এবং ঝোপঝাড়ের রঙের বৈশিষ্ট্য নিঃসন্দেহে দৃষ্টিনন্দন।
তাঁর আঁকা মনোরম প্রতিকৃতিগুলির উল্লেখ আগেই করেছি। তাঁর অন্যান্য প্রিয় মানুষগুলি, বিশেষত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, স্বামী ড. কালিদাস নাগ এবং সীতা দেবীর প্রতিকৃতিও এঁকেছিলেন তিনি। কলকাতায়, মাদ্রাজে, রেঙ্গুনে তাঁর ছবি যে শুধু প্রদর্শিত হয়েছিল তা নয়, তিনি পুরস্কৃতও হয়েছিলেন। তবে কলকাতার একটি প্রদর্শনীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক বেদনাময় কাহিনি। কলকাতার পোড়াবাজারে একটি প্রদর্শনীতে তাঁর একাধিক ছবি ছিল। পরবর্তীকালে লিখেছিলেন–
‘নামেও পোড়াবাজার কাজেও পোড়াবাজার! ওই প্রদর্শনীতে আমি অনেকগুলি ছবি দিয়েছিলাম। আগুন লেগে প্রদর্শনী পুড়ে যায়। অন্যদের সঙ্গে আমার ছবিগুলিও অগ্নিদেব গ্রাস করলেন।’
আগেই বলেছি, গগনেন্দ্রনাথ ছিলেন শান্তার প্রধান উৎসাহদাতা। ইউরোপের কোনও একটি দেশে ছবি পাঠাবেন। শান্তার করা দু’টি অয়েল পেন্টিং– শান্তিনিকেতন ‘আশ্রমের মাটির ঘরের দৃশ্য’ তাঁর খুব পছন্দ হল; চেয়ে নিলেন ছবিদু’টি প্রদর্শনীতে পাঠাবেন বলে। জাহাজডুবি হয়ে অন্যান্য সবার ছবির সঙ্গে সে ছবিগুলিরও সলিল সমাধি হল। ‘তবু আগুনে পোড়ে না যা ডোবে না জলে’– তা হল শিল্পীর প্রতিভা। আর সেই শিল্প-প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে ‘প্রবাসী’, ‘মডার্ন রিভিউ’তে ছাপা বা ‘চ্যাটার্জিস আলবাম’ নামক সংকলনের পাতার ছবিগুলি। যা আজও রসিক দর্শকের কাছে তাঁর অভিজ্ঞান হয়ে রয়েছে। মৃত্যুর বছর খানেক আগে ১৯৮২ সালে কলকাতার বিড়লা অ্যাকাডেমিতে তাঁর জীবিতকালের শেষ প্রদর্শনীটি হয়। এছাড়া সীতাদেবীর লেখা কোনও কোনও গল্পেও ছবি এঁকে দিতেন তিনি। ছবি আঁকা ছাড়া, সেকালের রীতি অনুসারে প্রচুর এমব্রয়ডারির কাজও তিনি করেছেন। যদিও সেগুলি কোনও প্রদর্শনীতে দেননি। আসলে সে যুগে এসব কাজের যে কোনও শৈল্পিক গুরুত্ব আছে, লোকের মনে সে ধারণাই ছিল না। ঘরে ঘরে এসব শিল্পকলার অসংখ্য নমুনা আজ তাই অযত্ন ও বিস্মৃতির ধুলোয় ঢাকা পড়ে নষ্ট হয়ে গিয়েছে।

সারা পৃথিবী ঘুরেছেন তিনি। আর জীবনস্রোতের ঘাটে ঘাটে দায়িত্ব পালন আর অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরতে ভরতে কখন যেন তাঁর ছবি অভিমানে, ছেড়ে চলে গেছে তাঁকে। জীবনের অলিন্দে শেষ সূর্যের রশ্মি যখন দীর্ঘ ছায়া ফেলছে, তখন কি যেন এক গভীর অভিমানে লিখছেন–
‘যদি সংসারের তলায় তলিয়ে না যেতাম, এই পর্যবেক্ষণের দীক্ষা বড় কোন কাজে দিয়ে যেতে পারতাম। পৃথিবীর নানা ঐশ্বর্যের ভিতর যে রেখা ও রঙের ছন্দ অনুক্ষণ নানাভাবে ফুটে আছে এবং ফুটে উঠছে, তা দেখবার শক্তি অল্পদিনেই কিছু লাভ করেছিলাম, কিন্তু পরে নানা তুচ্ছতার ধোঁয়ায় সে দৃষ্টি আচ্ছন্ন হয়ে গেছে মনে করে ছুঃখ পাই।’
কিংবা
‘একসময় ভাবতাম আমি হয়ত ভাল শিল্পী হতে পারব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই হল না। মনে করে খুশি হই যে কোন কোন ছবির জন্য সমঝদারদের প্রশংসা পেয়েছিলাম। অথচ এখন সামান্য একটা ছবিও আঁকতে পারি না।’
একজন শিল্পীর এ আক্ষেপ মর্মস্পর্শী। তাঁর অবনগুরু তো বলেইছিলেন– সবসময়েই মনে হয় শিল্পীর, কিছুই যেন হল না। শান্তাদেবীর এ ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর চার দশক পরেও এই উত্তাল পৃথিবীতে তাঁর ছবিগুলো নিয়ে আসে হারিয়ে যাওয়া শান্ত জীবনের এক ঝলক সুবাতাস। আর সেটাই কি সেই বিদূষী, গুণী, আদ্যন্ত শিল্পী মানুষটির সৃজনী প্রতিভার স্বীকৃতি নয়?
…………… পড়ুন চিত্রার্পিত কলামের অন্যান্য পর্ব ……………
পর্ব ৭ : আধুনিক ভাস্কর্যের লীলাভূমি
পর্ব ৬ : প্রথম বাঙালি মহিলা ইলাস্ট্রেটর
পর্ব ৫ : গোপেশের খল ক্লাউনেরা
পর্ব ৪ : নন্দলালের ছাত্রী থেকে সশস্ত্র বিপ্লবী
পর্ব ৩ : অরুন্ধতীর ছবি: আলো ক্রমে আসিতেছে
পর্ব ২ : আমিনা করের ছবি যেন জীবনানন্দের কবিতা
পর্ব ১ : মনের মানুষের সন্ধানেই রানী চন্দের শিল্পনীড় রচনা
তথ্যসূত্র:
১. পূর্বস্মৃতি, শান্তা নাগ, প্যাপিরাস
২. চিত্রাঙ্কনে বাংলার মেয়ে, জানকীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়
চিত্র-ঋণ: নারায়ণ সাহু, গৌরবকেতন লাহিড়ী
A Unit of: Sangbad Pratidin Digital Private Limited. All rights reserved